ধর্ম ও ভাস্কর্যের নামে রাজনীতি

প্রকাশ: ০৪ ডিসেম্বর ২০২০     আপডেট: ০৪ ডিসেম্বর ২০২০

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ধর্ম সৌন্দর্যপ্রিয় ও নন্দনতত্ত্বে সমৃদ্ধ। পৃথিবীর জীবন্ত ও প্রসিদ্ধ ধর্মসমূহের কোনোটাই সৌন্দর্যবোধ ও নান্দনিকতার আবেদনকে অস্বীকার করেনি, বরং সব ধর্ম-দর্শনেই সত্য, সুন্দর ও সৃষ্টিশীলতা সংশ্নিষ্ট কর্মযজ্ঞকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ইসলাম গতানুগতিক অর্থে শুধু আচার-অনুষ্ঠানসর্বস্ব কোনো ধর্মের নাম নয়; এটি প্রকৃতপক্ষে মানবসমাজের জন্য একটি পরিপূর্ণ জীবন বিধান। মানুষের জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত যাবতীয় কর্মপদ্ধতির সুস্পষ্ট ও পূর্ণাঙ্গ বয়ান রয়েছে ইসলামে। যদিও ইসলামের সেই পূর্ণাঙ্গ সৌন্দর্যবোধ ও নন্দনতত্ত্বের একনিষ্ঠ প্রতিপালন ও চর্চা কোথাও হচ্ছে না, তারপরেও বিশ্বমানবতার জীবনঘনিষ্ঠ ও সামগ্রিক বিষয়ে প্রদত্ত বিধিবিধান সংবলিত এই ধর্ম তার ঐতিহাসিক প্রবর্তনের পর থেকে জাতি, ধর্ম, বর্ণ নির্বিশেষে গোটা মানবসমাজের স্বার্থ, অধিকার ও মর্যাদাবোধ সমুন্নত রাখার মহান ব্রত নিয়ে বিশ্বসভ্যতায় নজিরবিহীন অবদান রেখে চলেছে।

শুধু মানুষ নয় বরং মহান প্রভুর সৃষ্টি সমস্ত মাখলুকের জীবনপ্রণালি, চাহিদার জোগান, শান্তি, কল্যাণ ও নিরাপত্তার সব ধরনের ব্যবস্থাপনার নিখুঁত নির্দেশনা রয়েছে ইসলাম ধর্মে। মসজিদ ও মাদ্রাসার গণ্ডির ভেতরে অথবা উপলক্ষগত কিছু আচার-অনুষ্ঠানের মধ্যেই এই ধর্মের মর্মবাণী ও আবেদন সীমাবদ্ধ নয়; ইসলামের অনুশাসনের পরিধি মানবসমাজের বৈষয়িক ও অপার্থিব ক্ষেত্রে যেমন দিগন্ত বিস্তৃত তেমনি মানবজীবনের কোনো ক্ষেত্রকেই এর সংবিধিবদ্ধ নীতিমালার বাইরে ছেড়ে দেওয়া হয়নি। তাই জাগতিক ও পারলৌকিক বিষয়াবলির ওপর ধর্মীয় নির্দেশনার প্রসঙ্গ বিবৃত করতে চাইলে সেখানে সংকীর্ণ সাম্প্রদায়িক স্বার্থ অথবা গোষ্ঠীগত ফায়দা হাসিলের মতলব যেন প্রাধান্য বিস্তার না করে- সেদিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখতে হবে।

যতটুকু নিজেদের স্বার্থকে সমুন্নত রাখবে ততটুকু বলা বা পালন করা আর যেখানে স্বার্থ থাকবে না, ফায়দা লাভের বিষয় আসবে না সেখানে চুপ থাকা- এ ধরনের মতলববাজি ইসলাম সমর্থন করে না। পরিতাপের সঙ্গে লক্ষণীয়, আজ ইসলামকে জাগতিক তুচ্ছ স্বার্থে ব্যবহারের নির্লজ্জ মহড়া নানা ক্ষেত্রেই আমরা দেখতে পাচ্ছি। পৃথিবীতে গোটা মানবজাতির বৃহত্তর কল্যাণ ও স্বার্থ রক্ষায় যে ইসলাম এসেছিল, আজ আমরা তাকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলীয় সংকীর্ণ গণ্ডির ভেতর আবদ্ধ করে ফেলতে চাইছি। ইসলাম রক্ষার নামে কথিত ইসলামওয়ালাদের কথাবার্তা, আচার-আচরণ, বক্তব্য-বিবৃতি, চিৎকার ও অঙ্গভঙ্গি, বিকৃত রুচিবোধ, অশালীন শব্দপ্রয়োগ, অদূরদর্শিতা, স্থান-কাল-পাত্র ভেদে কৌশল-জ্ঞানের অপ্রতুলতা আর ধর্মের অপব্যাখ্যার কারণে খোদ ইসলামকেই আজ তামাশায় পরিণত করছেন! নানা ধর্মমত আর বৈচিত্র্যপূর্ণ জাতি-গোষ্ঠীর বসবাস আমাদের এই প্রজাতান্ত্রিক বাংলাদেশে; ত্রিশ লাখ শহীদ আর দুই লাখ মা-বোনের সল্ফ্ভ্রমহানি এবং অগণিত মানুষের অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার বিনিময়ে অর্জিত হয়েছে এই স্বাধীন সার্বভৌম দেশটি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম এই দেশে ব্যক্তি, সমাজ ও রাষ্ট্রীয় জীবনে অনেক ক্ষেত্রেই ইসলামী অনুশাসনের প্রতিপালন ও চর্চা হয়ে আসছে। দেশে ইসলামের প্রচার-প্রসারের কার্যক্রম কখনোই শ্নথ হয়ে যায়নি, বাধাগ্রস্তও হয়নি; বরং রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামসহ সব ধর্মমতের পরিচর্যার এক সর্বজনীন পরিশীলিত অবস্থা বিদ্যমান রয়েছে। যার ফলে দেশে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিরাজ করছে এবং আন্তঃধর্মীয় সহাবস্থানের এক স্বর্গীয় পরিবেশও অস্তিত্বশীল রয়েছে।

বাংলাদেশের শাসকবর্গীয় মানুষের অধিকাংশই মুসলিম এবং পবিত্র ইসলামের প্রতি অনুগত ও শ্রদ্ধাশীল; পাশাপাশি অন্যান্য ধর্মমতের প্রতিও তারা দায়িত্বশীলতা ও সম্মানবোধ রেখে চলেছেন। এ ধরনের পরিচিতি ও স্বীকৃতি দেশের সরকারি দল ও বিরোধী পক্ষ নির্বিশেষে সবাইকেই দেওয়া যায়। এমন এক মানবতাবাদী চিন্তা-চেতনা ও মতাদর্শের আলোকে দেশটি পরিচালিত হচ্ছে বলেই প্রতিদ্বন্দ্বী বিশ্বে বাংলাদেশ অভূতপূর্ব উন্নয়নের দিকে অব্যাহত গতিতে ছুটে চলেছে। ঠিক সেই সময় আমাদের ধর্মীয় অঙ্গনের কিছু আলেম বঙ্গবন্ধুর এক ভাস্কর্য ইস্যুতে মাঠ গরম করে চলেছেন। ইসলামের দৃষ্টিতে ভাস্কর্য জায়েজ কি নাজায়েজ সেই বিতর্কের একাডেমিক আলোচনায় না গিয়ে তারা যুদ্ধংদেহী মনোভাবের পরিচয় দিয়েছেন। দেশে জাতির পিতার জন্মশতবর্ষ চলছে, করোনা মহামারির কারণে প্রধানমন্ত্রী গৃহীত অনুষ্ঠানমালার পরিসর খুবই সীমিত করে দিয়েছেন। স্বাধীনতার মহান স্থপতি ও জাতির পিতার প্রতি সম্মান প্রদর্শন একটি অন্যতম নাগরিক দায়িত্ব। তাই সবকিছু নিয়ে মাঠ গরম করা দূরদর্শিতার পরিচয় বহন করে না; বরং প্রজ্ঞা ও সদুপদেশের মাধ্যমে মহান প্রভুর দিকে মানুষকে আহ্বানের তাগিদ দিয়েছে ইসলাম। সামাজিক অস্থিরতা ও বিপর্যয় সৃষ্টি হত্যার চেয়েও বড় অপরাধ হিসেবে সাব্যস্তকৃত; তাই কোনো মহলের নির্বুদ্ধিতা ও ধর্মান্ধতার কারণে খোদ ইসলাম ক্ষতিগ্রস্ত হোক- তা কাম্য নয়।

দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ধর্ম ইসলাম এটি যেমন সত্য, দেশটি শরিয়া আইন অনুযায়ী চলে না, এটিও সত্য। তাই এ দেশে ইসলামের নীতিবিধান অনুযায়ী অনেক কাজই যেমন সুসম্পন্ন হয় তেমনি ইসলামী নিয়ম-কানুনের বাইরেও বহু কর্ম সম্পাদিত হয়ে থাকে। আমাদের সমাজে এমন বহু জিনিসের প্রচলন আছে, যা ইসলাম সমর্থন করে না; এসব ব্যাপারে ইসলামের প্রকৃত নির্দেশনা আলেমরা তাদের হেকমত, বুদ্ধিমত্তা ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তুলে ধরবেন, প্রতিবাদ করবেন- এটিই স্বাভাবিক। কিন্তু সম্প্রতি দেশের বরেণ্য একজন মরহুম পীরের ছেলে এবং আরেকজন উপমহাদেশের প্রখ্যাত হাদিসবিশারদ, মরহুম শায়খুল হাদিসের ছেলে যেভাবে বক্তব্য দিয়েছেন তা এ দেশের ধর্মপ্রাণ মানুষকে আহত করেছে; তাদের ভূমিকায় নানা সন্দেহ ও প্রশ্নের উদ্রেক হয়েছে। একজন বঙ্গবন্ধুর ভাস্কর্যকে বুড়িগঙ্গায় ভাসিয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছেন আর অন্যজন যে কোনো মূল্যে ভাস্কর্য হতে না দেওয়ার শপথ ব্যক্ত করেছেন; দেশের প্রবীণ নাগরিকদের অবমাননা করেছেন, বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ শ্রদ্ধেয় জাফর ইকবাল স্যারকে এবং কলামিস্ট ও গবেষক শাহরিয়ার কবিরকে বিকৃত নামে প্রকাশ্য জনসভায় গালমন্দ করেছেন। এগুলো ইসলামের অনুপম আদর্শের সঙ্গে অসংগতিপূর্ণই শুধু নয়, প্রচলিত আইনেও শাস্তিযোগ্য অপরাধের শামিল। মহানবী (সা.) ইরশাদ করেন, 'তোমরা জবান ও লজ্জাস্থানের হেফাজত করো, আমি তোমাদের জন্য জান্নাতের জিম্মাদার হবো।' সামান্য পার্থিব ইস্যুতে নবগঠিত হেফাজত নেতারা নিজেদের জবানেরই হেফাজত করতে পারেন না, তারা কীভাবে ইসলামের হেফাজত করবেন! এখানেই প্রশ্ন, তাহলে কি ভাস্কর্য বিরোধিতা যতটা না ধর্মীয় কারণে, তার চাইতে অনেক বেশি রাজনৈতিক কারণ? এর সঙ্গে কি জাগতিক ক্ষমতাকেন্দ্রিক মোহাবিষ্টতার সংশ্নিষ্টতা জড়িয়ে গেছে? আমাদের অনুরোধ, আগে নিজেরা ইসলামকে বুঝুন; অতঃপর অন্যদের তা মানতে ও হেফাজত করতে বলুন।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়