'মানুষ জীবনানন্দ' ও লাবণ্য দাশ

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬

ফারুক মঈনউদ্দীন

মৃত্যু-পরবর্তী সময়ে জীবনানন্দের অপ্রকাশিত কবিতা, গল্প এবং উপন্যাসের যে বিশাল এক সম্ভার আবিষ্কৃত হয়, তার মধ্যে একটা গল্পের নাম 'মাংসের ক্লান্তি।' গল্পের মূল চরিত্র হেম এক সময় জ্যাঠামশায়ের বাসায় থাকত। তারপর কলেজের বোর্ডিংয়ে এবং সবশেষে ইডেন কলেজে পড়াশোনা করেছে। হেম বড়লোকের মেয়ে না হলেও সচ্ছল জ্যাঠামশাইয়ের ভ্রাতুষ্পুত্রী হিসেবে তার চালচলন বড় ঘরের মেয়েদের মতোই ছিল। অমূল্যদের বাড়িতে খড়ের ছাউনি, দরমার বেড়া, মাটির মেঝে। তবুও স্ত্রীর আবদারে বিয়ের পর তার জন্য আলাদা স্নানঘর তৈরি করে দিয়েছিল স্বামী অমূল্য। কারণ, 'বিয়ে করার পর পয়সার হিসাব করতে হয় না। হিসাবই করতে হয় না পয়সার। না পৃথিবীর, না জীবনের। দিনগুলো কুহকের মতো চালিয়ে দিতে হয়। কিংবা মেশিনের মতো, বিবেককে এসবের মাঝখানে ডেকে আনা বড় সর্বনেশে,...।' অথচ সেই স্নানঘর ব্যবহারের অনুমতি ছিল না অমূল্যের। প্রথমে দু'চার দিন ব্যবহার করলেও পরে অপমানজনকভাবে সে সুযোগ থেকে তাকে বঞ্চিত করেছে হেম। তার এই আক্রোশ থেকেই গল্পে হেমকে পরিণত করা হয় কুরূপা হয়ে যাওয়া এক সূতিকা রোগীতে। তাকে দেখায় 'কৃমির মতো,' 'মাকড়সার পায়ের মতো,' 'কুয়াশার পেত্নীর মতো'। হেম গানের চর্চাও করত। তখন 'গায়িকার এপাশে-ওপাশে চারপাশে তাই পঁচিশ-ত্রিশ হাতের ভেতর কোনো লোকজনের গন্ধ নেই, দুটো বাছুর, একটা শিংভাঙা গরু, একটা পাঁচকিলো ছাগল আর দু-চারটা শালিক ইতস্তত চরছে মাত্র।'
গল্পের এটুকু পড়ে আমাদের মনে পড়ে যেতে পারে জীবনানন্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশের লেখা স্মৃতিগ্রন্থ 'মানুষ জীবনানন্দ'র কথা। মাত্র ৭২ পৃষ্ঠার বইটিতে রয়েছে জীবনানন্দের সঙ্গে তার বিয়ের সম্পর্ক তৈরি হওয়ার সময় থেকে কবির মৃত্যু পর্যন্ত সময়ের খণ্ড খণ্ড স্মৃতিকথা। বইটি প্রকাশিত হওয়ার আগে তিনি বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি লেখা লিখেছিলেন বিভিন্ন সাময়িকী বা ম্যাগাজিনে। এটা সহজেই ধারণা করা যায়, কবির মৃত্যুর পর বিভিন্ন মহল থেকে অনুরুদ্ধ হয়ে তাকে সেসব লিখতে হয়েছিল। মরণোত্তর নন্দিত জীবনানন্দের স্ত্রী হিসেবে তিনি যদি কিছু না লিখেন তাহলে ব্যাপারটা অস্বাভাবিক ঠেকতে পারে। অথচ কবির মৃত্যুর পর 'জীবনানন্দস্মৃতি' ময়ূখ প্রকাশের পরিকল্পনা যখন হয়, তখন সম্পাদকীয় সিদ্ধান্ত হয়েছিল 'অশোকানন্দ'কে এবং 'সুচরিতা'কে স্মৃতিকথামূলক গদ্য লিখতে অনুরোধ করা হবে, লাবণ্য দাশকে নয়,...।' ('জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য,' ভূমেন্দ্র গুহ, গাঙচিল, কলকাতা, ২০০৮)।
