সেদিনের জলসা ঘর আজকের মধুর ক্যান্টিন

প্রকাশ: ১৬ এপ্রিল ২০১৪

বরুণ দাস

সেদিনের জলসা ঘর আজকের মধুর ক্যান্টিন

মধুর ক্যান্টিন

আমরা কথা বলছিলাম শাহবাগের পুরনো দিনের স্মৃতিময় বাগানবাড়ি নিয়ে। নবাব আবদুল গণি মূলত জমিদারি থেকে অবসর নিয়ে বসবাসের জন্য এ জায়গাটি কিনে দুটি বিলাসবহুল বাড়ি, একটি জলসা ঘর, একাধিক পুকুর এবং একটি চিত্তাকর্ষক বাগান তৈরি করেছিলেন। প্রাসাদোপম বাড়ি দুটির একটির নাম ছিল 'ইশরাত মঞ্জিল' এবং অন্যটির নাম ছিল 'নিশাত মঞ্জিল'। বাগানবাড়ির চারদিক দেয়াল দিয়ে সুরক্ষিত করা হয়েছিল। বাড়ি দুটির ছিল মার্বেল পাথরে বাঁধানো বৈঠকখানা, সঙ্গে অনেকটি বাঁধানো চত্বর।
এখন ভাবতে হয়তো অবাক লাগছে; তবে সেই সময় এখানে আঁকাবাঁকা সরু লেক ছিল, যার দৈর্ঘ্য ছিল প্রায় কয়েক কিলোমিটার। আরও ছিল অনেকগুলো বড় আকারের প্রাকৃতিক এবং বাঁধানো সরোবর। কোনো কোনো সরোবরের মধ্যখানে ছিল দ্বীপ আকারে তৈরি করা গোল চত্বর এবং সেগুলোয় যাওয়ার জন্য ছিল সেতু। ছিল নানা রঙের বাহারি মাছসহ অনেক চৌবাচ্চা, নানা রঙের ফোয়ারা। রকমারি গাছ-গাছালি আর দেশি-বিদেশি ফুল-ফলের গাছে পুরো বাগানটি ছিল সুন্দর করে সাজানো।
শাহবাগে কয়েক একর জমির ওপর গড়ে ওঠা 'ইশরাত মঞ্জিল' নামের দ্বিতল ভবনটি ছিল সবচেয়ে বেশি আকর্ষণীয়। এটি মূলত বাইজিদের নাচার জন্য নাচঘর হিসেবে ব্যবহৃত হতো। পরবর্তীকালে ১৯০৬ সালে এ দালানটি নিখিল ভারত মুসলিম শিক্ষা সম্মেলনের স্থান হিসেবে পরিণত হয়, যাতে প্রায় চার হাজার অংশগ্রহণকারী যোগ দিয়েছিলেন। 'ইশরাত মঞ্জিল' পুনর্নির্মাণ করে তৈরি হয় হোটেল শাহবাগ, যা ছিল ঢাকার প্রথম আন্তর্জাতিক হোটেল। ১৯৬৫ সালে ভবনটি ইনস্টিটিউট অব পোস্ট গ্র্যাজুয়েট মেডিসিন অ্যান্ড রিসার্চ সংক্ষেপে পিজি হাসপাতাল অধিগ্রহণ করে, যা পরবর্তীকালে ১৯৯৮ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় দ্বারা অধিগৃহীত হয়।
অনেকেরই হয়তো জানা নেই যে, বর্তমানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলাভবন এলাকায় 'মধুর ক্যান্টিন' নামে পরিচিত যে ভবনটি রয়েছে সেটি ছিল মূলত বাগানবাড়ির 'জলসা ঘর'। ভবনটির মেঝে ও চারদিকের প্রশস্ত অঙ্গন ছিল মার্বেল পাথরে বাঁধানো। এখানে নবাব পরিবারের লোকরা স্কেটিং অনুশীলন করতেন বলে ভবনটিকে 'স্কেটিং প্যাভিলিয়ন'ও বলা হতো। এ ভবনটির দুটি গোলাকার কক্ষ আজও টিকে আছে। পরে এটি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র এবং শিক্ষকদের খাওয়া ও আড্ডার স্থান হিসেবে পরিণত হয়। ১৯৬০ সালের শেষ দিকে মধুর ক্যান্টিন পরিণত হয় পশ্চিম পাকিস্তানের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত ছাত্রদের একটি মিলনস্থল হিসেবে, যার একদিকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা অনুষদ এবং অন্যদিকে আইবি রয়েছে। মধুর ক্যান্টিন এখনও শক্তিশালী রাজনৈতিক প্রতীক হয়ে বিদ্যমান।
'নিশাত মঞ্জিল' নামে আরও যে একটি দ্বিতল ভবন ছিল_ সেটি নবাবদের পারিবারিক জাদুঘর ছিল। বর্তমানের কাঁটাবন জায়গাটি ছিল নবাবদের ঘোড়ার আস্তাবল। শাহবাগে একটি চিড়িয়াখানাও ছিল। আগামী পর্বে থাকবে সেসব কাহিনী।