নির্যাস

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০১৯      

 সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ [১৫ আগস্ট, ১৯২২-১০ অক্টোবর, ১৯৭১]

আধুনিক বাংলা সাহিত্যের এক স্তম্ভপ্রতিম কথাশিল্পী সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ। কল্লোল যুগের ধারাবাহিকতায় তাঁর আবির্ভাব হলেও তিনি ইউরোপীয় আধুনিকতায় পরিশীলিত নতুন সাহিত্যবলয়ের সূত্রপাত করেন। জগদীশগুপ্ত, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় প্রমুখের উত্তরসূরি এই কথাসাহিত্যিক অগ্রজদের কাছ থেকে পাঠ গ্রহণ করলেও বিষয়, কাঠামো ও ভাষা-ভঙ্গিতে নতুন এক ঘরানার জন্ম দিয়েছেন।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ শুধু ঔপন্যাসিক হিসেবেই নন, ছোট গল্প রচয়িতা হিসেবেও সমান কৃতিত্বের অধিকারী। তিনি অল্প বয়সেই সাহিত্যচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন। ছাত্রাবস্থায় কলকাতায় তার প্রথম গল্পগ্রন্থ 'নয়নচারা' প্রকাশিত হয়। সমালোচকরা এই গল্পগ্রন্থের নতুনত্ব ও স্বকীয়তা স্বীকার করেছেন। তাঁর অধিকাংশ গল্পের পটভূমি বাংলাদেশের গ্রামীণ জীবন। গ্রামের সমাজ জীবনের অনাচার, নানা কুসংস্কার ও ধর্মান্ধতার সার্থক চিত্র অঙ্কন করেছেন তিনি তার গল্পে। সাধারণ মানুষের প্রতি আন্তরিক দরদ এবং সামাজিক ও রাজনৈতিক ভণ্ডামির ওপর দ্বিধাহীন কশাঘাত তার রচনার অনন্যসাধারণ বৈশিষ্ট্য। তাঁর রচিত গল্পের মধ্যে 'নয়নচারা', 'না কান্দে বুবু', 'শত্রু নাই', 'একটা তুলসী গাছের কাহিনী', 'পাগড়ি', 'দুই তীর ও অন্যান্য গল্প' প্রভৃতি একজন প্রথম শ্রেণির গল্পকার হিসেবে সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহকে সুপ্রতিষ্ঠিত করেছে। সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর প্রথম উপন্যাস 'লালসালু'। বাংলা কথাসাহিত্যে এই 'লালসালু' একটি প্রথাবিরোধী উপন্যাস। মূলত গ্রামীণ সমাজের সাধারণ মানুষের সরলতাকে কেন্দ্র করে ধর্মকে ব্যবসার উপাদানরূপে ব্যবহারের একটি নগ্ন চিত্র উপন্যাসটির মূল বিষয়। ধর্মকে যারা স্বার্থের হাতিয়ার হিসেবে বা শোষণের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করে, লালসালু উপন্যাসে সেই ধর্ম ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে একটি জোরালো প্রতিবাদ উচ্চারিত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে মজিদ নামক চরিত্রের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমানুষের যে ব্যক্তিগত লড়াই এবং তার অস্তিত্বের জন্য বা টিকে থাকার জন্য তার যে নিরন্তর সংগ্রাম; সেটিকেও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ তার উপন্যাসে অত্যন্ত জোরালোভাবে নিয়ে এসেছেন। তিনি তিনটি নাটকও রচনা করেছেন, নাটক তিনটি হলো 'বহিপীর', 'তরঙ্গভঙ্গ' ও 'সুড়ঙ্গ'।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর আরেকটি বিশেষ গুণ ছিল তিনি ভালো ছবি আঁকতেন। সাহিত্যের প্রতি যেমন তিনি শৈশব থেকে আগ্রহী ছিলেন, তেমনি স্কুলে পড়ার সময় থেকে ছবি আঁকা বা চিত্রশিল্পের দিকেও আগ্রহী ছিলেন। স্কুলের হাতে লেখা ম্যাগাজিন 'ভোরের আলো'র সমস্ত অলঙ্করণ ও অঙ্গসজ্জা তিনি নিজের হাতে করেছেন। অল্প বয়সেই সাহিত্যিক খ্যাতি না পেলে হয়তো তিনি চিত্রশিল্পীই হতেন। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদীন ও পটুয়া কামরুল হাসানের সঙ্গে সখ্য গড়ে উঠে তাঁর চিত্রশিল্পের আগ্রহের কারণেই। ওয়ালীউল্লাহ বেশ কিছু ছবিও এঁকেছেন। কিন্তু বিভিন্নজনের কাছে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকার ফলে তাঁর ছবির কোনো প্রদর্শনী হয়নি। চিত্রশিল্পী হিসেবে ওয়ালীউল্লাহর সবচেয়ে বড় নিদর্শন হলো তিনি তাঁর বেশ কয়েকটি বইয়ের প্রচ্ছদ নিজেই এঁকেছেন। যেসব বইয়ের প্রচ্ছদ তিনি নিজে এঁকেছেন সেগুলো হলো- 'চাঁদের অমাবস্যা', 'দুইতীর ও অন্যান্য গল্প', 'কাঁদো নদী কাঁদো' ইত্যাদি। শৈশবে ছবি আঁকার স্বীকৃতিস্বরূপ পুরস্কারও পেয়েছেন তিনি। তাঁর আরও একটি দুর্লভ গুণ হলো- তিনি ভালো কাঠ খোদাই ও ভালো ছুতোর মিস্ত্রির কাজ জানতেন। নিজের ঘরদোরের টুকিটাকি আসবাবপত্র তিনি নিজের হাতে বানাতেন। জীবনকে, জীবনের পরিবেশকে, যতটা সম্ভব শিল্পীত করার প্রয়াসই ছিল ওয়ালীউল্লাহর একমাত্র সাধনা। তার স্ত্রী ছিলেন ফরাসি আন্‌-মারি লুই রোজিতা মার্সেল তিবো। তাদের আলাপ হয়েছিল সিডনিতে। ওয়ালীউল্লাহ যেমন পাকিস্তানি দূতাবাসে, আন্‌-মারি তেমনি ছিলেন ফরাসি দূতাবাসে। দেড়-দুই বছরের সখ্য ও ঘনিষ্ঠতা রূপান্তরিত হয় পরিণয়বন্ধনে।

সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ রাজনীতিসম্পৃক্ত মানুষ ছিলেন না, কিন্তু সমাজ ও রাজনীতিসচেতন ছিলেন। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় ফ্রান্সের প্যারিসে তিনি চাকরিহীন, বেকার। তা সত্ত্বেও বাঙালির স্বাধীনতা সংগ্রামের পক্ষে জনমত তৈরির চেষ্টা করেছেন, সঙ্গতিতে যতটুকু কুলোয় তদনুযায়ী টাকা পাঠিয়েছেন কলকাতায় মুক্তিযুদ্ধ তহবিলে। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মাত্র ৪৯ বছর বয়সে, ১৯৭১ সালের ১০ অক্টোবর গভীর রাতে অধ্যয়নরত অবস্থায় মস্তিস্কের রক্তক্ষরণজনিত কারণে প্যারিসে নিজস্ব ফ্ল্যাটে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি। তার সন্তানদের ধারণা, তাদের পিতার অকাল মৃত্যুর একটি কারণ দেশ নিয়ে দুশ্চিন্তা, আশঙ্কা ও হতাশা। তিনি যে স্বাধীন মাতৃভূমি দেখে যেতে পারেননি সে বেদনা তার ঘনিষ্ঠ মহলের সকলেই বোধ করেছেন।

১৯৬১ সালে উপন্যাসে বিশেষ অবদানের জন্য বাংলা একাডেমি পুরস্কার, ১৯৬৫ সালে 'দুই তীর ও অন্যান্য গল্প'-এর জন্য আদমজী পুরস্কার এবং ১৯৮৪ সালে মরণোত্তর একুশে পদক লাভ করেন।