প্রাচীন একটি মানচিত্রে দেখা যায় যে, শহর-ঢাকার তিন ভাগের দুই ভাগই ছিল বাগ-বাগিচা অর্থাৎ বাগানে ঢাকা। এই মানচিত্রের চিত্রকর ছিলেন ভারতের প্রথম সার্ভেয়ার জেনারেল জেমস রেনেলে। এখন শুনতে অবাক লাগলেও এটি সত্যি যে, শহর ঢাকায় যত্রতত্র গড়ে উঠেছিল বহু বাগবাগিচা। এর অন্যতম দৃষ্টান্ত পিলখানার পেছন দিকে নবাব রশিদ খাঁন-কা বাগিচা, রমনার বাগ-ই শাহী; যা বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান ও শাহবাগ। কার্জন হল চত্বরের বাগ-ই মুসা, হোসেনি দালান, বকশিবাজার এলাকার বাগ-ই উমেদ বুর্জুগ, দিলকুশার নবাবী বাগিচা এবং পোস্তগোলার হুক্কাবাহকের বাগান। এ ছাড়া লালবাগ, স্বামীবাগ, পরীবাগ, শান্তিবাগ, মধুবাগ, গোলাপবাগ প্রভৃতি এলাকায়ও যে বাগবাগিচা ছিল তা নাম থেকেই বোঝা যায়।
মোগল সংস্কৃতির ধারায় 'বাগ' বা 'বাগান' গড়ে তোলা এক সময় ঢাকা শহরের ঐতিহ্যে পরিণত হয়েছিল। এ রকমই একটি বাগানসমৃদ্ধ এলাকা ছিল 'আরামবাগ'। বাগ বা বাগানে প্রচুর গাছ থাকায় রৌদ্র-তাপে শ্রান্ত মানুষ এর নিচে আশ্রয় পেয়ে এবং ফল খেয়ে বেশ আরাম পেত। এ থেকেই এর নাম আরামবাগ হয়েছে। আরামবাগ বর্তমানের অতি ব্যস্ত বাণিজ্যিক এলাকা হলেও এর বাগ নামটি মুছে যায়নি। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩২ নম্বর ওয়ার্ড হিসেবে এর পরিচিতি হলেও আরও একটি পরিচয় অনেকেরই জানা আছে। সেটা হলো প্রায় আটশ' প্রেস বা ছাপাখানা রয়েছে এই এলাকায়। প্রেসপাড়া হিসেবেও এটি বহুল পরিচিত এলাকা। ঢাকার ঐতিহ্যবাহী শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নটর ডেম কলেজ আরামবাগেই অবস্থিত।
এই আমাদের ঢাকা ধারাবাহিক পর্বে কথা বলছিলাম রাজধানীর বিভিন্ন বাগ, বাগান বা বাগিচা নিয়ে। ঢাকা সিটি করপোরেশনের ৩৬ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্গত এলাকা চামেলিবাগ। এর উত্তরে মালিবাগ ও রাজারবাগ, দক্ষিণে শান্তিনগর। ছোট আয়তনের এই এলাকাটিতে এক সময় চামেলি ফুলের গাছের বিপুল সমারোহ ছিল বলে জানা যায়। সেই থেকেই জায়গাটির নামকরণ করা হয়েছে 'চামেলিবাগ'। বর্তমানে এটি একটি পরিচ্ছন্ন আবাসিক এলাকা হিসেবে বিশেষভাবে পরিচিতি পেলেও এখানে বেশ কিছু বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানও রয়েছে।
রাজারবাগ এলাকার উত্তর দিকের একটি এলাকার নাম মোমেনবাগ। আউটার সার্কুলার রোডের অভ্যন্তরে অবস্থিত সাবেক মন্ত্রী আবদুল মোমেন এখানে একটি বড়সড় বাগান তৈরি করেছিলেন। ফলে স্থানটি পরিচিতি পায় 'মোমেনবাগ' নামে। ঢাকার এই জায়গাটিতে বিশ শতকের পঞ্চাশ-ষাটের দশক থেকে জনবসতি গড়ে ওঠে।
ঢাকা শহরের মগবাজার-নয়াটোলার কাছে অবস্থিত একটি এলাকার নাম 'মধুবাগ'। এক সময় এলাকাটি ঘন বন-জঙ্গলে পরিপূর্ণ ছিল। এই জঙ্গলে মৌমাছিরা মধুর চাক তৈরি করে মধু উৎপাদন করত। তাই এলাকাটি 'মধুবাগ' নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।

মন্তব্য করুন