জীবনানন্দ দাশ ক বি তা

জীবনানন্দ দাশের 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা'

প্রকাশ: ২০ অক্টোবর ২০১৭      

ফয়জুল লতিফ চৌধুরী

জীবদ্দশায় কবি জীবনানন্দ দাশ কম-বেশি ২৬৯টি কবিতা পত্রপত্রিকায় প্রকাশ করেছিলেন। এর মধ্যে ১৬২টি কবিতা সংকলিত হয়েছিল ৬টি কাব্যগ্রন্থে। ১৯৫৪'র ২২ অক্টোবর দুর্ঘটনাজনিত আকস্ট্মিক মৃত্যুর পর কয়েকটি ট্রাঙ্কে সযত্মেম্ন রক্ষিত পাণ্ডুলিপির শত শত খাতা আবিস্কৃত হয়। দুর্ভাগ্য হলেও সত্য, এগুলোর বেশ কিছু কবি-কন্যা মঞ্জুশ্রী দাশের কাছ থেকে হারিয়ে যায়। শেষ পর্যন্ত কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে জীবনানন্দ দাশের পাণ্ডুলিপির যে খাতাগুলো জমা পড়ে, তার মধ্যে কবিতার খাতা ৪৮টি। এগুলো গ্রন্থাগারের 'দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ বিভাগ'-এ সংরক্ষিত আছে।
এর মধ্যে ৬ সংখ্যা চিহ্নিত খাতাটির সূচনাপত্রে কবি বাংলায় লিখেছিলেন, 'কবিতা' 'শ্রী জীবনানন্দ দাশ' এবং তৃতীয় পঙ্‌ক্তিতে ইংরেজিতে লিখেছিলেন 'March, 1934'। লাইব্রেরির কর্মকর্তারা এটির অন্তর্ভুক্তি চিহ্ন(Accession Number) দিয়েছেন JD 6/6। অনেকটি বান্ডিলে জীবনানন্দের পাণ্ডুলিপির খাতাগুলো জমা দেওয়া হয়েছিল। ৬ সংখ্যক বান্ডিলে এ খাতাটি ছিল। অর্থাৎ খাতাটি ৬ সংখ্যক বান্ডিলের ৬ সংখ্যক খাতা। গ্রন্থাগারের কর্মকর্তারা সূচনাপৃষ্ঠে লিখে রেখেছেন :পৃষ্ঠা সংখ্যা ১ থেকে ৭৫; দুটি পাতা (পৃষ্ঠা ৩৫ থেকে ৩৮) বাঁধাই থেকে খুলে গেছে।
উল্লিখিত ৭৫ সংখ্যক পৃষ্ঠার যে ক'টি পাতা পাওয়া যায়নি, তারও সংখ্যা লিখিত ছিল। কিন্তু পরে কেটে দেওয়ায় এখন আর বোঝা যায় না এখানে কোন্‌ পৃষ্ঠা থেকে কোন্‌ পৃষ্ঠার সংখ্যা লেখা হয়েছিল। বর্তমানে যে অবস্থায় আছে তাতে বোঝা যায়, জীবনানন্দ দাশ এ খাতাটিতে সাকল্যে ৭৩টি কবিতা লিখেছিলেন। দুটি পাতা কেউ দয়া করে কেটে নিয়েছেন, যাতে ১ ও ২ এবং ১৩ ও ১৪ সংখ্যক কবিতা ছিল। পাতা দুটি কেটে নেওয়ার চিহ্ন সুস্পষ্ট। আমরা এখন জানি, আকাশবাণীর কোনো এক মুদ্রিত পত্রিকার জন্য অনুলিপি করার কষ্ট স্বীকার না করে ১ ও ২ সংখ্যক কবিতা সংবলিত পাতাটি কেটে নেওয়া হয়েছিল।
জীবনানন্দ দাশ এ খাতার কবিতাগুলো 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' নাম দিয়ে একটি কাব্যাকারে প্রকাশ করার কথা ভেবেছিলেন। অনেক ভাবনার মতো এ ভাবনাটিও জীবনানন্দ বাস্তবায়ন করেননি। ৭৩টি কবিতার প্রথম ৬৪টি স্পষ্টত সনেট। পরবর্তীকালে কবিভ্রাতা অশোকানন্দের উদ্যোগে সিগনেট প্রেস থেকে এ খাতাটির ৫৯টি সনেট নিয়ে একটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করা হয়।
২.
