"শহর কলকাতা কবি এবং সঙ্গীতস্রষ্টা নজরুল সম্পর্কে একরকম আগ্রহহীন হয়ে পড়েছিল। কিন্তু ব্যক্তি নজরুলকে কলকাতা শহরের ভুলে যাওয়া অসম্ভব। নজরুলের জীবনকে ঘিরে সত্য অর্ধসত্য মিলিয়ে নানা রকমের কল্পকাহিনী তাঁর এককালের বন্ধু এবং গুণমুগ্ধ ভক্তের দল সৃষ্টি করে যাচ্ছিলেন। ভাগ্য সুপ্রসন্ন বলতে হবে। অকৃত্রিম নজরুল সুহৃদ কমরেড মুজফ্ফর আহ্মদকে দীর্ঘদিন নেহেরু সরকারের জেলে কাটাতে হয়েছিল। ওই অখণ্ড অবসরে তিনি যদি 'কাজী নজরুল ইসলাম :স্মৃতিকথা' শীর্ষক বড়সড় বইটি না লিখতেন, হয়ত আমাদের বিশ্বাস করতে হত নজরুল ইসলামেরও রাবণের মত দশটি মুণ্ডু এবং বিশটি হাত ছিল।"
-আহমদ ছফা (১৯৮৮)

'কাজী নজরুল ইসলাম :স্মৃতিকথা' নামে বড়সড় বইটি লেখার পাঁচ-সাত বছর আগে মুজফ্ফর আহ্মদ ছোট একটি বই লিখিয়াছিলেন। বইটির নাম ছিল 'কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা)'। আমরা এই দুইটি বইকে প্রকাশের ক্রম অনুসারে প্রথম বারের ও দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথা বলিয়া নির্দেশ করিব। দ্বিতীয়বারের স্মৃতিকথার একান্ত বিসমিল্লাহয় মুজফ্ফর আহ্মদ ঘোষণা করিয়াছিলেন, "আমার এই পুস্তকখানা আমার লেখা 'কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা)'র পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ নয়। এখানা শুরু হতে শেষ পর্যন্ত নূতন লেখা পুস্তক।"
নজরুল ইসলামের জীবনচরিত লেখকদের কাছে মুজফ্ফর আহ্মদের এই বই দুইটি আজ পর্যন্ত 'সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য' আকরের ভূমিকা পালন করিয়া আসিতেছে। ১৯৭২ সালে নজরুল ইসলামের সংস্রবে একটি মূল্যবান 'তথ্যমূলক নিবন্ধ' লিখিতে বসিয়া পশ্চিমবঙ্গের স্বনামধন্য মনীষী গোপাল হালদার এই কথা অকপটে স্বীকার করিয়াছিলেন। ১৯৩৭ সালে কবি সমর সেন তাঁহার প্রথম বই 'কয়েকটি কবিতা' প্রকাশ করেন বিশ্ববিদ্যালয় প্রদত্ত স্বর্ণপদক বিক্রয় করিয়া। ঐ বইটি তিনি যে মুজফ্ফর আহ্মদকে উৎসর্গ করিয়াছিলেন তাহা অকারণ নয়।
কেন তাঁহার মনে কাজী নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে 'স্মৃতিকথা' লেখার বাসনা জাগিয়াছিল সে কৈফিয়তও মুজফ্ফর আহ্মদ দিয়াছিলেন দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথার ভূমিকাযোগে। নজরুল ইসলাম যদি অকালে 'ব্যাধিগ্রস্ত ও জীবন্মৃৃত' না হইতেন এ বাসনার জন্ম বোধ করি হইত না। মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিয়াছেন, 'কাজী নজরুল ইসলাম যখন সুস্থ ছিল তখন তার সম্বন্ধে আমি আমার স্মৃতিকথা লিখব, একথা কোনদিন স্বপ্নেও আমার মনে আসেনি। সে বয়সে আমার চেয়ে দশ বছরের ছোট। সে যদি কোনদিন তার স্মৃতিকথা লিখত তবে তাতেই তো আমার সম্বন্ধে তার কিছু লেখার কথা। আমার চোখের সামনে সে যে এমন ব্যাধিগস্ত ও জীবন্মৃত হয়ে যাবে তা কি আমি কোনদিনও ভাবতে পেরেছিলেম?'

