কফিনে চলো হরিণ শাবক

গল্প

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০১৯      

প্লাবন ইমদাদ

১.

শীত, ভীষণ শীত!

বড্ড কম্পন পেশিতে পেশিতে। কাঁপছে অস্থিমজ্জা। বাশুরী চুল কাঁপছে থরোথরো। এখন মৃত্যুর পরের সময়। কফিনের অপেক্ষায় হরিণ-শাবক। কফিনে বোধ হয় ভয় আছে; কালো ভয়। মৃত্যুর পরেও ভয়! মরণের থেকেও কঠিন তবে কফিনে ঢোকা! কখন আসবে উষ্ণ কফিন! কে জানে? সে জানে; ওই কফিনওলা। ল্যাম্পপোস্টের হ্যালোজেন কি কিছুটা উষ্ণতা দিচ্ছে? না, আলোর রেখাগুলো একেকটা বরফের তীরের মতো হাড়ে হাড়ে গিয়ে আঘাত করছে, বিক্ষত করছে অস্থিমজ্জা। কফিন। কফিন কই!

এ শহর সিংহে ভরা, ভরা মাংসাশী পশুতে। ওরা তাড়া করেছিল হরিণ শাবককে। তারপর বোধের টুঁটি চেপে ধরে ওকে খাবলে খেয়েছে। নিথর দেহ ফেলে রেখে গেছে হয়তো কোনো ডাহুক পাখির ঝাঁক এখানটায়। পায়রারা খবর দিয়েছে কফিনওলা ঋষিকে। ঋষি আসবেন; ওমে ভরা কফিন নিয়ে আসবেন। রাতে শাবক ফুরোতে দিতে চায় না ভোরের আলো ওকে জাতিস্বর করে তুলতে পারে বলে। সে সমাহিত হতে চায় আঁধার থাকতে থাকতেই। ঋষি কই? কতদূর? জোরে চিৎকার, ঋষি ই ই ই ই ই ...। কুয়াশা প্রাচীর ভেদ করে কোথায় যায় এ শব্দ? নাকি কেবল ঠোঁট নড়ে, কোনো শব্দ বেরোয় না। নাকি শব্দ হতে, কুয়াশা প্রাচীর হতে ঋষি বহু, বহুদূর!

মৃত, বিক্ষত হরিণ-শাবক কি করে কুয়াশা-দেয়ালে লাথি দেয়! আকাশে ফিকে চাঁদ ঢেলে দেয় আলোক বর্ষণ। সে বর্ষণ শাবক ছেলের চুল স্পর্শে আগেই প্যাঁচারা ছোঁ মেরে ছিনিয়ে নেয়। মৃতের আলোর প্রয়োজন কী? তেষ্টা নেই, আকুতি নেই, জরা, ক্ষরা কিছুই নেই। কেবল একটা সুনসান অপেক্ষা আছে। ঋষি আর ঋষির কফিনের অপেক্ষা।

সাদা কুয়াশা-দেয়ালে কে যেন ছবি আঁকে একমনে। ভিঞ্চি? মকবুল ফিদা? নাকি আমাদের জয়নুল? জ্যোৎস্নার রঙে শাবকের থেঁতলানো স্নায়ুর ছবি, আগের অথবা এই জন্মের এক গামলা স্মৃতির রঙ ঢেলে দিয়ে একটা মানচিত্র আঁকে। শাবক এগোতে চায়। অথচ মৃতেরা হাঁটতে পারে না। আঁকিয়ে চলে যায় সব রঙ গুটিয়ে শিশিরের সরণি ধরে। এই কি আঁকিয়ের বেশে কফিনওলা সেই ঋষি!

মাথার উপরে রেইনট্রির মগডাল থেকে দোতারার শব্দ আসে। কে বাজায়? নাকি বাজায় না? ঋষি কি তবে মগডালে বসা ইস্রাফিলের প্রতিনিধি? সুর কি ওর ধ্বংসাস্ত্র? বাউল বাজায়? ভাটিয়ালি? লালন? হাসন? কী বাজায়? এ বোধ হয় শাবকের শেষকৃত্যের বাদ্য!

