বিপদে দোয়া প্রার্থনা

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২২ আগস্ট ২০১৯      

মো. মুক্ত হাসান

আরবি ভাষায় দোয়া শব্দের অর্থ দ্বিবিধ। প্রথমত, বিপদাপদ দূরীকরণ ও অভাব পূরণের জন্য কাউকে ডাকা এবং দ্বিতীয়ত, যে কোনো অবস্থায় কাউকে স্মরণ করা অর্থাৎ অভাব পূরণের জন্য স্বীয় পালনকর্তাকে ডাকা অথবা পালনকর্তার ইবাদত করা। দোয়ার আদব হলো, অপারগতা, অক্ষমতা, বিনয় ও নম্রতা প্রকাশ করে দোয়া করা। দোয়া কবুল হওয়ার জরুরি শর্ত হলো, বলার ভঙ্গি ও দোয়ার আকার-আকৃতি বিনয় এবং নম্রতাসূচক হওয়া। কারণ দোয়ার ভাষা ও অক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য হতে হবে।

আজকাল জনসাধারণ যে ভঙ্গিতে দোয়া প্রার্থনা করে, একে দোয়া প্রার্থনা না বলে বরং দোয়া পড়া বলা উচিত। কেননা প্রায়ই জানা থাকে না যে, মুখে যে শব্দগুলো উচ্চারণ করা হচ্ছে, তার অর্থ কী? তারা অর্থ না বুঝেই ইমামের আবৃত্তি করা বাক্যাবলির সঙ্গে সঙ্গে আমিন আমিন বলতে থাকেন। দোয়া প্রার্থনার যে স্বরূপ, তা এ ক্ষেত্রে পাওয়া যায় না। এটা ভিন্ন কথা যে, আল্লাহতায়ালা স্বীয় কৃপায় এসব নিষ্প্রাণ বাক্যও কবুল করে নিতে পারেন। কিন্তু এ কথা বোঝা দরকার যে, দোয়া প্রার্থনা পাঠ করার বিষয় নয়। সুতরাং চাওয়ার যথার্থ রীতি অনুযায়ী চাইতে হবে। এ ছাড়া যদি কারও নিজ বাক্যাবলির অর্থও জানা থাকে এবং তা বুঝেই বলে, তবে বলার ভঙ্গি এবং বাহ্যিক আকার-আকৃতিতে বিনয় ও নম্রতা ফুটে না উঠলে এ দোয়া দাবিতে পরিণত হয়।

চুপি চুপি ও সংগোপনে দোয়া করা উত্তম এবং কবুলের নিকটবর্তী। কারণ, উচ্চস্বরে দোয়া চাওয়ার মধ্যে প্রথমত বিনয় ও নম্রতা বিদ্যমান থাকা কঠিন। দ্বিতীয়ত, এতে রিয়া ও সুখ্যাতির আশঙ্কা রয়েছে। এ কারণেই খয়বর যুদ্বের সময় দোয়া করতে গিয়ে সাহাবায়ে কেরামের আওয়াজ উচ্চ হয়ে গেলে রাসুল (সা.) বলেন :তোমরা কোনো বধিরকে অথবা অনুপস্থিতকে ডাকাডাকি করছ না যে, এত জোরে বলতে হবে; বরং একজন শ্রোতা ও নিকটবর্তীকে সম্বোধন করছ। স্বয়ং আল্লাহতায়ালা জনৈক সৎকর্মীর দোয়া উল্লেখ করে বলেন :অর্থাৎ যখন সে পালনকর্তাকে অনুচ্চস্বরে ডাকল, এতে বোঝা যায় যে, অনুচ্চস্বরে ডাকা আল্লাহতায়ালার পছন্দনীয়। হজরত হাসান বসরী (রহ.) বলেন :প্রকাশ্যে ও সজোরে দোয়া করা এবং নীরবে ও অনুচ্চস্বরে দোয়া করা এ দুয়ের ফজিলত ৭০ ডিগ্রি তফাত রয়েছে (ইবনে কাসির, মাযহারি)। আল্লাহ বলেন, তোমরা স্বীয় প্রতিপালককে ডাক, কাকুতি-মিনতি করো এবং সংগোপনে; তিনি সীমা অতিক্রমকারীদের পছন্দ করেন না (সুরা আল-আরাফ :৫৫)। বস্তুত আল্লাহর নাফরমানিরই অপর নাম সীমা অতিক্রম করা। কারণ এ বিশ্বচরাচর ও এর প্রত্যেকটি ক্ষুদ্র-বৃহৎ বস্তু আল্লাহতায়ালার সৃষ্ট এবং তাঁর আজ্ঞাধীন। মানুষ যতদিন আল্লাহর আজ্ঞাধীন থাকে, ততদিন এসব বস্তুও মানুষের খাদেম হয়ে থাকে। পক্ষান্তরে মানুষ যখন আল্লাহর অবাধ্যতা করতে শুরু করে, তখন জগতের প্রত্যেকটি বস্তু অজান্তে ও পরোক্ষভাবে মানুষের অবাধ্য হয়ে ওঠে। হয়তো মানুষ চর্মচক্ষে দেখে না; কিন্তু এসব বস্তুর প্রভাব, বৈশিষ্ট্য, পরিণাম বা উপকারিতার প্রতি লক্ষ্য করলে এর প্রমাণ পরিলক্ষিত হয়।

সমাজের অবস্থার প্রতি লক্ষ্য করলে দেখা যায়, আরাম-আয়েশ ও প্রাচুর্য থাকা সত্ত্বেও মানবগোষ্ঠীর মাঝে অস্থিরতা, নতুন নতুন রোগ-ব্যাধি ও বিপদাপদ ভিড় জমাচ্ছে। কোনো ধনকুবেরই স্বস্থানে নিশ্চিন্ত ও তৃপ্ত নয়। বরং আধুনিকতা সাজসরঞ্জাম আল্লাহর নাফরমানি যে হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে; ডেঙ্গু, চিকুনগুনিয়া, ম্যালেরিয়া, নিপা ভাইরাস, এইডসের মতো নিত্যনতুন রোগ-ব্যাধি ও অস্থিরতা অনুরূপ বেড়ে চলছে। এটা কোনো কবির কল্পনা নয়, বরং এমন একটি বাস্তব সত্য, কোরআন ও হাদিস যার সাক্ষ্য। আল্লাহর শাস্তির হালকা নমুনা এ জগতে রোগ-ব্যাধি, মহামারি, ঝড় ও বন্যার আকারে দেখা দেয়। সুতরাং সব রোগ-ব্যাধি ও বিপদাপদ থেকে মুক্তির জন্য বিনয় ও নম্রতা সহকারে আল্লাহর কাছে দোয়া করতে হবে। এক হাদিসে রাসুল (সা.) বলেন : বান্দা যতক্ষণ কোনো গোনাহ অথবা আত্মীয়তার সম্পর্কছেদের দোয়া না করে এবং তড়িঘড়ি না করে, ততক্ষণ তার দোয়া কবুল হতে থাকে। সাহাবায়ে কেরাম আরজ করলেন, তড়িঘড়ির দোয়া করার অর্থ কী? তিনি বললেন :এর অর্থ হলো, এরূপ ধারণা করে বসা যে, আমি এত দীর্ঘদিন থেকে দোয়া করছি অথচ এখনও পর্যন্ত কবুল হলো না! অতঃপর নিরাশ হয়ে দোয়া ত্যাগ করা (মুসলিম, তিরমিজি)।