কাজী নজরুল ইসলামের সহিত যখন মুজফ্ফর আহ্মদের সাক্ষাৎ পরিচয় ঘটে, তখনও তিনি জীবনের ব্রত কি হইবে তাহা সম্পূর্ণ স্থির করিয়া লইবার অবকাশ পান নাই। ইংরেজি ১৯১৯ সালের কথা। মুজফ্ফর আহ্মদ তখন কলিকাতায় অবস্থিত 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতি'র একমাত্র সব-সময়ের কর্মী এবং তাঁহাদের প্রকাশিত 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র সহকারী সম্পাদক। সেদিনের স্মৃতির ভাঁড়ার হাতড়াইয়া তিনি লিখিতেছেন, 'আমার জীবনের পেশা কি হবে_সাহিত্য, না রাজনীতি_এই নিয়ে ১৯১৯ সাল হইতেই আমার মনে একটা প্রবল দ্বন্দ্ব চলে আসছিল। একটা কিছুতে নিজেকে বিলিয়ে দেব এটা ঠিকই করেছিলাম। তা না হলে বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য সমিতির সব সময়ের কর্মী হতে পারতাম না। তবে সাহিত্য ও রাজনীতির ভিতরে কোনটাকে বেছে নেব তা ঠিক করতে পারছিলাম না।' কিন্তু কোন না কোনভাবে ১৯২০ সালের মধ্যেই তিনি স্থির করিয়া ফেলিলেন, এখন হইতে রাজনীতিই হইবে তাঁহার পেশা।
নজরুল ইসলাম সে বছরই কলিকাতায় আসিলেন, সাহিত্যক্ষেত্রে আবির্ভূত হইলেন, হইয়া সকলকে চমকিতও করিলেন। মুজফ্ফর আহ্মদ স্মরণ করিয়াছেন, 'উনিশশ বিশের দশকেই তার লেখা নিয়ে বাংলা ও ইংরেজি কাগজের সাহিত্যিক স্তম্ভে আলোচনা শুরু হয়ে গিয়েছিল। উনিশশ ত্রিশের দশকে তার সৃজনকর্ম ছিল আরও বিরাট ও বিশাল।' দুর্ভাগ্যক্রমে উনিশশ চলি্লশের দশকে নজরুল ইসলাম দুরারোগ্য ব্যাধির কবলে পড়িলেন। ইহাতে মুজফ্ফর আহ্মদ দুঃখ প্রকাশ করিয়াছেন। লিখিয়াছেন, 'তার ব্যাধিগ্রস্ত হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই তার সম্বন্ধে সব আলোচনা প্রায় বন্ধ হইয়া যাওয়ায়' তিনি খুবই মর্মপীড়া বোধ করিতেন।
উনিশশ পঞ্চাশের দশকে নজরুল ইসলাম সম্বন্ধে আলোচনা নতুন করিয়া শুরু হইলে মুজফ্ফর আহ্মদের কথায়, তাঁহার 'আনন্দের আর সীমা থাকল না'। তিনি লিখিয়াছেন, 'আরও কিছু পরে দেখা গেল যে নানা স্থানে নজরুলের জন্মদিবসও পালিত হচ্ছে।' এক ধরনের 'নজরুল স্মৃতিকথা' লেখার চল শুরু হইল অনেকটা এ সময়েই। এ বিষয়ে ১৯৫৯ নাগাদ লেখা প্রথম বারের স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহ্মদ মন্তব্য করিলেন, 'আজকাল নজরুল ইসলাম সম্পর্কে অনেকে অনেক কিছু লিখেছেনও। বড় দুঃখ যে এই সব লেখার ভিতরে কিছু কিছু লেখা নিছক কল্পনাপ্রসূত।'
এই জাতীয় কল্পনাবিলাস বন্ধ করার তাগিদেই তাঁহার মনে স্মৃতিকথা লেখার বাসনা প্রথম জাগে বলিয়া তিনি জানাইয়াছেন। এ বাসনার লক্ষ্য কি তাহা একাধিক জায়গায় তিনি স্পষ্টও করিয়াছেন। যেমন, 'কাজী নজরুল প্রসঙ্গে :স্মৃতিকথা' পুস্তকের এক জায়গায় তিনি লিখিয়াছেন, 'ভবিষ্যতে যাঁরা নজরুল জীবনী লেখায় ব্রতী হবেন তাঁদের কিঞ্চিৎ সাহায্য হতে পারে এই ভেবে আমি তার সম্বন্ধে আমার স্মৃতিকথার কিছু কিছু লিপিবদ্ধ করছি।' যাহারা নিজ নিজ স্মৃতিকথা উনিশশ পঞ্চাশের দশক হইতে প্রকাশ করিয়া আসিতেছিলেন তাহাদের কথা মনে রাখিয়া_১৯৬৫ সালেও_তিনি একই অভিযোগের পুনরাবৃত্তি করিলেন, 'এই সময়েই আবার কেউ কেউ তাঁদের স্মৃতি হতে নজরুলের জীবনের কিছু কিছু ঘটনা কাগজে ছাপানো শুরু করলেন। এইসবের অনেকগুলি অতিরঞ্জিত ও ভুল তথ্যে ভরা থাকত, দুয়েকটি হত আগাগোড়া বানানো কথা।'
মুজফ্ফর আহ্মদ বরাবরই জোর দিয়া বলিয়াছেন, নজরুল ইসলাম প্রসঙ্গে তিনি যাহা লিখিতেছেন তাহা মোটেও জীবনী নহে, স্মৃতিকথা মাত্র। দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথার ভূমিকায় তিনি তাই আরও একবার জানাইলেন, 'এই পুস্তকখানার নাম হতেই সকলে বুঝতে পারবেন যে আমি নজরুল সম্বন্ধে শুধু আমার স্মৃতিকথাই লিখেছি, তার জীবনী আমি লিখিনি। জীবনী লেখার জন্য যে কঠোর পরিশ্রম করতে হয় এই বয়সে (১৯৬৫ সালের ৫ই আগস্ট তারিখে আমার বয়স ছিয়াত্তর বছর পুরো হবে) তা করার মতো শক্তিসামর্থ্য আমার নেই। তবে এই স্মৃতিকথা যথাসম্ভব তথ্যনিষ্ঠ করার চেষ্টা আমি করেছি। হয়তো সব জায়গায় সফলকাম হতে পারিনি।'

এখানে আমরা মুজফ্ফর আহ্মদের তথ্যনিষ্ঠার একটি উদাহরণ চয়ন করিব। প্রথম বারের স্মৃতিকথাযোগে তিনি লিখিয়াছিলেন, "'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় ছাপানোর জন্যে নজরুল যখন প্রথম লেখা পাঠিয়েছিল (১৯১৮ সনে) তখন হতেই তার সঙ্গে আমার পত্র লেখালেখি শুরু হয়।" দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথায় সে কথা খানিক সংশোধন করিয়া তিনি লিখিতেছেন, "এখানে আমার অসাবধানতা যে প্রকাশ পেয়েছে তা আমাকে স্বীকার করতেই হবে। এর একটি কারণ, আমি কম জায়গায় বেশি কথা বলার চেষ্টা করেছি। অন্য কারণ, লেখার সময়ে আমার হাতের কাছে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' ছিল না। তাই আমার স্মৃতি আমার সঙ্গে প্রতারণা করতে পেরেছে। ১৯১৮ সালে নজরুল ইসলাম 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় ছাপানোর জন্যে কোনো লেখাই পাঠায়নি। সে আমাদের প্রথম লেখা_একটি কবিতা_পাঠিয়েছিল ১৯১৯ সালে।"
এতদিনে সকলেই জানেন বাংলা ১৩২৬ সালের শ্রাবণ (১৯১৯ সালের জুলাই-আগস্ট) সংখ্যা 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় নজরুল ইসলামের লেখা 'মুক্তি' নামাংকিত একটি কবিতা ছাপা হইয়াছিল। মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিয়াছেন, 'যতটা জানা গিয়েছে, এটিই ছিল তার প্রথম পত্রিকায় ছাপানো কবিতা। তার আগেও সে অনেক কবিতা লিখেছে, কিন্তু এটিই প্রথম ছাপা হয়েছিল। কাঁচা লেখা মনে করে তার কোন পুস্তকে এই কবিতাটিকে সে স্থান দেয়নি।' এই 'কবিতাটি রক্ষিত হওয়ার প্রয়োজন আছে' জ্ঞান করেন বলিয়াই মুজফ্ফর আহ্মদ 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' হইতে পুরা কবিতাটি তাঁহার দ্বিতীয় বারের 'স্মৃতিকথা'য় উদ্ধৃত করিয়াছেন।
মুজফ্ফর আহ্মদ সবিনয়ে লিখিয়াছেন, "আমি কবি বা সাহিত্যিক নই। কাব্য বা সাহিত্যের আমি যে একজন সমঝদার সে কথাও জোর গলায় প্রচার করার অধিকার আমার নেই। তবুও নজরুল ইসলামের এই প্রথম কবিতাটির পাণ্ডুলিপি হাতে পেয়ে আমি অত্যন্ত উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিলেম। সমালোচক ও সমঝদাররা এই কবিতাটির তারিফ করেননি। কেউ কেউ বলেছেন কবিতাটি রবীন্দ্রনাথের অনুকরণ। যিনি যা কিছু বলুন না কেন, আমি কিন্তু নজরুল ইসলামের এই কবিতাটিতে তার ভবিষ্যত সম্ভাবনা দেখতে পেয়েছিলেম। তার এই কবিতা এবং 'হেনা' ও 'ব্যথার দান' প্রভৃতি ছোটগল্প পড়ে আমার মনে হয়েছিল যে বঙ্গসাহিত্যে একজন শক্তিশালী কবি ও সাহিত্যিকের উদ্ভব হতে যাচ্ছে।"
এই কবিতাটি ছাপা হওয়ায়, বলাবাহুল্য, নজরুল ইসলাম নিজে খুবই খুশি হইয়াছিলেন। সেই খুশির চোটে 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা' সম্পাদক সমীপে পত্রযোগে তিনি লিখিয়াছিলেন, "বাই দি বাই, আপনারা যে 'ক্ষমা' বাদ দিয়ে কবিতাটির 'মুক্তি' নাম দিয়েছেন, তাতে আমি খুব সন্তুষ্ট হয়েছি।" এই চিঠির তারিখ ১৯ আগস্ট ১৯১৯। মোকাম 'ফরটিনাইনথ বেঙ্গলস', করাচি। এই চিঠিতেই 'ব্যাটালিয়ন কোয়ার্টারমাস্টার হাবিলদার' কাজী নজরুল ইসলাম ঘোষণা করিয়াছিলেন, 'আপনার এরূপ উৎসাহ বরাবর থাকলে আমি যে একটি মস্ত জবর কবি ও লেখক হব, তা হাতেকলমে প্রমাণ করে দিব, এ একেবারে নির্ঘাৎ সত্যি কথা।' এই সত্যি কথার প্রমাণস্বরূপ নজরুল ইসলাম মুজফ্ফর আহ্মদ ও তাঁহার সহকর্মীদের জানাইয়াছিলেন, "এবারে পাঠালুম একটি লম্বাচওড়া 'গাথা' আর একটি 'প্রায় দীর্ঘ' গল্প আপনাদের পরবর্তী সংখ্যা কাগজে ছাপাবার জন্যে, যদিও কার্তিক মাস এখনো দূরে।"
সমস্যার মধ্যে, নজরুল ইসলামের পাঠানো ১৯ আগস্ট ১৯১৯ তারিখের এই চিঠিশরিফ 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'য় তখন ছাপা হয় নাই। চিঠিটি প্রথম ছাপা হয় ঘটনার অনেক পরে ঢাকায় প্রকাশিত সাহিত্য মাসিক 'সওগাত' কাগজে। পরে মুজফ্ফর আহ্মদের আত্মীয় কবি আবদুল কাদির সম্পাদিত 'নজরুল রচনা-সম্ভার' সংকলনেও (ঢাকা, মে ১৯৬১) ইহার স্থান হয়। দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথায় (তৃতীয় সংস্করণে) পাদটীকা আকারে মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিয়াছেন, "পরে খবর পেয়েছি যে শহীদুল্লাহ সাহেবের সঙ্গে পত্রখানা ঢাকা চলে গিয়েছিল। আমার দীর্ঘ অনুপস্থিতির সময়ে তিনিই তা 'মাসিক সওগাতে' ছেপেছিলেন।"
এতক্ষণে স্মৃতির সহিত বিস্মৃতির সমস্যাও দেখা দিয়াছে। মুজফ্ফর আহ্মদ স্বীকার করিয়াছেন, "নজরুলের এই পত্রে 'সাহিত্য পত্রিকা'য় ছাপানোর জন্যে একটি বড় গাথা ['একটি লম্বাচওড়া গাথা'] ও একটি গল্প [একটি 'প্রায় দীর্ঘ' গল্প] পাঠানোর কথা লেখা আছে। 'হেনা' শীর্ষক গল্পটি আমরা পেয়েছিলেম এবং কার্তিক ১৩২৬ (অক্টোবর ১৯১৯) সংখ্যক সাহিত্য পত্রিকায় তা ছেপেওছিলেম। সাহিত্য সমিতি আর সাহিত্য পত্রিকার নামে পাঠানো চিঠিপত্র ও লেখা ইত্যাদি সবই প্রথমে আমার হাতে আসত। 'হেনা' নামক গল্পের সঙ্গে কোন গাথা যে এসেছিল তা কিছুতেই আমার মনে পড়ছে না।"
উপরের চিঠিতে নজরুল ইসলাম অধিক লিখিয়াছিলেন, "আর যদি এত বেশি লেখা ছাপাবার মত জায়গা না থাকে আপনার কাগজে, তা হলে যে কোন একটা লেখা 'সওগাতে'র সম্পাদককে 'হ্যান্ডওভার' করলে আমি বিশেষ অনুগৃহীত হব।" এ প্রসঙ্গে মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিয়াছেন, "'সওগাত'কে নজরুলের কোন কবিতা যে আমি ছাপাতে দিইনি (দিতে হলে আমিই দিতুম) একথা একরকম জোরের সঙ্গে বলতে পারা যায়। কারণ নিজের বা পরের কোন লেখাই আমি কোনদিন 'সওগাতে' ছাপতে পাঠাইনি। 'সওগাতে'র সংস্রবে অনেক গুরুত্বহীন কথাও আমার মনে আছে, নজরুলের কবিতা পাঠানোর কথা ভুলতে পারি বলে তো আমার মনে হয় না।"
এ প্রসঙ্গে একপ্রস্থ মজার গল্পও শুনাইয়াছেন মুজফ্ফর আহ্মদ :"মনে আছে একবার একজন যুবক তাঁর একটি গল্প 'সাহিত্য পত্রিকা'য় ছাপতে পাঠিয়েছিলেন। গল্পটি নির্বাচিত না হওয়ায় তিনি তা ফেরত নিয়ে যান। পরের মাসে দেখা গেল যে গল্পটি তাঁর স্ত্রীর নামে 'সওগাতে' ছাপা হয়ে গেছে। এই যুবক পরবর্তী জীবনে কলকাতায় একজন বিশিষ্ট নাগরিক হয়েছিলেন।" সাহিত্যের ইতিহাসে এ ধরনের ঘটনা আকছার ঘটিয়া থাকে। নজরুলের পাঠানো 'গাথা' না পাওয়ার প্রসঙ্গে মুজফ্ফর আহ্মদ অনুমান করিয়াছেন, গাথাটি হয়তো শেষ পর্যন্ত ডাকে দেওয়াই হয় নাই। তাঁহার যুক্তি, "'মুক্তি' নামক কবিতা যখন সাহিত্য পত্রিকায় প্রথম ছাপা হয় তখনই আমরা স্থির করেছিলেম যে নজরুল ইসলামের সব লেখা আমরা সাহিত্য পত্রিকায় ছাপাব, আর যতটা সম্ভব তাকে আমরা সকলের সামনে তুলে ধরব। কাজেই তার গাথাটি ছাপার জন্যে নির্বাচিত না হওয়ার কথা উঠতে পারে না।"
আসল ঘটনা কি তাহা হইলে? মুজফ্ফর আহ্মদ ইহার যুক্তিসঙ্গত একটা উত্তরও সরবরাহ করিয়াছেন। তিনি অনুমান করিয়াছেন, নজরুল ইসলাম হয়তো গাথা-কবিতাটি শেষ পর্যন্ত পাঠাইয়াই উঠেন নাই। তিনি সবিস্তার লিখিয়াছেন, 'আমার মনে হয় নজরুল ইসলাম তার পত্রখানাই প্রথম ডাকে দিয়েছিল, আর লেখা পাঠিয়েছিল পরে। তখন তার মনে এই পরিবর্তন এসে থাকবে যে কবিতাটি সে আর ছাপতে পাঠাবে না। তা না হলে এই কবিতাটি নিয়ে তার সঙ্গে অনেক পত্র লেখালেখি হত। এমন একটি কথা ভুলতে পারি বলে তো আমার মনে হয় না, বিশেষ করে তার লেখার একটি শব্দের পরিবর্তনের কথা পর্যন্ত যখন আমার মনে আটকে রয়েছে।'

প্রথম বারের স্মৃতিকথার আরেকটি ভুল তথ্যও মুজফ্ফর আহ্মদ দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথায় সংশোধন করিয়াছেন। নজরুল ইসলামের সহিত মুজফ্ফর আহমদের প্রথম দেখা কখন হইয়াছিল? প্রথম স্মৃতিকথার বয়ান অনুসারে হইয়াছিল ১৯১৯ সনের শেষভাগে। কিন্তু ১৯৬৫ সালে লেখা দ্বিতীয় স্মৃতিকথায় এই তথ্যেরও একটি সংশোধনী দেওয়া হইয়াছে। 'কাজী নজরুল প্রসঙ্গে (স্মৃতিকথা)' পুস্তকে আছে :'বাঙ্গালি পল্টন ভেঙ্গে দেওয়ার কয়েক মাস আগে, ১৯১৯ সালের শেষ ভাগে, নজরুল ইসলাম পল্টন হতে একবার ছুটি পেয়েছিল। পল্টনে যোগ দেওয়ার পরে এটা ছিল তার প্রথম ছুটি। এই ছুটিতে নজরুল তার বাড়ীতে (আসানসোল মহকুমার অধীন জামুরিয়া থানার চুরুলিয়া গ্রামে) গিয়েছিল। এই সময়ে সে কলকাতাও আসে এবং ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রীটে সাহিত্য সমিতির আফিসে আমার সঙ্গে দেখা করে। এটা ছিল আমাদের প্রথম সাক্ষাৎ। নজরুলের সঙ্গে ছিলেন শ্রীযুত শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়_তখনকার দিনে নজরুলের ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের অন্যতম।'
১৯৬৫ সনের দ্বিতীয় স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহ্মদ ইহার একটি সংশোধনী দিয়াছেন। তিনি লিখিয়াছেন, 'আমি জীবনে কোনদিন রোজনামচা লিখিনি। লিখলেও তা আমার নিকটে না থেকে পুলিশের, অর্থাৎ গবর্নমেন্টের মুহাফিজখানায় থাকত। তবে ১৯১৯ সালের শেষভাগে নজরুল ইসলামের ছুটিতে আসার কথা লেখাটা আমার পক্ষে ভুল হয়েছে। আসলে সে ছুটিতে এসেছিল ১৯২০ সালের জানুয়ারি মাসের চতুর্থ সপ্তাহে, তার আগে নয়।'
কিভাবে তিনি এই সিদ্ধান্তে পেঁৗছিলেন? মুজফ্ফর আহ্মদ আপনকার নতুন সিদ্ধান্তের পক্ষে সাক্ষ্য মানিয়াছেন পত্রিকা প্রকাশের ক্ষণটিকে। তিনি লিখিয়াছেন, "এটা এভাবে বুঝতে পারছি যে ত্রিমাসিক 'বঙ্গীয় মুসলমান সাহিত্য পত্রিকা'র ১৩২৬ সালের মাঘ সংখ্যা নজরুল ছুটিতে আসার আগে শুধু বারই হয়নি, করাচির সেনানিবাসে এ পত্রিকার সেই সংখ্যাটি তার হাতে পেঁৗছেও গিয়েছিল। তার প্রাপ্তিস্বীকার করে যে পত্রখানা সে আমায় লিখেছিল তাও আমি তার ছুটিতে আসার আগে পেয়েছিলেম। পত্রিকার এই সংখ্যার কথা সে তার বন্ধু শৈলজানন্দ মুখোপাধ্যায়কেও লিখেছিল। কারণ তার 'ব্যথার দান' শীর্ষক গল্পটি এই মাঘ সংখ্যক সাহিত্য পত্রিকায় ছাপা হয়েছিল। বাংলা মাঘ মাস, খ্রিষ্টিয় মাসের হিসাবে ছিল জানুয়ারি-ফেব্রুয়ারি মাস।"
প্রথম বারের স্মৃতিকথায় মুজফ্ফর আহ্মদ লিখিয়াছিলেন, 'নজরুলের বয়স তখন [১৯১৯ সালের শেষভাগে] ২২ বছরের মতো হবে, কিংবা কিঞ্চিৎ কমও হতে পারে। তখন তার মধ্যে আমি তিনটি জিনিশ লক্ষ্য করেছিলাম_সুগঠিত দেহ, অপরিমেয় স্বাস্থ্য ও প্রাণখোলা হাসি। নজরুলের এই তিনটি জিনিশের জন্যে প্রথম দেখাতেই লোকেরা তার ওপর আকৃষ্ট হতেন।' আর দ্বিতীয় বারের স্মৃতিকথায় কথাটা আছে এইরকম :'হাঁ, কাজী নজরুল ইসলামকে সেদিন আমি প্রথম দেখলাম। সে তখন একুশ বছরের যৌবনদীপ্ত যুবক। সুগঠিত তার দেহ আর অপরিমেয় তার স্বাস্থ্য। কথায় কথায় তার প্রাণখোলা হাসি। তাকে দেখলে, তার সঙ্গে কথা বললে যে-কোন লোক তার প্রতি আকৃষ্ট না হয়ে পারত না।'
মুজফ্ফর আহ্মদের এই স্মৃতির প্রতিধ্বনি পাওয়া যায় সমকালের অনেক স্মৃতিকথায়। আমরা এখানে মাত্র একটি উদাহরণ দিয়া তামামশোধ করিব। ১৯৯৪ সনে প্রকাশিত স্মৃতিকথায় শ্রীমতী প্রতিভা বসু লিখিয়াছেন, 'সেই সময়ে যে তিনটি যুবক সারা বাংলার গর্ব বলে আলোড়ন তুলে ফেলেছিলেন তার মধ্যে একজন সুভাষচন্দ্র বসু, একজন নজরুল ইসলাম, আর একজন দিলীপকুমার রায়। এই তিনজনের নাম সকলের মুখে মুখে, ঘরে ঘরে। আমার আগ্রহ দেখে বাবা বললেন, 'আমি খবর নেব কিভাবে গান শোনার সুযোগ ঘটতে পারে।' হ

মন্তব্য করুন