ইসলামের উদার শিক্ষা ও বাস্তবতা

প্রকাশ: ১১ ডিসেম্বর ২০২০     আপডেট: ১১ ডিসেম্বর ২০২০

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ইসলাম প্রবর্তনের মধ্য দিয়ে অশান্ত, বিশৃঙ্খল ও ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ মরুময় আরবের জাহেলিয়াত সমাজে সৌহার্দময় পরিবেশ, স্থিতিশীলতা ও শান্তিপূর্ণ অবস্থা ফিরে আসে। ঐশী নির্দেশনার আলোকে পৃথিবী এক নতুন সভ্যতার স্পর্শ পায়। মানুষ মানুষকে মানবতা, পরমতসহিষ্ণুতা ও ঔদার্যের দৃষ্টিকোণ থেকে চিনতে শিখে, পরস্পর পরস্পরকে সম্মান করতে শেখে এবং অজ্ঞতা-মূর্খতা ও পাষণ্ডতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে আসে। ইসলামের কল্যাণে আরব সমাজ ওহির জ্ঞানে আলোকিত হয়, সব নিষ্ঠুরতা তিরোহিত হয় এবং মানবতা পূর্ণতা পায়। পৃথিবীর বুকে নিগৃহীত, বঞ্চিত ও উপেক্ষিত জনমানুষের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটে; কেননা ইসলাম তাদের সবার যৌক্তিক, মানবিক ও কাঙ্ক্ষিত চাহিদা পরিপূরণে এক স্বপ্নসারথির ভূমিকা পালন করে।

মানবতার বড়ই দুর্দিনে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে ইসলামের প্রবর্তন হলো, যার মাধ্যমে তিনি হলেন বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী হজরত মোহাম্মদ (সা.)। যার শুভাগমনের মধ্য দিয়েই ধরণীতে মানবিকতার সব দিক পূর্ণতা লাভ করে। মহান আল্লাহ তাকে পৃথিবীর মানবমণ্ডলীর অনুসরণের জন্য সর্বোত্তম নমুনা তথা আদর্শের মূর্তপ্রতীক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। তাকে প্রস্টম্ফুটিত করেছেন উন্নততর ও মহত্তম চারিত্রিক মাধুর্যে; মানুষ ও মানবতার জন্য তার রেখে যাওয়া নীতি-আদর্শকে অবধারিত করে দিয়েছেন। তার সব আদেশকে ফরজ আর সব নিষেধকে হারাম ঘোষণা করেছেন। আর পরম স্রষ্টার পক্ষ থেকে এসবই করা হয়েছে একটি শান্তিময় মানবসমাজ গড়ে তোলার জন্য; যে সমাজে মানবতার সব গুণ ও বৈশিষ্ট্য বিকশিত হবে।

মহানবী (সা.) ও তার প্রিয় সাহাবায়ে কেরাম তাদের মহত্তম আদর্শ, নজিরবিহীন ত্যাগ ও সর্বমানবিক মূল্যবোধের কারণে মানব ইতিহাসে অনুসরণীয়-অনুকরণীয় হয়ে আছেন। স্বীয় স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়ে তারা অন্যের স্বার্থকে প্রাধান্য দিয়েছেন। জাগতিক চাওয়া-পাওয়ার ঊর্ধ্বে উঠে; সব আমিত্বকে বিসর্জন দিয়ে তারা নির্মোহ থাকার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। পার্থিব লোভ-লালসা কখনোই তাদের স্পর্শ করতে পারেনি। মানুষ, সমাজ ও সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর কোনো উপকরণ কখনোই তাদের জীবনমানে কালিমা লেপন করতে পারেনি। তাদের একেকজন মানবহিতৈষী ও মানবতার জন্য আশীর্বাদ হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিলেন। তাদের সুচিন্তা, সুকথা ও সুনীতি সবার জন্যই সুফল বয়ে আনে। পৃথিবীর তাবৎ মুসলিম মিল্লাতের জন্য এর চেয়ে বড় নেয়ামত আর কিছুই হতে পারে না। কেননা তাদের যে কাউকে অনুসরণ করলে মানবজীবন ধন্য ও সার্থক হয়ে ওঠে। কিন্তু আজ আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশে আমরা কী দেখছি? শতকরা ৯০ ভাগ মুসলমানের দেশে ইসলামের অনুপম জীবনাদর্শ আমাদের সমাজজীবনে কতটুকু আশীর্বাদ নিয়ে আসতে পারছে? শান্তির ধর্ম ইসলামের মোড়কে যেন আজ সমাজ থেকে শান্তি বিতাড়নের মহড়া চলছে। ধর্মের নির্দেশনা আর ইসলাম হেফাজতের নামে ধর্মের অপব্যাখ্যা- ইসলামের ক্ষতিসাধনই যেন সেই মহড়ার চূড়ান্ত ফল।