এই স্মৃতিকথায় জীবনানন্দ, তার মা কুসুমকুমারী দাশ কিংবা সত্যানন্দ দাশ সম্পর্কে উঠে এসেছে লাবণ্য দাশের উচ্ছ্বসিত প্রশংসা এবং মহত্ত্বগাথা। যেমন, 'বাংলা মায়ের যে ক'জন সন্তান বিশ্বের দরবারে মায়ের আসন সুপ্রতিষ্ঠিত করে গিয়েছেন, কবি জীবনানন্দ তাঁদের অন্যতম,...।' কিংবা 'সর্বানন্দের মেজো ছেলে সত্যানন্দই কবির বাবা। সৌম্যমূর্তি সত্যানন্দ একজন শিক্ষাব্রতী ছিলেন। তাঁর জ্ঞানের পরিধি ছিল অপার-অসীম।' অথবা 'দেবতা কাকে বলে জানি না। কিন্তু তাঁকে বোধ হয় আমি দেবতার চাইতেও বড় মনে করতাম।' কবির মা সম্পর্র্কে লিখতে গিয়ে তিনি বলেন, 'শ্বশুরবাড়ি গিয়ে প্রথম থেকেই একটা জিনিস লক্ষ্য করেছি যে, সংসারের প্রত্যেকটি লোকের জন্য আমার শাশুড়ি হাসিমুখে এবং অক্লান্তভাবেই তাঁর কর্তব্য করে যাচ্ছেন,...।'
সূচনায় উলি্লখিত গল্পটির সঙ্গে লাবণ্য দাশের স্মৃতিকথার তুলনা প্রথম ভাবনায় একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে। কিন্তু গল্পটির তৃতীয় বাক্যেই গল্পকার জীবনানন্দ আমাদের স্মৃতিকে উসকে দিয়ে হেমকে উপস্থাপন করেন 'মানুষ জীবনানন্দ' গ্রন্থের লেখক লাবণ্য দাশের প্রতিবিম্বের মতো। বইটি থেকে এবং অন্যান্য আকর গ্রন্থ থেকে আমরা জানি, লাবণ্যর বয়স যখন সাত বছর তখন মাত্র চার মাসের ব্যবধানে তার বাবা রোহিণীকুমার গুপ্ত এবং মা সরযু গুপ্ত (সেন) দু'জনই মারা যান। সেই অনাথ অবস্থায় লাবণ্যরা তিন বোন এবং এক ভাই তাদের অকৃতদার জ্যাঠামশাই অমৃতলাল গুপ্তর আশ্রয়ে চলে এসেছিলেন। এ প্রসঙ্গে বইটি থেকে আমরা জানতে পারি, লাবণ্য সেখান থেকে গিরিডিতে ইংরেজি হাইস্কুলের বোর্ডিংয়ে থেকে পড়াশোনা করেছিলেন। স্কুল শেষ হওয়ার পর তিনি ভর্তি হয়েছিলেন ঢাকার ইডেন কলেজে।
'মাংসের ক্লান্তি' গল্পের হেমও জ্যাঠামশাইর বাড়ি এবং কটকের বোর্ডিংয়ে থাকার পর পড়াশোনা করেছিল ঢাকার ইডেন কলেজে। জীবনানন্দ-লাবণ্য দম্পতির প্রথম সন্তান মেয়ে, হেম-অমূল্য দম্পতিরও একটি মেয়ে। তার পরই হেম সূতিকা রোগে আক্রান্ত হয়ে সম্পূূর্ণ সৌন্দর্য্য বঞ্চিত হয়ে প্রায় নিঃস্ব হয়ে পড়ে। লাবণ্য দাশ কাবু হয়ে পড়েছিলেন 'অ্যানজাইনা' রোগে। হেমের মতো লাবণ্যও সঙ্গীত চর্চা করতেন।
