জবানের হেফাজত জরুরি

প্রকাশ: ২৫ ডিসেম্বর ২০২০     আপডেট: ২৫ ডিসেম্বর ২০২০

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

মহান আল্লাহর সর্বশ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানুষ। মানুষকে আল্লাহপাক অসংখ্য নেয়ামত দান করেছেন। মানুষের ওপর আল্লাহ প্রদত্ত সেসব নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম প্রধান হলো 'জবান', তথা কথা বলার শক্তি। মানুষের উচিত আল্লাহর দেওয়া এই নেয়ামতকে সৃষ্টির কল্যাণে কাজে লাগানো। অর্থাৎ জবান পেয়েছি বলেই তা দিয়ে যা ইচ্ছা তাই বলা যাবে না; জবানের হেফাজত জরুরি। জবানের হেফাজত করতে না পারার কারণে ব্যক্তিতে-ব্যক্তিতে, সমাজে ও দেশে নানা ধরনের বিবাদ-বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়। কখনও তা মানবসমাজকে মারাত্মক বিপদের দিকে ঠেলে দেয়; সভ্যতার বিনাস সাধনেও এটি গুরুতর অনুষঙ্গ হিসেবে কাজ করে। তাই সুস্থ, নিরাপদ ও কল্যাণধর্মী সমাজব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার জন্য মানুষকে অবশ্যই জবানের হেফাজতকারী হতে হবে; যেন তার জবান নিঃসৃত কোনো কথায়, বক্তব্যে বা বিষোদ্গারে অপরাপর কোনো আদম সন্তানের জন্য মনঃকষ্টের কারণ না হয়, কারও অধিকার ক্ষুণ্ণ না হয় এবং জবানের নেতিবাচক ভূমিকায় যেন সমাজ ও রাষ্ট্রে অস্থিতিশীল পরিস্থিতির উদ্ভব ও শান্তি বিনষ্ট হওয়ার উপক্রম না ঘটে। শান্তির ধর্ম ইসলামে তাই মানুষের জবানের হেফাজতের ওপর অত্যধিক গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

পবিত্র কোরআনের সুরা মোমেনুন-এ মহান আল্লাহ একজন প্রকৃত মুসলমানের সাতটি মৌলিক গুণের কথা উল্লেখ করেছেন; যার দ্বিতীয় প্রধান গুণটিই হচ্ছে- মোমেনকে অবশ্যই অনর্থক কথাবার্তা পরিহার করে চলতে হবে। অর্থাৎ মোমেনের জবানকে হেফাজত করতে হবে; বেফায়দা তথা নিরর্থক, অসংলগ্ল, অদূরদর্শী ও বিভ্রান্তিকর বাক্যব্যয় কোনো মোমেনের কাজ হতে পারে না। সুরা আহযাবে আল্লাহপাক মানুষকে নির্দেশনা দিয়েছেন, তারা যেন তাকে ভয়ের নীতি অবলম্বন করে চলে এবং সঠিক কথাটি বলে। এর বিনিময়ে আল্লাহপাক তাদের কার্যক্রমকে সংশোধন করে দেবেন এবং তাদের কৃত অপরাধগুলোকে মার্জনা করবেন। এখানেও জবান নিঃসৃত কথারই তাৎপর্য তুলে ধরা হয়েছে। সুরা কাফে বলা হয়েছে, মানুষের দুই কাঁধে ডান ও বাম পাশে দু'জন ফেরেশতা বসাবস্থায় তাদের যাবতীয় কর্ম লিপিবদ্ধ করে থাকেন; মানুষ এমন কোনো কথা বলে না, যা তারা সংরক্ষণ করেন না। অর্থাৎ মানুষের জবান থেকে উচ্চারিত সব কথাই রেকর্ড হয়ে যায়; তাই জবানের হেফাজত অতি জরুরি। সুরা ইনফিতারে আরও পরিস্কার বলা হয়েছে, কিরামান-কাতেবিন তথা সম্মানিত দুই লেখক মানুষের যাবতীয় কথা ও আমল লিপিবদ্ধ করে থাকেন। সুরা হুজরাতে মহান আল্লাহ মানুষকে নির্দেশ দিয়েছেন, তারা যেন অন্য মানুষকে উপহাস না করে, কাউকে অনর্থক দোষারোপ না করে এবং একে অন্যকে যেন মন্দ বা বিকৃত নামে না ডাকে। ঠিক তেমনিভাবে কেউ যেন অন্যের অসাক্ষাতে তার নিন্দা না করে, গিবত বা পরচর্চার অনুশীলন না করে। মূলত এগুলোর মাধ্যমে মানুষের জবান দূষিত হয় এবং এসবের ফলে সমাজে নানা ফেতনা ও বিপর্যয়ের সৃষ্টি হয়।

