সহানুভূতির শিক্ষা

প্রকাশ: ৩১ জুলাই ২০২০

হাফেজ মাওলানা আবদুল কুদ্দুস

মহান রাব্বুল আলামিন মুসলিম জাতির জন্য পুরস্কারস্বরূপ বছরে দুটি সৌভাগ্যের দিন দান করেছেন। তার একটি হলো ঈদুল ফিতর, অন্যটি ঈদুল আজহা। ঈদ মানে আনন্দ। ঈদ মানে খুশি। ঈদের আরেক অর্থ- বারবার ফিরে আসা। আজহা মানে ত্যাগ, উৎসর্গ, জবেহ করা। অর্থগুলো থেকে এ কথা স্পষ্ট হয় যে, আল্লাহ তা'আলার সন্তুষ্টি হাসিলের উদ্দেশ্যে আল্লাহর প্রেমে বিভোর হয়ে পশু জবেহ করার মাধ্যমে মুসলিম মিল্লাত যে ঈদ উদযাপন করে, তাই ঈদুল আজহা। শুধু পশু কোরবানি নয়, মনের পশুত্বকেও কোরবানি করার নাম 'ঈদুল আজহা'।  

যার ওপর জাকাত ফরজ, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। অর্থাৎ ১০ জিলহজ ফজর থেকে ১২ জিলহজ সন্ধ্যা পর্যন্ত পারিবারিক প্রয়োজন ব্যতিরেকে কোনো ব্যক্তি যদি নিসাব পরিমাণ মালের মালিক হয়, তার ওপর কোরবানি করা ওয়াজিব। শরিয়তের পরিভাষায় নিসাব পরিমাণ মাল বলতে বোঝায়- সাড়ে সাত তোলা স্বর্ণ বা সাড়ে ৫২ তোলা রৌপ্য অথবা সমপরিমাণ সম্পদ বা বাংলাদেশি টাকা। উট, গরু, মহিষ, ছাগল, ভেড়া, দুম্বা ছাড়া কোরবানি শুদ্ধ নয়। কোরআনের ভাষায় এগুলোকে বলে 'বাহিমাতুল আনআম'। শরিয়তের দৃষ্টিতে কোরবানির পশুর বয়সের সীমা হলো- উট পাঁচ বছরের, গরু বা মহিষ দুই বছরের, ছাগল, ভেড়া বা দুম্বা এক বছর বা তার ঊর্ধ্বে।   

আল্লাহ সুবহানাহু ওতা'আলা সূরা কাউছারের ২ নম্বর আয়াতে ঘোষণা করেন, 'সুতরাং তুমি তোমার প্রতিপালকের জন্য সালাত কায়েম করো এবং কোরবানি করো।' হাদিস শরিফে এসেছে- 'কোরবানির দিন আদম সন্তানের কোনো নেক আমলই আল্লাহ তা'আলার দরবারে এত প্রিয় নয়, যত প্রিয় কোরবানি করা। সুতরাং কোরবানি করা শরিয়তের একটি আবশ্যিক ও ফজিলতপূর্ণ ইবাদত। নবী করিম (সা.) বলেন, 'কিয়ামতের দিন কোরবানির পশু, রক্ত, খুর, শিং, লোম এগুলো বান্দার পক্ষে সাক্ষী হবে। কোরবানির পশুর রক্ত জমিনে পড়ার আগেই আল্লাহর নির্ধারিত মর্যাদার স্থানে পতিত হয়। তাই তোমরা কোরবানি করো আনন্দ চিত্তে।' (ইবনে মাজাহ)। কোরবানি করতে হবে হালাল উপায়ে। হালাল উপার্জন থেকে কোরবানি করা মুমিনের বৈশিষ্ট্য। লোক দেখানোর জন্য পশু কোরবানি করলে তা আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এ ব্যাপারে কোরআন মাজিদে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা এসেছে- 'আল্লাহর নিকট কখনোই পৌঁছে না এগুলোর গোশত ও রক্ত, বরং পৌঁছে তোমাদের তাকস্ফওয়া।' (সূরা হাজ্জ, আয়াত :৩৭)