কেবল এটুকু মিল থাকার কারণে কাল্পনিক চরিত্রটির সঙ্গে লাবণ্য দাশকে মিলিয়ে ফেলার কোনো যুক্তিগ্রাহ্য কারণ আপাতদৃষ্টিতে পাওয়া যাবে না। যে কোনো লেখকের সৃষ্ট চরিত্রগুলোর অধিকাংশই আহরিত হয় তাদের চারপাশের চেনা মানুষদের মধ্য থেকে। তবে কেবল এ গল্পটিই নয়; জীবনানন্দের আরও বেশ কিছু গল্পে রয়েছে অতৃপ্ত দাম্পত্য, দারিদ্র্য, অচরিতার্থ প্রেমের বঞ্চনাবোধ ইত্যাদি আনন্দহীন অনুষঙ্গ। তার অনেক গল্পে দেখা যায় স্বামীটি বেকার এবং দরিদ্র, স্ত্রী সচ্ছল পরিবারের মেয়ে। সেসব গল্পের স্বামীটির দাম্পত্য অভিজ্ঞতা সুখহীন, ফলে প্রায়ই সংসারবিমুখ। তার গল্পের স্বামী চরিত্রগুলোর কেউ কেউ স্ত্রীর দুর্ব্যবহারে দাম্পত্য জীবনের প্রতি বীতশ্রদ্ধ হয়ে প্রাক্তন প্রেমিকার সঙ্গে অসফল প্রেমের কথা ভেবে মর্মবেদনায় ভোগে। তার বিভিন্ন গল্প ও উপন্যাসে (বিশেষ করে 'মাল্যবান') ক্রমাগত এসব কাহিনী এবং চরিত্রের সনি্নবেশ দেখে সেসব চরিত্রের সঙ্গে পাঠক যদি জীবনানন্দকে এক করে ফেলেন, সেটিকে খুব অসঙ্গত মনে হবে না। কারণ জীবনানন্দের ব্যক্তি ও দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে সামান্য যে আভাসটুকু পাওয়া যায় তা থেকে তার গল্পের স্বামী চরিত্রগুলোর কাছ থেকে ব্যক্তি জীবনানন্দকে আলাদা করা কঠিন। আবার কানাঘুষায় লাবণ্য দাশ সম্পর্কে যতটুকু জানা যায়, তাতে জীবনানন্দের সৃষ্ট স্ত্রী চরিত্রগুলোকে লাবণ্যেরই প্রতিচ্ছবি বলে ভ্রম হয়। গল্পগুলোতে তিনি নিজের কিংবা স্ত্রী লাবণ্যের ব্যাপারে কোনো রাখঢাক রাখেননি। এই বিষয়টি মনে দানা বাঁধে, যখন দেখা যায় জীবনানন্দ-লাবণ্য দম্পতির মধ্যকার সম্পর্কের নানান অসঙ্গতির কথা বিচ্ছিন্নভাবে নানানজনের লেখায় উঠে আসে। তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর বিধায় এ বিষয়ে সবারই ছিল যথেষ্ট সাবধানতা।
লাবণ্য দাশের বইটির প্রথমেই আমাদের জানা হয়ে যায়, তার সঙ্গে কবির বিয়ে হয়েছিল অনেকটা তার ইচ্ছের বিরুদ্ধে। লাবণ্য সবে তখন কলেজে ঢুকে মুক্তির আস্বাদ পেয়েছেন। ব্রিটিশবিরোধী গুপ্ত রাজনৈতিক দলের সঙ্গে তার সম্পর্কের বিষয়টিও জ্যাঠামশাইর কাছে ততদিনে আর গোপন নেই। তাই তিনি পিতৃমাতৃহীন মেয়েটিকে পাত্রস্থ করার জন্য সক্রিয় উদ্যোগ নিয়েছিলেন। লাবণ্য মৃদু আপত্তি করলেও জ্যাঠামশাইকে দায়মুক্ত করার জন্যই যে তিনি বিনা বাক্যব্যয়ে দিলি্লর রামযশ কলেজের মুখচোরা লাজুক অধ্যাপকটির সঙ্গে বিয়েতে রাজি হয়ে গিয়েছিলেন, সেটি বইয়ের প্রথমেই জানিয়ে দেন তিনি।