মানবতার পরম সুহৃদ মহানবীকে (সা.) জিজ্ঞেস করা হয়েছিল, আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা বিপদ-মুসিবত বা আজাব-গজব থেকে পরিত্রাণের প্রকৃষ্ট উপায় কী? জবাবে মুখ্যত রাসুলে পাক যা বলেছিলেন তা হলো, তুমি তোমার জবানকে হেফাজত করো। জবান দ্বারা কৃত চোগলখুরির কারণে মানুষের কবরে ভয়াবহ আজাব হয় বলে রাসুলে পাকের হাদিস দ্বারা প্রমাণিত। মানুষের জবান নিঃসৃত মিথ্যা কথাকেই সমগ্র পাপাচারের জননী আখ্যা দেওয়া হয়েছে। বুখারি, মুসলিম ও তিরমিজি শরিফের হাদিস অনুযায়ী মিথ্যাচার মানুষকে পাপের দিকে পথনির্দেশ করে আর পাপাচারের অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো জাহান্নাম। অন্যদিকে জবানের মাধ্যমে মানুষ যখন সত্যবাদিতাকে অবলম্বন করে, তারই পরিপ্রেক্ষিতে সত্য তাকে পুণ্যকর্মের দিকে ধাবিত করে আর পুণ্যকর্মের প্রত্যাশিত মধুর ফল হচ্ছে জান্নাত। জবানকে যারা পরিমিতিবোধের আওতায় রাখবে, কর্কশ ও রুক্ষভাষী না হয়ে মিষ্টভাষী হবে, তাদের জন্য জান্নাতে এমন বালাখানার আয়োজন করা থাকবে, যা বাইরে থেকেই ভেতরের সবকিছু দৃশ্যমান ও দৃষ্টিনন্দন হবে! বুখারি শরিফের হাদিস থেকে জানা যায়, সে-ই প্রকৃত মুসলিম যার জবান থেকে অন্য মানুষ নিরাপদ থাকে। জবান স্থির ও কল্যাণধর্মী না হওয়া পর্যন্ত কোনো ব্যক্তি নিজেকে মোমেন দাবি করতে পারে না। এমনকি যার হাত ও জিহ্বা থেকে তার প্রতিবেশী নিরাপদ নয়, সে আল্লাহর জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। জবানের হেফাজতের গুরুত্ব এমনই, মহানবী (সা.) স্বয়ং সেই ব্যক্তির জন্য জান্নাতের জিম্মাদারি গ্রহণ করেছেন, যে ব্যক্তি স্বীয় জবানকে হেফাজত করতে পেরেছে। মানুষের কথার আঘাত অনেক বড় আঘাত হিসেবে থেকে যায়; কখনোই বিস্মৃত হয় না। তীর, তরবারি বা ধারালো অস্ত্রের আঘাত সময়ের ব্যবধানে নিঃশেষ হয়ে যায়, কিন্তু জবানের লাগামহীন কথার বেদনাক্লিষ্ট যন্ত্রণা মানুষকে দগ্ধ ও ক্ষতবিক্ষত করে দেয়; মানসপটে তার চিত্রায়ণ এত গভীরতর হয়, যা কখনোই অপনোদন করা সম্ভবপর হয় না।

মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব জবানের হেফাজত করা। একটি পরিশুদ্ধ আত্মাবিশিষ্ট মানুষের অনিবার্য গুণ হলো, তিনি সর্বদাই তার জবান দিয়ে এমন কথা বলবেন, যা বৃহত্তর মানবসমাজের চিরকল্যাণ বয়ে আনবে। মানবতা, সভ্যতা ও গোটা সৃষ্টিলোক তার কথায় উপকৃত ও উজ্জীবিত হবে এবং সর্বত্রই তার সুফল সামগ্রিক শান্তির ফল্কগ্দুধারা হয়ে প্রবহমান থাকবে। সে জন্যই মহানবী (সা.) বলেছেন, যে ব্যক্তি মহান আল্লাহ ও পরকালে বিশ্বাস স্থাপন করে, সে যেন কল্যাণকর কথা বলে, নতুবা চুপ থাকে। তিরমিজি শরিফে আব্দুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত হাদিসে রয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন তার জবানে মিথ্যা, মন্দ ও বিভ্রান্তি সৃষ্টিকারী কোনো কথা বলে, তখন সে কথার কারণে সৃষ্ট দুর্গন্ধে রহমতের ফেরেশতারা তার থেকে অনেক দূরে চলে যায়। বুখারি ও মুসলিমের অপর এক হাদিসে এ সংক্রান্ত আরও ভয়াবহ পরিণাম বর্ণনা করে বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি যখন ভালো-মন্দ, কল্যাণ-অকল্যাণ ও সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলার কোনোরূপ বিচার-বিবেচনাবোধ ছাড়াই কিছু বলে ফেলবে তার পরিণামে সে নিজেকে জাহান্নামের এতটাই গভীরে নিয়ে যায়, যার পরিমাণ পূর্ব ও পশ্চিম দিগন্তব্যাপী বিস্তৃত। তাই মানবসমাজের বৃহত্তর স্বার্থ সুরক্ষার তাগিদে সংশ্নিষ্ট সবার উচিত, কথা বলা বা বক্তৃতা প্রদানের ক্ষেত্রে জবানের যথাযথ হেফাজত নিশ্চিত করা।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়