মলাটবন্দি মারুফুল ইসলাম

প্রকাশ: ০৯ নভেম্বর ২০১৮      

আহমেদ জুয়েল

সমসাময়িক কবি-সাহিত্যিকদের নিয়ে বড় কাজ করার প্রবণতা বোধ হয় খুব কমই লক্ষ্য করা যায়। অভিযোগ- সমসাময়িকদের নিয়ে কেউ লিখতে চায় না। সেখানে হারুন পাশা সম্পাদিত বিশেষ আয়োজনভিত্তিক পত্রিকা 'পাতাদের সংসার' ব্যাতিক্রম। 'জীবিতদের নিয়ে কাজই আমাদের লক্ষ্য'- এ ঘোষণা দিয়ে তার কাজ করছেন। এবং এক এক করে পাঁচ বছরে তারা ১৭টি সংখ্যা প্রকাশ করেছেন। বিষয়টি অবশ্যই প্রশংসার এবং একই সঙ্গে সাহসের। সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, আহমদ রফিক, আসাদুজ্জামান নূর, কামাল চৌধুরী প্রমুখকে নিয়ে তাদের এই সাহসী কাজের ধারাবাহিকাতায় এবার 'পাতার সংসার'-এ মলাটবদ্ধ হয়েছেন সময়ের শক্তিমান কবি ও ছড়াকার মারুফুল ইসলাম।

সেপ্টেম্বরে প্রকাশিত পাতার সংসারের এ সংখ্যায় সূচিবদ্ধ হয়েছে প্রাজ্ঞ থেকে সমসমায়িক ৫১ জন কবি, সাহিত্যিক তথা সংস্কৃতজনের লেখা। যাদের লেখার মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে উঠেছে কবি ও ব্যক্তি মারফুল ইসলামের দশদিগন্ত। এ ছাড়াও রয়েছে কবির সাক্ষাৎকার, নিবেদিত কবিতা ও ছড়া এবং মারুফুল ইসলামের কবিতা, ছড়া, গান ও সংক্ষিপ্ত পরিচিতি।

সংখ্যার সূচনা হয়েছে কবি মারুফুল ইসলামের সাক্ষাৎকারের মধ্য দিয়ে। সেখানে এক প্রশ্নের জবাবে কবি বলছেন, 'স্রষ্টার কাজ সৃষ্টি করা, সৃষ্টি করা এবং সৃষ্টি করা। আর কিছুই না, কিচ্ছু না।' মারুফুল ইসলামের বক্তব্য মেনে নিলেও, স্রষ্টার সৃষ্টি নিয়ে অগ্রজ বা প্রিয়জনের দৃষ্টিভঙ্গি বা মূল্যায়ন স্রষ্টাকে নিঃসন্দেহে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেয়, যা তাকে সহযোগিতা বা প্রেরণা জোগায় সামনে এগিয়ে যাওয়ার। তবে, সেই মূল্যায়ন বা বিশ্নেষকের লেখক তালিকায় নামগুলো যদি হয় আহমদ রফিক, আনিসুজ্জামান, সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম, হাবীবুল্লাহ সিরাজী বা মঈনুল আহসান সাবের, তুষার দাশ, ফারুক হোসেন, ইরাজ আহমেদ প্রমুখ প্রাজ্ঞ সাহিত্যবিশারদ কবি-লেখক; তখন শুধু মারুফুল ইসলাম নন, তার পাঠক তথা বাংলা সাহিত্যের পাঠকের জন্যও জরুরি পাঠ্য হয়ে দাঁড়ায় লেখাগুলো বা সংকলনটি। ঠিক তেমনি একটি আয়োজন পাতার সংসারের মারুফুল ইসলাম সংখ্যা।

মারুফুল ইসলামের কাবিসত্তার আলোচনায় অধ্যাপক আনিসুজ্জামান লিখেছেন, "তার প্রথম কাব্য 'মালাবন্দী মন' (১৯৯৩) প্রকাশিত হয়েছিল আজ থেকে ২৫ বছর আগে। তারপর তার বেশ কয়েকটি কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ পায়। ২০১৬ সালে প্রকাশিত 'সাঁইজি' এবং ২০১৭ সালে প্রকাশিত 'নতুন করে পাবো বলে' কাব্য দুটিতে মারুফের নবযাত্রা পাঠককে বোধ হয় চমকিত করে। তারই যেন প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১৮ সালে মারুফের বাংলা একাডেমি পুরস্কারলাভে।"

