ধর্ম ও ধর্মবিশ্বাস মানবজীবনে বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। এস ওয়াজেদ আলীর (১৮৯০-১৯৫১ খ্রি.) ভাষায়- ধর্ম না হলে মানুষ থাকতে পারে না। ধর্ম ছাড়া মানুষের মহত্তর বৃত্তিগুলো বাঁচতে পারে না। ধর্ম ছাড়া প্রত্যেক মানুষের অন্তরে যে বিশ্বমানবটি, যে ড়িৎষফ ংড়ঁষ-টি আছে, সে কখনও শান্তি পায় না। এই ধর্মের বলেই মানুষ অসাধ্য সাধন করে, এই ধর্মের বলেই মানুষ ফেরেশতা হয়ে ওঠে, এই ধর্মের বলেই মানুষ জ্বরা-মৃত্যুর জুলমাত অতিক্রম করে এবং অনন্ত জীবনের আবেহায়াত লাভ করে।

ধর্ম মানুষকে শুধু ধার্মিক করে না; বরং মানুষ ধর্মবিশ্বাসের কারণে আরও অধিক মানবিক, উদার, দায়িত্বশীল ও মূল্যবোধসম্পন্ন হয়। কোনো ধর্মই মানুষের অকল্যাণ করতে শেখায় না; সমাজের জন্য অনিষ্ট ডেকে আনে না এবং সভ্যতার জন্য ক্ষতিকারক হয় না। বরং ধর্ম ও ধার্মিক পৃথিবীকে শান্তি দিতে পারে। এর প্রমাণ সিলেটের শাহজালাল ইয়ামেনি, শাহ পরান, নেত্রকোনার শাহ সুলতান রুমি, বগুড়ার সুলতান মাহিসওয়ার, রাজশাহীর শাহ মাখদুম, খুলনার খানজাহান আলী, চট্টগ্রামের বার আউলিয়া, রামকৃষ্ণ পরমহংস দেব, স্বামী বিবেকানন্দ, গৌতম বুদ্ধ, লোকনাথ ব্রহ্মচারী- তাদের সবাই ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষা করেছেন, মানুষকে শান্তি দিয়েছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত ও লালিত-পালিত ধর্মগুলোর সারশিক্ষা হলো, প্রেম-শান্তি-সম্প্রীতি।

ইসলাম মানবতার ধর্ম। হত্যা, সন্ত্রাস ও গোলযোগ ইসলামের মূলনীতির পরিপন্থি। কোরআনে বলা হয়েছে- 'পৃথিবীতে ফ্যাসাদ সৃষ্টি করো না।' (২:১১) 'আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের ভালোবাসেন না।' (৫:৬৪) 'আর ফেতনা হত্যার চেয়েও ভীষণতর অন্যায়।' (২:২১৭) 'যে ব্যক্তি কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল সে যেন গোটা মানবজাতিকেই হত্যা করল।' (৫: ৩২) হিন্দু ধর্মের মূলবাণী 'নমস্কার' শব্দের মধ্যেই নিহিত আছে, যার অর্থ- তোমার ভেতরে যে ভগবান আছে তার প্রতি আমি মস্তকাবনত। এ রকম চমৎকার ও কল্যাণকামী সম্বোধন যে ধর্মে আছে তা অন্য ধর্মের জন্য অমঙ্গল বয়ে আনতে পারে না। জরথুস্ত-এর ধর্মগ্রন্থের নাম জেন্দাবেস্তা, তাতে বলা হয়েছে- ক্রোধ আর হিংসার দ্বারা আত্মার সৌন্দর্য নষ্ট করা হয়। পরের দুঃখ দূরীকরণের দ্বারাই প্রকৃত সুখ পাওয়া যায়, পরের দুঃখ দূরকারী ব্যক্তিজগৎ পিতার প্রকৃত উপাসক। অহিংসা পরম ধর্ম- এটি বৌদ্ধ ধর্মের মূলনীতি; সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য এই একটি বাক্যই যথেষ্ট। বৌদ্ধ ধর্ম স্বর্গের আশায় বা নরকের ভয়ে সৎ থাকতে বলে না, বরং বিবেকের তাড়নায় সৎ জীবনযাপন করতে বলে। ইহুদি ধর্মের অন্যতম মূলনীতি হলো- কাউকে হত্যা করো না। এ মূলনীতি অনুসরণ করলে সম্প্রীতি বিনষ্ট হয় না। একেশ্বরবাদী শিখ ধর্মের মর্মবাণী হচ্ছে- 'ধর্মাচরণের দ্বারা মানবতার কর্মফলকে কল্যাণের পথে নিয়ন্ত্রিত করা, সততার সঙ্গে বসবাস করা, নিরহঙ্কারী থাকা, শুদ্ধতা অবলম্বন করা এবং নিজেকে যাবতীয় কুপ্রবৃত্তির ঊর্ধ্বে রাখা। কনফুসীয় ধর্মের মূলনীতি হলো- বিশ্বজনীনতা, শান্তি ও ন্যায়বিচারভিত্তিক একটি নৈতিক ব্যবস্থার প্রবর্তন। যিশুখ্রিষ্টের আদর্শ ধারণ করলে খ্রিষ্টান জগৎ প্রেম আর ভালোবাসায় পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। এভাবে প্রতিটি ধর্মের মূলনীতি অনুসরণ করলে সম্প্রীতির নূ্যনতম অভাব থাকে না।

