ইসলামে পরোপকারের তাগিদ

প্রকাশ: ২৩ আগস্ট ২০১৯     আপডেট: ২২ আগস্ট ২০১৯      

ড. মো. শাহজাহান কবীর

মানুষের সৎগুণাবলির অন্যতম হচ্ছে পরোপকার। পরোপকার হচ্ছে, অন্যের প্রয়োজনে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য-সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেওয়া। বিপদে-আপদে পাশে থাকা ও যথাসম্ভব সহযোগিতা করা। সামাজিক জীব মানুষ। একে অপরের সহযোগিতা ছাড়া জীবনযাপন করা প্রায় অসম্ভব। যখন কোনো সমাজে একে অপরের প্রতি সহযোগিতার মনোভাব হ্রাস পায়, সে সমাজের মানুষ সব দিক দিয়েই পিছিয়ে পড়ে। সে সমাজে অরাজকতা ও বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়, শান্তি হ্রাস পায়। পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ কমে যায়। সম্পর্কের ক্ষেত্রে দূরত্ব তৈরি হয়।

এমন অনেক সমস্যা আছে, যা একা কোনো ব্যক্তির পক্ষে সমাধান করা সম্ভব নয়। তবে তার সঙ্গে যদি এক বা একাধিক ব্যক্তির শ্রম ও প্রচেষ্টা জড়িত হয়, তাহলে ওই সব সমস্যার সমাধান সহজেই হয়ে যায়।

ইসলাম শান্তি ও সহানুভূতির ধর্ম। পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন এবং সহযোগিতার মনোভাব ইসলামের অন্যতম আদর্শিক বিষয়। এ জীবন শুধু নিজের ভোগ-বিলাসিতার জন্য নয়; বরং গোটা সৃষ্টির উপকার সাধন এবং কল্যাণকামিতা প্রত্যেক মানুষের অন্তরে জাগ্রত থাকবে, এটাই ইসলামের বিধান। রাসুলে কারিম (সা.) বলেছেন, সমগ্র সৃষ্টি আলল্গাহর পরিবার। তাই পরোপকারের চেতনায় কোনো শ্রেণিভেদ নেই। বড়-ছোট, ধনী-গরিব, আত্মীয়-অনাত্মীয়, স্বজাতি-বিজাতি, মুসলিম-অমুসলিম এসব ব্যবধানের ঊর্ধ্বে উঠে ইসলামের শান্তি ও সৌহার্দ্যের সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেন তিনি।

অনাথ-অসহায় ও দারিদ্র্যপীড়িত অনাহারীর কষ্টে সমব্যথী হতে আলল্গাহতায়ালা রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন। নিঃস্ব ও অভাবীর অভাব মোচনে জাকাত ফরজ ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে বেশ কিছু আয়াত নাজিল করেছেন। যেমন-সুরা আল হাদিদের ১১ আয়াতে এরশাদ হয়েছে : 'কে আছে যে আলল্গাহকে উত্তম ঋণ কর্জে হাসানা দেবে, তা হলে তিনি তার জন্য একে বর্ধিত করে দেবেন এবং তার জন্য সম্মানজনক প্রতিদানও রয়েছে।'

অন্যত্র সুরা আল-বাকারার ২৬২ আয়াতে এরশাদ হয়েছে :'যারা আলল্গাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, কিন্তু রটনা করে না। অর্থাৎ দানের খোঁটা দেয় না, আর যাকে দান করেছে তাকে কষ্টও দেয় না, এর প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে; পরকালে তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।' সুরা আল-হাদিদের ১৮ আয়াতে এরশাদ হয়েছে :'নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, যে ক্ষেত্রে তারা (বিশুদ্ধ অভিপ্রায়ে) আলল্গাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদের প্রতিদান বর্ধিত করা হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান' (সুরা আল-হাদিদ, আয়াত :১৮)।

প্রখ্যাত সাহাবি জাবির ইবনে আবদুলল্গাহ বলেন :রাসুলে কারিম (সা.) জীবনে কখনও কাউকে 'না' বলেননি। তাঁর বদান্যতা, পরোপকার, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে অবদানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মানবসেবায় গুরুত্ব আরোপ এবং এতে উদ্বুদ্ধ করে রাসুলুলল্গাহ (সা.) অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন।

মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তাঁর চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এতই উন্নত যে, পরোপকার তথা অন্যের কল্যাণকামিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। মহান আলল্গাহ তাঁকে গোটা মানবজাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই, যা তাঁকে স্পর্শ করেনি। এমন কোনো অনুভূতি নেই, যা তিনি অনুভব করেননি। তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে :'আমি প্রেরিত হয়েছি উন্নত চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য' (আল হাদিস)।

পরোপকারিতার প্রতি গুরুত্ব আরোপ করে মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, 'আলল্গাহ অন্য মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনকারীর প্রতি দয়া করেন। তোমরা জগদ্বাসীর সঙ্গে দয়া ও উপকারিতার আচরণ করো। তাহলে আসমানের মালিকও তোমাদের প্রতি দয়া ও মমতার আচরণ করবেন।' এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, ইসলাম শত্রু-বন্ধু-নির্বিশেষ সবার সঙ্গে এমনকি সব সৃষ্ট জীবের সঙ্গে দয়া-মমতা ও উপকারিতামূলক আচরণ প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছে। ইসলামে মানবসেবা ও পরোপকারের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে উলেল্গখ আছে, রাসুলে কারিম (সা.) এরশাদ করেন- 'কিয়ামত দিবসে নিশ্চয় আলল্গাহতায়ালা বলবেন, 'হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করোনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক, আপনি তো বিশ্ব পালনকর্তা, কীভাবে আমি আপনার শুশ্রূষা করব?' তিনি বলবেন, 'তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কি জান না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে, তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে?' 'হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম; কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্ব পালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?' তিনি বলবেন, 'তুমি কি জান না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল; কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাওনি।' 'হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাওনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামিন, তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?' তিনি বলবেন, 'তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল; কিন্তু তাকে তুমি পান করাওনি। তাকে যদি পান করাতে, তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।'

সহকারী অধ্যাপক, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা