বাংলাদেশের গানের আকাশে উজ্জ্বলতম নক্ষত্রের নাম
সাবিনা ইয়াসমিন। অসংখ্য কালজয়ী গানের শিল্পী তিনি। চলচ্চিত্রেই প্রায় ১২ হাজার গানে কণ্ঠ দিয়েছেন। জনপ্রিয় অনেক আধুনিক ও দেশাত্মবোধক গান তার কণ্ঠে পেয়েছে অমরতা। দশবার পেয়েছেন জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার। জীবনের নানা প্রসঙ্গ নিয়ে কথা বলে লিখেছেন
ইমরান উজ-জামান
সপ্তসুরে তার জীবন বাঁধা। সারা জীবন একটি কাজই করেছেন গান, গান আর গান। বাধা যে আসেনি তা নয়। কিন্তু গান তিনি ছাড়েননি কিংবা গান তাকে ছেড়ে যায়নি। এমনকি রোগ-ব্যাধিতেও নয়। সাবিনা গানের হাতেখড়ির কথা বলতে গিয়ে বলেন, 'বড় বোন ফরিদা ইয়াসমিন যখন দুর্গাপ্রসাদ রায়ের কাছে তালিম নিতেন তখন ওর পাশে আমিও থাকতাম। ওখান থেকেই গানের প্রতি ভালোবাসা'। পরে ওস্তাদ পিসি গোমেজের কাছে একটানা ১৩ বছর তালিম নিয়েছেন। আর এভাবেই গানের জগতে প্রবেশ।
১৯৫৪ সালের ৪ সেপ্টেম্বর পৈতৃক বাড়ি সাতক্ষীরায় জন্ম নেওয়া সাবিনা ইয়াসমিনের ৫ বোনের মধ্যে ৪ বোনই গানের ভুবনের মানুষ_ ফরিদা ইয়াসমিন, ফওজিয়া খান, নীলুফার ইয়াসমিন ও সাবিনা ইয়াসমিন। মাত্র ৭ বছর বয়সে স্টেজ প্রোগ্রামে অংশ নেন সাবিনা। ছোটদের সংগঠন খেলাঘরের সদস্য হিসেবে রেডিও ও টেলিভিশনে গান করেছেন নিয়মিত। ১৯৬৭ সালে 'আগুন নিয়ে খেলা' এবং 'মধুর জোছনা দীপালি' গানটির মাধ্যমে তিনি প্লেব্যাক গায়িকার খাতায় নাম লেখান। তবে, 'তারও আগে নতুন সুর ছবিতে শিশু শিল্পী হিসেবে গান করেছিলাম' জানালেন সাবিনা।
ছোটবেলায় প্রতিমা ব্যানার্জির মতো গান গাইতে চেষ্টা করতাম। লতা, আশা, নির্মলা মিশ্র, গীতা দত্ত_ এদের গানও ভালো লাগত। একটি স্মৃতি তাকে বেশ আলোড়িত করে_ ১৯৭২ সালের কথা, বোম্বেতে গানের একটি অনুষ্ঠানে গান গাইছি, শ্রোতা হিসেবে আছেন এসডি বর্মণ, অমিতাভ বচ্চন, জয়া ভাদুড়ি, রাজকুমারসহ আরও অনেকে। হঠাৎ দেখি লতা মুঙ্গেশকর ঢুকছেন। তাকে দেখে ভয় পেয়ে হারমোনিয়াম বন্ধ করে তাড়াতাড়ি বেরিয়ে যাচ্ছি। সবাই আবার জোর করে ধরে বসিয়ে দিলেন। শচীন দেব অনুরোধ করলেন 'নাইয়ারে নাওয়ের বাদাম তুইলা' গানটির জন্য। সেদিন লতা মুঙ্গেশকর উঠে এসে আমাকে আশীর্বাদ করেছিলেন। দিনটি আমার জন্য এখনও বিশেষ কিছু।
সাবিনা ইয়াসমিনের গানের ভুবনে বিচরণ দীর্ঘদিনের। কথায় কথায় তিনি বলতে সুরে করলেন ভালোলাগা কিছু গানের কথা। 'জন্ম আমার ধন্য হলো মাগো, এমন করে আকুল হয়ে আমায় তুমি ডাক'_ আমার খুব হৃদয়ছোঁয়া একটি গান। করাচির ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের জন্য ১৯৬৯-৭০ সালে এই গানটি করাচির একটি স্টুডিওতে রেকর্ড করেছিলাম। গানটি লিখেছেন নঈম গওহর। সুর করেছেন আজাদ রহমান।' জানালেন, গানটি তিনি রেকর্ড করেন নজরুলসঙ্গীত শিল্পী ফিরোজা বেগমের সঙ্গে। ওই সময় এইচএমভি