১৯২৮ খ্রিস্টাব্দে সিটি কলেজের টিউটরের চাকরি থেকে জীবনানন্দ বরখাস্ত হন। কিছু দিন বেকার জীবনের পর ১৯২৯ সালের ডিসেম্বরে দিল্লির রামযশ কলেজে চাকরি লাভ করেন। কয়েক মাস পর ১৯৩০-এর মার্চে বিবাহোপলক্ষে রামযশ কলেজ থেকে ছুটি নিয়ে বরিশালে ফিরে আসেন জীবনানন্দ দাশ। ২৬ বৈশাখ তারিখে ঢাকা শহরে বুড়িগঙ্গা নদীর তীরে জগন্নাথ কলেজের পাশে অবস্থিত ঢাকা ব্রাহ্মসমাজ মন্দিরে কবি জীবনানন্দ দাশ রোহিণীকুমার গুপ্তের কন্যা লাবণ্য গুপ্তের সঙ্গে পরিণয়সূত্রে আবদ্ধ হন। লাবণ্য গুপ্ত সে সময় ঢাকার ইডেন কলেজের ছাত্রী। বিয়ের পর জীবনানন্দ দাশ আর রামযশ কলেজে ফিরে যাননি; কার্যত বেকার জীবন বেছে নিয়েছিলেন।
বেকার জীবনানন্দ সস্ত্রীক বরিশালে পিতৃগৃহে অবস্থান করতে থাকেন। এ সময় প্রচুর লেখালেখি করেন তিনি। পিতৃগৃহে ছিলেন বলে চাকরি না থাকলেও যাকে বলে 'জীবন সংগ্রাম', তা ছিল না। চাকরি খোঁজার দায়িত্ব এবং বেকার থাকার অনির্বচনীয় মর্মযাতনা সত্ত্বেও অবসর ছিল প্রশস্ত। এই প্রশস্ত অবসরে জীবনানন্দ দাশ ভূতগ্রস্তের মতো লিখেছেন। বিশেষভাবে উল্লেখ্য, কবিতার পাশাপাশি এ সময় তিনি গল্প-উপন্যাসও লিখতে শুরু করেন।
কবি জীবনানন্দ দাশ গল্প লিখতে শুরু করেন ১৯৩১-এ। 'পূর্ণিমা'সহ ১৪টি গল্প লেখেন এ এক বছরেই। ১৯৩২-এ লেখেন দুটি উপন্যাস 'প্রেতিনীর রূপকথা' এবং 'নিরুপম যাত্রা'। উপরন্তু এ বছর ৩৬টি গল্প লিখে ফেলেন জীবনানন্দ। ১৯৩৩-এ রচনা করেন সাতটি উপন্যাস, যথা- 'অতসী', 'কারুবাসনা', 'জীবনপ্রণালী', 'বিভা', 'মৃণাল', 'কল্যাণী' এবং 'আমরা চারজন'। এত লিখেও চরিতার্থতার সন্তুষ্টি হয়নি। ১৭ সেপ্টেম্বর (১৯৩৩ খ্রি.) দিনলিপিতে অসহায় সুরে তার স্বগতোক্তি এ রকম :'কী করিব? চায়ের দোকান দিব? মিষ্টির দোকান? বেকারি খুলিব? হাঁস-মুরগির ব্যাপারি? মাছের চাষ? তাড়ির আখড়া খুলিয়া বসিব নাকি? না জুতা সেলাই করিব?'
এ গেল গল্প-উপন্যাসের কথা। এবার কবিতার সংখ্যার প্রতি নজর ফেরানো যেতে পারে। ডিসেম্বর ১৯৩১-ফেব্রুয়ারি ১৯৩২- তিন মাসে একটি খাতায় ৪৩টি কবিতা লিখেছেন জীবনানন্দ দাশ। একই সময়ে আরেকটি খাতায় ১৪টি কবিতার সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে। ১৯৩৩-এর কোনো খাতা বা ১৯৩১ ও ১৯৩২-এ আর কোনো কবিতার খাতা উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। দৃষ্টি এড়ানোর মতো সংখ্যা নয় যে, উদ্ধারকৃত খাতাগুলোর মধ্যে ১৯৩৪-এ চারটি খাতায় লিখিত কবিতার সংখ্যা ২৪২ এবং ১৯৩৪-৩৬ চিহ্নিত আরেকটি খাতায় লিখিত কবিতার সংখ্যা ৫০। ১৯৩৫-এর আগস্টে বরিশাল ব্রজমোহন কলেজে টিউটর হিসেবে চাকরি লাভ করেন জীবনানন্দ। ফলে তার দীর্ঘ বেকার জীবনের অবসান ঘটে। কিন্তু লেখালেখির এই দ্রুত চাল আরও কিছু দিন অব্যাহত থাকে। দেখা যায়, কেবল ১৯৩৬-এর এপ্রিল মাসেই দুটি খাতায় জীবনানন্দ ১৭৩টি কবিতা রচনা করেছেন। ১৯৩৭-এর জুন ও অক্টোবরের খাতার সন্ধান পাওয়া গেছে। তাতে দেখা যায়, এ দু'মাসের অবকাশে রচিত কবিতার সংখ্যা ১২৮। এসবের অধিকাংশ স্বল্প পরিচিত কবিতা।