পচে যাচ্ছে মাংস। করোটি থেকে চোখ বের হয়ে আসতে ধরেছে। দ্রুত কফিনে ঢোকা দরকার। না হলে ওদের নির্মল পৃথিবীর বায়ু দূষিত হয়ে যাবে শাবকের পচা মাংসের গন্ধে।

২.

সাদা কুয়াশা-প্রাচীর ফুটো হয়ে যায়। আলোর চৌকাঠ মাড়িয়ে কফিন আসে। ধবল কফিন। ওম আছে তো ওতে? নাকি ওখানেও কনকনে শীতলতা! এ কফিন চলমান। দুটো তাগড়া ঘোড়ার পিঠে সাদা কফিন। লাগাম টেনে কফিন থামান ঋষি। ডালা খুলে বেরিয়ে আসেন রক্তাভ বসনে। হরিণ শাবকের বাশুরী চুলে আঁচড় কাটে ঋষির মায়াবী আঙুল। শাবকের শীত উবে যায়। ঋষির দৃষ্টির নির্দেশে শূন্যে কফিনে শাবক। ভীষণ আঁধার। আঁধার মাংসের পচন-গন্ধ গিলে খায়। করোটিতে চোখ দেবে যায়। উষ্ণ কফিনে ঋষির কোলে শাবকের মাথা আর কোলজুড়ে মেলে দেওয়া বাশুরী চুল। টকটক ঘোড়া চলে কফিন নিয়ে। কোথায় চলে? সমাধিস্থল কতদূর? শাবক দ্রুত সমাহিত হতে চায় ঋষির হাতে। ঋষি নির্ভার, নির্বাক। রিশির রক্তচক্ষু হাঁ করে তাকিয়ে অন্ধকার শুষে নিচ্ছে। তিনি দ্বিধান্বিত। শুনেছেন এই হরিণ শাবকটি অক্ষরের সন্তান। ঋষির খাদ্যও অক্ষর। ভীষণ অক্ষরের তেষ্টা ঋষির। ঋষি কি তবে শাবকের অক্ষর-শরীর গিলে খাবে? নাকি সেই দূর গোরস্তানে দাফন করে ফিরে আসবেন অন্য কোনো শব্দ-সন্তানের অক্ষর গিলতে! শাবক কিছু জানে না। সে মৃত, শেষকৃত্য প্রত্যাশী। শুনেছে ঋষির ভোগ হলে শাবকের স্বর্গপ্রাপ্তি সুনিশ্চিত। শাবক স্বর্গে যেতে চায় এই নারকীয় অসুখের আরোগ্য পেতে। কিন্তু ঋষিই কেবল জানেন এ মৃতের বিষয়ে সিদ্ধান্ত!

৩.

