ও দেশেও কি শ্রাবণ মাস আসে?

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ২৬ জুলাই ২০১৯      

সেলিম আহ্‌মেদ

সকাল থেকে একটা লয়ে বৃষ্টি জানিয়ে দিচ্ছে, এ শ্রাবণ মাসের দিন। শ্রাবণ মানে কি নিছক অঝোর ধারা? নাকি অন্য কোনো গুরুত্ব আছে এই মাসের? পুরাণ ইত্যাদি থেকে বয়ে আসা ঐতিহ্যের এক বিপুল অংশ পৃক্ত হয়ে রয়েছে শ্রাবণ মাসের সঙ্গে। হিন্দু পরম্পরায় শ্রাবণ এক পবিত্র মাস। এই মাসে কিছু আচার পালন করলে নাকি যাবতীয় মনস্কামনা পূর্ণ হয়- এমন ধারণা কালনিরবধি মনের মধ্যে বহন করে আসছেন হাজার হাজার মানুষ। আজ আমার ছুটি, গত কয়েকদিনের টানা কাজের পর শরীর আর চলছে না। অফ ডে। সোফায় শুয়ে আছি আর গানের যন্ত্রটায় বাজছে-

কুছ তো লোগ কহেঙ্গে

লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা

ছোড় বেকার কি বাতো ম্যায় কহি

বিত নে জায়ে র‌্যায়না...

রাজেশ খান্না আর শর্মিলা ঠাকুরের সিনেমার গান। রাজেশ খান্না ভারতে সিনেমায় প্রথম সুপার স্টার, ১৯৬৯ সাল থেকে ১৯৭১ সাল পর্যন্ত একটানা ১৫টি হিট সিনেমায় তিনি নায়ক- সে রেকর্ড বুঝি আজও কেউ টপকাতে পারে নাই। এ গান রাজেশ খান্না-শর্মিলা ঠাকুরের অমর প্রেম-এর মতো ব্লকবাস্টার সিনেমার। কলকাতায় অমর প্রেম ছবির শুটিংয়ের সময় তাঁর ভক্তদের ভিড়ে হাওড়া ব্রিজে শুটিংই করতে পারেননি পরিচালক। শেষ পর্যন্ত তাঁর জন্য নকল হাওড়া ব্রিজ তৈরি করতে বাধ্য হন প্রযোজক।

হঠাৎ কলিং বেল বাজে। দরজা খুলতেই দেখি আমার ছেলেবেলার বন্ধু রাশেদ, আধাভেজা বড় বড় দুটো ব্যাগসহ দাঁড়িয়ে। রাশেদ ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলতে থাকে- 'তিন বছর কুমিল্লা আর তিন বছর আট মাস চিটাগাং থেকে এবার নর্থবেঙ্গল ট্রান্সফার, একদম রংপুর জাহাজ কোম্পানি মোড়ের ব্রাঞ্চ।' বাথরুম থেকে তোয়ালে নিয়ে মাথায় ঘষতে ঘষতে সোফায় ধপাস বসে বলে- 'কি রে, মন খারাপ?' আমি বললাম, কেন? রাশেদ বলতে শুরু করে- 'বাইরে শ্রাবণের একটানা বৃষ্টি, তুই তো বলিস, বৃষ্টির দিন একা থাকলেই স্মৃতিরা এসে ভিড় করে, বড্ড জ্বালায়।'

-একদম রংপুর ব্রাঞ্চে ট্রান্সফার?

-বন্ধু, বৃহস্পতিবার সন্ধ্যায় বাসে করে দিনাজপুর তারপর শুক্রবার শনিবার বন্ধ, আমাকে ঠেকায় কে?

-রবিবার ভোরে আবার বাসে করে ফিরে অফিস, তাই না?

-হুম্‌ম্‌ম্‌। এইবার বল মন খারাপ কেন?

-কোথায় খারাপ?

