ইসলামে পরোপকারের তাগিদ

প্রকাশ: ২০ নভেম্বর ২০২০     আপডেট: ২০ নভেম্বর ২০২০

ড. মো. শাহজাহান কবীর

ইসলাম মানুষকে সর্বোচ্চ দয়া, স্নেহ-মমতা, আন্তরিকতা, মানবিক মূল্যবোধ, সহমর্মিতা ও সহানুভূতির শিক্ষা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে মহান আল্লাহতায়ালা আন্তরিকতা ও সহমর্মিতার প্রতীক হিসেবে সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ নবী ও রাসুল হজরত মুহাম্মদকে (সা.) পৃথিবীর বুকে প্রেরণ করেছেন। মহান আল্লাহতায়ালা সুরা আল-আম্বিয়ার ১০৭ আয়াতে ইরশাদ করেন, 'আর আমি আপনাকে বিশ্বজগতের জন্য অনুগ্রহস্বরূপ প্রেরণ করেছি।'

অনাথ-অসহায় ও দারিদ্র্যপীড়িত অনাহারীর কষ্টে সমব্যথী হতে আল্লাহতায়ালা রমজান মাসে রোজা ফরজ করেছেন। নিঃস ও অভাবীর অভাব মোচনে জাকাত ফরজ ও সাদাকুল ফিতর ওয়াজিব করেছেন। দান-সদকা ও অন্যের জন্য খরচে উদ্বুদ্ধ করে বেশ কিছু আয়াত নাজিল করেছেন। যেমন- সুরা আল-হাদিদের ১১ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : 'কে আছে যে আল্লাহকে উত্তম ঋণ কর্জে হাসনা দেবে, তা হলে তিনি তার জন্য একে বর্ধিত করে দেবেন এবং তার জন্য সম্মানজনক প্রতিদানও রয়েছে।'

অন্যত্র সুরা আল-বাকারার ২৬২ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে : 'যারা আল্লাহর পথে নিজেদের ধন-সম্পদ ব্যয় করে, কিন্তু রটনা করে না অর্থাৎ দানের কথা প্রচার করে না; আর যাকে দান করেছে তাকে কষ্টও দেয় না, এর প্রতিদান তাদের প্রতিপালকের কাছে আছে; পরকালে তাদের কোনো ভয় থাকবে না এবং তারা চিন্তিতও হবে না।' সুরা আল-হাদিদের ১৮ আয়াতে ইরশাদ হয়েছে :'নিশ্চয় দানশীল পুরুষ ও দানশীল নারী, যে ক্ষেত্রে তারা (বিশুদ্ধ অভিপ্রায়ে) আল্লাহকে উত্তম ঋণ দান করে তাদের প্রতিদান বর্ধিত করা হবে এবং তাদের জন্য রয়েছে সম্মানজনক প্রতিদান।' প্রখ্যাত সাহাবি জাবির ইবনে আবদুল্লাহ বলেন, রাসুলে কারিম (সা.) জীবনে কখনও কাউকে 'না' বলেননি। তার বদান্যতা, পরোপকার, মানবসেবা ও সমাজকল্যাণে অবদানের অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইতিহাস ও হাদিস গ্রন্থগুলোতে লিপিবদ্ধ হয়েছে। মানবসেবায় গুরুত্বারোপ এবং এতে উদ্বুদ্ধ করে রাসুলে পাক (সা.) অসংখ্য হাদিস বর্ণনা করেছেন।

