মাদার তেরেসা বলেছিলেন, 'একটি মিষ্টি হাসি শান্তির বার্তার শুরু'। তিনি সারাজীবন শান্তির জন্য কাজ করেছেন। কলকাতায় এমন সমাজে এমন মানুষের মধ্যে কাজ করেছেন, যা তাকে বিশ্ববাসীর কাছে শান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। অসহায় মানুষের মুখের হাসির মাঝে তিনি শান্তির বার্তা খুঁজে পেতেন। ২০১৭ সালে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের স্টেট ডিপার্টমেন্টের আমন্ত্রণে মাসব্যাপী সফরের একপর্যায়ে ক্যালিফোর্নিয়ার 'ক্যাথেড্রাল অব আওয়ার লেডি অব দ্য অ্যাঞ্জেল'-এ যাই। সেখানে গিয়ে মেরির ছবির পাশেই মাদার তেরেসার বিশাল বিশাল সেবামূলক ছবি দেখে বেশ পুলকিত হয়েছিলাম। কেননা তার এ সেবার ক্ষেত্রটি ছিল পশ্চিম বাংলার। আমাদের প্রতিবেশী রাষ্ট্রে। তিনি ছিলেন খ্রিষ্টান। তার সেবার স্থানটিতে বেশিরভাগ ছিল হিন্দু, মুসলমান এবং অনেক আদিবাসী। আর খ্রিষ্টান তো ছিলই। ধর্মকে ধারণ করে যে ঐকতান তা-ই আমাদের বাঁচিয়ে রাখতে পারে জনম জনম। এর এক সুন্দর উদাহরণ ছিলেন মাদার তেরেসা। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর এ প্রান্তে দাঁড়িয়ে আমরা কি আর সেই ইন্টারফেইথ হারমনি বা আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির কথা বলতে পারছি? আমরা কি দৃঢ়তার সঙ্গে বলতে পারছি আমরা অতীতের চেয়ে ভালো আছি? উত্তর কি হ্যাঁ আসবে? আমার মনে হয় না। না সূচক দিকেই অনেকের উত্তর আসবে? মানবিক শান্তির পৃথিবী ধীরে ধীরে যে অসহিষ্ণুতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, এ বিষয়টি খুব সম্ভবত জর্ডানের বাদশাহ আবদুল্লাহ দ্বিতীয় বুঝতে পেরেছিলেন। তার উত্থাপিত প্রস্তাবেই ১৩ সেপ্টেম্বর ১৯৯৯ সালে ৫৩/২৪৩ নম্বর রেজুলেশনে 'ওয়ার্ল্ড ইন্টারফেইথ হারমনি উইক' সিদ্ধান্তটি গৃহীত হয়। সিদ্ধান্তে চারটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়া হয়- ১. পারস্পরিক সমঝোতা ও আন্তঃধর্মীয় আলোচনা, ২. সব ধর্মের অংশগ্রহণে প্রতি বছর ফেব্রুয়ারির ১-৭ তারিখ 'ওয়ার্ল্ড ইন্টারফেইথ হারমনি উইক' পালন, ৩. স্রষ্টার ভালোবাসার সৃষ্টি মানুষের প্রতি ভালোবাসার হাত সম্প্রসারণের বার্তা বিশ্বের সব মসজিদ, মন্দির, চার্চ, সেনেগগ ও অন্যান্য ধর্মের উপাসনালয়ে প্রচার করা এবং ৪. জাতিসংঘ মহাসচিব কর্তৃক শান্তির বিষয়টি সর্বদা সাধারণ পরিষদে অবহিত করা।