-এই যে তুই একা, বাইরে বৃষ্টি আর তোর ঘরে গান চলছে কুছ তো লোগ কহেঙ্গে...লোগো কা কাম হ্যায় কহেনা...আচ্ছা তুই বিয়ে করবি না?



আমাদের কথার মাঝে মরহুম এসে দাঁড়ায়, তারপর বলতে শুরু করে- 'স্যার, টেবিলে খাবার দিছি, মুগের ডাইল দিয়া খিচুড়ি আর গরুর গোশতের কালা ভুনা; তাই একটু দেরি হইলো।' রাশেদ এই একটা ব্যপারে ভীষণ রিঅ্যাক্ট করে- 'মরহুম কি কারো নাম হয়? বাদল, তুই খুব ঝামেলা করিস।'

আমরা দু'জন টেবিলে বসতে বসতে কথা বলি, আমি বলতে থাকি- 'ও যখন এ বাসায় আসে, মাত্র চব্বিশ ঘণ্টায় পুরো বাসা আর আমার সবকিছুর দায়িত্ব কাঁধে নিয়ে নেয়। কিন্তু ওর নাম আমার দাদার নামে। আমি তো দাদার নামে ওকে ডাকতে পারি না, তাই পুরো নাম ঢেকে সেদিন থেকে শুধু মরহুম।'

খাবার টেবিলক্লথের উপর মরহুম একটা নতুন রানার দিয়েছে, দস্তরখানাটা মাদুরের মতো। মাদুরের একটা চমৎকার গন্ধ আছে, বৃষ্টির দিনে তা বাড়ে। রাতে বাহাদুর বাজারে রাশেদের দোকানে ঢুকতেই এই গন্ধটা নাকে এসে লেগে থেকে যেতো। চিকন করে খুব ঠাস বুনোটে বাঁধা মাদুর। এসব মাদুর শরীয়তপুর, বরিশাল থেকে আসতো। দিনাজপুরে একদল ফেরিওয়ালা গরমকালে এসব মাদুর বিক্রি করতে আসতো। তারপর আষাঢ়-শ্রাবণের আগে আর একদল ফেরিওয়ালা ফরিদপুর থেকে আসতো ছাতা ঠিক করতে। দিনাজপুর রেল স্টেশনের ধারে সস্তা হোটেলে খেয়ে-থেকে এরা টাকা জমিয়ে শ্রাবণ মাসের শেষে বাড়ি ফিরে যেতো। এখন কি এমন দল বেঁধে ফেরিওয়ালারা আসে? তখন ওরা সারাদিনের ক্লান্তি শেষে বিনোদনের জন্য চলে যেতো লিলি অথবা বোস্তান সিনেমা হলে রাতে সেকেন্ড শো সিনেমা দেখতে। তারপর শো শেষ হলে সব হল্লা করে বাহাদুর বাজারের রাস্তায় ফিরে যেতো থাকার হোটেলে। আমি আর রাশেদ হয়তো তখন রাস্তায় দাঁড়িয়ে স্টার সিগারেট ফুঁকছি, রাশেদ দৌড়ে এদের একজনকে দাঁড় করিয়ে খুব আগ্রহ নিয়ে দেখে আসা সিনেমার গল্প শুনতে চাইতো। সেই লোক ভীষণ সরল মনে কাহিনী বলতে শুরু করলেই রাশেদ প্রশ্নবাণে তাকে জর্জরিত করার খেলায় মেতে উঠতো, গল্প বলা লোকটা খেই হারিয়ে ফেলতো। রাশেদ এবার আর একজনকে দাঁড় করিয়ে সেই নির্মম খেলাটা শুরু করতো। আমি ওর দোকানের সিঁড়িতে বসে প্রতিবার রাশেদের একই রকম আগ্রহ আর গল্প শোনার ইচ্ছাকে দেখতাম। মানুষকে বিরক্ত করতে রাশেদের এক অদ্ভুত প্রাণশক্তি আছে।

খিচুড়ি মুখে দিয়েই রাশেদ জিজ্ঞাসা করে- 'অনুর কোনো খবর পেয়েছিস?'