মহানবী (সা.) ছিলেন সর্বোত্তম চরিত্রের অধিকারী। তার চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য এতই উন্নত যে, পরোপকার তথা অন্যের কল্যাণকামিতার ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন অগ্রগামী। মহান আল্লাহ তাকে গোটা মানব জাতির জন্য রহমত হিসেবে পাঠিয়েছিলেন। মানবজীবনের এমন কোনো দিক নেই, যা তাকে স্পর্শ করেনি। এমন কোনো অনুভূতি নেই, যা তিনি অনুভব করেননি। তিনি নিজের পরিচয় তুলে ধরেছেন এভাবে :'আমি প্রেরিত হয়েছি উন্নত চরিত্রের পূর্ণতা বিধানের জন্য।' মহানবীর (সা.) চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যের মধ্যে পরোপকার বা খিদমতে খালক একটি উল্লেখযোগ্য বিষয়। অন্য ভাইয়ের দুঃখে দুঃখিত হওয়া ও বিপদগ্রস্তের প্রতি সহানুভূতি প্রদর্শন উন্নত চরিত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। হাদিসে বর্ণিত- রাসুলে কারিম (সা.) বলেন, 'তোমরা আল্লাহর বান্দাদের প্রতি রহম কর, তাহলে তোমাদের প্রতিও রহম করা হবে।' অন্যত্র বলা হয়েছে :যে ব্যক্তি মানুষের প্রতি দয়া করে না, তার প্রতিও দয়া করা হবে না। পরোপকারের প্রতি গুরুত্বারোপ করে মহানবী (সা.) আরও বলেছেন, 'আল্লাহ অন্য মানুষের প্রতি দয়া প্রদর্শনকারীর প্রতি দয়া করেন। তোমরা জগৎবাসীর সঙ্গে দয়া ও উপকারিতার আচরণ কর। তাহলে আসমানের মালিকও তোমাদের প্রতি দয়া ও মমতার আচরণ করবেন।' এ হাদিস থেকে প্রমাণিত হলো, ইসলাম সবার সঙ্গে দয়া-মায়া ও উপকারিতামূলক আচরণ প্রদর্শনের শিক্ষা দিয়েছে। একটি গবেষণায় দেখা গেছে, যারা প্রতি সপ্তাহে বা কয়েক সপ্তাহে অন্তত একদিন ছোট ছোট সহযোগিতা বা সহমর্মিতামূলক কাজ করেন- যেমন বন্ধুকে সাহায্য করা, আত্মীয়ের বাসায় বেড়াতে যাওয়া ইত্যাদি, তাদের সত্তাজুড়ে স্বস্তির সুবাতাস বয়ে যায়; অন্যরকম ভালো লাগা অনুভূত হয়। অবসাদ কমে যায়।

ইসলামে মানবসেবা ও পরোপকারের গুরুত্ব সম্পর্কে হাদিসে কুদসিতে উল্লেখ আছে- রাসুলে কারিম (সা.) ইরশাদ করেন- 'কেয়ামত দিবসে নিশ্চয় আল্লাহতায়ালা বলবেন, হে আদম সন্তান, আমি অসুস্থ হয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমার শুশ্রূষা করোনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার প্রতিপালক, তুমি তো বিশ্বপালনকর্তা, কীভাবে আমি তোমার শুশ্রূষা করব?' তিনি বলবেন, 'তুমি কি জানতে না যে, আমার অমুক বান্দা অসুস্থ হয়েছিল, অথচ তাকে তুমি দেখতে যাওনি। তুমি কি জানো না, যদি তুমি তার শুশ্রূষা করতে তবে তুমি তার কাছেই আমাকে পেতে?'

'হে আদম সন্তান, আমি তোমার কাছে আহার চেয়েছিলাম, কিন্তু তুমি আমাকে আহার করাওনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার রব, তুমি হলে বিশ্বপালনকর্তা, তোমাকে আমি কীভাবে আহার করাব?' তিনি বলবেন, 'তুমি কি জানো না যে, আমার অমুক বান্দা তোমার কাছে খাদ্য চেয়েছিল, কিন্তু তাকে তুমি খাদ্য দাওনি।'

'হে আদম সন্তান, তোমার কাছে আমি পানীয় চেয়েছিলাম, অথচ তুমি আমাকে পানীয় দাওনি।' বান্দা বলবে, 'হে আমার প্রভু, তুমি তো রাব্বুল আলামিন তোমাকে আমি কীভাবে পান করাব?' তিনি বলবেন, 'তোমার কাছে আমার অমুক বান্দা পানি চেয়েছিল। কিন্তু তাকে তুমি পান করাওনি। তাকে যদি পান করাতে তবে নিশ্চয় আজ তা প্রাপ্ত হতে।'

এসব আয়াত ও হাদিসের শিক্ষা সামনে রাখলে কোনো মুসলিমের পক্ষেই সমাজসেবাবিমুখ হওয়া সম্ভব নয়। আর্ত-মানবতার সেবায় ইসলামের প্রকৃত চিত্র তুলে ধরে নিজেদের কর্মকাণ্ড শুধু মসজিদ-মাদ্রাসা স্থাপন, কোরআন শিক্ষা ইত্যাদির মাঝে সীমাবদ্ধ না রেখে এতিমদের পুনর্বাসন, নিরক্ষরতা দূরীকরণ, বিধবাদের সহায়তা প্রদান, যৌতুক প্রতিরোধ, মাদকদ্রব্য নির্মূল, বৃক্ষরোপণ, বেকারদের প্রশিক্ষণ ইত্যাদি সমাজসেবামূলক কাজের উদ্যোগ গ্রহণ কিংবা এসব কাজে সহায়তা প্রদান করা প্রত্যেক মুমিন মুসলিমের অন্যতম দায়িত্ব। মহান আল্লাহ আমাদের ইসলামের আদর্শের ওপর জীবন পরিচালনার তৌফিক দান করুন।

সহকারী অধ্যাপক ও বিভাগীয় প্রধান, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, ফারইস্ট ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি, ঢাকা