হু হু বাতাস কেটে কফিনের রথ চলে কুয়াশা ফুঁড়ে। শাবক ঋষিকে বলতে চায় সে যেন ওকে গিলে খেয়ে স্বর্গে পাঠান। কিন্তু ঠোঁট তো নড়ে না, কণ্ঠ তো বাজে না। মৃতের কোনো বুলি নেই। অব্যক্ততার যন্ত্রণায় আবারও শাবকের মাংস পচে পচে খুলে যেতে ধরে। ঋষি খসে পড়া মাংস লাল পাঞ্জাবির পকেটে রাখতে থাকে আপাতত। সিদ্ধান্ত যে হয়নি এখনও। ঋষিকে আরেক লোভে পেয়ে বসে। মৃত অথচ সমাহিত নয় এমন করে শাবক রয়ে যাক। তাতে এ অক্ষরপুত্র শব্দে শব্দে ভরিয়ে দেবে ঋষির অগাধ সাম্রাজ্য, ধ্যানের পর্বত। তাহলে তো রাতের দেবতাকে বলতে হবে রাতটাকে অনন্তকালের জন্য ধরে রাখতে। রাত পোহালেই যে জেগে উঠবে শাবক! শাবকের ভেতরটায় মোচড়ায় শেষকৃত্যের জন্য। অথচ ঋষি কফিনের রথে বসে বসে কী সব দ্বিধায় ভোগেন। খবর নিয়ে জানা গেল রাতের দেবতা বিশ্রামে মেঘের দেশে। ফিরতে ফিরতে কাল দুপুর। এখন সে আর ঋষিকে সাক্ষাৎ দিবেন না। ঋষি তাড়া দেয় ঘোড়াকে। ঘোড়া ছুটে প্রবল বেগে। অনেক দূরের পাহাড়ে যেতে হবে। পাহাড়দেব নাকি অরণ্যে রাত ঝুলিয়ে রাখতে পারে অনন্তকাল ধরে। ঘোড়া হাঁপায়। তেষ্টায় কাতর ওরা। একটা মোহন দিঘি খুঁজে খুঁজে ওতে জল পান করে আবার ছুটে। ওই তো দূরে দেখা যায় কালো পর্বত। অরণ্যদেবের দরবারে পৌঁছালে জানা যায় দেবতা ধ্যানমগ্ন; ডাক দেয়া অসম্ভব। কফিনের রথ ছুটে। ঘোড়ার পিঠে লাশ-শাবকের বাশুরী চুল থরোথরো কাঁপে। চৈতন্যহীন মৃত শাবককে দেখে ঋষির মায়া হয়। এ রাতকে অনন্ত করতেই হবে আজ। এই শব্দ-পুত্রকে জাতিস্বর হতে দেয়া যাবে না। শাবকের এ জন্মের সকল অক্ষর ঋষির চায়।

৪.

ঘোড়াকে পথ নির্দেশ করে ঋষি এবার ত্রিশ পর্বত পার হয়ে নিজের ধ্যানালয়ের দিকে। সেখানে পরাণ-পাতার গাছ রয়েছে অথবা মরে গেছে। যদি থাকে তবে পরাণ-পাতা ছুঁয়ে দিলে শাবক ঋষির বশে অসাড় হয়ে কেবল দিনরাত অক্ষরে অক্ষরে পঙ্‌ক্তির ঝর্ণা গড়ে দেবে। সে ঝর্ণায় আঁজলা ভরে ঋষি পঙ্‌ক্তি পান করবে শাবকের। ত্রিশ পর্বত দূরের পথ। সময়কে আটকানো যাচ্ছে না। ঘোড়াকে তাড়া দেয় ঋষি। কফিনের রথ চলে পর্বতের পর পর্বত পেরিয়ে। কোত্থেকে যেন একটা লু হাওয়া আসে ভাঁটফুলের ঘ্রাণ নিয়ে। রিশির আলসেমি ধরে। তন্দ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েন।

৫.

আর দুটি পর্বত পেরোলেই পরান-পাতার গাছ। ঘোড়া হাঁপায়, থামে না। ঋষির কোলে নিথর শাবক। ঋষি কফিনের দেয়ালে ঠেস দিয়ে তন্দ্রামগ্ন। কফিনের রথ পৌঁছে পরান-পাতা গাছের তলায়। ঘোড়ার পা থেমে যায়। ঋষি চোখ মেলে ডালা খুলে। কাঙ্ক্ষিত পথ ফুরোলো তবে। এবার সে অক্ষর শাবকের অফুরান পঙ্‌ক্তির ঝর্ণায় তেষ্টা মেটাবে পরান-পাতা ছুঁয়ে।

কিন্তু হায়, ডালা খুলতেই কফিনে ঢুকে পড়ে ভোরের আলো। ওরা জানে না যে রাত ফুরিয়ে গেছে। আলোর পরশে শাবকের কাঙ্ক্ষিত মৃত্যু তাকে প্রত্যাখ্যান করে। সে জেগে ওঠে ঘুম চোখ নিয়ে। শাবক কফিন থেকে বেরিয়ে দিগন্তের দিকে ছোটে। দিগন্তের দিকে ঋষি তখন নির্বাক তাকিয়ে।