কোরবানির ফজিলত সম্পর্কে হযরত আবু সাঈদ খুদরী (রা.) বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) হজরত ফাতেমা (রা.)-কে বলেন- হে ফাতেমা! তোমার কোরবানির পশুর কাছে দাঁড়িয়ে থাকো। কারণ কোরবানির পশুর যে রক্ত মাটিতে পড়বে তার বদৌলতে আল্লাহ তা'আলা পূর্বের গুনাহগুলো মাফ করে দেবেন। এ কথা শোনার পর হজরত ফাতেমা (রা.) প্রশ্ন করলেন- এ সুসংবাদ শুধু কি আহলে বাইতের জন্য, না সকল উম্মতের জন্য? নবীজি বলেন, সকল উম্মতের জন্য। (জামিউল ফাওয়ায়েদ)। এ ছাড়াও কোরবানির পশুর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে আল্লাহ তা'আলা নেকি দান করেন। এ প্রসঙ্গে হজরত যায়েদ বিন আকরাম (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসখানা এখানে প্রণিধানযোগ্য- তিনি বলেন, সাহাবিগণ নবী করিম (সা.)-কে জিজ্ঞাসা করলেন, হে আল্লাহর নবী! কোরবানি কী? নবীজি উত্তরে বললেন, তা তোমাদের পিতা ইব্রাহিম (আ.)-এর সুন্নত। তারা আবার বললেন, এতে আমাদের কি কোনো কল্যাণ আছে? তিনি বললেন, এর প্রতিটি পশমের বিনিময়ে একটি করে নেকি রয়েছে। তারা আবারও বললেন, বকরির পশমেও কি তাই? তিনি বলেন, বকরির প্রতিটি পশমেও একটি করে নেকি রয়েছে।

প্রসঙ্গত বলা দরকার যে, এ বছরের ঈদুল আজহা একটি ভিন্ন আবহ নিয়ে আমাদের মাঝে আগমন করেছে। কারণ বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনার সংক্রমণ এখনও অব্যাহত রয়েছে। ফলে এ বছর মধ্যবিত্তের একটি অংশ হয়তো কোরবানি দিতে পারবেন না। বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার কারণে অনেকেই চাকরি হারিয়েছেন, ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় আয়-রোজগার কমে যাওয়ার কারণে হয়তো অনেকেই কোরবানি করতে পারবেন না। তাই সমাজের যারা বিত্তশালী বা সম্পদশালী রয়েছেন, তাদের উচিত গরিব দুঃখী মানুষের পাশে দাঁড়ানো। যারা এ বছর কোরবানি করতে পারছেন না তাদের মাঝে কোরবানির গোশত বণ্টন করে ঈদের আনন্দ তাদের সঙ্গে ভাগাভাগি করা দরকার। কোরবানির গোশত পেট পুরে শুধু একাকী না খেয়ে গরিব-মিসকিনের মাঝে বিতরণের ব্যাপারে আল্লাহ তা'আলা উৎসাহ প্রদান করেছেন- এ ব্যাপারে আল্লাহ সুবাহানাহু ওয়াতা'আলা বলেন- 'অতঃপর তা থেকে (কোরবানির গোশত) তোমরা নিজেরা খাও এবং গরিব অভাবগ্রস্তকে খেতে দাও। (সূরা হাজ্জ, আয়াত :২৮)

পশু কোরবানির পাশাপাশি পবিত্র ঈদুল আজহার দিনের সুন্নত আমলসমূহ হলো- ঈদুল আজহার নামাজের উদ্দেশ্যে গোসল করা, পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন হওয়া, নতুন কাপড় পরিধান করা, সাধ্যমতো সুগন্ধি লাগানো, উচ্চ স্বরে তাকবির পাঠ করা, এক রাস্তা দিয়ে ঈদের ময়দানে যাওয়া, অন্য রাস্তা দিয়ে ফিরে আসা, কোরবানির গোশত নিজে খাওয়া, আত্মীয়-স্বজনকে দেওয়া, গরিব মিসকিনকে দেওয়া, বেশি বেশি নফল ইবাদত করা, জিকির-আজকার করা। মহান রাব্বুল আলামিন আমাদের সহিহ নিয়তে কোরবানি করার তওফিক দান করুন।

লেখক ও ইসলামী গবেষক 
smakhon@gmail.com