থেকে দুটি গানের একটি রেকর্ড বের হয়। যেখানে প্রথম গানটি ছিল সমবেত কণ্ঠে গাওয়া 'পুবের ওই আকাশে সূর্য উঠেছে আলোকে আলোকময়'। তার সঙ্গে 'জন্ম আমার ধন্য হলো মা গো' গানটি সংযোজিত হয়। এই গান পরবর্তী সময়ে কাজী হায়াতের 'দেশপ্রেমিক' ছবিতে ব্যবহার করা হয় সাবিনার কণ্ঠে। আর 'ও আমার বাংলা মা তোর' গানটি আলাউদ্দিন আলীর সুর করা। গানটির কথা লিখেছেন আবুল ওমরাও মো. ফখরুদ্দিন। তিনি একজন মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। যুদ্ধের নয় মাস বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরে দীর্ঘ সময় নিয়ে গানটি লিখেছিলেন তিনি। এ গানটি ১৯৭২ সালে করা। প্রথম গানটি রেকর্ড করা হয় ডিআইটি টিভি ভবনে। মূলত মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক একটি চলচ্চিত্র 'এক ঝাঁক বলাকা'-এর জন্য গানটি সাবিনা গেয়েছিলেন। সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে আলাউদ্দিন আলীর এটি প্রথম ছবি ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত ছবিটি হয়নি। পরে দ্বিতীয় দফায় গানটি আবার রেকর্ড করা হয় বিটিভির জন্য। 'একটি বাংলাদেশ তুমি জাগ্রত জনতার, সারা বিশ্বের বিস্ময় তুমি আমার অহঙ্কার_ গানটির অসম্ভব শ্রোতাপ্রিয় একটি গান। এই গানটি ট্রান্সক্রিপশন সার্ভিসের জন্য করা। ঠিক সময়কাল স্মরণ করতে পারলেন না, বললেন সম্ভবত ১৯৭৪-৭৫ সালে করা। গানটি সুর করেছেন অজিত রায় আর লিখেছেন প্রয়াত নজরুল ইসলাম বাবু।
'ও মাঝি নাও ছাইড়া দে মাঝি পাল উড়াইয়া দে'_গানটি সাবিনার কাছে বিশেষভাবে স্মরণীয়। বললেন, প্রয়াত এসএম হেদায়েতের কথা ও আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে গানটি যখন রেকর্ড করা হয়, তখন আমার ছেলে শ্রাবণ গর্ভে। ওকে নিয়েই গানটি করি। সেটা ছিল অন্যরকম এক অভিজ্ঞতা।' সাবিনা যেন ফিরে গেলেন সেই দিন, সেই ক্ষণে। আবার ফিরে এসে কথা শুরু করলেন, ১৯৮২ সালের দিকে ২৬ মার্চ বিটিভির বিশেষ অনুষ্ঠানের জন্য নজরুল ইসলাম বাবুর কথা এবং আহমেদ ইমতিয়াজ বুলবুলের সুরে গাই সব ক'টা জানালা খুলে দাও না_ গানটি। মনে আছে, ইপসা রেকর্ডিং স্টুডিওতে গানটি রেকর্ড করা হয়েছিল। রেকর্ডিস্ট ছিলেন শাফায়াত আলী খান। গিটার বাজিয়েছিলেন টিপু এবং প্রয়াত শেখ ইশতিয়াক। তবলায় দেবু ভট্টাচার্য। পারকেশনে ইমতিয়াজ আর ভায়াব্রোফোন বাজিয়েছিলেন মানাম আহমেদ। সুরকার কি-বোর্ড আর বেজ গিটার বাজিয়েছিলেন। গানটি টানা আট-নয় বছর বিটিভির খবরের আগে ও পরে বাজানো হয়েছে।