বাংলাদেশ মুসলিম অধ্যুষিত জনপদ হিসেবে এ ভূখণ্ডের ঐতিহাসিক, সুদীর্ঘ ও প্রাচীন ঐতিহ্য রয়েছে। আবহমানকাল ধরে এ দেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক চেতনা লালন করে চলেছেন। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, গোত্র ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে সবার সহাবস্থানের অপরূপ চিত্র আমাদের সমাজজীবনের এক গৌরবোজ্জ্বল অধ্যায় হিসেবে বিবেচিত। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির অনন্য ও উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে আমাদের প্রাণপ্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ। সুফি-সাধক, পীর-অলি ও গাউস-কুতুবদের পদভারে ধন্য হয়েছে এ ভূখণ্ড। জীবন সম্পর্কে তাদের নির্দেশনা, উপদেশ ও শিক্ষা এতদঞ্চলের মানুষের হৃদয় গভীরে প্রোথিত। সুফি-সাধক ও ইসলাম প্রচারকদের মূল শিক্ষাই ছিল উদারতা, মানবিকতা, মনুষ্যত্ববোধ, সহমর্মিতা, পরমতসহিষ্ণুতা আর সর্বজনীন ভালোবাসা ও ত্যাগের মহিমা। বাংলার সমাজজীবনে সুফি ধর্মপ্রচারকদের এমন শিক্ষার ব্যাপক প্রভাব পড়ে। এ দেশের সবুজ-শ্যামল ও উর্বর ভূমিতে বসবাসরত জনমানুষ সুফি-সাধকদের ত্যাগ ও উদারতার আদর্শে উজ্জীবিত ও অনুপ্রাণিত হয়ে আরও মায়াবী, দায়িত্বশীল ও মানবিক হয়ে ওঠেন। কোনো ধরনের রুক্ষতা, শুস্কতা, অন্ধত্ব, গোঁড়ামি ও একগুঁয়েমি তাদের অন্তরে আর দানা বাঁধতে পারেনি। সব কুসংস্কার আর অজ্ঞতার মূলোৎপাটিত হতে থাকে সত্য-ন্যায়ের আলোকবর্তিকার মারফতে। মানুষ মানুষকে সম্মান করতে শেখে, অন্যের অধিকার ও মর্যাদা সমুন্নত রাখতে সচেষ্ট হয় এবং ত্যাগ ও উদারতার মহিমায় উদ্ভাসিত হতে থাকে। সুফিদের অলৌকিকতায় বিস্মিত হয়ে দলে দলে মানুষ তাওহিদের পতাকাতলে আশ্রয় নিতে থাকে। তাদের ব্যক্তি-মাধুর্য, নৈতিক চরিত্র আর আচার-ব্যবহারে অজস্র বনি আদম মুগ্ধ হয়ে ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে সমবেত হয়। ধর্মের কল্যাণকর দিকটি, উদারতা, মহানুভবতা ও পরিশীলিত রূপটিই মানুষের সামনে এবং সমাজের সংশোধনে পরিস্টম্ফুট হয়ে ওঠে।

পাক-ভারত উপমহাদেশে বিশেষ করে বাংলা ভূখণ্ডে ইসলামের ব্যাপক প্রচার-প্রসার ও প্রভাবের পেছনে সুফিবাদের ভূমিকা অগ্রগণ্য। এ অঞ্চলের জনমানুষের হৃদয়-গভীরে ইসলাম প্রোথিত হওয়ার ক্ষেত্রে সুফি-সাধকদের সীমাহীন ত্যাগ ও অবর্ণনীয় কষ্ট স্বীকার আর ব্যাপক কর্ম-কৌশল অবদান রেখেছে। কিন্তু আজকের প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশে ইসলাম প্রচারে সুফি-সাধকদের সুদীর্ঘকালের চিরায়ত ঐতিহ্যের সেই ধারা যেন বিলুপ্তি ঘটতে যাচ্ছে। শান্তির ধর্ম ইসলামের রক্ষক যারা হবেন, তারাই আজ ইসলামকে সাময়িক স্বার্থসিদ্ধির উপকরণ, পার্থিব লালসা অর্জনের হাতিয়ার ও জাগতিক ক্ষমতার অংশীদার হয়ে মোহ-মত্ততায় নিমজ্জমান থাকার উৎস হিসেবে ব্যবহার করছেন। এ যেন পবিত্র কোরআনের সেই সতর্ক বাণীরই বহিঃপ্রকাশ; যেখানে মহান আল্লাহ নির্দেশনার আলোকে বলেছেন- 'তোমরা আমার আয়াতগুলোকে অল্প মূল্যে বিক্রি করে দিও না।' (৫ :৪৪) জাগতিক স্বার্থ হাসিলের জন্য আজ ইসলামকে হেফাজতের নামে ইসলামের বিনাশ সাধনেই যেন ব্যস্ত আছেন কথিত ইসলামওয়ালারা; সেখানে ইসলামের মূল্য আজ অতীব নগণ্য, তুচ্ছ। এ অবস্থায় ইসলামের সর্বজনীন ও উদারনৈতিক শিক্ষাকে অবলম্বন করে যাবতীয় বিভ্রান্তির অবসান ঘটাতে হবে; এ দায়িত্ব আমাদের সবার।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফার্সি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়