ভার্সিটিতে আমাদের ক্লাসে অনু নামে একটা মেয়ে ছিল। স্টুডেন্ট খুব ভাল ছিল না, উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ কিন্তু ওর আচরণ আর কথা বলা ভীষণ মোহনীয় ছিল। অনুকে অনেকেই পছন্দ করতো, তাদের ভেতর আমিও একজন। ছুটিতে যখন ট্রেনে করে কমলাপুর থেকে দিনাজপুর যেতাম, সে এক দীর্ঘ পথ, তখন আমার একটা খেলা ছিল। ট্রেনের জানালায় মাথা রেখে ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমার আর অনুর একটা প্রেমের দৃশ্যকল্প রচনা করা। প্রচণ্ড ভিড়, সব ঈদের ছুটিতে বাড়ির যাত্রী, দম নেয়া কষ্টকর। এমন একটা গুমোট পরিবেশে খুব কষ্ট করে সব ভুলে কল্পনার পরিবেশ তৈরি করতাম। এভাবে কমলাপুর রেল স্টেশন থেকে বাহাদুরাবাদ ঘাট পর্যন্ত একটা গল্প দাঁড়াতো। তারপর যমুনার ওপারে ফুলছড়ি ঘাট থেকে ট্রেন চলতে শুরু হতো আর বানানো দৃশ্যকল্পের সময় নিয়ে বাস্তবসম্মত একটা এডিট করতাম। সঙ্গে জুড়ে দিতাম সংলাপ। আমি জানতাম, আমার প্রিয় বন্ধু রাশেদ দেখা হলে প্রথমেই জানতে চাইবে- অনুর খবর কী? তখন বেশ সময় নিয়ে গল্পটা বলবো। এই প্র্যাকটিসে লাভ হতো অনেক, এতোদূর জার্নির ধকলটা নস্যি মনে হতো, আর রাশেদের দোকানে এক রাত আড্ডায় রসিয়ে এই গল্পটা বলা হতো। গল্প কেউ যদি মনে রাখে, সে দায় নিশ্চয় আমার না। আর রাশেদ নিশ্চয় বিশ্বাস করে, আমাকে দিয়ে প্রেম হবে না; আর লটারিতে প্রেম জিতে নেওয়ার কোনো নিয়ম নেই। রাশেদ সাংঘাতিক একজন বাস্তববাদী ছেলে, স্কুলজীবনে হঠাৎ ওর বাবার মৃত্যু। মফস্বলের ডাক্তাররা বুঝতেই পারে নাই; পরে আমরা জেনেছিলাম, করোনারি থ্রম্বোসিস। রাশেদের সে বয়সে ছোট ভাই-বোন আর মাকে নিয়ে যুদ্ধ শুরু, সেই বাহাদুরবাজারে সুতার দোকান। রসুনের আচার নিতে নিতে রাশেদ আবার জিজ্ঞাসা করলো- 'আচ্ছা, অনু নামে কেউ কি ছিল? না পুরোটাই তোর বানানো গল্প?'

এখন থেকে ঠিক দু'মাস আগে, দিনক্ষণ মেলালে একদম বাষট্টি দিন। দিল্লির কনাট প্যালেস হয়ে জনপথের দিকে হাঁটছি, নিউ দিল্লির এ জায়গাটা আমার হাঁটতে ভাল লাগে; জনপথ। এ পথের দু'ধারে হ্যান্ডমেড প্রোডাক্টের স্বর্গ, চমৎকার গিফট্‌ আইটেম, স্যুভেনির বিক্রি হয়। বেশিরভাগই বিভিন্ন রাজ্য থেকে আনা। হঠাৎ একটা লেডিজ শোল্ডার ব্যাগ দেখে থমকে দাঁড়ালাম। কাফ লেদারের তৈরি, সঙ্গে স্টোনের বিডস লাগানো, চমৎকার একটা চকচকে সবুজ রঙের গ্লাস ফিনিশ আর উপরে সাদা-সবুজে মেশানো অনিক্স বিডস, দারুণ কম্বিনেশন। বাইরে এসে দোকানটার নাম দেখে মনে রাখার চেষ্টা করলাম। দিল্লির রঙ বানানো কোম্পানিগুলো পলিমার রেজিন দিয়ে কাজ করে না। আমার ভুল হয়েছে, ফিলিপাইন চলে যাওয়া ঠিক হতো। আজ চলে যাওয়ার টিকিটটা কনফার্ম করতে পারলে ভাল, এয়ার ইন্ডিয়ার কি সব স্ট্রাইকে সব সিডিউল পাল্টে গেছে? আমি হাঁটছি এয়ারলাইন্সের কাউন্টারের দিকে, অন্য কোনো এয়ারলাইন্সে টিকিটটা এনডোর্স করা যাবে মনে হয়। কাউন্টারে এক বয়স্ক ভদ্রলোক আগামীকাল হোটেলে ফোন করে কনফার্ম করবেন বললেন। এমন সময় এক নারীকণ্ঠ আমার পাশে দাঁড়িয়ে পরিস্কার বাংলায় বলে উঠলো- 'তুমি কবে যেতে চাও? তোমার রিটার্ন টিকিট আমি বিমানে এনডোর্স করে দিচ্ছি।'

তাকিয়ে দেখি, অনু দাঁড়িয়ে আছে, মুখে একটা মিষ্টি হাসি। পরেছে লাইট গ্রিন একটা শাড়ি, জমিনে আরো লাইট গ্রিন আর হলুদে ছাপা ফুল-লতা-পাতা। শাড়ি থেকে একটা রঙ নিয়ে সেই গ্রিন শেডের ব্লাউজ, জুতো একদম গ্রিন। দীঘল চুল খোলা, কানে এক রত্তি গ্রিন কালারের পাথরের ফুল। অনু বললো- 'আমার তোমাকে চিনতে একটুও কষ্ট হয় নাই, তুমি চিনেছো তো?' আমি দাঁড়ালাম, ফিসফিস করে বললাম- 'অনু, তুমি এখানে?'

-দিল্লিতে প্রায় দু'বছর। আসো।

অনুকে অনুসরণ করে একটা কাচঘেরা রুমে ঢুকলাম। অনু আমাকে বসতে বলে ইন্টারকমে কফি-বিস্কুট দিতে বললো। তারপর বলতে শুরু করলো- 'বউ-বাচ্চাসহ নিশ্চয়? ওরা কোথায়? হোটেলে?' আমি মাথা নেড়ে বললাম- 'বিয়ে আমার হয় নাই, কুমার সভার সদস্য।' এর মাঝে ট্রে নিয়ে একজন এসে কফি আর বিস্কুট রেখে গেল। অনু ইশারায় আমাকে কফি নিতে বললো। এইবার মুখ খুললো- 'আমি তো ভেবেছিলাম, আমারই শুধু বিয়ে হলো না! এখন দেখছি, সংখ্যাটা ঠিক না।'

-তুমি বিয়ে করনি?

-নাহ, হয় নাই আর কি।

-আহা, সোজা করে বলো তো।

-থার্ড ইয়ারের শেষের দিকে বাসায় একটা ছেলেকে পছন্দ করলো, মানে সেটেল ম্যারেজের জন্য। ঠিক সে সময় আইআরএর রকিব ভাইয়ের সাথে আমি একটু মিশতে শুরু করেছি, ঠিক প্রেম না। হাকিম ভাইয়ের ওইখানে চা খেয়ে লাইব্রেরির সামনে বসে কথা বলা, খুব বেশি হলে টিএসসি। রকিব ভাই সব শুনে আমাদের বাসায় কথা বলতে গেলেন। কিন্তু আমার বাবা-মা কোনো ছাত্রের সাথে বিয়ে দেবেন না, তা স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন। আমি গৃহবন্দি হয়ে গেলাম। ছয় মাস পর পরীক্ষা দেয়ার জন্য পাহারায় ভার্সিটি যেতাম, তোমরা বুঝতে পারো নাই।

-পরীক্ষার পর বিয়ে হলো বুঝি?

