আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই রয়েছেন

প্রকাশ: ১৮ ডিসেম্বর ২০২০     আপডেট: ১৮ ডিসেম্বর ২০২০

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

মানবজাতির প্রকৃত সুরক্ষা মহান আল্লাহর কুদরতি হাতে। ইসলামের ইতিহাসে মহান আল্লাহ কর্তৃক সেই সুরক্ষার এক অত্যুজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হলো পবিত্র কাবা শরিফ। মানবেতিহাসের প্রথম গৃহ ও পৃথিবীর অধিবাসীদের জন্য হেদায়াতের কেন্দ্রবিন্দু পবিত্র কাবা গৃহটি মক্কা শরিফে বিদ্যমান (৩:৯৬)। ইতিহাসের নানান যুগে সময়ের প্রয়োজনে, দৃঢ়তা ও পরিচ্ছন্নতার স্বার্থে বহুবার এই পবিত্র গৃহের সংস্কার কাজ সম্পন্ন হয়েছে। বায়তুল্লাহ বা আল্লাহর ঘর হিসেবে দুনিয়াবাসীর কাছে এ পবিত্র গৃহের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অপরিসীম। কৌশলগত অবস্থানের দিক থেকেও পবিত্র কাবা গৃহের মর্যাদা ও গুরুত্ব লক্ষণীয়। এটি গোটা পৃথিবীর মধ্যমণি হয়ে পবিত্র মক্কাভূমিতে স্বমহিমায় অবস্থান করছে। মহান আল্লাহ যুগে যুগে এই পবিত্র গৃহ রক্ষণাবেক্ষণের জন্য তার প্রিয় ও অনুগত বান্দাদের মনোনীত করেছেন; যারা কাবার যাবতীয় দেখাশোনা ও পরিচর্যার কাজে নিয়োজিত ছিলেন। ইতিহাসের পরিক্রমায় আরবে আইয়ামে জাহেলিয়া তথা অন্ধকার যুগে কাবা শরিফের রক্ষণাবেক্ষণের দায়িত্বে যারা ছিলেন তারা সাহস, শক্তি বা সামাজিক অবস্থানে কিছুটা দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন; সেই সুযোগে ইথিওপিয়ার খ্রিষ্টান শাসক আবরাহা আল আশরাম (মৃ. ৫৭৫ খ্রি.) এই পবিত্র গৃহের ধ্বংস সাধনে প্রবৃত্ত হন। কিন্তু কাবার রক্ষণাবেক্ষণকারীরা দুর্বল হলে কী হবে; এ গৃহের প্রকৃত মালিক যিনি সেই মহান আল্লাহ তো দুর্বল নন। আবরাহার আক্রমণ থেকে তিনিই তার প্রিয় গৃহের হেফাজতের প্রকৃত স্বত্বাধিকারী।

মানবেতিহাসের সর্বকালের সর্বযুগের সর্বশ্রেষ্ঠ মহাপুরুষ হলেন ইসলামের মহান পয়গম্বর হজরত মোহাম্মদ (সা.)। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র ও সম্প্রদায় নির্বিশেষে পৃথিবীর সকল মানুষের কাছে তিনি হলেন গ্রহণযোগ্য ও স্বীকৃত মহামানব। তার মতো মহাপুরুষ কখনও এর আগে এ বসুন্ধরায় আগমন করেননি; আর কখনও আসবেনও না। সমগ্র দুনিয়াবাসীর জন্য রহমতের আধার, চারিত্রিক উৎকর্ষে অনন্য ও সর্বপ্রকার উন্নত মানবিক গুণাবলিতে সমৃদ্ধ ছিল তার ব্যক্তিসত্তা। অথচ এ মহান ব্যক্তিত্বকেও একত্ববাদের বাণী প্রচার করতে গিয়ে সমকালীন কায়েমি স্বার্থান্বেষী মহলের কঠিন বাধা-প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হয়েছে। শুধু বাধাই নয়, অবর্ণনীয় নির্যাতন ও নিষ্পেষণের শিকার হতে হয়েছে; বারবার নিতে হয়েছে জীবনের ঝুঁকি। আরবের অবিশ্বাসী সমাজপতি ও মাতব্বর শ্রেণির প্রতিহিংসার অনলে তার জীবন অজস্রবার ছারখার হওয়ার উপক্রম হয়েছে। কখনও আবু জেহেল, আবু লাহাব বা তার স্ত্রী, কখনও উতবা-শায়বা আবার কখনও উমরের (অবশ্য পরবর্তী সময়ে ইসলাম গ্রহণ করে আমিরুল মুমেনিনের মর্যাদায় অভিষিক্ত হয়েছেন) দ্বারা তার জীবন হুমকির মুখে পড়েছে। দারুণ নদওয়ার মন্ত্রণালয় গৃহে তাকে হত্যা করার সব ষড়যন্ত্র পাকাপোক্তা করে হিজরতের রজনীতে যাবতীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। বদরের রণাঙ্গনে কিংবা উহুদের যুদ্ধে, খন্দকের উপত্যকায় অথবা হুনায়নের ময়দানে কতই না বিপদাপদ আর কঠিন সময় এসেছিল রাসুল (সা.)-এর জীবনে; বহুবার তাকে নিঃশেষ করার চক্রান্ত হয়েছে। কিন্তু পবিত্র কোরআনে আল্লাহর ঘোষণা এ রকম- 'ওয়া মাকারু ওয়া মাকারাল্লাহ, ওয়াল্লাহু খাইরুল মাকেরিন' অর্থাৎ তারা ষড়যন্ত্র করে এবং আল্লাহও কৌশল অবলম্বন করেন আর আল্লাহর চাইতে শ্রেষ্ঠ কৌশল অবলম্বনকারী কে আছেন (৩:৫৪)। তাই আমরা দেখতে পাই, আরবের শক্তিশালী প্রতিপক্ষের মোকাবিলায় অসহায়, এতিম মহানবী (সা.)-কে মহান আল্লাহ জগতের সবচাইতে শক্তিধর মহামানবে পরিণত করলেন। স্বয়ং বিশ্বপ্রভু আগত সকল দুর্যোগ-মসিবত থেকে তার প্রিয় হাবিবকে হেফাজত করলেন। রাসুলে কারিম (সা.)-কে হেফাজতের জাজ্বল্যমান অনেক দৃষ্টান্ত তার জীবনেতিহাসে প্রমাণিত হয়ে আছে। পবিত্র কোরআনেও এসব মহাঅলৌকিক ঘটনার বিবরণাদি উল্লেখ করে মহান আল্লাহ একত্ববাদে বিশ্বাসী পৃথিবীর সকল মানুষকে ইমানি শক্তিতে আরও বলীয়ান ও উজ্জীবিত করেছেন।

