সমর মজুমদারের বর্ণিল লহরী

প্রকাশ: ২৮ মার্চ ২০১৪      

মঈনুদ্দীন খালেদ

রেখা সসীম। রঙ সীম। রেখা নকশায় রহস্যের জাল বোনে। রঙ নিত্য পরিবর্তনশীলতার ব্যঞ্জনায় অপারতার দিকে টানে। একটা কথা শিল্পের ইতিহাসে প্রচলিত আছে : প্রাচ্যশিল্প রেখাধর্মী। পশ্চিম তুলনামূলক অনেক বেশি রঙ ও রঙনির্ভর ফর্মের কারবারি। এ কথাটা অর্ধসত্য। অনেক ক্ষেত্রে তা নাকচ হয়ে গেছে। পূর্বদেশের রেখাধর্মিতার জালে রঙ রহস্যময় অভিব্যক্তির ফর্ম নিয়ে ধরা দিয়েছে। মিনিয়েচারের বিপুল ইতিহাস ক্রমে ক্ষয়ে গিয়ে পরিমিত রেখা ও রঙের পরিমার্জনায় আধুনিক শিল্পে নতুন ভাষার জন্ম হয়েছে। একজন শিল্পী যখন দেশোয়ালি মনোভঙ্গি নিয়ে তুলি-কলম ধরেন তখন তিনটি শিল্পের ত্রিবেণী সঙ্গমে তার সাঁতার কাটতে হয়। বুদ্ধিমার্গী পশ্চিমি নিরীক্ষাপ্রবণ দৃষ্টিভঙ্গির শিল্পীরা প্রায়শ এ পথের যাত্রী নন। ওই ত্রিবেণী জট খুলে বলা দরকার। কারণ তা না হলে সত্তরের দশকের শিল্পী সমর মজুমদারের চিত্রকর্ম হয়তো যথার্থভাবে বিশ্লেষিত হবে না। দুটি পরিণাম আমরা উপেক্ষা করতে পারি না। এক, চারুকলার বিদ্যালয়ে রেনেসাঁপ্রসূত বৈজ্ঞানিক চিত্রবিদ্যার শিক্ষা আর অপরটি স্বদেশের মাটিলগ্ন প্রধান ধারা লোককলা। তৃতীয়টি হলো কখনও ভারতীয় হিন্দু-বৌদ্ধ মূর্তিতত্ত্বজাত ভাষা, কখনও ভারতীয় স্থানিক বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত মিনিয়েচার বা মোগল মিনিয়েচারের রীতি। এসব ভাষার যোজন-বিয়োজনের মধ্য দিয়ে দ্বিমাত্রিক স্পেসে চিত্রগত সমস্যা মিটিয়ে উত্তীর্ণ শিল্পসফল মুদ্রা ধরতে চাওয়ার যে অভিযান তারই একজন যাত্রিক সমর মজুমদার।
সমর মজুমদার বইয়ের প্রচ্ছদ অঙ্গসজ্জার শিল্পী হিসেবে বিখ্যাত। চিত্রসাধনার অন্য একটি জায়গা তিনি আড়ালে রেখে দিয়েছিলেন। এই প্রথম তিনি একান্ত রেখাধর্মী সৃজনশীল নকশাপ্রধান কাজ থেকে শুরু করে বিমূর্ত বর্ণবিহারের ব্যঞ্জনার কাজ নিয়ে প্রদর্শিত হলেন। তবে যে সমর প্রচ্ছদ রচনা করেন সেই সমরের সঙ্গে পেইন্টিং রচয়িতা সমরের ব্যাপক তফাত রয়েছে। তিনি প্রচ্ছদ, ইলাস্ট্রেশন করেন বলেই তাকে নকশার শুদ্ধতা খুঁজতে হয়_ পরিমিত রঙ রেখায় সীমিত স্পেসে বক্তব্যকে পরিস্টম্ফুট করতে হয়; এই ভাবনাটা যখন আর স্থির লক্ষ্য অভিসারী নয় অথবা তা কোনো আখ্যান বা গল্পকে অনুসরণ করে না