-না না। এ সময়ে রকিব ভাই রাশান একটা স্কলারশিপ নিয়ে লুমুম্বা ভার্সিটিতে চলে গেল, আর আমার হবু বর ময়মনসিংহ শহরে খোলা রেলগেটে ট্রেন আর বাসের সংঘর্ষে সঙ্গে সঙ্গে ওপারে চলে গেল। এদিকে আমাদের রেজাল্ট হয়ে গেলে আমি এমিরেটস-এর চাকরি নিয়ে দুবাই চলে গেলাম। এয়ারহোস্টেস ছিলাম না; অফিসেই। আমি এয়ার ট্রাফিকটা ভাল বুঝি। এই আমার বিয়ে না হওয়ার গল্প। বাসার সাথে আমার যোগাযোগ খুব কম, অভিমানটা আজো কমাতে পারি নাই।

অনু ল্যাপটপে মনোযোগী হয়ে বললো- 'স্ট্রাইক আজও চলছে, কাল রাতে অন্য এয়ারলাইন্সে এনডোর্স করে দিতে পারি। দিলাম। এয়ারপোর্টে শুধু পিএনআর হলে ঝামেলা হতে পারে; কাল দুপুরে প্রিন্টআউট নিয়ে যেও।' একটানা কথা বলায় আমি কিছুই বলি নাই, শুধু মুগ্ধ হয়ে কত বছর পর অনুকে দেখছি। এইবার চোখ তুলে তাকিয়ে বললো- 'তুমি উঠেছো কোথায়?' আমি বললাম, সাউথ এক্সে একটা গেস্ট হাউসে। অনু আবার বলতে শুরু করে- 'জিকেতে আমাদের অফিসের দুটো ফ্ল্যাট আছে, আমরা শেয়ার করে থাকি। রান্নাটা ওখানেই হয়, তাই শান্তি। রেস্টুরেন্টের ভরসা করি না। তুমি এখন কোথায় যাবে?' আমি বললাম- 'আমার কোনো কাজ হয় নাই, তা দিল্লিতে হবেও না। একদম ছুটি, তুমি কাল টিকিট রিকনফার্ম করলে দেশে ফিরে যাবো।' হাসতে হাসতে অনু বলে- 'আমার তো অফিস শেষ, ছুটি হয়েছে। চলো, এখন তুমি দিল্লিতে আমার গেস্ট।'

ট্যাক্সিতে কোনো কথাই হলো না, আমাদের ট্যাক্সি এসে থামলো বড় একটা গেটের কাছে। ক্রাফট্‌স ভিলেজ। ট্যাক্সি ভাড়া দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে অনু বলতে শুরু করে- 'জাদুঘরে যা দেখা যায় না, তুমি এখানে তা দেখতে পারবে, আর্টিজান অ্যাট ওয়ার্ক।'