এ প্রসঙ্গে বলে রাখা যায়, তার মৃত্যুর পর অদ্যাবধি ১২৮টি গল্প এবং ২১টি উপন্যাস আবিস্কৃত ও প্রকাশিত হয়েছে। জীবনানন্দের কবিতার সংখ্যা কত, তা নিশ্চিত করে বলা দুরূহ। জীবনানন্দ দাশের কবিতার খাতা উদ্ধার, পাঠ ও মুদ্রণযোগ্য পাণ্ডুলিপি প্রণয়নে প্রধান ভূমিকা কবি ভূমেন্দ্র গুহের। ২০১৬-তে মৃত্যুর পূর্বে তার সম্পাদনায় প্রতিক্ষণ 'পাণ্ডুলিপির কবিতা' শিরোনামে ১৪ খণ্ড গ্রন্থ প্রকাশিত করেছে। এতে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ১ থেকে ৩৪ সংখ্যক সর্বমোট ৩৪টি কবিতার খাতার ১৫৭০টি কবিতা মুদ্রিত হয়েছে। জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ৪৮টি খাতায় কবিতার সংখ্যা ২১৫২। সুতরাং বলা যেতে পারে, আরও ৫৮২টি কবিতার পাণ্ডুলিপি সংস্করণ মুদ্রণের অপেক্ষায় রয়েছে, যদিও এগুলোর বেশ কিছু ইতিমধ্যে বিভিন্ন গ্রন্থ ও পত্রপত্রিকায় মুদ্রিত ও প্রকাশিত হয়ে গেছে।
কিন্তু এখানেই কাহিনীর শেষ নয়। সম্প্রতি কলকাতার সপ্তর্ষি প্রকাশন 'অপ্রকাশিত' শিরোনামে দুই খণ্ডে জীবনানন্দের আরও ৬৩টি কবিতা গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেছে। এ কবিতাগুলো সদ্য উদ্ধারকৃত। অতএব, সব মিলিয়ে কবি জীবনানন্দ দাশের গ্রন্থিত-অগ্রন্থিত কবিতার সংখ্যা কম-বেশি ২২১৫। ২০১৫ খ্রিস্টাব্দে এক সাক্ষাৎকারে কবি ভূমেন্দ্র গুহ প্রাক্কলন করেছিলেন জীবনানন্দের কবিতার সংখ্যা কম-বেশি ২৪০০ হতে পারে। তার অনুমান বাস্তবানুগই ছিল বলা যেতে পারে। তবে আমাদের এও মনে রাখতে হয়, ১৯৩০-১৯৪৬ কালপর্বের বেশ কিছু খাতা চিরতরে হারিয়ে গেছে।
৩.
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে চারটি খাতায় লিখিত কবিতার সংখ্যা ২৪২ এবং ১৯৩৪-৩৬ চিহ্নিত পৃথক আরেকটি খাতায় কবিতার সংখ্যা ৫০। এই পাঁচটির একটিতে মাত্র ২-৩ দিনের অবকাশে জীবনানন্দ দাশ একনাগাড়ে ৭৩টি কবিতা লিখেছিলেন। শেষের কয়েকটি বাদ দিলে প্রায় সবই সনেট। জীবদ্দশায় এ কবিতাগুলোর একটিও তিনি কোনো পত্রিকায় প্রকাশের জন্য প্রেরণ করেননি; ১৯৫৪-তে প্রকাশিত 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'তেও গ্রহণ করেননি। তবে গ্রন্থাকারে প্রকাশের কথা তার বিবেচনায় ছিল। জীবনানন্দ গ্রন্থের প্রচ্ছদ নাম স্থির করেছিলেন 'বাংলার ত্রস্ত নিলীমা'। এ বিষয় ওপরে উল্লেখ করা হয়েছে।
সনেটগুলো সম্পর্কে জীবনানন্দ একমাত্র প্রভাকর সেনকেই অবহিত করেছিলেন। এই বয়োকনিষ্ঠ কবিতানুরাগীর সঙ্গে জীবনানন্দের আন্তরিক পত্রালাপ হয়েছিল। প্রভাকর সেনের জন্ম ১৯২৪ সালে। বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি অর্থনীতি অধ্যয়ন করেছিলেন এবং কবিতা লিখতেন। অদ্যাবধি এর অতিরিক্ত আর কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। প্রভাকর সেনকে লেখা জীবনানন্দের চারটি চিঠি কবির মৃত্যুর পর আবিস্কৃত হয়। এর তিনটি 'ময়ূখ' সাহিত্য পত্রিকার জীবনানন্দ স্ট্মৃতি-সংখ্যায় গ্রন্থিত হয়েছিল। চতুর্থ চিঠিটি সংরক্ষণ করা হয়েছিল 'বাংলার ত্রস্ত নিলীমা' গ্রন্থে অন্তর্ভুক্ত করার উদ্দেশ্য নিয়ে।