'মানুষ জীবনানন্দ' বইটিতে তিনি যতই জীবনানন্দের গুণকীর্তন করে থাকুন না কেন, তাদের দাম্পত্য সম্পর্ক ছিল শীতল কিংবা ঘনঘটাময়। এ বিষয়টি নিয়ে পরবর্তীকালে কেউ সরাসরি তেমন কিছু না লিখলেও ভূমেন্দ্র গুহ একাধিকবার বিভিন্নভাবে তেমনই ইঙ্গিত দিয়েছেন। ঢাকায় এক অনুষ্ঠানে স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, 'লাবণ্য দাশ ছিলেন খুবই সুন্দরী মহিলা। নিজের রূপসৌন্দর্য সম্পর্কে তিনি সব সময় সচেতন থাকতেন। কিন্তু জীবনানন্দ দাশ সব সময়ই তাঁর স্ত্রীকে উপেক্ষা করতেন, এমনকি তাঁর স্ত্রীও। লাবণ্য দাশ মহিলা হিসেবে অসাধারণ ছিলেন। জীবনানন্দ দাশ উৎকৃষ্ট স্বামী ছিলেন না। উৎকৃষ্ট পিতাও ছিলেন না। কাব্য নিয়েই ছিল তার যত সাধনা, ধ্যান। কবিতার জন্যই সাহিত্যের জন্যই তিনি তিক্ত জীবনযাপন করে গেছেন। তিনি তাঁর স্ত্রীকে নিরাপত্তা দিতে ব্যর্থ হয়েছেন। ফলে জীবনানন্দ দাশ সংসার চালাতে যে অক্ষম, এটা বোঝাতে তাঁর স্ত্রী ভালোবাসতেন।'
কবিতা সিংহের নেওয়া লাবণ্য দাশের এক সাক্ষাৎকারে জানা যায়, বিয়ের আসর থেকেই ছোটখাটো উজ্জ্বল বুদ্ধিদীপ্ত বুদ্ধদেব বসুকে তার ভালো লেগে গিয়েছিল। লাবণ্যের চোখে সুন্দর লেগেছিল তার প্রাণচাঞ্চল্য, আকর্ষণীয় কথা বলার ভঙ্গি, সহজ-সাবলীল আচরণ। এ কথা বলা বোধকরি অসঙ্গত হবে না যে, তার তুলনায় নিতান্ত ম্রিয়মাণ, অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের জীবনানন্দকে নিশ্চয়ই লাবণ্যর কাছে অপেক্ষাকৃত অনেক বেশি ম্লান মনে হয়েছিল। এই বিষয়টি পরবর্র্তী সময়ে নিজের অজান্তে লাবণ্য দাশ স্বীকারও করে ফেলেছিলেন বলে জানা যায় ভূমেন্দ্র গুহের লেখায়। তিনি লেখেন, জীবনানন্দের শ্রাদ্ধবাসরে রাখার জন্য তার একখানা ভালো ছবি কারও কাছে পাওয়া যাচ্ছিল না, তার ঘনিষ্ঠ আত্মীয়দের কারও কাছে ছিল না, এমনকি যে বোন সুচরিতা দাশ প্রায়ই ছবি তুলতেন, তার কাছেও কবির কোনো ছবি নেই। শেষ পর্যন্ত লাবণ্য দাশের কাছে ছবি আছে কিনা জানতে চাইলে তিনি ভূমেন্দ্র গুহকে 'কিঞ্চিৎ অবজ্ঞার সুরেই প্রায় বলেছিলেন, মনে পড়ছে, আমার কাছে নেই অন্তত, তা ছাড়া ওই ছবি-টবি তোলানো-টোলানো নিয়ে আমার কোনো মাথাব্যথা কোনো দিন বিশেষ ছিল না। তোমাদের দাদা দেখতেও তো এমন কিছু রাজপুত্তুর ছিলেন না।' (অনুষ্টুপ, জীবনানন্দ বিশেষ সংখ্যা, ১৯৯৮)।