মাটির দেয়াল, বড় বারান্দায় ব্যাক স্ট্র্যাপ। তাতে দারুণ কাপড় বুনছে; মৃৎশিল্পের কারিগররা তৈরি করছে বিশাল সাইজের ঘোড়া। লাইফ সাইজের চেয়েও বড়। এগুলো বানানোর পদ্ধতিটাও চমৎকার। হুইলে বড় বড় মটকার মতো তৈরি হচ্ছে, তারপর জোড়া লাগিয়ে একটা ঘোড়া। আর একটা দল অর্নামেন্টাল কাজগুলো করছে। চোখ কান লেজ সব তৈরি হচ্ছে। অনু হঠাৎ আমাকে টানতে টানতে নিয়ে বলছে- 'এদিকটায় আসো। এরা আমার সবচেয়ে প্রিয়। দেখো এরা যে লাল-কালো রঙ দিয়ে ছবি আঁকছে এ মধুবনী। এটাকে মিথিলা আর্ট বলতে পারো। হিন্দু এপিকটা এমন যে, সীতার বাবা শিল্পীদের বলেছিল, সীতার বিয়ের সাজসজ্জা হবে মধুবনী পেইন্টিং দিয়ে। আচ্ছা বাদল, এর পর তুমি কবে আসবে?' আমি অজান্তে বিনা কারণে বলে ফেললাম- 'জুলাই মাসের শেষের দিকে।' অনু আমার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে মাথা নামিয়ে শক্ত করে জাপ্টে ধরে বললো- 'তুমি কোলকাতায় আসবে, আমি ছুটি নিয়ে চলে যাবো কোলকাতা। তারপর তুমি আর আমি চলে যাবো বিহারের মধুবনী জেলায়। তোমার সাথে থাকার শুরুটা সেই মধুবনীতে করতে চাই। যাবে তো?'

আমি আলতো করে অনুর পিঠে ঘন চুলে হাত বুলিয়ে দিতেই বুঝলাম, ও আমার বুকে কাঁদছে আর আমি শব্দের সবচেয়ে ক্ষীণধারায় ফিসফিসিয়ে বললাম- 'যাবো তো।'

আমার আর রাশেদের মরহুমের রান্না করা খিচুড়ি আর গরুর গোশতের কালা ভুনা খাওয়া হয়ে গেছে। ডাইনিং টেবিল থেকে দু'জনে উঠে এসে সোফায় বসেছি। খুব যত্ন করে একটা সিগারেট ধরাতেই রাশেদ আবার কথা বলতে শুরু করে- 'ঢাকা থেকে তুই দিনাজপুর গেলেই দু/এক রাত আমার সাথে দোকানে কাটাবি, রুটিনের মতো। তোর মনে আছে, রাতের গল্প মানেই সেই অনুর গল্প। মধ্যরাতে আমরা নিউ হোটেলের গরম ভাত খেয়ে যখন দোকানে ফিরে আসতাম, প্রায় রাতে জনমানবশূন্য বাহাদুরবাজার মোড়ের ট্রাফিক আইল্যান্ডে দাঁড়িয়ে তুই চিৎকার করে বহুবার বলেছিস, আমি অনুকে চিনি না। বাদল, অনু কি ছিল? না পুরোটাই বানানো?'

বৃষ্টি আরো বেড়ে গেছে, আমার নয়তলায় ফ্ল্যাটের বিশাল থাই অ্যালুমিনিয়াম আর কাচের জানালা দিয়ে অনেক দূর দেখা যায়, ক্রমেই দৃষ্টি ঝাপসা হয়ে আসছে, কাচে বৃষ্টির আছড়ে পড়াটায় বেশ জোর আছে। বৃষ্টির শব্দ কিন্তু বেশ বৈতালিক। দিল্লি থেকে ফোন আসে। অনু বলতে থাকে- '২৮ শে জুলাই রোববার তোমার টিকিট কনফার্ম করেছি, ঢাকা-ক্যালকাটা। ভোর ৫টা ২০-এ তোমার রিপোর্টিং, আমি ক্যালকাটা পৌঁছে যাবো। এক সাথে ব্রেকফাস্ট। তোমার দেয়া কাফ লেদারের ব্যাগটা আজ নিয়ে বেরিয়েছি, অফিসের সবাই ভীষণ পছন্দ করছে। আমারও দারুণ ভাল লেগেছে, তুমি কিছু বলছো না কেন?' আমি সোফা থেকে উঠে রাশেদের সাথে দূরত্ব বাড়াই, জানালার কাছে গিয়ে বলি- 'আমি তো শুনছি, আচ্ছা, দিল্লিতে কি অঝোর ধারায় বৃষ্টি হয়? অনু, ওখানে কি শ্রাবণ মাস আসে?'