মহান আল্লাহ প্রদত্ত ও তাঁর কাছে গ্রহণযোগ্য দ্বীন বা জীবনব্যবস্থার নাম হলো ইসলাম। আল্লাহপাক বলেন, 'ইন্নাদ-দ্বিনা ইনদাল্লাহিল ইসলাম' অর্থাৎ 'নিঃসন্দেহে আল্লাহর নিকট গ্রহণযোগ্য দ্বীন একমাত্র ইসলাম।' তিনি আরও বলেন, 'ওমাইয়াবতাগি গাইরাল ইসলামা দ্বিনান ফালাইয়ুকস্ফবালা মিনহু ওয়াহুয়া ফিল আখিরাতি মিনাল খাসিরিন' অর্থাৎ 'যে লোক ইসলাম ছাড়া অন্য কোনো ধর্ম তালাশ করে, কস্মিনকালেও তা গ্রহণ করা হবে না এবং আখেরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।' কেননা আল্লাহতায়ালা বিশ্বের মানবগোষ্ঠীর সার্বিক জীবনাচার ও জীবন পদ্ধতি হিসেবে ইসলামকেই মনোনীত ও পছন্দ করেছেন। পবিত্র কোরআনের সর্বশেষ নাজিলকৃত আয়াতেও আমরা সে বিষয়েরই প্রতিধ্বনি শুনতে পাই। আল্লাহপাক বলেন, 'আল ইয়াওমা আকমালতু লাকুম দ্বিনাকুম ওয়া আতমামতু আলাইকুম নি'মাতি ওযারাদিতু লাকুমুল ইসলামা দ্বিনা' অর্থাৎ, 'আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পূর্ণাঙ্গ করে দিলাম, তোমাদের প্রতি আমার অবদান সম্পূর্ণ করে দিলাম এবং ইসলামকে তোমাদের জন্য দ্বীন হিসেবে পছন্দ করলাম।'

ইসলাম সালাম (সমর্পণ, আনুগত্য), সিল্‌ম (সন্ধি করা, মিলন, সমবেদনা), সালাম (শান্তি, প্রণিপাত, সংশোধন, দোষমুক্তি), সালামাত (মুক্তি, অভয়, নিরাপত্তা) এর যে কোনো ধাতু হতে নির্গত বলা যায়। কারণ ইসলাম শব্দ উল্লিখিত প্রত্যেক অর্থে ব্যবহূত হয়ে থাকে। মুসলিম ইসলাম হতে নির্গত বিশেষণ; অর্থ : সন্ধি, শান্তি, নিরাপত্তা বা আত্মসমর্পণকারী। ইসলামের পারিভাষিক অর্থ হজরত মোহাম্মদ (সা.) প্রচারিত ধর্ম। যা স্বাভাবিক ও কল্যাণকর তা সিদ্ধ ও বরণীয় এবং যা অস্বাভাবিক ও অকল্যাণকর তা নিষিদ্ধ ও বর্জনীয়। ইসলামের যাবতীয় বিধি-নিষেধ এই নীতির ওপর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ইসলামের শাব্দিক অর্থ আনুগত্য করা। পরিভাষায় একটি বিশেষ ধর্মের আনুগত্য করার নাম ইসলাম, যা আল্লাহতায়ালা পয়গম্বরদের মাধ্যমে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য প্রেরণ করেছেন। কেননা, সব পয়গম্বরের শরিয়তে ধর্মের মূলনীতি এক ও অভিন্ন।

অতঃপর ইসলাম শব্দটি কখনও উপরোক্ত ব্যাপক অর্থে ব্যবহূত হয় এবং কখনও শুধু সর্বশেষ শরিয়তের অর্থে ব্যবহূত হয়, যা শেষ নবী (সা.)-এর প্রতি অবতীর্ণ হয়েছে। কোরআনে কারিমে উভয় প্রকার ব্যবহারই বিদ্যমান। পূর্ববর্তী পয়গম্বররা নিজেকে 'মুসলিম' এবং নিজ নিজ উম্মতকে 'উম্মতে মুসলিমাহ' বলেছেন- এ কথাও কোরআনপাক থেকেই প্রমাণিত। শেষ নবী (সা.)-এর উম্মতকে বিশেষভাবে 'মুসলিম' বলাও পবিত্র কোরআনে উল্লেখিত রয়েছে। মোটকথা, যে কোনো পয়গম্বর যে কোনো খোদায়ি ধর্ম নিয়ে জগতে আগমন করেছেন, তাকেই ইসলাম বলা হয় এবং হজরত মোহাম্মদ (সা.)-এর উম্মতের বিশেষ উপাধি হিসেবেও এ শব্দটি ব্যবহূত হয়। ইসলাম শব্দের প্রকৃত অর্থ আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ করা এবং তাঁর অনুগত হওয়া। এ অর্থের দিক দিয়ে প্রত্যেক পয়গম্বরের আমলে যারা তাঁর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে এবং তাঁদের আনীত বিধি-বিধানের আনুগত্য করেছে, তারা সবাই মুসলমান ও মুসলিম নামে অভিহিত হওয়ার যোগ্য ছিল এবং তাদের ধর্মও ছিল ইসলাম। এ অর্থের দিকে লক্ষ্য করেই হজরত নুহ (আ.) বলেন, 'ওয়া উমিরতু আন আকুনা মিনাল মুসলিমিন' অর্থাৎ আমি 'মুসলিম' হওয়ার জন্য আদিষ্ট হয়েছি। এ কারণেই হজরত ইবরাহিম (আ.) নিজেকে ও নিজ উম্মতকে 'উম্মতে মুসলিমা' বলেছিলেন। হজরত ঈসা (আ.)-এর সহচররা এ অর্থের প্রতি লক্ষ্য করেই সাক্ষ্য দিয়ে বলেছিল, 'ওয়াশহাদ বিআন্না মুসলিমুন' অর্থাৎ সাক্ষী থাকুন যে, আমরা মুসলিম। ফল কথা হলো, প্রত্যেক পয়গম্বরের আমলে তাঁর আনীত দ্বীনই ছিল দ্বীনে ইসলাম এবং আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য। পরে এগুলো একের পর এক রহিত হয়েছে এবং পরিশেষে দ্বীনে-মুহাম্মদিই 'ইসলাম' নামে অভিহিত হয়েছে, যা কেয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে।

কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ ও জাকাত এই পাঁচটিকে আরকানে ইসলাম বা ইসলামের স্তম্ভ বলা হয়। ঘর যে রূপ শুধু খুঁটি নয়, আরও অনেক জিনিস সংযোগে হয়, সেইরূপ শুধু কালেমা, নামাজ, রোজা, হজ, জাকাত ইসলাম নয়, আরও বহু জিনিসের সংযোগে ইসলাম হয়। বড়ই পরিতাপের বিষয়, আজকাল অনেকে শুধু এই পাঁচটি বিষয়কেই ইসলাম মনে করে থাকে। কেউ এইটুকু করতে পারলে তাকে পাক্কা মুসলমান মনে করা হয়, তার অন্য কার্যকলাপ যতই ইসলামবিরোধী হোক না কেন। মনে রাখতে হবে যে, ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন বিধান। এর কিছুটা গ্রহণ ও কিছুটা বর্জন করলে সুফল পাওয়ার আশা কম। অভিধানের দৃষ্টিতে ইসলাম অর্থ আদেশ পালন করে চলা। কিন্তু দ্বীনের ভাষায় যখন কথা বলা হয়, তখন এ শব্দের অর্থ শুধু সেই আদেশ পালন, যা আল্লাহতায়ালার পক্ষ থেকে করা হয়। অর্থাৎ, আল্লাহর আদেশ পালন করে চলা। অতএব, মুসলিম তাকেই বলে, যে আল্লাহর আদেশ মেনে চলে এবং তাঁর আদেশ লঙ্ঘন করে না। গোটা সৃষ্টিজগৎ সৃষ্টিগতভাবে এবং বাধ্যতামূলকভাবে মুসলিম এবং শরিয়তগতভাবে সব নবীর উম্মতই মুসলিম ছিলেন। এমনিভাবে আল্লাহতায়ালার প্রেরিত প্রত্যেক দ্বীনও ছিল ইসলাম। কিন্তু ইসলাম এবং মুসলিম শব্দদ্বয় যখন সাধারণভাবে বলা হয়, তখন শেষ নবীর প্রচারিত দ্বীনকেই বলা হয় ইসলাম এবং তাঁর অনুসারী উম্মতকে বলা হয় মুসলিম।

ইসলাম আল্লাহ প্রদত্ত পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। ইসলাম কোনো অনুষ্ঠানসর্বস্ব ধর্ম নয়। এটি একটি পরিপূর্ণ এবং শাশ্বত জীবন-বিধান। ইসলামের ব্যুৎপত্তিগত অর্থ হচ্ছে শান্তি, আর এর ব্যাপক অর্থ হচ্ছে মহান আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে আত্মসমর্পণ করা। হজরত আদম (আ.) থেকে শুরু করে যত আম্বিয়ায়ে কেরাম দুনিয়াতে আগমন করেছেন, তাঁরা সবাই ইসলামের পয়গাম নিয়েই এসেছেন। মোহাম্মদ (সা.)-এর মাধ্যমে ইসলাম পরিপূর্ণতা লাভ করেছে। রাসুল (সা.) আল্লাহ কর্তৃক মনোনীত যে দ্বীন বা পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা এনে দেন তা কিয়ামত পর্যন্ত কায়েম থাকবে। ইসলাম হচ্ছে আলো, এই আলো মানবতাকে শিরক, কুফর ও বিদআতের মতো পাপ ও পঙ্কিলতা থেকে পবিত্র করে। এই আলো মানুষকে সত্য সুন্দর সিরাতুল মুস্তাকিমে পরিচালিত করে। ইসলাম দুনিয়ার কল্যাণের দিকনির্দেশনা প্রদান করে। সঠিক ও সত্য এ দ্বীন মানুষকে ন্যায় ও সত্য পথেই পরিচালিত করে। কোরআন মজিদে ইরশাদ হচ্ছে, 'সত্য সমাগত মিথ্যা দূরীভূত, মিথ্যা তো বিলুপ্ত হবারই (১৭ :৮১)।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন