ধ্বংসের জীবিকা

প্রকাশ: ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৬      

স্বকৃত নোমান

ঘুণপোকা। কাঠখেকো এই পতঙ্গটির নাম শুনলে আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে একটা ধ্বংসচিত্র। এর কারণ আছে। ঘুণপোকারা কাঠ গর্ত করে এবং তা খেয়ে বেঁচে থাকে। তার মানে ধ্বংসের মধ্য দিয়ে এরা জীবিকা নির্বাহ করে। তাই মানুষের কাছে এরা হয়ে উঠেছে ধ্বংসের প্রতীক। এই কারণেই ঘুণে ধরা মন, ঘুণে ধরা বিশ্বাস, ঘুণে ধরা বিবেক, ঘুণে ধরা সমাজ, ঘুণে ধরা রাষ্ট্র, ঘুণে ধরা সভ্যতা ইত্যাদি তুলনামূলক কথা লোকমুখে প্রচলিত।
মনকে কীভাবে ঘুণে ধরে? কয়েকটা উদাহারণ দেওয়া যাক। ধরা যাক তার নাম চম্পা। এক যুবকের সঙ্গে দুই বছরের প্রেম ছিল তার। এক সময় সম্পর্কটা ভেঙে চলে গেল তার প্রেমিক। তারপর অন্য একজনকে বিয়ে করে সংসার শুরু করল সে। কিন্তু হারানো প্রেমিককে সে কিছুতেই ভুলতে পারে না। মনের মধ্যে ঘুণপোকার মতো বাসা বেঁধে আছে সেই যুবক। সারাক্ষণ তার ছবি, তার স্মৃতি মনের মুকুরে ভাসে। তাই বন্ধুদের সামনে চম্পা কুঁকড়ে থাকে। তার কথোপকথন, চলাফেরা, সিদ্ধান্ত-সিদ্ধান্তহীনতায় লেগে থাকে পুরনো আঘাতের কালশিটে। তার ভেতরে প্রতি মুহূর্তে পাড় ভাঙার শব্দ।
সীমান্তের সাথে আবার এ রকম কিছু ঘটেনি। ঢাকার একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্র সীমান্ত। বাইরে থেকে তাকে দেখলে মনে হবে, বন্ধুবান্ধব, প্রেম, কলেজ জীবন তাকে দীর্ঘশ্বাস ফেলার সুযোগ দেয়নি। কিন্তু ভেতরে তার এক অদ্ভুত শূন্যতা। সীমাহীন হাহাকার। বাইরে সে হাসছে, গল্প করছে, কিন্তু ভেতরে বইছে 'কী আর হবে এসব করে'-এর চোরাস্রোত। উদ্দেশ্যহীনতা আর অন্ধকারের উদযাপনে ভরে ওঠে তার ডায়েরির পাতা। প্রতিদিন। কেউ জানে না।
আবার এই দু'জনের থেকে অনেক দূরে, অন্য একটা ক্যানভাসের মানুষ নওশের সাহেবের ব্যাপারটাও অনেকটা এ রকমই। ভালো বেতনের সরকারি চাকুরে, অবসরের আর কয়েক বছর বাকি। আদ্যন্ত সংসারী মানুষ তিনি। ছেলেমেয়েরা প্রতিষ্ঠিত। কিন্তু অফিসের কম্পিউটারের সামনে বসলেই নিজেকে অপদার্থ মনে হয় তার। উইন্ডোজ, এক্সপি, ইলাস্ট্রেটর, কোয়ার্ক, স্মার্টফোন, অ্যাপ, অনলাইন ইত্যাদি শব্দ যেন তাকে দেখেই দাঁত বের করে হাসে। ফেসবুক, টুইটার, জি-মেইলের লোগোগুলো তাকে যেন চোখে আঙুল দিয়ে দেখায় কী হু হু করে তার চারপাশটা স্বার্থপরের মতো ডিজিটালাইজ হয়ে গেল, আর তিনি কোথায় পড়ে রইলেন! সারাদিন খিটখিটে হয়ে থাকেন তিনি। কাজেও এখন ভুল হয় বেশি। সারদিন গায়ে জড়িয়ে রাখেন মন-খারাপের চাদর।
উপরে যে তিনজনের উদাহরণ দেওয়া হলো তাদের প্রত্যেকের মনে ঘুণপোকার বাসা। তাদের মনটাকে অবসাদের ঘুণপোকা কুরে কুরে খাচ্ছে। এই ঘুণপোকা এক অদৃশ্য দানব। তাকে দেখতে পাচ্ছে না তারা, কিন্তু সে এদের মাথার ভেতর বসে আছে, সারা শরীরে লতিয়ে আছে। অবশেষে তার ভার এতই অসহ্য হয়ে উঠছে তাদের কাছে, যার ফলে তারা তাকে নিয়ে বেঁচে থাকার চেয়ে মরে যাওয়াটাই শ্রেয় মনে করে। যেমন মনে করেছিলেন মার্কিন কবি সিলভিয়া প্লাথ। মনকে কীভাবে ঘুণে ধরে তা বোঝা যায় এই কবির জীবনের দিকে তাকালে। পৃথিবীটাকে তিনি তুলনা করেছিলেন ঘুণেধরা আসবাবের সঙ্গে। তার মনের মধ্যে ঢুকে পড়েছিল আত্মহননের ঘুণপোকা। তখন তার বয়স মাত্র ত্রিশ। এক রাতে সন্তানদের খাইয়ে-দাইয়ে ঘুম পাড়িয়ে রান্নাঘরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলেন। তারপর গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে আগুনের মধ্যে মাথাটা রাখলেন! আহা! কী অকালেই না ঝরে গেল একটি প্রতিভা!
এবার আসি ঘুণেধরা বিশ্বাসের কথায়। বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের অন্তর্বর্তী যে নেতিবাচক চিন্তা ও অনুভূতি আমাদের যন্ত্রণা বা কষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তার নাম সন্দেহ। এ সন্দেহ নামক ঘুণপোকা যার মনের ঘরে আশ্রয় নেয়, তাকে একেবারে মানসিক যন্ত্রণার চূড়ান্ত পর্যায়ে নিয়ে যায় এবং নিঃশেষ করে ফেলে।
আমার এক বন্ধুর কথা জানি, যে বিয়ে করেছিল প্রায় চার বছর আগে। স্ত্রী ছিল মোটামুটি সুন্দরী। চার বছরে তাদের সন্তানাদি কিছু হয়নি। স্বামী-স্ত্রী দু'জনেরই বেসরকারি চাকরি। প্রথম দুই বছর তাদের দাম্পত্য জীবন ভালোই কেটেছিল। পরস্পরের প্রতি ছিল অগাধ বিশ্বাস। তৃতীয় বছর বন্ধুটির মনে ঢুকে গেল সন্দেহের ঘুণপোকা। প্রাইভেট ফার্মে চাকরি করে স্ত্রী, বাসায় ফিরতে প্রায়ই রাত হয়ে যেত। স্বামীর সন্দেহের কারণ এটাই। কেন দেরি করে বাসায় ফেরে? কোথায়, কার সঙ্গে সময় কাটায়? এই নিয়ে শুরু হলো দাম্পত্য কলহ। এক পর্যায়ে স্ত্রীর মনেও ঢুকে গেল স্বামীর প্রতি সন্দেহ। নিশ্চয় তার স্বামী অন্য কোনো নারীর প্রেমে মজেছে! নইলে তার সঙ্গে এমন আচরণ করবে কেন? এসব নিয়ে দু'জনের কলহ আর থামে না। টেনেটুনে কোনো রকমে চার বছর একসঙ্গে থাকল তারা। তারপর আর পারল না। কারণ ততদিনে পরস্পরের প্রতি তাদের সব বিশ্বাস ঘুণপোকায় খেয়ে নিঃশেষ করে ফেলেছে। ফলে সম্পর্কটা ভেঙে গেল। এখন তারা দু'জন দুই পথের যাত্রী।
ঘুণে ধরা বিবেকও এ রকমই। বিবেকে ঘুণ ধরে গেলে ন্যায়-অন্যায় বোধ আর কাজ করে না। মানুষের কাছ থেকে মনুষ্যত্ববোধ হারিয়ে যায়। সেদিন কার কাছে যেন শুনেছিলাম, ইউরোপের এমন একটি দেশ আছে, কেউ যদি ভুল করে সে-দেশের কোনো পার্কে তার ব্যাগটি ফেলে রেখে যায়, এক সপ্তাহ পর ফিরে এসে ব্যাগটিকে আবার যথাস্থানে দেখতে পাবে। শুনে কেমন অবাক লাগল। আহা, মাটির পৃথিবীতে মানুষ স্বর্গ নামিয়ে এনেছে তবে! অথচ আমাদের দেশটির কথা ভাবুন। ঢাকার রমনা পার্কে যদি আপনি একটি ব্যাগ ভুল করে রেখে যান, এক সপ্তাহ তো দূরের কথা, এক ঘণ্টাও থাকবে কিনা সন্দেহ! না থাকার কারণ কিন্তু ওই একটাই, আমাদের বিবেকে ঢুকে গেছে ঘুণপোকা। ঘুণেধরা বিবেকের কারণে আমাদের ন্যায়-অন্যায় বোধ বলতে আর কিছু অবশিষ্ট নেই। ব্যাগ তো খুবই সামান্য ব্যাপার, তার চেয়েও তো বড় ঘটনা ঘটছে এই দেশে। দিনে-দুপুরে ডাকাতির ঘটনা ঘটছে। ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে অহরহ। খাদ্যে ভেজাল মেশাতে আমাদের বিবেকে বাধে না; ঘুষ খেতে আমাদের লজ্জা করে না। খুন ধর্ষণ চাঁদাবাজি চুরি ডাকাতি টেন্ডারবাজি করার সময় আমাদের বিবেক একবারও বলে না_ এই অন্যায় কাজটি করো না। চোখের সামনে কেউ কাউকে মেরে ফেললেও আমরা এগিয়ে যাই না। বিবেকে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছে বলেই রাজন ও রাকিবের মতো শিশুকে নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়। একই কারণে চাঁদার জন্য পুলিশ আগুনে দগ্ধ করে চা-দোকানি বাবুল মাতুব্বরকে। আমাদের নৈতিকতা, শ্রদ্ধাবোধ, সততা, আদর্শ, নীতি, ধৈর্য ও বিশ্বাসে ঘুণপোকা ধরেছে। যার ফলে আমাদের পরিচয় 'মানুষ' হলেও মনুষ্যত্ব-স্বভাব অর্জনে আমরা ব্যর্থ হচ্ছি।
আমাদের রাজনীতির দিকে তাকান। রাজনীতিও আজ ঘুণেধরা। আগে রাজনীতি ছিল নীতি ও আদর্শের সমার্থক। রাজনৈতিক চেতনায় উজ্জীবিত হয়ে এ দেশের মানুষ ৫২-এর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এবং পরবর্তী সময়ে ৯০-এর গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিল। তখনকার রাজনীতি আর বর্তমানের রাজনীতির মধ্যে কোনো মিল নেই। আগের রাজনীতি ছিল গণমানুষের অধিকার আদায়ের সংগ্রাম। রাজনীতি এখন মুনাফা ও বাণিজ্যের হাতিয়ার। আগে জনস্বার্থে রাজনীতিতে এসে মানুষ সম্পদ খোয়াতেন আনন্দচিত্তে। এখন অন্যের সম্পদ কেড়ে নিয়ে সম্পদ বানানোর সবচেয়ে সহজ পথ হচ্ছে রাজনীতি। এখন রাজনীতি হলো স্বজনপ্রীতি, আধিপত্য বিস্তার, টেন্ডারবাজি, চাঁদাবাজি, হত্যা, বোমাবাজি, সন্ত্রাস ইত্যাদির সমার্থক। রাজনীতি আর ব্যবসা দুটোর মধ্যে এখন তফাত নেই। তার মানে রাজনীতিতে ঘুণ ধরে গেছে। ঘুণপোকা গভীর থেকে কাটছে রাজনীতিকে। সৎ ও মেধাবী তরুণরা এখন রাজনীতিতে আসতে চায় না। বেশিরভাগ তরুণ মনে করে, বাংলাদেশের রাজনীতি ঘুণে ধরে গেছে। তাদের কাছে রাজনীতি মানেই ঘৃণার বিষয়। বিগত বছরটিতে রাজনৈতিক সহিংসতায় কত মানুষ দগ্ধ হয়েছে, তা তো সাবার জানা। রাজনীতির মধ্যে রাজনীতিবিদের নামে ঢুকে পড়া ঘুণপোকাদের ঠেকাতে না পারলে আমাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ যে অন্ধকার- তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাতেও চলছে ঘুণপোকার দৌরাত্ম্য। মৌলিক শিক্ষা পদ্ধতি থেকে বেরিয়ে এ দেশের শিক্ষা এখন বিপণন শিক্ষা পদ্ধতির দিকে চলে গেছে। শিক্ষকরা এখন ভোগবাদী, পুঁজিবাদী চিন্তার ধারক-বাহক। শিক্ষকরা মনে করেন, ক্লাসরুমে শিক্ষা দেওয়া মানেই হলো আর্থিকভাবে তাদের ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া। তাই তারা এখন ক্লাসরুমে সময় দেওয়ার পরিবর্তে প্রাইভেট পড়ানো ও কোচিং ব্যবসার সঙ্গে সরাসরি জড়িত। শিক্ষাকে পণ্য বানিয়ে তারা শিক্ষার্থীর কাছে বিক্রি করছেন। প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে সন্তানদের পড়ার অত্যধিক ব্যয় জোগাড় করতে পিতার কর্মস্থলে অবৈধ আয়ের কাছে নৈতিকতা পদদলিত হয়। অর্থের বিনিময়ে অর্জিত সনদ ও কষ্টার্জিত সনদ একাকার হয়ে উভয় শিক্ষিতরা ছুটছে অর্থের পাহাড় গড়তে। তাদের কাছে মানবতা ববর্রতায় রূপ নিয়েছে। ঘুণেধরা শিক্ষা ব্যবস্থার কারণে শিক্ষার্থীদের মন থেকে শিক্ষকদের সম্মান ও মর্যাদা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীরা এখন বাধ্য হয়ে শিক্ষকদের সম্মান করে; মন থেকে নয়।
মানুষের দেহেও রোগ-ব্যাধির ঘুণপোকা বাসা বাঁধে। আর এই ঘুণপোকা নিয়ে ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন বিবেকে ঘুণধরা চিকিৎকরা। চিকিৎসা আমাদের মৌলিক অধিকার, অথচ চিকিৎসার নামে চলছে রমরমা বাণিজ্য। অস্ত্রোপচারের পর পেটের ভেতর ছুরি বা গজ রেখেই সেলাই দেওয়া, বাঁ পায়ের পরিবর্তে সুস্থ ডান পা কেটে ফেলা, প্যাথলজি পুরুষ রোগীর গর্ভধারণ চিহ্নিত করা আর ভুল চিকিৎসায় রোগীর জীবন বিপন্ন করে তোলা যেন নিয়ম হয়ে পড়েছে। দাঁত তোলার নামে শিক্ষানবিশ ডাক্তাররা হাত পাকাচ্ছেন। অনেক হাসপাতালে ডাক্তারের পরিবর্তে ওয়ার্ডবয় সর্বেসর্বা। জটিল, কঠিন অপারেশন করতেও দ্বিধা করছেন না তারা। সুযোগ-সুবিধাহীন সরকারি হাসপাতালে এক শ্রেণীর ডাক্তার, নার্স, আয়া-কর্মচারীর চরম দুর্ব্যবহারের সামনে রোগীরা থাকছেন বড়ই অসহায়। বেসরকারি হাসপাতাল-ক্লিনিকে উন্নত চিকিৎসা আর ভালো ব্যবহারের নামে চলছে গলাকাটা বাণিজ্য। স্বাস্থ্যসেবার নামে গজিয়ে ওঠা বাণিজ্য কেন্দ্রগুলোয় রোগীদের থেকে মাত্রাতিরিক্ত সেবা ফি আদায়ের