প্রভাকর সেনকে লেখা চিঠিগুলো গুরুত্বপূর্ণ। তিনটি চিঠি ময়ূখ পত্রিকায় মুদ্রিত হয়েছিল। প্রভাকর সেনকে লেখা চতুর্থ চিঠিটি সিগনেট প্রেস থেকে হারিয়ে যায়। ওই চিঠির স্ট্মৃতি খনন করে ভূমেন্দ্র গুহ জানিয়েছেন :এই চিঠিটিতে কবিতাসৃজন-প্রক্রিয়ার নানা রকম উপকরণ অনুষঙ্গ বিষয়ে জীবনানন্দের উপলব্ধি ও অভিজ্ঞতার কথা বিশদভাবে ব্যাখ্যাত হয়েছিল, এবং অন্তঃপ্রেরণা বিষয়টি যে কবির পক্ষে কোনো একটি কবিতার সৎ হয়ে গড়ে উঠতে পারার প্রাথমিক শর্ত, অন্তত জীবনানন্দের পক্ষে, তা তিনি নিবিড় মর্মগ্রাহিতার সঙ্গে অনেকটা বিস্তৃতি জুড়ে বলেছিলেন।
জীবনানন্দ এ চিঠিতে আরও লিখেছিলেন যে, বেশ কয়েক বছর আগের একটা সময়ে যখন তিনি এক রকম বাধ্যতামূলকভাবে নানাভাবে নানা দিকে বিড়ম্বিত বোধ করছিলেন এবং অনন্যোপায়ের মতো স্ট্মৃতিসত্তা সান্ত্বনার মতো এক প্রকৃতির সন্নিধানে গিয়ে দাঁড়াচ্ছিলেন, তখন 'একটি বিশেষ ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়ে' 'আবহমান বাংলা ও বাঙালী'র প্রেক্ষিতে কতকগুলো 'সনেট-জাতীয়' কবিতা দু'-তিন দিনের ভেতরে লিখে ফেলেছিলেন; লেখাগুলো খুব সহজেই হয়ে উঠেছিল নিজেরা, লেখাবার তারা ও তাদের অবয়ব প্রায় পূর্ণ দৃষ্টিলোকী হয়ে উঠেছিল, এ রকম হয়েছিল যে, সেগুলো এক জায়গায় গুছিয়ে তোলার সময় তার কখনও মনে হয়নি যে, সম্পূূর্ণতার তাগিদে তাদের রূপের কোনো পরিবর্তন কখনও দরকার হবে আর।
এসব ধারণা কবিতাগুলোর পুনর্বীক্ষণের সময়ও অটল থেকেছে এবং জীবনানন্দ লিখেছিলেন :লেখাগুলোকে 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' নামে পুস্তকাকারে গ্রথিত করা যেত হয়তো দূর অতীতের কোনো এক সময়ে, কিন্তু ১৯৪৫-৪৬-এ পৌঁছে সে জিনিস করা আর সম্ভব নয় তার পক্ষে, তার যুক্তি ছিল :অনেক সাম্প্রতিক রচনাই তো প্রকাশিত না-হয়ে পড়ে থাকছে আর সময়ও অনেকটা এগিয়ে গিয়েছে ওই লেখাগুলোর সময়ের থেকে।
৪.
১৯৫৪'র ২২ অক্টোবর মৃত্যুর কিছু পূর্বে কলকাতার নাভানা প্রকাশনা সংস্থা প্রকাশ করেছিল জীবনানন্দ দাশের 'শ্রেষ্ঠ কবিতা'। তার মৃত্যুর পর প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ প্রবন্ধ সংকলন 'কবিতার কথা'। সিগনেট প্রেস থেকে 'কবিতার কথা' প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৬ খ্রিস্টাব্দে। একই সময়ে 'বাংলার ত্রস্ত নিলীমা'র 'প্রেস কপি' তৈরি করেন কবি ভূমেন্দ্র গুহ, যাতে কবির ছোট বোন সুচরিতা দাশের অনেক অবদান ছিল।

