ইতিহাসের আপাত দায়মোচন

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯      

আসজাদুল কিবরিয়া

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস ২২ বছর পর 'হুবহু' পুনর্মুদ্রিত হলো। নারায়ণগঞ্জের অর্ধশতবর্ষী বেসরকারি গণগ্রন্থাগার সুধীজন পাঠাগার জেলা প্রশাসনের সহায়তায় ১৯৮৫ সালে প্রথম এই বইটি প্রকাশ করেছিল। দুরূহ কাজটি কিছু গ্রন্থপ্রেমী ও সমাজ সচেতন মানুষের প্রচেষ্টায় সম্পন্ন হয়েছিল।

যদিও সুধীজন পাঠাগারের মাধ্যমে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস রচনার মূল পরিকল্পনাটি এসেছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাস বিভাগের অধ্যাপক মমতাজুর রহমান তরফদারের কাছ থেকে। সেটা পাকিস্তান আমলের কথা। সুধীজন পাঠাগার তখন নারায়ণগঞ্জের আমলাপাড়ায় সবে যাত্রা শুরু করেছে। অধ্যাপক তরফদার পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা কর্মাধ্যক্ষ ও বাংলা একাডেমির তৎকালীন প্রকাশনা কর্মকর্তা ফজলে রাব্বিকে এই বলে পরামর্শ দিয়েছিলেন যে, নারায়ণগঞ্জ মহকুমার সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ের সহায়তায় সেখানে রক্ষিত পুরনো দলিলাদি পরীক্ষা-নিরীক্ষা করলে ইতিহাসের মাল-মশলা পাওয়া যাবে। পাঠাগারকর্মীদের পক্ষে সেদিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়নি। তবে অধ্যাপক তরফদারেরই এক ছাত্র ও পাঠাগারের কর্মী হোসেন জামাল স্বাধীনতার পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্রন্থাগার ব্যবহার করে নারায়ণগঞ্জের আদিপর্ব রচনার কাজ শুরু করেছিলেন। অকাল প্রয়াণের জন্য তিনি তা শেষ করতে পারেননি। বইটির শুরুতেই তার অসম্পন্ন লেখাটি স্থান পেয়েছে। অবশ্য মুক্তিযুদ্ধের আগে দেওয়ান সিরাজুল হক নারায়ণগঞ্জের আদিপর্ব নিয়ে আরেকটি বিস্তারিত লেখা তৈরি করেছিলেন, যা পাঠাগারের সাময়িকী সুধীতে প্রকাশিত হয়েছিল। বলা যায়, সেটিই ছিল নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস রচনার প্রাথমিক সূত্রপাত।

১৯৭৪ সালে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাসের একটি পাণ্ডুলিপি প্রস্তুত করা হয়েছিল। পরবর্তীকালে তা যথেষ্ট পরিমার্জন ও সংযোজন-বিয়োজন করে '৮০-র দশকের মাঝামাঝিতে বর্তমান গ্রন্থের রূপ ধারণ করে। প্রথমে নারায়ণগঞ্জ পৌরসভা, পরে জেলা প্রশাসন সহযোগিতা দিতে এগিয়ে আসে। এ কাজে ইতিহাসবিদ বা বিশেষজ্ঞের তেমন কোনো অংশগ্রহণ ছিল না। স্বাভাবিকভাবেই নানা সীমাবদ্ধতা ও ত্রুটি-বিচ্যুতি মেনে নিয়ে বইটি আলোর মুখ দেখেছিল। আর তাই প্রকাশের পর এর লেখক-সম্পাদক-প্রকাশকরা নানামুখী যৌক্তিক-অযৌক্তিক সমালোচনায় বিদ্ধ হয়েছিলেন, নিন্দাবাদ সয়েছিলেন। কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে প্রায় দুই যুগ আগে কাজটি ছিল অনন্য। এর লেখক-সম্পাদক-প্রকাশকরা চেয়েছিলেন পাটের শহর ও প্রাচ্যের ডান্ডি নারায়ণগঞ্জের আর্থ-সামাজিক-রাজনৈতিক-সাংস্কৃতিক বিকাশের একটি গোছানো বিবরণী গ্রন্থনা করতে। স্বেচ্ছাশ্রমের ভিত্তিতে করা এ কাজে তারা সফল হয়েছিলেন। কেননা, নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস সম্পর্কে জানতে-বুঝতে এখন পর্যন্ত এই বইটি বিকল্পহীন। যেহেতু বইটি আর পাওয়া যাচ্ছিল না, সেহেতু এর আরেকটি সংস্করণ অপরিহার্য হয়ে পড়ে।

সুধীজন পাঠাগার বইটির সংশোধিত সংস্করণ প্রকাশের বিষয়ে বিগত বছরগুলোয় কিছু উদ্যোগও নিয়েছিল। বিশেষত প্রয়াত খ্যাতনামা ইতিহাসবিদ প্রফেসর এ এফ সালাহ্‌উদ্দিন আহমদ বইটি পর্যালোচনা করে কিছু দিকনির্দেশনা দিয়েছিলেন। এ ছাড়া পাঠাগার কর্তৃপক্ষের আহ্বানে সাড়া দিয়ে নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ বিভিন্ন ধরনের তথ্য-উপাত্ত ও দলিলাদি প্রদান করেছিল। প্রথম প্রকাশের পর পত্র-পত্রিকায় ও মুক্ত আলোচনায় পরবর্তী সংস্করণে করণীয় সম্পর্কে পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। এসব কিছুর আলোকে একটি পুনর্বিন্যাসিত-সংশোধিত সংস্করণ ছিল প্রত্যাশিত। বইটি হুবহু পুনর্মুদ্রণের মধ্য দিয়ে আপাত দায়মোচনের প্রয়াসই পরিলক্ষিত হলো। ইতিহাসের গবেষক বা গবেষক দল নিয়োগ করে নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস গ্রন্থের একটি সংশোধিত ও ঋদ্ধ সংস্করণ প্রকাশের পথে আগামী দিনে সুধীজন পাঠাগার হাঁটবে, এটা এখন আশা করা যায়।

নারায়ণগঞ্জের ইতিহাস



প্রকাশক

জেলা প্রশাসন, নারায়ণগঞ্জ ও সুধীজন পাঠাগার

প্রচ্ছদ

আমিনুর রহমান মাসুদ

মূল্য

৩০০ টাকা