পাগলা ঘোড়া চলছে তো চলছেই। দিনে দিনে এমনকি প্রতি ঘণ্টার ব্যবধানেও পাল্টে যাচ্ছে বেড ভাড়া, ডাক্তারের ফি। সকালে যে ডাক্তার রোগী দেখছেন ৫০০ টাকা ফি নিয়ে, বিকেলেই তিনি হয়ে উঠছেন বিশেষজ্ঞ ডাক্তার এবং রোগীপ্রতি ফি নিচ্ছেন দেড় হাজার। চিকিৎসকরা নিজেদের খেয়ালখুশিমতো যখন যা খুশি ফি বাড়াচ্ছেন, বাড়াচ্ছেন অন্যান্য চিকিৎসা সেবামূল্যও। আর হারবাল চিকিৎসার নামে যে রমরমা ব্যবসা চলছে, সেগুলোর অধিকাংশেরই নেই কোনো ভিত্তি। চিকিৎসক হিসেবে যারা প্রতিষ্ঠান চালাচ্ছেন তারা হেকিম, ডাক্তার বা বিশেষজ্ঞ বলে দাবি করলেও কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাদের নেই। তারা সাধারণ মানুষের দুর্বলতার সুযোগ নিয়ে হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা। মানুষ রোগ-বালাই নিয়ে বাণিজ্য করতে তাদের বিবেকে এতটুকুও বাধে না। কীভাবে বাধবে? ঘুণপোকা যে তাদের বিবেকে বাসা বেঁধেছে!
আমাদের সংস্কৃতিতেও বাসা বেঁধেছে ঘুণপোকা। সংস্কৃতিই হচ্ছে একটি জাতির পরিচায়ক। আমাদের অনেক পুরনো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রয়েছে, যা আমাদের জাতির পরিচয় বহন করে। অথচ বিদেশি সংস্কৃতির ঘুণপোকা ঢুকে আমাদের ঐতিহ্যবাহী সংস্কৃতিকে ধ্বংস করে দিচ্ছে। আমাদের লোকগীতি, কিচ্ছা-কাহিনী, আলকাপ, যাত্রা, পালাগান, ভাওয়াইয়া, জারি-সারি, লালনগীতি এবং গম্ভীরার মতো গানও আজ আমরা হারাতে বসেছি।
অপরদিকে, রক্তের বিনিময়ে অর্জিত আমাদের বাংলা ভাষার অবমাননা চলছে দেদার। কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, উচ্চ আদালত এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রায় সর্বক্ষেত্রেই বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও অবহেলা চলছে। আমাদের অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, আমরা ইংরেজিতে বা ইংরেজি মিশ্রিত বাংলায় কথা বলতেই বেশি স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি। বাংলা-ইংরেজির সংমিশ্রণে এমন এক ভাষা তৈরি করছি, যার মাধ্যমে করে চলেছি বাংলাকে অপমান। বাংলা টিভি চ্যানেল বা এফএম রেডিওতে সমানতালে চলছে বাংলা ভাষার অপমান। যেখানে মানুষকে বিনোদনের মাধ্যমে ভাষা শিক্ষা দেওয়ার কথা ছিল সেখানে ওইসব চ্যানেলই ভাষার বিকৃতি করে চলেছে অবিরাম। তার মানে ভাষার প্রতি আমাদের যে প্রেম ছিল, যে ভাষার জন্য বাঙালি রক্ত দিয়েছিল, তাতেও আজ ঘুণ ধরে গেছে। অর্থাৎ আমাদের দেহ-মন, বিবেক, সংসার, সমাজ, শিক্ষা, চিকিৎসা, রাজনীতি, সংস্কৃতি এমনকি রাষ্ট্রে ঘুণপোকা বাসা বেঁধেছে। কখনও সশব্দে আর কখনও নিঃশব্দে খেয়ে যাচ্ছে। এই ঘুণপোকার হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় আমাদের জানা নেই। পরিত্রাণের চিন্তাও আমরা করছি না।
