জালালুদ্দিন রুমির খোদাপ্রেম

প্রকাশ: ১৫ জানুয়ারি ২০২১     আপডেট: ১৫ জানুয়ারি ২০২১

ড. মোহাম্মদ বাহাউদ্দিন

ইসলামের শাশ্বত বিধান আল কোরআনের অমীয় বাণীকে আরও সাবলীল ব্যাখ্যায় অস্থির মানবাত্মার শান্তির জন্য বাঙ্‌ময় করে তুলেছেন মানবতা ও আত্মার বংশীবাদক কবি জালালুদ্দিন রুমি তার মসনভি শরিফে। তাই বর্তমান বিশ্বে জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে প্রতিটি শান্তিপিয়াসী মানুষের আত্মায় ঠাঁই করে নিয়েছে তার কবিতার অমোঘ বাণী। রুমি তার কবিতায় প্রেমের যে অমীয় সুধা বিলিয়েছেন, তৃষ্ণার্ত মানবাত্মা সেই সুধা পান করে স্বর্গীয় শান্তিতে পরিতৃপ্ত হচ্ছে। বিশ্বব্যাপী শান্তিপিয়াসী অস্থির আত্মাগুলো রুমিতেই স্বস্তি খুঁজে পাচ্ছে প্রতিনিয়ত। রুমির এই মানবীয় শান্তির আবেদনের গুরুত্ব উপলব্ধি করেই ইউনেস্কো ২০০৭ সালকে রুমি বর্ষ ঘোষণা করেছিল।

আমরা যখন জালালুদ্দিন রুমির নাম শুনি এবং শত শত বছর ধরে পাক-ভারত উপমহাদেশে তো বটেই, পৃথিবীর সত্য ও সৌন্দর্যপ্রিয় প্রতিটি জাতির মাঝেই রুমির কবিতা ও কাব্যের প্রেমময় বাণী অধ্যয়নের তীব্র আগ্রহ প্রত্যক্ষ করি, তখন মনের অজান্তেই এ কবির দ্বারা আমরা প্রভাবিত হই। সত্যের সন্ধানে এবং সুন্দরের খোঁজে যে আদম সন্তানই সুদীর্ঘ কণ্টকাকীর্ণ উঁচু-নিচু পথ পাড়ি দিতে সংকল্পবদ্ধ হয়েছেন, জালালুদ্দিন রুমি তাদের পাশেই দাঁড়িয়েছেন আপন মানুষ হিসেবে। বিশ্বপ্রেমিক ও সাধক কবি মাওলানা রুমির মসনভি শরিফের প্রধানতম আলোচ্য বিষয় দর্শন, কালাম, ইরফান, তাসাউফ ও আখলাক। দর্শনের আলোচ্য বিষয় জীবন ও জগতের অনন্ত রহস্য আর স্রষ্টার সঙ্গে সৃষ্টির সম্পর্ক প্রসঙ্গ। কালাম শাস্ত্রে আলোচনা করা হয় ধর্মীয় আকিদা-বিশ্বাসের ক্ষেত্রে নানা প্রশ্ন ও জটিলতার সমাধান নিয়ে। ইরফান বা তত্ত্বজ্ঞানের মূল উপজীব্য আত্মার সাগরে অবগাহন করে আল্লাহর পরিচয় বা তত্ত্বজ্ঞানের মণিরত্ন কুড়ানো। তাসাউফ বা কৃচ্ছ্র বলা হয় আধ্যাত্মিকতার অকূল সমুদ্র পাড়ি দেওয়ার লক্ষ্যে রুহানি প্রান্তরগুলো অতিক্রম করা ও বিশেষ আধ্যাত্মিক হাল-এ উপনীত হয়ে পরম প্রেমাস্পদ আল্লাহকে লাভ করার প্রাণান্ত সাধনাকে। ইলমে আখলাকে রয়েছে মানব চরিত্রের অসুন্দর দিকগুলো দূর করে সুন্দর মানবীয় গুণাবলি ও চরিত্রের ফুল ফোটানোর শিক্ষা ও অনুশীলন। রুমি কোরআন মাজিদ ও হাদিস শরিফের আয়নায় এসব বিষয়কে একত্র করে প্রবর্তন করেছেন তার প্রেমদর্শন।

