মহান আল্লাহ মানুষকে অসংখ্য-অগণিত নেয়ামত দিয়েছেন। এসব নেয়ামতের মধ্যে অন্যতম হলো তারুণ্য। মানবজীবনকে যদি একটি মহিরুহের সঙ্গে তুলনা করা হয় তাহলে তার বিকশিত রূপের এক অনবদ্য চারাগাছ এই তারুণ্য। তারুণ্যের মেধা, যোগ্যতা, দুর্ভেদ্য শক্তিমত্তা ও অভিনবত্ব সর্বাংশে অজেয়, অসামান্য। একটি সমাজ, সভ্যতা ও জাতিসত্তার বিকাশে তারুণ্যের ভূমিকা সর্বযুগে, সব দেশে ও যাবতীয় ধর্ম-দর্শনে খুবই প্রশংসিত ও তাৎপর্যপূর্ণ। পবিত্র কোরআনুল কারিমসহ সব ধর্মগ্রন্থে তারুণ্যের শক্তি ও সামর্থ্যকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। তরুণ ও যুবসমাজই পারে সমাজের পশ্চাৎমুখী অবস্থান ও অনগ্রসরতার অবসান ঘটিয়ে দুর্বার গতিতে ইতিবাচক ও অগ্রসরমান ধারা নিশ্চিত করতে। সমাজের আমূল পরিবর্তনে তরুণ-যুবাদেরই থাকে মুখ্য ভূমিকা; অন্তত সভ্যতার ইতিহাস তাই প্রমাণ করে। পৃথিবীতে অন্ধকার যুগের অবসান ঘটিয়ে ইসলামের শান্তিপূর্ণ ও প্রেমময় বিধি-বিধানের আলোকে মানবেতিহাসের সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ এক যুগ বিনির্মাণে মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর নেতৃত্বে এই তরুণরাই অসম সাহস, প্রত্যয়দীপ্ত অবস্থান ও অবর্ণনীয় ত্যাগ-তিতিক্ষার অতুলনীয় দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল।

আল্লাহ রাব্বুল আলামিন পবিত্র কোরআনের সুরা রুম-এ বলেছেন- 'আল্লাহুল্লাযি খালাকাকুম মিন যুফিন ছুম্মা জাআলা মিমবাদি যুফিন কুওয়াহ।' অর্থাৎ আল্লাহ তোমাদের সৃষ্টি করেন দুর্বল অবস্থায়; অতঃপর এ দুর্বলতার পরেই দেন শক্তিমত্তা। মহান আল্লাহর উপরিউক্ত বাণীর মর্মানুযায়ী এ শক্তিমত্তা হলো তারুণ্যের, যা নিঃসন্দেহে মানুষ ও মানবতার জন্য পরম রবের পক্ষ থেকে শ্রেষ্ঠতম অনুগ্রহ। এ তারুণ্যকে কাজে লাগিয়ে জরাজীর্ণ ও পঙ্কিলতায় ঘেরা সমাজ ব্যবস্থাকে বিশ্বস্রষ্টার সর্বোত্তম সৃষ্টি মানুষ ও মানব সভ্যতার জন্য বসবাস উপযোগী করে তোলাই ইসলামের সুমহান লক্ষ্য। বিশ্বমানবতার পরম সুহৃদ মহানবী (সা.) মাক্কি ও মাদানি জীবনে সেই তারুণ্যের অজেয় শক্তিকেই কাজে লাগিয়েছিলেন; তাদের সুসংগঠিত করেছিলেন। তার নক্ষত্রতুল্য সাহাবায়ে কেরামের মাঝে মাত্র কয়েকটি গৌরবোজ্জ্বল নামই আমাদের সামনে সেই ঐতিহাসিক সত্যটির সাক্ষ্য বহন করবে। হজরত উমর (রা.), হজরত আলি (রা.), হজরত বেলাল (রা.), হজরত তালহা (রা.), হজরত জোবায়ের (রা.), হজরত খালিদ বিন ওয়ালিদ (রা.), হজরত আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.), হজরত আব্দুল্লাহ বিন রাওয়াহা, হজরত মোআজ (রা.) ও হজরত মোআওয়িজ (রা.)-এর মতো তারুণ্যদীপ্ত সফল মানুষই মহানবীর (সা.) নবুয়তি মিশনকে কামিয়াবির চূড়ায় উপনীত করতে সর্বাত্মক সহযোগীর ভূমিকা পালন করেছিলেন।