প্রকৃতিতে সব সময় একটি শূন্যতা অপর কোনো পূর্ণতা এসে পূরণ করে দিয়ে যায়। একটির বাহুল্য অপরটির কাঁচিতে কাটা পড়ে। প্রকৃতিতে এভাবে স্বয়ংক্রিয় উপায়ে সমতা বজায় থাকে। ভেতরের এই ঘুণপোকাগুলো আমাদের কোন বাহুল্যকে ধসিয়ে দিতে প্রকৃতি আরোপ করছে? কিসের শূন্যতাকে ভরাতে প্রকৃতি আমাদের মানসজগতে এদের নিয়ে এসে স্থাপন করেছে? লেখার শুরুতে কাঠের ওপর গর্তের কথা বলেছি, তাই এবারও ধরে নিচ্ছি ঘুণপোকা আমাদের ভেতরকার গর্তরূপ শূন্যতাটুকুর প্রতীক-ফলাফল। কী সেই শূন্যতা, তা যদি মনে জানতে পারি, তবেই এ থেকে পরিত্রাণের উপায় বের করা সম্ভব।
লক্ষ্য করলে দেখতে পাই ঘুণপোকা বাসা বাঁধে প্রাণহীন জৈব কাঠামোয়। প্রকৃতির বস্তুজগৎ আর অবস্তুজগৎ প্রায় অভিন্ন নিয়মে চলে। যে কারণে মানুষের হাজার বছর ধরে জমানো অবস্তুগত অব্যক্ত জ্ঞানগুলোর আড়ালে দেখতে পাওয়া যায় বস্তুজগতের নিয়মের উদাহরণ। সেই সূত্র ধরে বলা যায়, আমাদের মনোজাগতিক আদর্শিক ধসের পেছনে দায়ী ঘুণপোকাগুলো মনটাকে শব্দ করে কাটতে পারছে এ জন্য যে, ভেতরকার প্রাণ এবং প্রাণের ভেতর অবস্থিত যে অধিপ্রাণ তা ইতিমধ্যে মরে গেছে। প্রাণ যেহেতু নেই, তার কাঠামো হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকার অধিকারও প্রকৃতির কাছে নেই। তাই ঘুণপোকা ধরিয়ে প্রকৃতি তা ধসিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়ার ভেতর দিয়ে তাকে নিতে শুরু করেছে।
মনোজাগতিক, আদর্শিক ধস ঠেকানোর স্বার্থে ঘুণপোকা তাড়াতে একটা উপায়ই হাতে আছে। তা হলো প্রকৃতির প্রাণের আড়ালে বাস করতে থাকা যে অধিপ্রাণ তাকে কোনোভাবেই মরতে দেওয়া চলবে না। মরলেই তা ঘুণপোকার আবাস হয়ে উঠবে প্রাকৃতিক নিয়মেই। ওই প্রাণের ভেতর প্রাণ বাঁচে শিল্পে, বাঁচে সংস্কৃতিচর্চায়। এই চর্চায় বন্ধ হলে, মনের বেদিতে শিল্পপ্রতিমার পূজা বন্ধ হলে প্রাণের ভেতর প্রাণ আর বাঁচার রসদ পায় না। তাই শিল্প-সংস্কৃতির সুস্থ চর্চাই ঘুণপোকার হাত থেকে পরিত্রাণের উপায় বলে মনে করি। শিল্প ও সংস্কৃতির ভেতর দিয়ে মানুষ নিজেকে জানার প্রথম পাঠটুকু পায়। অবিরাম গ্রহণ-বর্জনে শুদ্ধির দিয়ে ক্রমশ এগিয়ে চলার যে যাত্রা, তার শুরুটুকু তো নিজেকে জানা দিয়েই শুরু হয়। এ কারণেই শাস্ত্রে আছে_ আত্মনং বিদ্ধি। নিজেকে জানো। নিজেকে জানার জন্য যে যাত্রা, সে যাত্রাই কিন্তু রক্ত চলাচল বাড়ায়। ঘুণপোকা রক্তের ওই চলাচলের মুখে আর অধি হয়ে উঠতে পারে না।