আমরা লক্ষ্য করি, স্ত্রীর কাছেই প্রয়াত মানুষের ছবি চাওয়া স্বাভাবিক হলেও এ ক্ষেত্রে তার কাছ থেকে না চেয়ে আত্মীয়স্বজনের কাছেই প্রথমে খোঁজ করা হয়। কোথাও পাওয়া না গেলে সবশেষে চাওয়া হয় স্ত্রীর কাছে। কারণ ছবি যারা খোঁজ করছিলেন তারা হয়তো জানতেন যে লাবণ্য দাশের কাছে স্বামীর ছবি থাকার কথা নয়।
জীবনানন্দ ট্রামের ধাক্কায় আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর তাকে দেখতে আসতেন আত্মীয়-অনাত্মীয় অনেকেই_ ভাই অশোকানন্দ, তার স্ত্রী নলিনী দাশ, খুড়তুতো বোন জ্যোৎস্না দাশগুপ্ত, সুপ্রিয়া দাশগুপ্ত। ভূমেন্দ্র গুহ লিখছেন, 'তাঁরা বেশ কিছুক্ষণ করে হাসপাতালে থেকেছেন। কিন্তু জীবনান্দের স্ত্রী লাবণ্য দাশকে বেশিক্ষণের জন্য হাসপাতালে ধরে রাখা সম্ভব যায়নি। বস্তুত, জীবনানন্দ যেদিন মারা যান, তার কয়েক দিন আগে থেকে তিনি হাসপাতালে আসা পুরো বন্ধ করে দেন এবং মৃত্যুর সময়ে তিনি হাসপাতালে ছিলেন না।' ('আলেখ্য :জীবনানন্দ,' ভূমেন্দ্র গুহ, আনন্দ পাবলিশার্স প্রা. লি. কলকাতা, ১৯৯৯)। আবার অন্যত্র ('জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য') তিনি উল্লেখ করেন, জীবনানন্দের মৃত্যুর পর লাবণ্য দাশকে বাসা থেকে হাসপাতালে আনার জন্য দু'বার গাড়ি পাঠানো হলেও তিনি আসেননি। মহলবিশেষের মতে, এ সময় তিনি টালিগঞ্জে সিনেমার কাজে ব্যস্ত ছিলেন।
জীবনানন্দের সঙ্গে সংসারজীবনে লাবণ্য দাশের হয়তো কিছু বঞ্চনাবোধ ছিল। প্রথম থেকেই এ বিয়ের প্রতি লাবণ্যর যে অনীহা ছিল, সেটি হয়তো সারাজীবনেও তিনি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। সে জন্য কবির মৃত্যুর পর তার শবদেহ দাহ করতে নিয়ে যাওয়ার জন্য যখন প্রস্তুত, কলকাতাকেন্দ্রিক কবি-লেখকরা এসে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করে যাচ্ছেন, লাবণ্য দাশের তখনকার প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন, 'এক সময়ে জীবনানন্দর স্ত্রী লাবণ্য দাশ আমাকে ঝুল বারান্দার কাছে ডেকে নিয়ে গেলেন। বললেন, অচিন্ত্যবাবু এসেছেন, বুদ্ধবাবু এসেছেন, সজনীকান্ত এসেছেন, তা হলে তোমার দাদা নিশ্চয়ই বড়মাপের সাহিত্যিক ছিলেন; বাংলা সাহিত্যের জন্য তিনি অনেক কিছু রেখে গেলেন হয়তো, আমার জন্য কী রেখে গেলেন বলো তো!' (বিশ্বভারতী পত্রিকা, বৈশাখ-আষাঢ়, ১৪০২)।