তখন তাতে শিল্পীর মুক্ত মন বিচিত্র চালে উল্লসিত হয়ে ওঠে এবং সৃজনশীলতার নতুন মাত্রা যোগ হয় শিল্পীর কাজে। সমর মজুমদারের কাজ দেখে আমার এ উপলব্ধি হয়েছে। সব কাজই যে সে মানে পেঁৗছেছে তা তো বলা যাবে না। তবে তুলির নরম রেখায় মন্ময়ধর্মিতা রেণুর মতো আটকে থাকে আর সেসব রেখায় চিরকালের বাংলার নিসর্গের ও নিসর্গলীন মানুষের অভিব্যক্তিগুলো মনোহর মনোগ্রাম হয়ে হৃদয়ে স্থায়ী ছাপ ফেলে তারই দৃষ্টান্ত সমর মজুমদারের কাজ। বাংলার রূপ মন্ময়ধর্মিতায় জারিত করে শেধিত মুদ্রায় প্রকাশ দেওয়ার প্রবণতা স্তিমিত হয়ে এসেছে। নন্দলালের হরিপুরা কংগ্রেস চিত্রমালা আর কামরুল হাসানের চিত্র সাধনার বড় একটি অংশ ওই দৃষ্টিভঙ্গিলগ্ন শিল্পের সাক্ষী।
নিসর্গের মোহাবিষ্টতা_ প্রকৃতির কুহক-জনজীবনের মধ্যে অনাদিকালের সুর_ এসবেই সন্মোহিত হয়ে আছে সমর মজুমদারের সৃজনী-আত্মা। সমরের কাজে নগরদৃশ্য খুব নেই, খুব বেশি আছে গ্রামীণ জীবন ও নিসর্গ। নিসর্গে আছে নীল-হলুদ-লালের অবিমিশ্রতার সুখ আর সেই সঙ্গে সবুজ ছোপের শান্তি। তার ছবির দিকে তাকালে চোখ প্রায়শ রঙের আওয়ারি হয়ে যায়। আমরা যদিও তার কাজে সানন্দে বর্ণপাঠ করি, তবু রেখার বিশেষ পরিমার্জনায় বাংলার মানুষের শাশ্বত মুদ্রাগুলো আঁকার নিরীক্ষায়ও তিনি মগ্ন হয়েছেন। 'মা ও শিশু'. 'বাউল', 'গরুর গাড়ি', 'ধান মাড়াই' ইত্যাদি নানা কর্মকাণ্ডে দেহের যে নানা বাঁক-ভঙ্গি তৈরি হয় তা ললিত রেখার জ্যামিতিতে ধরতে চেয়েছেন। অঙ্গ-সংস্থান বা অ্যানাটমির নিরীক্ষায় সমর মজুমদার কখনও ব্যাপক সফল, কখনওবা তার কমপোজিশন যে রৈখিক পরিমার্জনায় পূর্ণতা পেতে চেয়েছে তা প্রশ্নবিদ্ধও মনে হতে পারে। তিনি যখন প্রধানত রৈখিক জ্যামিতিতে ভর করে মানুষি দেহ গড়তে চেয়েছেন তখন তাতে বিশেষ এক ধরনের ডিটরশন এসেছে; এ বিষয়টি নিয়ে শিল্পী হয়তো আরও পরিশীলনে যাবেন_ এমন ভাবনাও দর্শকের মনে জাগতে পারে। তবে প্রদর্শনীতে এ ধরনের কাজ কয়েকটি মাত্র। নারী দেহের ব্রীড়া যে রেখার পোচে কামরুল হাসান এঁকেছেন সে পথেরই অনুসারী হয়ে সমরও শিল্পীত প্রয়াস চালিয়েছেন। এটাও শিল্পচর্চার একটা বাস্তবতা। প্রকৃতি যেমন আমাদের শিল্পের পাঠশালা, কামরুল হাসানের মতো বিপুলব্রজ শিল্পীর সৃজনকর্মও আমাদের পাঠশালা। আর একথা তো প্রায়ই বলা হয় যে, একজন শিল্পী একই সঙ্গে প্রকৃতির কাছে এবং তার স্বযুগের ও পূর্ববর্তী যুগের শিল্পীর শিল্পের কাছে ঋণী। মানুষের দীক্ষাটা আসে ওই দুই উৎস থেকেই। আর নন্দলাল, যামিনী রায়, কামরুম্নল হাসানের পরম্পরা তো লোককলার অফুরান ভাণ্ডারেরই অকৃপণ অনুদান। সমরও লোকবাংলারই জাতক।
