সময়কে ছাড়িয়ে 'মধ্যাহ্ন'

প্রকাশ: ১৪ জুলাই ২০১৭

দীপন নন্দী

হুমায়ূন আহমেদ পাঠ শুরু কবে থেকে_ এ প্রশ্নের সঠিক উত্তর এখন আর মনে নেই। যতদূর মনে পড়ে, ষষ্ঠ কি সপ্তম শ্রেণিতে পাঠকালে প্রথম হাতে ওঠে হুমায়ূন আহমেদ। এর পর দিন-মাস-বছর কেটেছে হুমায়ূন-মুগ্ধতায়। কী অসম্ভব এক মায়ায় তিনি আমাকে আবিষ্ট করে রেখেছিলেন, সে রহস্যের ভেদও আজও হয়নি। সংবাদপত্রে যোগ দেওয়ার পর প্রথমবার স্পর্শ দূরত্বে দেখি তাকে। দীর্ঘক্ষণ তার দিকে চেয়ে হয়েছে কথোপকথন, যা তার লেখার চেয়েও মুগ্ধকর। 'কালের খেয়া' আহ্বান জানিয়েছে হুমায়ূন আহমেদের প্রিয় বই কোনটি জানাতে। এর উত্তর আমি কেন, কেউই চট করে দিতে পারবেন না। বেশ কিছুক্ষণ ভেবে দেখলাম তার 'মধ্যাহ্ন' আমার কাছে অন্য রকম ভালো লাগার উপন্যাস। এর কারণ কী, তার সবিস্তার বর্ণনার আগে জানিয়ে রাখি, এটি দুই খণ্ডের উপন্যাস। 'অন্যপ্রকাশ' থেকে ২০০৬ সালে প্রথম খণ্ড এবং পরের বছর দ্বিতীয় খণ্ড প্রকাশিত হয়। এর পাঠকপ্রিয়তা কেমন ছিল, তা পাঠকের কল্পনার কাছেই ছেড়ে দিলাম।
জানার ইচ্ছা থেকে ইতিহাস আমাকে টানে, কিন্তু ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস আমাকে সেভাবে টানে না। 'মধ্যাহ্ন' ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাস_ এ তথ্য প্রথমে জেনে হুমায়ূন আহমেদের নতুন উপন্যাসের প্রতি কিছুটা অনাগ্রহই জেগেছিল। কিন্তু যার আছে হুমায়ূন-নেশা, সে কি নতুন উপন্যাস না পড়ে থাকতে পারে? তাই ঝটপট কিনে ফেলে পড়তে শুরু করি। 'মধ্যাহ্ন' ইতিহাসভিত্তিক উপন্যাসের চেয়ে ভিন্ন কিছু। এটাকে দূর অতীত আশ্রিত কথন বলে বলে হয়েছে আমার কাছে। 'মধ্যাহ্ন'র প্রথম ভাগের সূচনায় আমরা পুকুরপাড়ে পেয়েছিলাম প্রৌঢ় হরিচরণ সাহাকে, যার মেয়ে শিউলি চলে গেছে এ জলের টানে। এর পর এমন সব চরিত্র আমাদের সামনে এসেছে, যাদের বাস্তব জীবনে অনুভব করেছি; তেমনি এমন কিছু চরিত্র রয়েছে, যারা সমাজে আপনার-আমার নিঃশ্বাস দূরত্বে বাস করেন। 'মধ্যাহ্ন'তে ইতিহাস রেখার মতো পথ চলেছে, তবে তা মুখ্য নয়। তাই বলা যেতে পারে, 'মধ্যাহ্ন' উপন্যাসে ইতিহাস আছে; ঐতিহাসিকতা নেই। আরও সহজ করে বললে হুমায়ূন আহমেদ ইতিহাসকে আশ্রয় করে একটি আখ্যান আমাদের সামনে তুলে ধরেছেন আপন নিপুণতায়।
লেখকের জন্মস্থান নেত্রকোনা থেকেই 'মধ্যাহ্ন' উপন্যাসের ছুটে চলা। যেখানে দেখা মিলেছে ধর্মের দ্বন্দ্ব। যার ফলে মুসলমান ছেলেকে দত্তক নিয়ে হরিচরণকে সমাজচ্যুত হতে হয়েছে। ব্রাহ্মণ অম্বিকা ভট্টাচার্য ধর্মান্তরিত হয়ে সিরাজুল ইসলাম ঠাকুর হন; পুকুড়ে নগ্নগাত্রে স্নানের অপরাধে কাঠমিস্ত্রি সুলেমানের রূপবতী স্ত্রী জুলেখার আশ্রয় হয় বেশ্যাপল্লীতে। আরও দেখা পাই সোনাদিয়ার জমিদার বাবু শশাংক পাল; শল্লার দশআনির মুসলমান জমিদার নেয়ামত হোসেন এবং তার অর্থে নির্মিত জুমাঘরের ইমাম মাওলানা ইদরিস; কলকাতা প্রবাসী মণিশংকর দেওয়ান; স্বদেশী আন্দোলনকারী শশী ভট্টাচার্য (যার মূল নাম কিরণ গোস্বামী), সোহাগগঞ্জ বাজারের রঙিলা নটিবাড়ির মালেকাইন সরযুবালা; ধুরন্ধর ধনু শেখসহ অনেকের। দেখা পাই অন্যতম সমাজপতি ন্যায়রত্ন রামনিধি চট্টোপাধ্যায়; মোহনগঞ্জের বিদ্বানজন শৈলজারঞ্জন মজুমদার। গানের সুরে দেখা দেন গায়ক আবদুুল হক, যার ডাকনাম উকিল মুনসি ও তার নিঃসন্তান স্ত্রী 'লাবুসের মা'। হঠাৎ সামনে আসেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের মতো ইতিহাস বদলে দেওয়া মানুষ।
মিলন কুন্ডেরা পাঠ করা না থাকলেও, তার সম্পর্কে একটা লেখা পড়েছিলাম_ 'তার উপন্যাসে বলে সব চরিত্র সমান গুরুত্ব পায়।' হুমায়ূন আহমেদের অন্য সব উপন্যাসের মতো এখানেও প্রতিটি চরিত্র অতি গুরুত্বের সঙ্গে বর্ণিত হয়েছে। হুমায়ূন আহমেদের 'সিগনেচার'- বাস্তবতার সঙ্গে অসম্ভবের যোগসূত্রও তিনি এখানে এঁকেছেন। অতিলৌকিক ও অতিপ্রাকৃতিক বিষয়াবলি রহস্যঘেরা থাকলেও, সরল লেখনীতে তা বিশ্বাসযোগ্যতা পেয়েছে সহজেই। সব মিলিয়ে উপন্যাসজুড়ে উপভোগ্য নানাকাহিনীর সমন্বিত অবয়ব রয়েছে। একদিকে আলো, অন্যদিকে কালো_ সমাজের দুই শ্রেণির মানুষ চমৎকারভাবে উঠে এসেছে দুটি খণ্ডেই।
সব মিলিয়ে পাঠের এক দশক পরও 'মধ্যাহ্ন'-মুগ্ধতা কমেনি; বরং এ লেখার আগে আরেক বার পাঠ করে সে মুগ্ধতা বৃদ্ধি পেয়েছে আরও। ি