'জীবনানন্দ ও সঞ্জয় ভট্টাচার্য' গ্রন্থে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন, জীবনানন্দের সাহিত্যবাতিকটা লাবণ্যর কাছে ছিল 'চির-কালের নির্ভেজাল অপছন্দের জিনিস।' তিনি এমন কথাও লিখেছেন যে, কন্যা মঞ্জুশ্রী যেন তার মায়ের কাছে ছিল অবাঞ্ছিত মাতৃত্বের ফসল। তার লেখা থেকেই জানা যায়, লাবণ্য দাশ ছিলেন কিছুটা আত্মকেন্দ্রিক এবং শ্বশুরবাড়ির প্রতি বিরাগ। জীবনানন্দ চেষ্টা করতেন তার মায়ের সঙ্গে লাবণ্যর সম্পর্কটা যাতে তিক্ত না হয়। কিন্তু এ ব্যাপারে তিনি স্ত্রীর কাছ থেকে কোনো সহযোগিতা পাননি।
জীবনানন্দ-লাবণ্য দম্পতির বৈবাহিক জীবনের ছন্দ কেমন ছিল তার কিছু আভাস, কিংবা উদাহরণ মেলে তার 'মাল্যবান' উপন্যাসে। আমরা এখন জানি উপন্যাসটির পাণ্ডুলিপি আবিষ্কৃত হওয়ার পর সেটি প্রকাশের উদ্যোগ নিলে প্রবল প্রতিরোধ আসে লাবণ্য দাশের কাছ থেকেই। কারণ উপন্যাসটি প্রকাশিত হলে লাবণ্য একেবারে নিরাবরণ হয়ে পড়বেন সবার কাছে। এই একটিমাত্র বিষয় থেকেই স্পষ্ট হয়, উপন্যাসটিতে জীবনানন্দ যেভাবে মাল্যবান-উৎপলা দম্পতির জীবনকে চিত্রিত করেছেন সেটিই ছিল তার সঙ্গে লাবণ্যর দাম্পত্য জীবনের বাস্তব সম্পর্ক। অথচ 'মানুষ জীবনানন্দ' বইতে তার চিহ্নমাত্র আভাস নেই। তবে বরিশালের একান্নবর্তী পরিবারে 'প্রতিপদে পরাধীনতার শিকল যে ফাঁস' হয়ে তার গলা আঁকড়ে ধরেছিল, কলকাতায় চলে আসার পর তিনি যে নাটক-সিনেমায় অভিনয় করার স্বাধীনতা পেয়েছিলেন, সেসবের প্রতি জীবনানন্দ যে চরম নিরাসক্ত ছিলেন_ এসব কথার আড়ালে তাদের মধ্যকার সম্পর্কটার একটা কাঠামো বোঝা যায়। জীবনানন্দের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ একাধিক ব্যক্তিত্বের জবানীতে যখন লাবণ্য দাশের সঙ্গে তার দাম্পত্য জীবনের অসঙ্গতির কথা জানা যায় এবং প্রমাণ হিসেবে 'মাল্যবান' উপন্যাসের প্রকাশনা নিয়ে লাবণ্যের নাটকীয় বিরোধিতার বিষয়টি যখন আর অপ্রকাশ্য থাকে না, তখন 'মানুষ জীবনানন্দ' বইটির আবেগাপ্লুত বয়ান, লেখিকার যাবতীয় প্রশংসা-বচনকে খুব বেশি আন্তরিক মনে হয় না। ফলে লাবণ্য দাশের স্মৃতিকথাটি পরিণত হয়েছে খুব কৃত্রিম, আন্তরিকতাহীন একটি গতানুগতিক মরণোত্তর প্রকাশনায়। এই উপলব্ধির সঙ্গে অনেকেই হয়তো একাত্ম হবেন না, কিন্তু একজন পাঠকের মনে যদি এমন ভাবনার উদয় হয়, সেটিকে দূর করার কোনো সোজা রাস্তাও খুঁজে পাওয়া কঠিন।