মানবচিত্তের তৃপ্তি অর্থ, ক্ষমতা, প্রতিপত্তি কোনো কিছুতেই নেই। পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধনী অথবা সেরা ক্ষমতাধর কেউই তার নিজ অবস্থানে পরিতৃপ্ত নয়। মূলত সত্যের সাধনাই মানব হৃদয়ের চরম ও পরম সাধনা। পরম সত্যকে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে, প্রতিটি কাজের মধ্যে অনুভব করাই মানুষের শ্রেষ্ঠ সাধনা, পরম তৃপ্তি। যে যতটুকু এই পরম সত্যকে অনুভব করতে পেরেছে, সে ততটাই পরিতৃপ্ত হয়েছে। এই জগৎ, এই জীবন, এই অনন্ত সৃষ্টির উৎসে যিনি আছেন এবং থাকবেন, যিনি চিরসত্য, অনন্ত, অবিনশ্বর, সর্বব্যাপী, যিনি আমাদের ভালোবাসেন অকাতরে, জাতি-ধর্ম-বর্ণ কোনো পরিচয়ই যার কাছে মুখ্য হয়ে ওঠে না, সবই তার সৃষ্টি- এই পরিচয়ই যার কাছে মুখ্য; সেই অশ্রুত পরমাত্মাকে ঘিরেই রয়েছে মানুষের প্রচ্ছন্ন সাধনা ও পরম আত্মতৃপ্তি। সেই স্রষ্টা আল্লাহকে হৃদয়ে ধারণ করা, তার সঙ্গে মিশে যাওয়া বা একাত্মতা ঘোষণা করা, সর্বপ্রকারে সত্য, সুন্দর ও পূর্ণ হয়ে ওঠা এই তো জীবনের পরম আরাধ্য। এই আরাধনার পরিপূর্ণ রূপ দেখি আমরা আধ্যাত্মিক ও অলৌকিক ক্ষমতাসম্পন্ন রুমির জীবনে। প্রকৃতপক্ষে আমরা প্রতিটা মানুষই নিজের অন্তর্জগতে একা। কিসের এই একাকিত্ব? সৃষ্টি যেদিন হতে তার স্রষ্টা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে এই মর্ত্যলোকে ছিটকে পড়েছে, সেদিন থেকেই সে একা হয়ে গেছে। তাই সে হাজার কোলাহলের মাঝেও একাকিত্ব অনুভব করে, তাই তার স্রষ্টা বা মূলের কাছে ফিরে যাওয়ার আকুতি। এটিই খোদাপ্রেম; মূলত এই সত্যই বিবৃত হয়েছে রুমির মসনভিতে। আর সে কারণেই পৃথিবীর যে কোনো প্রান্তের যে কোনো ধর্মের মানুষের কাছেই রুমির সমান সমাদর।

বিস্ময়ের ব্যাপার হচ্ছে, যতই দিন যাচ্ছে রুমির পাঠকপ্রিয়তা ততই বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিভিন্ন ভাষায় ভাষান্তরিত হয়ে ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চতর শ্রেণিতে দর্শনের ছাত্রদের পাঠ্যসূচিভুক্ত হওয়ার পাশাপাশি সাধারণ পাঠকদেরও দৃষ্টি আকৃষ্ট করছে রুমির কবিতা। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, রুমির মসনভি এ পর্যন্ত প্রায় পৌনে দুই কোটি কপি বিক্রি হয়েছে; প্রকৃত হিসাব হয়তো এর চেয়েও অনেক বেশি। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনো কাব্যগ্রন্থের বিক্রি সংখ্যার সন্দেহাতীতভাবে এটিই সর্বোচ্চ রেকর্ড। এটি সম্ভব হয়েছে এই কারণে যে, রুমি মানুষের মনের কাছাকাছি যেতে পেরেছিলেন, মানুষের মনের অস্থিরতা প্রশমিত করার মূলমন্ত্র রুমি জানতেন এবং তাই রূপ দিয়েছেন তার মসনভিতে।

ইংরেজি ভাষায় মসনভির অনুবাদক উইলসন বলেন, 'এই গ্রন্থ (মসনভি) কেবল ধর্মতত্ত্বের ছাত্রদের নয়, বরং সাধারণ দর্শনের একটি গ্রন্থ হিসেবে সব ছাত্রেরই পড়া উচিত।' মসনভির একটি অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো, এতে সাম্প্রদায়িক ভেদাভেদের কোনো চিহ্ন নেই। মোট কথা, মাওলানা রুমির কাব্যকর্মে সাধারণভাবে যে ধারণাটি ফুটে উঠেছে তা হচ্ছে, 'নিরঙ্কুশ খোদাপ্রেম'।

রুমির ইন্তেকাল ঘটেছে ৬৭২ হিজরির ৫ জমাদিউস সানি। তুরস্কের কুনিয়ার মাটিতে ঘুমিয়ে আছেন তিনি। আজও তার অমীয় কাব্যসুধা আমাদের অন্তর্লোক আলোকিত করে চলেছে প্রতিদিন, প্রতিনিয়ত। বর্তমান বিশ্বে আমরা যে অস্থির সময় পার করছি, যে হানাহানি-বিদ্বেষ-ক্লেদ প্রতিনিয়তই অস্থির করে তুলছে আমাদের মানবচিত্ত, তা থেকে চিরন্তন শান্তির জন্য আমাদের রুমিতেই ফিরে যাওয়া উচিত। কারণ রুমির মাধ্যমেই আমাদের জীবাত্মা তার মূল আশ্রয় পরমাত্মায় ফিরে যাওয়ার পথ খুঁজে পায়।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়