মারুফুল তার 'অপরাধ' কবিতায় নম্র কিন্তু আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে যখন বলে চলেন, 'বাঁশবনে আজও চাঁদ ওঠে/ বেতবনে ঘুঘু ডাকে/ মনমাঝি গান গায় মধুমতির নায়/ তবু এই সোনার বাংলায় আপনার মৃত্যুর চাইতে/ বড় কোনো গ্লানি/ বড় কোনো অপরাধ/ আমাদের সামূহিক জীবনের ইতিহাসে নাই।'- সত্যিই চমকে উঠতে হয়। বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে কিংবা তাঁর নির্মম হত্যা নিয়ে বাংলা সাহিত্যে লেখালেখি নেহাত কম নয়। কিন্তু, এমন কাব্যময় চিত্রকল্পে বেদনাবিধুর বিবৃতি ও দায়গ্রহণ কোথায় খুঁজে পাই? অথবা সাঁইজির কাছে জানতে চাওয়ার ছলে কবি সমাজকেই প্রশ্ন করেন- 'নীলকান্তমণি ঘষেছি/বৃন্ত ছেড়ে খসেছি/ সাষ্টাঙ্গে শুয়েছি/ আভূমি নুয়েছি/ সাঁইজি, তবু কেন সহজ মানুষ পেলাম না'- পাঠকের ভাবনার দুয়ারে আবারও টোকা পড়ে। তখন মনে হয় সৈয়দ মনজুরুল ইসলাম যথার্থই লিখেছেন, 'পাঠক মারুফুল ইসলামের কবিতা পড়বে সমৃদ্ধ হতে, কবিতার স্বাদ পেতে। আনন্দ পেতে, চিন্তার খোরাক পেতে।'

অন্যদিকে আহমদ রফিকের বিশ্নেষণে, মারুফুল ইসলাম আধুনিক সমাজ সচেতনতার কবি, জীবনের অলি গলিতে পথ চলার এক নাগরিক কবি। তার পর্যবেক্ষণে কবির 'আত্ম-অন্বেষা, জীবন অন্বেষার পাশাপাশি সমাজ অন্বেষাও লক্ষণীয়।' আবার কবির খেদের জায়গাটিও তুলে ধরে বলেছেন, একালের ঘর্মাক্ত জীবনে এতটুকু গাঢ় ছায়া নেই, শরীর জুড়ানোর ব্যবস্থা এ-সি-তো মনের জ্বালা কীভাবে জুড়োবে? আধনিক মন ও মননের সংবেদনশীলতায় তাই আর্তি অন্বিষ্টের। কিন্তু তা মেলে না বলেই কবির সখেদ উচ্চারণ :

ইচ্ছে করে বার বার ছুঁয়ে আসি সেই জল
সেই ঢেউ...

আবার হামিদ কায়সার দেখিয়েছেন, মারুফুল ইসলাম কীভাবে নিজের বৃত্ত নিজেই ভেঙেছেন। শব্দের মূর্ছনা বা স্নেহপ্রবণতার বদলে যেয়ে তার ছড়ায় কীভাবে চলে আসছে সমাজ, মানুষ, রাজনীতি। 'গুচুমনু গুটুমনু/ কইলজার টুকরা/ ছুনুমনু ছুটুমনু/ টুনটুনি ময়না'র ছড়াকারের কলমে কীভাবে চলে এলো 'আমার বাড়ি যাইয়ো ভ্রমর/ বসতে দেবো পিঁড়ি/ চড়তে দেবো গডফাদারের/ ঊর্ধ্বমুখী সিঁড়ি।'

কেউ আবার হাত দিয়েছেন মারুফুল ইসলামের লেখার কলকব্জায়- চিত্রকল্প, উপমা, উৎপ্রেক্ষা; মাত্রা, ছন্দ ইত্যাদি। ব্যক্তি মারুফুল তো রয়েছেনই। তাই, পাতাদের সংসারের মারুফুল ইসলাম সংখ্যাটিকে আয়নায় কবির প্রতিচ্ছবি বললে কিছুটা ভুলই হয় বোধ হয়। বরং তার চেয়ে ঠিক বলা হবে কবিকে তোলা হয়েছে অপারেশনের টেবিলে। সেখানে একেকজন চিকিৎসক বিশ্নেষণ করেছেন কবির মন-মনন, কলা-কৌশল এবং সন্তরণের বিস্তার।

কবির ফটোগ্রাফ অবলম্বনে পাতাদের সংসারের প্রচ্ছদ করেছেন সমর মজুমদার। ২৭২ পৃষ্ঠার সংখ্যাটির দাম ১০০ টাকা। পরিবেশক :পাঠক সমাবেশ, আজিজ মার্কেট, শাহবাগ, ঢাকা।