কিছুদিন আগে সাগরকন্যা সেন্টমার্টিন ভ্রমণে গিয়েছিলাম। সারাবেলা সমুদ্রতীরে একাকী হাঁটছি আর ঝিনুক কুড়াচ্ছি। একটা হাতব্যাগ নানান রঙের ঝিনুকে ভরে ফেললাম। অতি যত্নে ব্যাগটি আগলে রাখছি। রাতে কক্সবাজার ফিরে এলাম। স্থানীয় হাশেমিয়া আলিয়া মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ মাওলানা আজিজুল হক সাহেবের সঙ্গে পূর্বপরিচয় ছিল। সেই সূত্রে আমাদের সফরের এই পর্যায়ে তার মাদ্রাসাতেই রাতযাপনের আয়োজন।

রাতের বেলা সারাঘরে একটা উৎকট গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে। ঘরের ভেতর খুঁজলাম। তারপর জানালা খুলে বাইরে তাকালাম। কোথাও উৎসের সন্ধান পেলাম না। ফজরের নামাজ আদায় করে পরবর্তী গন্তব্যের উদ্দেশে দ্রুত বাসে উঠলাম। অবাক করার বিষয়, গাড়িতেও সেই একই গন্ধ! আরও তীব্র এবং ঝাঁজালো। শুধু আমি নই, অন্যরাও গন্ধের উৎস খুঁজছে। কী মনে করে আমার ব্যাগ খুললাম। খোলার সঙ্গে সঙ্গে সে কি ভয়াবহ দুর্গন্ধ! দ্রুত ব্যাগ খালি করলাম। খানিকটা লজ্জাও পেলাম। বিদগ্ধ পাঠক, এতক্ষণে নিশ্চয়ই বুঝতে পেরেছেন বালুকাবেলা থেকে তুলে আনা সেই তরতাজা ঝিনুকগুলোর মাংস পচে-গলে এই বিশ্রী গন্ধ ছড়াচ্ছে। সংগ্রহের যথাযথ পদ্ধতি অনুসরণ করলে হয়তো ঝিনুকগুলো বাড়িতে নিয়ে আসতে পারতাম। পথিমধ্যে এরকম বিড়ম্বনা ও যন্ত্রণার শিকার হতাম না।

এই ঝিনুকগুলোর মতো দুনিয়ার যাবতীয় সহায়-সম্পদও যদি মহান রবের নির্দেশিত পদ্ধতি অনুযায়ী অর্জন করা হয়, তাহলে সেগুলো শুধু দুনিয়া নয়, আখেরাতেও কাজে লাগবে। অন্যথায় কষ্টে অর্জিত এসব সম্পদ দুনিয়া ও আখেরাতে কেবল দুঃখ-কষ্ট আর ভোগান্তিরই কারণ হবে। মহান আলল্গাহ তায়ালার মনোনীত ধর্ম ইসলামে মানব জীবনের ব্যক্তিগত, পারিবারিক, সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় বিষয়াদির যাবতীয় সমস্যার হেকমতপূর্ণ সমাধানের বিধান রয়েছে। মানব জীবনের জন্য যা কিছু কল্যাণকর সবকিছুকে বৈধ করা হয়েছে। আর যা কিছু অকল্যাণকর সেসব কিছুকে অবৈধ করা হয়েছে। আর দুনিয়া মানুষের জন্য নিছকই একটি পরীক্ষার ক্ষেত্র।

আসুন পবিত্র কোরআনে চোখ মেলে তাকাই : 'আর চোখ তুলেও তাকাবে না দুনিয়াবি জীবনের শান-শওকতের দিকে, যা আমি এদের মধ্য থেকে বিভিন্ন ধরনের লোকদের দিয়ে রেখেছি। এসব তো আমি এদের পরীক্ষার মুখোমুখি করার জন্য দিয়েছি। আর তোমার রবের দেওয়া হালাল রিজিকই উত্তম ও অধিকতর স্থায়ী ' ( সূরা ত্ব-হা :আয়াত ১৩১)। লক্ষ্য করুন, দুনিয়ার জীবনের শান-শওকত, পরীক্ষার বস্তু। আর পরীক্ষার বিষয় কখনও সুখকর নয়। হারাম বস্তু কখনও আলল্গাহ প্রদত্ত নয়। দুনিয়াতে যা কিছু হালাল তার সবটুকুই আল্লাহ প্রদত্ত। সুতরাং বৈধ উপায়ে অর্জিত সম্পদ স্থায়ী হবে। এই সম্পদ সর্বদা বরকতময়। এর দ্বারা দুনিয়ার শান্তি লাভ হবে। তা থেকে ইমানদাররা অবশ্যই নিজ প্রয়োজন ও কল্যাণের পথে ব্যয় করতে পারবেন। হাদিসের ভাষায় : যদি কেউ একটি খেজুরও দান করেন, আল্লাহ তা পর্বত পরিমাণ বৃদ্ধি করে দেবেন। এভাবে বৈধ সম্পদ আখেরাত পর্যন্ত পৌঁছে যায়। আলল্গাহ সুবহানাহু তায়ালা বলেন, 'তোমরা তোমাদের রবের কাছে ক্ষমা চাও এবং তার দিকে ফিরে এসো। তাহলে তিনি একটি দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তোমাদের উত্তম জীবন সামগ্রী দেবেন। এবং অনুগ্রহ লাভের যোগ্য প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার অনুগ্রহ দান করবেন। তবে যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তাহলে আমি তোমাদের ব্যাপারে একটি অতীব ভয়াবহ দিনের আজাবের ভয় করছি।' (সূরা হূদ আয়াত ৩)

আলোচ্য আয়াতে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালার অঙ্গীকার : ভুল করে ক্ষমা চাইলে এবং পুনরায় আলল্গাহর দিকে ফিরে এলে তাকে উত্তম জীবন সামগ্রী দান করা হবে। মানব জীবনের এটাই তো একান্ত কামনা। আল্লাহ সুবহানাহু তায়ালার ওয়াদার ওপর যারা আস্থা রাখতে পারে না, তারা কোথায় গিয়ে ধ্বংস হলো সেটা তাদের ব্যাপার। তাই যে কোনো অবস্থায় সম্পদ অর্জনে বৈধ পন্থায় চেষ্টা করাই ইমানদারের পরিচয়। ইনশাল্লাহ, আমাদের রব কখনোই ব্যর্থ করবেন না, যতক্ষণ আমরা তার নির্দেশিত পথে চলব।

উপাধ্যক্ষ, শাহাবাদ মাজীদিয়া কামিল মাদ্রাসা, নড়াইল

মন্তব্য করুন