সমর মজুমদার মানুষের প্রাত্যিহিকতা_ যেখানে নারীর উপস্থিতি প্রধান এবং মানুষের অনাবিল সম্পর্কের মতো শান্ত প্রকৃতি চিত্রার্পিত করেছেন। এসব ছবির দিকে তাকালে বোঝা যায় জীবন সম্পর্কে সদর্থকতা তিনি পোষণ করেন এবং প্রকৃতি ও মানুষে এখনও তার গভীর আস্থা এবং প্রকৃতি ও মানবজীবনস্রোত তাকে প্রণোদনা দেয়_ তার সৃজনচৈতন্যতাতে আহ্লাদিত করে রাখে। রেখার লালিত্য বিস্তার আর রঙের লালিত্য সেই সত্যকেই জানান দিচ্ছে।
নিসর্গের অধরা প্রপঞ্চও কি সমর কখনও আঁকতে চাননি? আমার তো মনে হয় তিনি তা চেয়েছেন। প্রকাণ্ড বৃক্ষকাণ্ডের আড়াল থেকে বনভূমির মধ্যে দাঁড়িয়ে থাকা একটি লাল মাথা গরু যখন আবির্ভূত হয় তখন পরাবাস্তব বা সুররিয়ালিস্ট বোধে আক্রান্ত হয় দর্শকের মন। কিংবা পারাপারহীন নিসর্গের রঙিন আবহের মধ্যে যখন একটি মানুষ চেয়ারে বসে থাকে তখন চেনা প্রকৃতি অতিপ্রাকৃত গল্প হয়ে যায়। একদিকে বর্ণের মেঘের মতো উড্ডয়ন আর অন্যদিকে বিলুপ্তপ্রায় ইমেজ এই দুইয়ে মিলে এক মায়াপুরী তৈরি হয়েছে সমরের কাজে। রূপকথালোক, স্বপ্নপুরী, অবচেতন, দূরশৈশব থেকে ভেসে আসা ইমেজের এক স্বতঃস্ফূর্ত চালকে অবারিত রেখেছেন এই শিল্পী।
পরিণামে প্রকৃতি আসলে বিবিধ রঙের আলো। বর্ণলহরীতে আবিষ্ট হয়েছেন সমর মজুমদার। বর্ণ বা প্রকৃতি তাকে সুখদোলায় আন্দোলিত করে বলে তার কাজে বর্ণস্রোতের হিল্লোল দেখি। কখনও বর্ণ কেন্দ্র থেকে উদ্ভিন্ন হয়ে বৃক্ষের মতো উর্ধ্বমুখী হয়, কখনও বর্ণ মেঘমল্লার বা জলের মতো বিচিত্রগামী থেকে যায়। নিসর্গের পরিচিত বিষয়ের মৃদু সংকেত রেখে তিনি বস্তুনিরপেক্ষ বিমূর্ত শিল্প রচনা করতে চেয়েছেন। তার তুলি স্বচ্ছতা চায়। আরও বেশি করে অধিকার করতে চায় স্পেস। সমরের কেন এই মনোভঙ্গি? প্রচ্ছদের সীমিত পরিসর থেকে মুক্তির আনন্দেই কি তার পেইন্টিং এমন স্পেসের অপারতা পরিমাপ করতে চাচ্ছে? হয়তো তাই; হয়তো তা নয়। কিন্তু জ্যামিতিক সীমানাকে নাকচ করে দিয়ে কেবলই বর্ণের স্বাধীন গতি হয়ে উঠেছে শৈল্পিক ধ্যানের শেষ অনিষ্ট।