'বাংলার ত্রস্ত নিলীমা'র জন্য ভূমেন্দ্র গুহ ও সুচরিতা দাশ ঠিক ক'টি কবিতা নির্বাচন করেছিলেন, তা কোথাও উল্লিখিত নেই। তবে কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রক্ষিত ৬ সংখ্যক খাতার ৭৩টি কবিতার সবই তারা প্রেস কপিতে দেননি। এ বিষয়ে ভূমেন্দ্র গুহ লিখেছেন : "... আমরা 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা'র প্রেস কপি তৈরি করলুম, করলুম মানে লাইন-টানা ফুলস্কেপ কাগজে কবিতাগুলো ধরে ধরে স্পষ্ট অক্ষরে হুবহু কপি করলুম পর পর, খাতায় যেমন ছিল, তেমন; খাতার শেষের দিকের যে কবিতাগুলোর চেহারা 'সনেট-জাতীয়' নয়, সেগুলো আর কপি করলুম না, আলাদা করে রাখলুম অন্য কোনোভাবে গ্রন্থিত হবে ভেবে।"
ভূমেন্দ্র গুহ ও সুচরিতা দাশ মিলে উৎসর্গপত্রে লিখলেন 'আবহমান বাংলা ও বাঙালী'- প্রভাকর সেনকে লেখা চিঠির থেকে শব্দবন্ধটি নিয়ে। কোনো ভূমিকা লিখলেন না তারা; পরিবর্তে প্রেস কপিতে প্রথমেই স্থাপন করা হলো প্রভাকর সেনকে লেখা ওই চিঠি একটি শিরোনামের অভিভাবকত্বে :'এই বই-এর কবিতাবলী সম্বন্ধে জীবনানন্দ যা চিঠির আকারে লিখেছিলেন নিরুদ্দিষ্ট কোনো পাঠককে।' তখনও জানা যায়নি জীবনানন্দের এ গুরুত্বপূর্ণ চিঠিটির প্রাপক তরুণ কবি প্রভাকর সেন।
সবই ঠিক ছিল কিন্তু সিগনেট প্রেসের স্বত্বাধিকারী দিলীপ কুমার গুপ্ত, যিনি কলকাতার সাহিত্য মহলে সচরাচর 'ডি. কে.' বলে অভিহিত হতেন, তার বিবেচনায় 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' নামটি খুব ভারি এবং কবিতাগুলোর সহজ ছন্দের সঙ্গে কেমন যেন 'বেমানান'। সরল, ছোট এবং আকর্ষক একটি প্রচ্ছদ নামের সন্ধানের ফলস্বরূপ অতঃপর 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা' গ্রন্থটির নাম বদলে রাখা হলো 'রূপসী বাংলা'। সিগনেট প্রেস থেকে রূপসী বাংলা প্রকাশিত হলো ১৯৫৭-তে। 'বাংলার ত্রস্ত নীলিমা'র কবি জীবনানন্দ দাশ অচিরেই রূপসী বাংলার কবি হয়ে উঠলেন।
১৯৫৭-তে সিগনেট প্রকাশিত 'রূপসী বাংলা'র ভূমিকা লিখেছিলেন কবিভ্রাতা অশোকানন্দ দাশ। ভূমিকাটি নিম্নরূপ :
"এই কাব্যগ্রন্থে যে-কবিতাগুলি সঙ্কলিত হল, তার সবগুলিই কবির জীবিত-কালে অপ্রকাশিত ছিল; তাঁর মৃত্যুর পরে কোনো-কোনো কবিতা বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।
কবিতাগুলি প্রথম বারে যেমন লেখা হয়েছিল, ঠিক তেমনই পাণ্ডুলিপিবদ্ধ অবস্থায় রক্ষিত ছিল; সম্পূর্ণ অপরিমার্জিত। পঁচিশ বছর আগে খুব পাশাপাশি সময়ের মধ্যে একটি বিশেষ ভাবাবেগে আক্রান্ত হয়ে কবিতাগুলি রচিত হয়েছিল। এ-সব কবিতা 'ধূসর পাণ্ডুলিপি' পর্যায়ের শেষের দিকের ফসল।
কবির কাছে 'এরা প্রত্যেকে আলাদা-আলাদা স্বতন্ত্রসত্তার মতো নয় কেউ, অপরপক্ষে সার্বিক বোধে একশরীরী; গ্রামবাংলার আলুলায়িত প্রতিবেশ-প্রসৃতির মতো ব্যষ্টিগত হয়েও পরিপূরকের মতো পরস্পরনির্ভর।..."
আর গ্রন্থের পেছনের মলাটে বিজ্ঞাপন স্বরূপ যা লেখা হলো, তা-ও স্ট্মরণীয় এবং উদ্ধরণযোগ্য :
"বাংলার রূপ তার প্রকৃতিতে, কাব্যকাহিনী এবং ইতিহাসের ঘটনায় বিধৃত হয়ে আছে। এর মধ্যে বিশেষত প্রকৃতির অংশ নিয়ে আপাততুচ্ছকে ঘিরে যে মহিমামণ্ডল জীবনানন্দ দাশ তাঁর কবিতায় সৃষ্টি করেছেন তার তুলনা যে-কোনও দেশের সাহিত্যেই বিরল। 'রূপসী বাংলা' তাঁর চিত্ররূপময় কাব্যরীতির মধ্যেও স্বল্পপরিজ্ঞাত একটি নতুন অধ্যায়, কেননা এর প্রতিটি কবিতা এক-একটি সনেট। নিভৃতে নিজের মনে, চতুর্দশপদে গ্রথিত এই কবিতাবলীতে, মৃত্যুর-ছায়া-পড়া সকরুণ গভীর একটি ভালোবাসার কাহিনী তিনি রচনা করে গেছেন। দেশপ্রেম নিয়েও এরা যে উৎকৃষ্ট কাব্য হয়ে উঠেছে সেই কারণেও এই গ্রন্থ কাব্যের ইতিহাসে স্ট্মরণীয় হয়ে থাকবে।"
ভূমেন্দ্র গুহ ও সুচরিতা দাশ মিলে উৎসর্গপত্র নির্বাচন করেছিলেন :'আবহমান বাংলা ও বাঙালী'। সিগনেট কর্তৃপক্ষ করল :'আবহমান বাংলা, বাঙালী'।
৫.
কলকাতা ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে সুসংরক্ষিত ৬ সংখ্যক কবিতার খাতায় লেখা ৭৩টি কবিতার ৫৯টি 'রূপসী বাংলা'য় সংকলন করা হয়েছিল। শেষভাগ থেকে কিছু অংশ (১৩ পঙ্‌ক্তি) নিয়ে একটি 'ভূমিকা কবিতা' জুড়ে দেওয়া হয়েছিল প্রথম কবিতার পূর্বাংশে। প্রথমে সংবেশিত সনেটটির প্রথম চরণ স্ট্মরণযোগ্য :'তোমরা যেখানে সাধ চলে যাও- আমি এই বাংলার পারে (রয়ে যাবো)'। সিগনেট প্রকাশনা সংস্থা জীবনানন্দের যে সনেটগুলো তাদের নির্বাচন থেকে বাদ দিয়েছিল, সেগুলোর দুটি এই সঙ্গে মুদ্রিত হলো। এ দুটোর প্রথম পঙ্‌ক্তি যথাক্রমে 'সমুদ্রের জলে আমি দেহ ধুয়ে চেয়ে থাকি নক্ষত্রের আকাশের পানে' এবং 'তোমরা স্বপ্নের হাতে ধরা দাও- আকাশের রৌদ্র ধুলো ধোঁয়া থেকে স'রে।' া


