যে কথা এ জীবনে, রহিয়া গেল মনে...

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০১৯      

টোকন ঠাকুর

যে কথা এ জীবনে, রহিয়া গেল মনে...

'ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা'য় যুগল উপস্থাপনায় শ্রীকান্ত আচার্য ও অদিতি মহসিন

ঝেঁপে বৃষ্টি আসে। এত বৃষ্টি যে, মাঠকে আর মাঠই মনে হয় না, মনে হয়, বৃষ্টির নিচে নিজেকে সঁপে দেয় কিশোরী দুর্গা, কেঁপে কেঁপে ওঠে লাউলতার মতো তার শরীর। শরীর দুলে দুলে ওঠে, নেচে নেচে ওঠে মন। মন আবার দেখা যায় নাকি? দুর্গা দেখতে পায় তার ছোট্ট ভাইটি, অপু, সেও ভিজছে বাঁশবনের মধ্যে বসে, অপুও দেখছে বৃষ্টিকে, বৃষ্টিও দেখছে- ওরা কী করবে এখন? এই বৃষ্টিতে ভিজেই কিনা, পরে দুর্গার জ্বর এলো, দুর্গা কিশোরী মাত্র, জ্বর এলো শরীর কাঁপিয়ে। দুশ্চিন্তার দুএকদিন বাদেই সেই জ্বরে মারা গেল কিশোরী মেয়েটি-এরকমটি মনে আছে? মনে আছে বিভূতিভূষণকে? সেই গত শতাব্দীর ত্রিশের দশকে আগত লেখক বন্দ্যোপাধ্যায়কে? মনে আছে 'পথের পাঁচালী;কে? পরে পঞ্চাশের দশকের মধ্যভাগে গিয়ে চিত্রায়িত হলো যখন সত্যজিতের চোখে, আজ আমরা দেখতে পাই অস্কারজয়ী রায়ের ছবির কিশোরী দুর্গাকে, একদিন ঝেঁপে বৃষ্টি এলো, সেই বৃষ্টিতে দুর্গা ভিজে যাচ্ছে বা ভিজে নিতে চাইছে আর খুব বৃষ্টি হচ্ছে আর মাঠ-জঙ্গল ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে। ভিজে যাচ্ছে পরিপার্শ্ব, ভিজে যাচ্ছে শরীর, মন। অর্থাৎ আজ শ্রাবণের সজল আমন্ত্রণ। নারকেল গাছের পত্রপল্লব ঝড়ো বৃষ্টিতে দুলে দুলে উঠছে, পাঠশালার মাঠে হাঁটুজল জমে গেছে, ছাতা মাথায় কে যেন হাঁটতে হাঁটতে যাচ্ছে আর তার ছাতার ওপরে বৃষ্টিদানার আছড়ে পড়া শব্দ শুনতে পাচ্ছি, আকাশে মেঘের কী দারুণ-নিদারুণ উপস্থিতি দেখা যাচ্ছে- কী এমন সেই কারণ?