পরবর্তী খবর পড়ুন : ফেরা না ফেরার গল্প

ঘরের মাঠে মস্কোয় বিধ্বস্ত রিয়াল

ঘরের মাঠে মস্কোয় বিধ্বস্ত রিয়াল

রাশিয়া নামক এক জুজু বুড়ির ভয় ভর করেছে রিয়ালের ওপর। ...

হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা

হারাচ্ছে জমি, অস্তিত্ব সংকটে সমতলের আদিবাসীরা

'জমি চাই মুক্তি চাই' স্লোগানে ১৮৫৫ সালে সাঁওতাল নেতা সিধু, ...

'কোল্ড আর্মসে' কক্সবাজার সৈকতে দুর্ধর্ষ হামলার ছক

'কোল্ড আর্মসে' কক্সবাজার সৈকতে দুর্ধর্ষ হামলার ছক

দুনিয়াব্যাপী কমান্ডো নাইফ এবং বিশেষ ধরনের ছুরি ও চাকু 'কোল্ড ...

সহিংসতা রোধে ইসিকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ আওয়ামী লীগের

সহিংসতা রোধে ইসিকে সতর্ক হওয়ার পরামর্শ আওয়ামী লীগের

দেশের বিভিন্ন স্থানে সৃষ্ট সহিংসতা ঠেকাতে নির্বাচন কমিশনকে (ইসি) আরও ...

গ্রেফতার হামলা বন্ধে সিইসির হস্তক্ষেপ চায় বিএনপি

গ্রেফতার হামলা বন্ধে সিইসির হস্তক্ষেপ চায় বিএনপি

প্রতীক বরাদ্দের পরও বিএনপির নেতাকর্মীদের হয়রানি, গ্রেফতার ও সন্ত্রাসী হামলার ...

বৃহত্তম সমাবেশ যুক্তরাজ্যে

বৃহত্তম সমাবেশ যুক্তরাজ্যে

১ আগস্ট ১৯৭১। যুক্তরাজ্যের রাজধানী লন্ডনের ট্রাফালগার স্কয়ারে দুপুর থেকেই ...

চট্টগ্রামে আমীর খসরুর প্রচারে হামলায় আহত ৫

চট্টগ্রামে আমীর খসরুর প্রচারে হামলায় আহত ৫

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর গণসংযোগে হামলার ...

২৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনা মোতায়েন

২৪ থেকে ২৬ ডিসেম্বরের মধ্যে সেনা মোতায়েন

আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আগামী ...