আমাদের সমাজে যেখানে অনেক ধর্মমতের লোকদের বসবাস, সেখানে প্রত্যুষে আজানের ধ্বনিতে ঘুম ভাঙে আবার সন্ধ্যায় বিহার থেকে প্রার্থনা ও মন্দির থেকে উপাসনার সুর ভেসে আসে। সবার একই বিদ্যায়তন, একই খেলার মাঠ; আনন্দ-বিনোদনের একই মিলনস্থল। প্রার্থনার সময় যে যার মতো করে পরম স্রষ্টাকে ডাকছে, প্রার্থনা করছে। সুতরাং সেখানে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতির রূপটি কতই না মধুর! বাংলার রুমি সৈয়দ আহমদুল হক (১৯১৮-২০১১ খ্রি.) তার ধর্মের ডাক প্রবন্ধে সর্বধর্মের মূলনীতিগুলোর বিশদ বিবরণ দিয়েছেন; যা অধ্যয়ন ও বাস্তবায়নে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতি আরও জোরদার হতে পারে। তাই এয়াকুব আলী চৌধুরীর (১৮৮৮-১৯৪০ খ্রি.) ভাষায় জোর দিয়ে বলতে হয়- 'মানুষ ধর্মের পথে চলো, পৃথিবীতে ধর্মই সার জিনিস।'

বাংলার রুমি সৈয়দ আহমদুল হক সর্বতোভাবে উদার ধর্মবোধে বিশ্বাসী ও সাম্প্রদায়িকতা রহিত মূল্যবোধের প্রবক্তা ছিলেন। ধর্মকে তিনি শান্তির উৎস হিসেবে দেখেছেন ও তার জীবনাদর্শে তুলে ধরেছেন। তার মতে, যারা ধার্মিক তারা সত্যিকার অর্থে পরিপূর্ণ মানুষ। ধর্মের মর্মবাণী হৃদয়ে ধারণ করলে মানুষ সৎ, নিষ্ঠাবান ও দায়িত্বশীল হতে বাধ্য। প্রকৃত ধার্মিকরা কখনও নির্দয়, অমানবিক ও জঙ্গি হতে পারে না। ধর্ম ও সাম্প্রদায়িকতা প্রবন্ধে বাংলার রুমি বলেন, ধর্ম কোনো দিন প্রগতিশীলতা ও জ্ঞান-বিজ্ঞানের প্রসারতাকে বারণ করে না; বরং ইতিহাস, দর্শন, রসায়ন, প্রকৌশল, পদার্থ, অঙ্ক, সাহিত্য, জ্যোতির্বিজ্ঞানসহ জ্ঞান-বিজ্ঞান ও বিশ্বসভ্যতার প্রতিটি ক্ষেত্রেই অপরিসীম অবদান রেখেছে ধর্ম। বিশ্বসভ্যতায় অনন্য অবদান রেখেছেন যারা, তাদের প্রায় সবাই কোনো না কোনো ধর্মের অনুসারী ছিলেন। অতি প্রাচীনকাল থেকেই ধর্ম-চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞান চর্চা হয়েছে। তাই তার ভাষায়, পৃথিবীর সমস্ত সমুদ্রের জল যদি কালি হয় এবং সমস্ত বৃক্ষরাজি যদি কলম হয়, তাহলেও বিশ্বসভ্যতায় ধর্মের যে অবদান রয়েছে, তার ব্যাখ্যা শেষ হবে না। তিনি শেষ করেন এই বলে যে, 'ধর্মের জয় হোক আর অধর্মের ক্ষয় হোক।' সারাজীবন তিনি ধর্মের কথাই বলেছেন এবং ধর্মেরই জয়গান গেয়েছেন। সকল ধর্মের মর্মবাণীর সমন্বয়ে আহরিত নির্দেশনার আলোকরশ্মিকে জীবনচলার পথের দিশারি করেছেন। এভাবেই বাংলার রুমি মানুষের মাঝে আন্তঃধর্মীয় সম্প্রীতিবোধকে জাগিয়ে তোলেন; যা আজ সমাজে শান্তি নিশ্চিতকরণের ক্ষেত্রে আবশ্যকীয় উপাদেয়। বাংলাদেশ সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির হাজার বছরের উজ্জ্বল দৃষ্টান্তের দেশ। এখানে মাঝে মাঝে ফেরকাগত, সম্প্রদায়গত, তরিকাগত বিদ্বেষ থেকে যে অপ্রীতিকর ঘটনাবলির জন্ম নেয়- সেগুলো কোনোমতেই কোনো ধর্মই সমর্থন করে না; বরং ধর্ম তো কেবল সর্বমানবের কল্যাণকামী জীবনাদর্শকেই ধারণ করে। তাই আমাদের উচিত, ধর্মের কল্যাণকর দিকগুলোকেই বেছে নেওয়া; ধর্মের নামে অনাচার সৃষ্টি করা শুধু সমাজের জন্যই ভয়াবহ পরিণাম ডেকে আনে না, সেটি অবধারিতভাবে ধর্মের জন্যও অপূরণীয় ক্ষতি বয়ে আনে। তাই আমরা বিভেদের উচ্চ প্রাচীর নয় বরং মিলনের নরম ফরাশ বিছিয়ে দিতে চাই- সে মিলন সর্বজনীন-বিশ্বজনীন, সকল জাতের, সকল ধর্মের, সকল মানুষের মিলন; সে মিলন সমগ্র মানবজাতির শান্তির, সম্প্রীতির।

চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ,  ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন