অনুপম জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টি

প্রকাশ: ০৫ জুলাই ২০১৯      

গোলাম কিবরিয়া

হাসান আজিজুল হক, বাংলা সাহিত্যের এক প্রধান পুরুষ। তার সৃষ্টিশীল রচনার পাশাপাশি অনুপম জীবনবোধ ও অন্তর্দৃষ্টির ছাপ পাওয়া যায় তার রচিত প্রবন্ধে, যা আমরা দেখি তার রচিত গ্রন্থ 'কথাসাহিত্যের কথকতা' বইয়ে। এই গ্রন্থে যেখানে কোনো পেশাদার সাহিত্য সমালোচকের অভ্যস্ত দৃষ্টি নয়, কথাসাহিত্যিকের সৃজন প্রতিভায় উদ্ভাসিত হয়েছে সাহিত্যের অন্তর্মহল। 'কথাসাহিত্যের কথকতা' প্রকাশিত হয়েছিল অনেক আগেই। বইটিতে বিভিন্ন সময় নতুন নতুন প্রবন্ধ যুক্ত হয়েছিল। বিভিন্ন সময়ের কথাসাহিত্যের বিভিন্ন দিক পর্যালোচনা করেছেন লেখক। প্রবন্ধগুলো বইয়ে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার আগেই নানা পত্রপত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে।

সময়, কাল-পাত্র ভেদে লেখাগুলোর এখনকার দৃষ্টি সম্পূর্ণ নাও হতে পারে। আর তাই প্রবন্ধগুলোর শেষে দেওয়া সালগুলো পাঠক যেন দেখে নেন তা-ই লেখক পাঠকের প্রতি অনুরোধ রেখেছেন।। বইটিতে ১২টি প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে। একেকটি প্রবন্ধ পাঠককে কথাসাহিত্যের ইতিহাসের একেকটি দিগন্তে নিয়ে যাবে। যেমন পাঠক বইয়ের প্রথমেই পাবেন লেখকের ১৯৭৪ সালে লেখা দুই যুগের দেশ মানুষের কথা প্রবন্ধটি। যেখানে রবীন্দ্রনাথ থেকে শুরু করে শরৎচন্দ্র, বিভূতিভূষণ ও মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের উপন্যাস রচনাশৈলী নিয়ে তার ভাবনা উল্লেখ করেছেন। সেখানে শওকত ওসমানের লেখার আলোচনাও ছিল। তিনি বলতে চেয়েছেন, আমি এদের সকলের পুরনো রচনা পড়তে পড়তে ভাবি সেই চারের দশকে যখন এরা লেখা শুরু করেছিল, উপন্যাস রচনার কোনো সমস্যা কি এদের আলোড়িত করেছিল? ভাষা ও রচনাশৈলী সংক্রান্ত কোনো সংকট? উপাদান ও বিষয় সংক্রান্ত কোনো সমস্যা? তিনি এমন অনেক প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। খুঁজতে চেয়েছেন প্রশ্নের উত্তর, যা পাঠককেও ভাবাবে এবং বেশ কিছু প্রশ্নের নতুন উত্তরও পেয়ে যাবেন। কাল-পাত্রভেদে এবং ঐতিহাসিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে সাহিত্যে প্রভাবিত হওয়া দিকগুলো লেখক হাসান আজিজুল হক তার অন্তর্দৃষ্টি দিয়ে দেখেছেন, যা উল্লেখ করেছেন লেখনীতে। বইটির দ্বিতীয় প্রবন্ধ দুষ্পাঠ্য কররেখা : আমাদের কথাসাহিত্য। কথাসাহিত্যিকের কাজ, কী লিখবেন এবং বিভিন্ন সময়ের কথাসাহিত্যের আলোকপাত হয়েছে এই প্রবন্ধে, যা প্রথম প্রকাশ হয়েছিল ১৯৭৮ সালে। মানুষের মুখ : বিষাদ-সিন্ধু প্রবন্ধে বিষাদ-সিন্ধু নিয়ে লেখক বিভিন্ন পর্যালোচনা করেছেন। তিনি বলেন, আধুনিক উপন্যাসের জটিলতার চিহ্নমাত্র নেই বিষাদ-সিন্ধুতে। এমন স্টম্ফটিক স্বচ্ছতা এবং সম্পূর্ণ বোধগম্যতা একমাত্র মহাকাব্যেই মিলতে পারে। ইন্দ্রীয় অতিক্রমের কোনো চেষ্টা বিষাদ-সিন্ধুর লেখক কখনোই করেছেন বলে আমার মনে হয় না। উপন্যাসটির জোর ও জনপ্রিয়তা ঠিক এখানেই। লেখক হাসান আজিজুল হকের এমন ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যালোচনা প্রবন্ধগুলোকে তাৎপর্যময় করে তুলেছে। বইটির একেকটি প্রবন্ধের সংযোজনে এর কলেবর বৃদ্ধি পেয়েছে অনেক। সাহিত্যের সাম্প্রতিক ধারার বিশ্বজনীন ও দৈশিক বিশিষ্টতার প্রতিফলন হয়ে উঠেছে আরও বিস্তৃত ও সংহত। এমনই কিছু প্রবন্ধ হলো- রবীন্দ্র-উপন্যাসের স্বদেশ ভাবনা : গোরা, শরৎচন্দ্র : একালের চোখে, জগদীশ গুপ্ত : কথাসাহিত্যে বিপরীত স্রোত, ভাষারীতি : মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের বিষবৃক্ষ, মহাদেশের কথক : গাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেজ, লেখকের উপনিবেশ, শিল্পীর দায়িত্ব এবং সাহিত্যের বাস্তব। সাহিত্যের বাস্তব প্রবন্ধে লেখক কথাসাহিত্যিকের কাজ নিয়ে বলেন, দক্ষ কারিগরের হাতে এক টুকরো হীরে অসামান্য হয়ে ওঠে। হীরের হীরেত্ব পরিপূর্ণ ফুটে ওঠে, তার অসংখ্য আলোর মধ্যেও সে আলো বিচ্ছুরণের ক্ষমতা পেয়ে যায়। কথাসাহিত্যিকের কাজের মধ্যেও ঠিক সেটাই ঘটে। বাস্তবের এক রকম বহুতলিক নির্মাণ, যার ভেতর দিয়ে শেষ পর্যন্ত বাস্তবের নির্যাসই প্রকাশ পায়। ি