যুদ্ধবিধ্বস্ত মরুময় আরবের মক্কা নগরীর সব অশান্তি আর বিবাদ-বিশৃঙ্খলার অবসান ঘটাতে মহানবী (সা.) তরুণ বয়সেই গঠন করেছিলেন 'হিলফুল ফুজুল' তথা এক শান্তিসংঘ, যার মাধ্যমে তিনি তদানীন্তন বর্বর-অসভ্য এক জাতিগোষ্ঠীকে সম্ভাব্য ধ্বংসের হাত থেকে সুরক্ষার প্রয়াস পেয়েছিলেন। পৃথিবীতে নবী-রাসুল প্রেরণের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা পর্যালোচনা করলে আমরা দেখতে পাব, তরুণ বয়সেই সব নবী-রাসুল তাঁদের স্বজাতির মধ্যকার শান্তি-শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করেছেন। হজরত ইব্রাহিম (আ.) নবুয়তপ্রাপ্তির বহু আগেই পরম স্রষ্টাকে চেনা-জানার উদগ্র বাসনা ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছিলেন। হজরত মুসা (আ.) তরুণ বয়সে নানাবিধ পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন এবং প্রতিটি জটিল পরিস্থিতি অত্যন্ত সাহসিকতা ও দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করেছেন। হজরত দাউদ (আ.) তরুণ বয়সে দুষ্টু ও অভিশম্পাতগ্রস্ত জালুতকে হত্যা করেছেন। হজরত ইউনুস (আ.) তারুণ্যের সাহস ও বিশ্বাসবলেই মাছের পেটে থাকা সেই জটিল অবস্থায়ও পরম রবের সানুগ্রহ সাহায্যের ওপর আস্থাশীল থেকেছেন। সৌন্দর্যের আধার হজরত ইউসুফ (আ.) তারুণ্যের ঔজ্জ্বল্য এবং বাহ্যিক ও আত্মিক পরিশুদ্ধতার কারণে যাবতীয় অপবাদ, উদ্ভূত সমস্যাবলি ও জেলখানার দুঃসময়কে জয় করতে পেরেছেন। তারুণ্যের প্রতীক হজরত ঈসা ইবনে মারইয়াম (আ.) মহান আল্লাহর এতটাই প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিলেন, তার সুরক্ষার জন্য আল্লাহপাক তাকে পূর্ণ নিরাপদে আকাশে উঠিয়ে নিয়েছিলেন। সুতরাং, এই তারুণ্য মহান আল্লাহর কাছে খুবই প্রিয় ও সম্মানিত।

মানবজীবনের তাৎপর্যময় এই সময় কোন কাজে ব্যয় করা হয়েছে, সে মর্মে কেয়ামতে প্রত্যেক মানুষ প্রশ্নের মুখোমুখি হবে। পাশাপাশি সত্যনিষ্ঠ ও খোদাভীরু তারুণ্যের জয়গান গেয়ে পারলৌকিক জীবনে তার উত্তম আবাসস্থলের নির্দেশনা তথা আরশে আজিমের ছায়াতলে স্থান পাওয়ার সুসংবাদ ব্যক্ত করা হয়েছে। তরুণ বয়সে পাপাচার ও গর্হিত কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা সর্বাধিক। তাই তো এ বয়সের ইবাদতকেই সর্বাপেক্ষা অধিক পুণ্যময় বলে ঘোষণা করা হয়েছে। তরুণ সমাজের চারিত্রিক ও মূল্যবোধের অবক্ষয় রোধে ইসলামে নানান প্রণোদনার বার্তা ঘোষিত হয়েছে। খোদাভীতি অন্তরে লালন ও কর্মে বাস্তবায়নের উত্তম সময় ও সুযোগও হচ্ছে এই তারুণ্যকাল। পৃথিবীতে আদর্শ তরুণদের এক অনবদ্য দৃষ্টান্ত হলো আসহাবে কাহাফের তরুণরা। সমকালীন নীতিহীন ও আদর্শবিমুখ জালিমদের রক্তচক্ষুুকে পরোয়া না করে সত্য ও ন্যায়ের পথে অবিচল থাকার এক ঐতিহাসিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল আসহাবে কাহাফের সেই গৌরবোজ্জ্বল তারুণ্য। বৈশ্বিক করোনা মহামারিতে আমাদের দেশের তারুণ্য এক সংকটকাল অতিক্রম করছে। আমরা নানাবিধ সমস্যা ও সীমাবদ্ধতার কারণে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান খুলতে পারছি না; স্কুুল-কলেজ-মাদ্রাসা-বিশ্ববিদ্যালয় পড়ূয়া তারুণ্য এ প্রতিকূল পরিস্থিতিতে জীবনের স্বাভাবিক গতি হারিয়ে ফেলছে। আমরা তরুণদের শারীরিক সুস্থতা নিয়ে যতটা ভাবছি, সামগ্রিক ব্যবস্থাপনা পর্যালোচনায় বলা যায়, তাদের আত্মিক, মানসিক অসুস্থতা ও বিপর্যয়কর অবস্থা সম্বন্ধে আমাদের কর্মপ্রয়াস ততটা পরিকল্পিত ও অর্থবহ নয়।

অধ্যাপক ও চেয়ারম্যান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

মন্তব্য করুন