আজ শ্রাবণের ঝরো ঝরো নিমন্ত্রণ। তাই ভিজতেই হবে- ভিজতে চাইও। ভিজতে চাই গানে, কবিতায়। ছবিও ভিজে যাক, ছবির মধ্যে কবিও ভিজে যাচ্ছেন দেখতে পাচ্ছি, কবির নামটি রবীন্দ্রনাথ। সত্যিই, সে অবাঙালি কালিদাস, বিদ্যাপতিই বলুন বা বলুন না কেন পঞ্চের অন্য চার বাঙালি কবির কথা বা কবিতা বা গান, রবীন্দ্রনাথই বর্ষার বড় ইজারাদার, তাঁর কবিতায় এবং প্রধানত গানে। ফলত, রবীন্দ্রসঙ্গীত ছাড়া আর এতো জলার্দ্র রেইন মিউজিয়ম কোথায়? এখন আমরা রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনি কোথায়? বেতার, টেলিভিশন, ইউটিউবে শুনি। শুনি ঘরোয়া মঞ্চে কিন্তু ঘরের মধ্যে বর্ষার গান শুনতে শুনতে একটা অভাব থেকেই যায়, অভাবটা হচ্ছে, বর্ষার গানই শুনছি ঠিকই কিন্তু বৃষ্টি তখন ঘরের দেওয়ালের ওপারে বা বাইরে হচ্ছে হয়তো। তাই বলে বৃষ্টির ভেতরে খোলা মঞ্চ করে সেখানেও তো আর গান করা সম্ভব না। চিত্তের সংকট থেকেই যায়। একই সঙ্গে বৃষ্টি দেখব আর বৃষ্টির গান শুনতে শুনতে বৃষ্টিকে ছোঁব- সে আশা কি মেলে? মিলবেই না কেন, প্রযুক্তি তো সুবিধা দিচ্ছেই। দেখতে পেলাম, হল্‌রুমের মঞ্চে যেখানে শিল্পী আর বাদ্যযন্ত্রীগণ বসবেন, তাদের পেছনে ৩টি ব্যাকড্রপ পাশাপাশি রাখা। সেই ব্যাকড্রপেই দেখা যাচ্ছে, অপু-দুর্গা ভিজে যাচ্ছে, সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর এক সিকোয়েন্স, তুমুল বৃষ্টি হচ্ছে বাংলায়। মেঘ চিৎকার করছে আকাশে, বনজঙ্গল, মাঠপ্রান্তর ভিজে যাচ্ছে, ছাতার ওপরে বৃষ্টি পড়ছে। মনে পড়তেই পারে, ইটস আওয়ার চাইল্ডহুড রেইন। আমরা ভিজতে ভিজতে হারিয়ে যাচ্ছি আমাদের শৈশবে, যে শৈশব আমরা হারিয়ে ফেলেছি আর পাব না, যে দেশ আমাদের শৈশবে ছিল সেই দেশ আর নেই, যে নদী আমাদের ছোটবেলায় দেখা, তাকে আজ আর খুঁজেও পাব না, যে সখিকে দেখেছি ইস্কুল পথের ধারে, তাকে আর কোনোদিন দেখব না। দেখতে চাইব কিন্তু দেখতে পাব না, ছুঁতে চাইব কিন্তু ছুঁতে আর পারব না এবং আমরা টের পাব, ছুঁতে পারছি না, যেমন ইচ্ছে হলেও আর বৃষ্টিকে ছুঁতে পারি না, ভিজতে পারি না। এতো এতো না পারাকে মেনে নিয়েই জীবন পাড়ি দিতে হয়, হচ্ছে। ওহ! বুকের মধ্যে গুড় গুড় করে ওঠে, বুকের মধ্যে বৃষ্টি আসে অকস্মাৎ, যে বৃষ্টি অন্য কেউ শুনতেই পাবে না, দেখতেও পাবে না। তারপর অনুষ্ঠান শুরু হলো।

ত্রপা মজুমদার ও আপন আহসান সঞ্চালনা করছিলেন। অনুষ্ঠান শিরোনাম- 'ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা।' সদ্যপ্রয়াত কণ্ঠশিল্পী সুবীর নন্দীর গাওয়া একটি গান- 'আমি বৃষ্টির কাছ থেকে কান্না শিখেছি, আমায় আর ভয় দেখিয়ে কোনও লাভ নেই' কণ্ঠে তুললেন শিল্পী অলোক সেন। অলোক সেনের দরদ মাখা গলায় গানটি শুনতে শুনতে সুবীর নন্দীকে মনে পড়তে বাধ্য। অলোক সেন আর সানজিদা মাহমুদ নন্দিতা গাইলেন আরো কিছু গান- 'শাওন রাতে যদি/স্মরণে আসে মোরে', 'আজ এই বৃষ্টির কান্না দেখে', 'আকাশ মেঘে ঢাকা, শাওন ধরা ধারে' 'ওগো বৃষ্টি আমার চোখের পাতা ছুঁয়ো না...'

অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন বাংলা ছবির মিষ্টি মেয়ে কবরী। কবরী ও রাজ্জাক অভিনীত একটি ছবি থেকেও দুমিনিট স্ট্ক্রিনিং করা হলো ব্যাকড্রপে, সেখানে রাজ্জাক-কবরীর লিপসিঙে দেখানো হলো, তারা দুজন নেচে-নেচে গাচ্ছেন, 'হই হই রঙ্গিলা, মন দিলা রে, রিমঝিম ঝিম বরষায় ডট ডট ডট...। এরপর আবার গান শুরু হলো, সম্ভবত এর আগেই শ্রীজাত ও জয় গোস্বামীর জলকাদা মাখা কবিতা পড়লেন ত্রপা। কিন্তু আমরা তখন দেখতে পাই, অদিতি মহসীন প্রায় চোখ মুদে মুদে গাইছেন, 'শাওন গগনে ঘোর ঘন ঘটা', 'বাদল দিনের প্রথম কদম ফুল', 'আবার এসেছে আষাঢ়', 'আজ আকাশের মনের কথা', 'ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা', 'আজ ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার', 'আজি ঝরো ঝরো মুখরিত বাদল দিনে', 'মেঘের পরে মেঘ জমেছে', 'বজ্র মানিক দিয়ে'।