পৃথিবীতে ইসলামের আবির্ভাব, বিস্তার, যুগে যুগে ইসলামের সুরক্ষা, আল্লাহর মনোনীত ও প্রিয় বান্দাগণকে যাবতীয় অনিষ্ট হতে রক্ষণাবেক্ষণ, মহানবী (সা.) ও পবিত্র কোরআনের হেফাজত সম্বন্ধে যত তাত্ত্বিক আলোচনা আমরা করব, সে সবের ফলে যে অনুসিদ্ধান্তে আমরা উপনীত হবো তা হলো যিনি স্রষ্টা তিনিই আসলে সৃষ্টির রক্ষক; পবিত্র কোরআন যার বাণী, তিনিই এর সংরক্ষণকারী, রাসুল (সা.)-কে যিনি প্রেরণ করেছেন তিনিই তার প্রকৃত হেফাজতকারী। তাই পৃথিবীতে কোরআন, মহানবী (সা.) ও ইসলামকে সকল ষড়যন্ত্র থেকে মহান আল্লাহই হেফাজত করবেন। বরং এসব বিষয়ে যদি কেউ উস্কানি দেয় তখন যা করণীয় সে সম্পর্কে মহান আল্লাহই বলে দিয়েছেন- 'অবশ্য তোমরা পূর্ববর্তী আহলে কিতাব ও মুশরেকদের কাছ থেকে অনেক অশোভন উক্তি শুনবে। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধারণ করো এবং পরহেজগারি অবলম্বন করো, তবে তা হবে একান্ত সৎ সাহসের ব্যাপার' (৩:১৮৬)।

উল্লিখিত আয়াতের মাধ্যমে মহান আল্লাহ আমাদের পরিস্কারভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, ইসলামের বিরোধীরা আক্রমণাত্মক বা বিদ্রুপাত্মক অনেক কথা বলবে, কাজ করবে। এসবের মোকাবিলায় মুমেনদের বিপর্যয় সৃষ্টি না করে ধৈর্যের পরাকাষ্ঠা বহন করতে হবে। কেননা প্রতিপক্ষের লোকেরা ইসলাম বিনাশে নিত্যদিন চক্রান্ত আর ষড়যন্ত্রের জাল বিস্তার করবে; ইসলামপ্রিয় মানুষদের উচিত হবে না তাদের ফাঁদে ধরা দেওয়া অথবা কোনো ফেতনার সৃষ্টি করা। মহান আল্লাহ আমাদের সতর্ক করেছেন- 'আল ফেতনাতু আশাদ্দু মিনাল কস্ফাত্‌ল' অর্থাৎ ফেতনা সৃষ্টি হত্যার চাইতেও ভয়ংকর। (২:১৯১) সুতরাং শান্তির জন্য ইসলাম আর ইসলামের জন্য ফেতনা এড়িয়ে চলা ও ধৈর্য ধারণ করা এবং তারই মধুর পরিণতি হবে মহান আল্লাহর সাথি হতে পারা। কেননা তিনি বলেছেন- 'ইন্নাল্লাহা মাআস্‌ সাবেরিন' অর্থাৎ নিশ্চয়ই মহান আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সঙ্গেই রয়েছেন (২:১৫৩)।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়