সমুদ্রের জলে আমি দেহ ধুয়ে চেয়ে থাকি নক্ষত্রের আকাশের পানে
চারি দিকে অন্ধকার; নারীর মতন হাত, কালো চোখ, ল্ফ্নান চুল ঝরে
যতদূর চোখ যায় নীল জল হূষ্ট মরালের মতো কলরব করে
রাত্রিরে ডাকিতে চায়- বুকে তার, প্রেমমূঢ় পুরুষের মতন আহ্বানে
পৃথিবীর কত প্রেম শেষ হল- তবু এই সমুদ্রের আকাগ্ধক্ষার গানে
বাধা নাই, ভয় নাই, ক্লান্তি নাই, অশ্রু নাই- মালাবার ঢেউয়ের ভিতরে
চারি দিকে নীল নারিকেল বন সোনালি ফুলের গন্ধে, বিস্ট্ময়ের ভরে
জানে তাহা- কতদিন থেকে ওই মলয়ালী আর তার শিশু তাহা জানে

জানি না মান্দ্রাজ নাকি এই দেশ? জানি না মলয় নাকি? কিংবা মালাবার?
জানি না এ পৃথিবীর কোন্‌ পথ- কোন্‌ ভাষা কোন্‌ মুখে এখানে বাতাসে
জানি না যৌবন কবে শেষ হয়ে গেছে কোন্‌ পৃথিবীর ধুলোতে আমার
তবুও আমার প্রাণ তামিলের কিশোরের মতো ঐ কিশোরীর পাশে
আবার নতুন জন্ম পায় আজ; কেউ নাই অন্ধকারে কবেকার ঘাসে
কত যে মউরী খই ঝ'রে গেছে- চারি দিকে ফুটে সব উঠিছে আবার।