চার দশকেরও বেশি সময় ধরে গানের ভুবনে বিচরণ করছেন সাবিনা। মোট কত হাজার গান গেয়েছেন তার সঠিক হিসাব নেই, তবে মরমি শিল্পী সেই আবদুল আলীম থেকে শুরু করে একালের কোনো উঠতি গায়কের সঙ্গেও অবিরাম গেয়ে চলেছেন একের পর এক গান। সুযোগ পেয়েছেন উপমহাদেশের বরেণ্য সুরকার আরডি বর্মণের সুরে গান গাওয়ার, বিখ্যাত কিশোর কুমারের সঙ্গেও ডুয়েট গান গাওয়ার। সাবিনা ইয়াসমিন সঙ্গীতে অবদানের জন্য পুরস্কৃত হয়েছেন অনেকবার। ১৯৮৪ সালে একুশে পদক, ১৯৯৬ সালে স্বাধীনতা দিবস পুরস্কার, মোট ১০টি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কারসহ অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মান। এ ছাড়া ভারত, পাকিস্তানে তিনি অনেকবার গান করেছেন। পৃথিবীর বিভিন্ন ভাষায় গান করেছেন সাবিনা ইয়াসমিন। গাজী মাজহারুল আনোয়ারের 'উল্কা' নামের সিনেমাতে অভিনয়ও করেছেন তিনি।
সাবিনা ইয়াসমিন তার গানের এই জীবনের জন্য খান আতাউর রহমানের অবদানের কথা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করলেন। বিখ্যাত কণ্ঠশিল্পী শ্যামল মিত্র, কিশোর কুমারের সঙ্গেও ডুয়েট গান করেছেন। সাবিনা ইয়াসমিনের প্রিয় সঙ্গীতশিল্পী মেহেদী হাসান, শাহনাজ রহমতউল্লাহ ও রুনা লায়লা। প্রিয় গান শ্যামল মিত্রের 'তুমি কি এমনি করে থাকবে দূরে'। নায়িকার হাতের প্রক্সি হিসেবে 'মনের মতো বউ' ছবিতে 'এ কি সোনার আলোয়' গানে পিয়ানো বাজানোর দৃশ্য খান আতা শুট করেছিলেন সাবিনা ইয়াসমিনকে দিয়ে।
এই গান নিয়েই শোনালেন মজার এক অভিজ্ঞতা_ অভিনেত্রী অঞ্জনা আমার খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। একদিন অঞ্জনা বেড়াতে গেছেন সারাদিনের জন্য। দুপুরে খাওয়ার পর দু'জনে বাগানে হাঁটছিলেন। অঞ্জনা অনুরোধ করলেন সাবিনাকে গান গাওয়ার জন্য। সাবিনা গুনগুন করে গান গাইতে শুরু করলেন। তার গান শুনে বাইরে থেকে একজন পথচারী মন্তব্য করে বসে_ 'এহ্, সাবিনা ইয়াসমিন হইবার চায়।' সে কথা মনে পড়লে এখনও হাসি পায়।
সাবিনা ইয়াসমিন একজন ব্যাংকারের সঙ্গে প্রথম বিয়ে ভেঙে যাওয়ার পর দ্বিতীয় বিয়ে করেন নৃত্য পরিচালক আমির হোসেন বাবুকে। সে সংসারও ভেঙে গেলে ২০০০ সালে বিয়ে করেন কবীর সুমনকে। মেয়ে ফাইরুজ ইয়াসমিন বাঁধন ও ছেলে শ্রাবণ। বাঁধন ব্যাংকে চাকরি করেন। বাঁধনের সঙ্গে ইতিমধ্যে 'প্রতিচ্ছবি' নামে ডুয়েট অ্যালবামও করেছেন তিনি।
বছর দশেক আগে শিল্পী সাবিনা ইয়াসমিন তপন মাহমুদের সঙ্গে 'মনে রবে কি না রবে আমারে' শিরোনামের একটি দ্বৈত অ্যালবামে গেয়েছিলেন। সেবারই প্রথম রবীন্দ্রসঙ্গীত গেয়েছিলেন তিনি। এবার তিনি একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম তৈরি করছেন কলকাতায়। প্রকাশও করবেন কলকাতা থেকে। অ্যালবাম প্রসঙ্গে সাবিনা ইয়াসমিন বলেন, 'বহু দিন ধরে শ্রোতাদের কাছ থেকে রবীন্দ্রসঙ্গীতের অ্যালবাম করার জন্য অনুরোধ আসছিল। ব্যক্তিগতভাবে আমারও ইচ্ছা আছে একটি পূর্ণাঙ্গ অ্যালবাম করার।' এরই মধ্যে কয়েকটি গান কণ্ঠেও তুলেছেন তিনি। সঙ্গীতায়োজনে রয়েছেন কলকাতার অমিত।

মন্তব্য করুন