সবকিছুরই শেষ আছে। এইচএসবিসি বাংলাদেশ আয়োজিত এই বাদলারাতের গানের অনুষ্ঠান 'ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা' শেষ হলো কণ্ঠশিল্পী শ্রীকান্ত আচার্যের গানে। তিনি গাইলেন 'বৃষ্টি তোমাকে দিলাম', 'এই মেঘলা দিনে একলা ঘরে থাকে না তো মন', 'তুমি এলে অনেকদিনের পরে যেন বৃষ্টি এলো', 'এলো বরষা', 'তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা', 'পাগলা হাওয়ার বাদল দিনে', 'মন মোর মেঘের সঙ্গী'।

বৃষ্টির গানের ফাঁকে টুকটাক কথা বলছিলেন সঞ্চালকদ্বয়। কবিতা পড়ছিলেন দু'এক ছত্র। ব্যাকড্রপে বৃষ্টি হচ্ছিল। ২৬ জুলাই সন্ধ্যা, ২০১৯, শুক্রবার শ্রাবণ সন্ধ্যায় গ্র্যান্ড বল্‌রুম, প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁওয়ে অডিয়েন্স কত ছিল? হতে পারে ৬ বা ৭ শত। বেশিও হতে পারে। শুরুতেই কথা বলেছিলেন এইচএসবিসি'র প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ফ্রাসোঁয়া দ্য মারিকো। প্রতীচ্যের এই মানুষটি প্রাচ্যের বা একান্তভাবে বললে বাংলার বর্ষার গান, কবিতার কতখানি অনুরাগী- একান্তভাবে না আলাপে বসলে জানব না, কিন্তু এইচএসবিসি'র উপ-প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মো. মাহবুব-উর-রহমান যে 'ঝরো ঝরো বরিষে বারিধারা' আয়োজনের প্রাণ, সার্বিক দায়িত্ব যে তিনিই মাথায় নিয়েছেন, তা আমরা দেখতে পাই। এক বৃষ্টিমুখর সন্ধ্যাকে গানে আর ছবি-কবিতায় আমাদের স্মৃতির ভেতর তিনিই গুঁজে দিয়েছেন। শ্রাবণের গান, কবিতা, ছবি সাজিয়ে দিলেন সঙ্গীত-কবিতার প্রেমিক এই মানুষটি। আমাদের সুবর্ণ শৈশবকে একঝটকায় টেনে এনে মনে করিয়ে দিলেন মো. মাহবুব-উর-রহমান। শ্রাবণ সন্ধ্যা স্মৃতির কোটরে আশ্রয় করে নিল। সব মিলিয়ে একটি ব্যাংক- এইচএসবিসি ব্যাংক যে এমন একটি বর্ষাসন্ধ্যা মেলে ধরল কয়েকশো পিপাসার্ত উৎকর্ণ শ্রোতার সামনে, এ কারণে ব্যাংকটিকে ধন্যবাদ জানাই। এটা অব্যাহত থাকুক, এই কথাই বলি।

সন্ধ্যা পৌঁছুল রাতে, একটু রাতই হয়ে গেল। গান শেষ হলো। শ্রাবণের রাত, আমরা সোনারগাঁও থেকে বেরিয়ে বাইরে এসে দেখি, বৃষ্টি হচ্ছে। ভিজে যাচ্ছে সমস্ত শহর। বৃষ্টির মল্লার প্রবাহিত হাওয়াই। ফিরে যাচ্ছি যে-যার বাসায়, আমার মাথার মধ্যে তখনও গানের মর্মর বেজে চলেছে, ছবি ও কবিতা উড়ছে। কিছু কি কোথাও ফেলে গেলাম, কিছু কি হারিয়ে গেলাম গানের মধ্যে? আর আমার মন থেকে কিছুতেই মুছছে না, যে কথা এ জীবনে, রহিয়া গেল মনে, সে কথা কারে বলা যায়? টুপটুপ করে বৃষ্টি পড়ে, রাস্তায় হাঁটি, পড়ুক না কিছু ফোঁটা ফোঁটা মেঘ মাথার ওপর। ঘরে না হয় দেরি করেই ফিরলাম আজ! কত কিছুতেই না আমরা দেরি করে ফেলি। এবার তুমুল বৃষ্টি শুরু হলো, এবার সত্যি সত্যিই ভিজে যাচ্ছি।

হ্যাঁ, ভালোবাসার তীব্র আকাঙ্ক্ষা ও হাহাকারের কেমন এক শূন্যতায় ভিজে যাচ্ছি, ভেসে যাচ্ছি...