জাতিসংঘের রেজুলেশন অনুযায়ী এখন 'ওয়ার্ল্ড ইন্টারফেইথ হারমনি উইক' চলমান। আমরা যদি আজকের বিশ্বকে নিয়ে কিছুটা পর্যালোচনা করি তাহলে অবশ্য এ কথা বলতে হবে, 'মানবিকতার' স্লোগান একেবারে ঠুনকো হয়ে যায়নি। ১৬৮৯ সালে ইংল্যান্ডের 'দ্য ডকুমেন্ট অব রাইটস' অথবা ১৯১৮ সালের 'ডিকলেয়ারেশন অব রাইটস' বিশ্বকে ধীরে ধীরে শান্তির কথা শিখিয়েছে। ন্যাশন স্টেট থিওরি মানুষকে জাতিভিত্তিক শান্তির পায়রা ওড়াতে শিখিয়েছে। তারপরও মধ্যযুগ বা পনেরো শতকে খ্রিষ্টান ধর্মীয় বিভেদে ইউরোপে যে মানুষ হত্যা করা হয়েছে, ফিলিস্তিন-ইহুদি যুদ্ধে সারা পৃথিবীতে যে বিভক্তি দেখা দিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে মুসলমানে মুসলমানে ধর্মীয় উগ্র আন্দোলনের মাধ্যমে যে রক্তের হোলিখেলা চলছে, রোহিঙ্গাদের রক্ত নিয়ে আমাদের চোখের সামনেই যেভাবে ধর্মীয় উগ্রতা ছড়িয়েছে, এর কি মানবিক ব্যাখ্যা আমরা খাড়া করব? প্রত্যেকেই যার যার অবস্থান থেকে হয়তো নিজের পক্ষে যৌক্তিক ব্যাখ্যা দাঁড় করবেন, নিজের নিরাপত্তা বা অস্তিত্বের কথা বলবেন। কিন্তু যদি বলা হয় নিজের অস্তিত্বের জন্য অন্যের অস্তিত্ব ধ্বংস করা কি বৈধ? ধর্মের নামে বা ব্যক্তির নামে অথবা রাষ্ট্রের নামে অন্যায়ভাবে কারও ওপর অত্যাচার করার লাইসেন্স কি কাউকে দিয়েছে? অবশ্যই দেয়নি। তাহলে সভ্যতা ও মানবতার বিশ্বের এ পর্যায়েও কেন এত হত্যা আর মানুষে মানুষে বিভেদ?

'ওয়ার্ল্ড ইন্টারফেইথ হারমনি উইক'-এ মূলত পারস্পরিক ধর্মীয় শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। তাহলে আমরা কী বলব, আধুনিক ও সভ্য সমাজের উত্তরাধিকারের দাবি নিয়ে তাহলে আমরা কি ধর্মের মৌল চেতনাকে বিসর্জন দিয়েছি?

আমি বিশ্বাস করি ধর্মের বিশ্বাসে ভিন্নতা আছে, আছে অঞ্চল বা সামাজিক আচরণের প্রভাব। তবে ধর্মের সৃষ্টিই হয়েছে মানবতার শান্তির জন্য। ধর্মের বাণী সর্বদা শান্তি ও সমৃদ্ধির বাণী বিলাচ্ছে, তাতে সন্দেহ নেই। সমস্যা হলো, আমরা যারা ধর্মের অনুসারী তাদের মধ্যে। ধর্ম নিয়ে অতি উগ্রতা অথবা একেবারে উদাসীনতা আমাদের ব্যক্তি, সামাজিক ও বিশ্ব ভ্রাতৃত্বের জন্য হুমকি, তা তো আমরা প্রকাশ্যেই দেখতে পাচ্ছি। এখন পৃথিবীতে দরিদ্রতার চেয়ে জাতীয়তাবাদ বা ধর্মের নামে উগ্রতা অনেক বেশি হুমকি হিসেবে দেখা দিয়েছে। ধর্মের ব্যাখ্যায় যদি ধর্মীয় পণ্ডিতদের নিয়ন্ত্রণে না থাকে, তাহলে ধর্মের অনুসারীদের আবেগ নিয়ে অনেকেই ব্যবসা করতে চাইবে। বিশ্বে বর্তমানে টেররিজমকে যেমন অনেকে ইন্ডাস্ট্রি হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে, তেমনিভাবে ধর্মীয় বাড়াবাড়ির লাগাম টেনে না ধরলে 'এক্সট্রিম রিলিজিয়াস ইকোনমি' নামে আরেকটি অর্থনৈতিক টার্ম হয়তো আমরা দেখতে পাব। সারাবিশ্বে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতার যে ঊর্ধ্বগতি, তা থেকে অবশ্যই আমাদের বের হয়ে আসতে হবে। শান্তির পথেই আমাদের হাঁটতে হবে। পারস্পরিক শ্রদ্ধার ভিত্তিতে ধর্মীয় নেতাদের দূরত্ব কমিয়ে আনতে হবে। বিতর্কিত বিষয় পেছনে রেখে ঐক্যের জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তবেই জাতিসংঘ ঘোষিত 'ওয়ার্ল্ড ইন্টারফেইথ হারমনি উইক' পালন যথার্থ হবে।

 অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া
iqbaliu@gmail.com

মন্তব্য করুন