পরবর্তী খবর পড়ুন : এতদিন কোথায় ছিলেন?

যেভাবে ওজন কমাতে ভূমিকা রাখে ফুলকপি

যেভাবে ওজন কমাতে ভূমিকা রাখে ফুলকপি

শীতকালীন সবজি ফুলকপি সবারই পছন্দের। রান্না, সিদ্ধ, ভাজি, ভাজা-সবরকম ভাবেই ...

ভারতের ছবিতে সব্যসাচীর সঙ্গে তিশা

ভারতের ছবিতে সব্যসাচীর সঙ্গে তিশা

প্রথমবারের মতো ভারতীয় একটি ছবিতে অভিনয় করতে যাচ্ছেন নুসরাত ইমরোজ ...

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা

চীনে আইফোন বিক্রি ও আমদানিতে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে দেশটির আদালত। ...

প্রার্থী হতে পারছেন না বিএনপির আলী আজগর

প্রার্থী হতে পারছেন না বিএনপির আলী আজগর

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ময়মনসিংহ-১ (হালুয়াঘাট-ধোবাউড়া) আসনের বিএনপির প্রার্থী আলী ...

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে বিভক্ত আদেশ হাইকোর্টের

খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা নিয়ে বিভক্ত আদেশ হাইকোর্টের

আসন্ন জাতীয় নির্বাচনে তিনটি আসনে বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার প্রার্থিতা ...

হবিগঞ্জে টেক্সটাইল মিলের গুদামে আগুন

হবিগঞ্জে টেক্সটাইল মিলের গুদামে আগুন

হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার নয়াপাড়ায় সায়হাম টেক্সটাইল মিলের গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ...

শেখ হাসিনার নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে মুখরিত কোটালীপাড়া

শেখ হাসিনার নির্বাচনী জনসভাকে কেন্দ্র করে মুখরিত কোটালীপাড়া

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিজ নির্বাচনী এলাকা ...

ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৩

ঝিনাইদহে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে আহত ৩

ঝিনাইদহের শৈলকুপায় আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের মধ্যে হামলা-পাল্টা হামলা, অফিস ...