কলম্বোতে শেষ সফরে

প্রকাশ: ০২ আগস্ট ২০১৯      

মালেকা পারভীন

গত বছরের (২০১৮) রোজার প্রথম দিন। অফিস শেষে বের হয়ে একটা টুকটুকের জন্য এদিক-ওদিক তাকাই। কিছু চোখে পড়ে না। রোজা রেখে হেঁটে বাসায় যেতে ইচ্ছে করছে না। বাসা কাছেই। আস্তে আস্তে হঁাঁছি। যদি কোনো ট্যাক্সি পেয়ে যাই।

রাস্তার ডানদিকের প্রথম কর্নারটা পেরিয়ে একটু সামনে এগোতেই প্রার্থিত বাহন চোখে পড়লো। আমাকে হঁাঁতে দেখে সম্ভাব্য যাত্রী ভেবে দাঁড়িয়ে পড়েছে। আমি চালকের মুখের দিকে দেখি। সাধারণ শ্রীলংকান চেহারা নয়। ফর্সা টকটকে চেহারা। বসে থাকলেও তার শরীরের বিশালত্ব বোঝা যায়।

তবে গন্তব্য আর ভাড়া নিয়ে কথা বলতে গিয়ে একেবারেই বুঝে গেলাম, ভদ্রলোকের কথায় কিছুটা অসংলগ্নতা আছে। পরনের লুঙ্গিটাও চোখে পড়ল। সাধারণত এখানকার ট্যাক্সিচালকরা শর্াঁ বা টি-শার্টের সাথে ফুলপ্যান্ট পরে, কেউ কেউ থ্রি কোয়র্াাঁর প্যান্ট। কিন্তু লুঙ্গি খুব একটা চোখে পড়েনি। তাই এবার সামান্য খটকা লাগলো। আর কোনো ট্যাক্সি পাবো কি-না চিন্তা করে এটাতেই উঠে বসলাম। মনের ভেতর বেশ খানিকটা অস্বস্তি নিয়ে।

পাঁচ মিনিটের রাস্তা কোনোরকম যেতে পারলে হয়। দুটো সিগন্যাল পার হয়ে গেছি। এর মধ্যে চালকের সাথে তেমন কোনো বাক্য বিনিময় হয়নি। শুধু ডানে-বামে নির্দেশ করা ছাড়া। আমাদের কথা হচ্ছে ইংরেজিতে। চালকের ইংরেজি ভালো। কথায় সামান্য জড়তা থাকলেও। সম্ভবত অসুস্থতাজনিত।

ট্যাক্সি যখন কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের সামনের রাস্তায় বাঁক নিলো, ভদ্রলোক হঠাৎ ঘাড় ঘুরিয়ে জানতে চাইলেন, আমি ভারতীয় কি-না। যেহেতু আমার পরনে শাড়ি। এখানেও মেয়েরা শাড়ি পরে। আমাকে জিজ্ঞাসা করার কারণ, আমার চেহারা টিপিক্যাল শ্রীলংকান নয়।

বাংলাদেশ আমার দেশ শুনে আবারো ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন। এবার আমি একটু ভয় পেলাম। পেছন ফিরে তাকিয়ে কথা বললে আবার না টুকটুক উল্টে যায়। এরপরই আমার চোখ কপালে ওঠা বিস্ময়ের পালা। মিষ্টি একটা হাসি দিয়ে টেনে টেনে চালক বললেন, টেগোর। রাবীন্দ্রনাত টেগোর। আমি তাঁর লেখা পড়েছি। গীতাঞ্জলি। তাঁর লেখা আমার ভালো লাগে। অনেক আগে পড়েছি। লাইব্রেরি থেকে বই নিয়ে। এতোগুলো কথা তিনি প্রায় এক নিশ্বাসে বলে চললেন।

আমার বিস্ময় চড়চড় করে বাড়ার সাথে সাথে ভয়টাও বাড়ছিল। যদি অন্যমনস্ক হয়ে একটা দুর্ঘটনা ঘটে যায়। বাসার কাছে এসে দাঁড়াতে হাঁফ ছাড়লাম। ততক্ষণে আমার কথা বলার ইচ্ছা প্রবল হয়ে উঠেছে। ভদ্রলোকের কথা শুনে মনে হচ্ছিল, তিনি শারীরিকভাবে অসুস্থ। কিন্তু তার স্মৃতিশক্তি প্রখর এবং তিনি একজন শিক্ষিত ব্যক্তি, যার সাহিত্য পাঠে আগ্রহ আছে।

কলম্বোর রাস্তায় তিন বছর ধরে এই ট্যাক্সিতে চলাচল করতে গিয়ে অনেক রকম মানুষের সাথে পরিচয় হয়েছে। কিন্তু কোনো দিন স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি, দেশটি ছেড়ে যাবার মাত্র কয়েক মাস আগে একদিন এমন একজনের সাথে পরিচয় হবে, যিনি আমাকে টেগোর-এর কথা বলে একই সাথে বিস্ময় আর ভালোবাসার আবেগে ভাসিয়ে দেবেন।

বাসার সামনে ট্যাক্সি থামার পর তার সাথে আমার আরো কিছু বিষয় নিয়ে কথা হলো। তিনি আমার মধ্যে কী দেখলেন কে জানে। বললেন, আপনি খুব ভালো মানুষ। বলতে গিয়ে তার চোখ ছলছল করে উঠলো। নিজের কোনো মোবাইল নম্বর না থাকাতে তিনি আমাকে তার স্ত্রীর নম্বরটা দিলেন। আমিও আবার কথা/দেখা হবে বলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি নিয়ে বাড়ি ফিরলাম।

শ্রীলংকায় থাকাকালীন এখানকার শিক্ষিত সমাজে, সামগ্রিকভাবে শিল্প-সাহিত্যকলায় কবিগুরুর পরিচিতি ও প্রভাবের কথা কমবেশি জানার সুযোগ হয়েছে। কলম্বো বিশ্ববিদ্যালয়ের সেন্টার ফর কনটেম্পোরারি ইন্ডিয়ান স্টাডিজ নিয়মিতভাবে কবির জন্ম বা মৃত্যুবার্ষিকী উদযাপনের পাশাপাশি অন্যান্য অনুষ্ঠানের আয়োজন করে থাকে। কিছু অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিত থাকবার সুযোগ হয়েছে। তখন দেখেছি, শ্রীলংকান রবিভক্তরাও আমাদের চেয়ে কোনো অংশে কম নন।

এ দেশের জাতীয় সঙ্গীতের সাথে কবির নামটি বারবার উচ্চারিত হয়। এ বিষয়ে আমার আরেকটি রচনা থেকে উল্লেখ করে বলি, শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীত 'শ্রীলংকা মাতা' এবং এর রচয়িতা বিখ্যাত সিনহালা গীতিকার-সুরকার আনান্দা সামারাকুনের ব্যাপারে বেশ কিছু ঘটনা শোনা যায়। সবচেয়ে প্রচলিত ধারণাটি হলো, সামারাকুন কবিগুরুর সঙ্গীতের দ্বারা উদ্বুদ্ধ বা প্রভাবিত হয়ে উক্ত গানটির বাণী রচনা এবং সুর সংযোজন করেন। সামারাকুন ১৯৩৬-৩৭ সালের দিকে সামান্য সময়ের জন্য শান্তিনিকেতনে কবিগুরুর সরাসরি সান্নিধ্যে থেকে শিল্প ও সঙ্গীত বিষয়ে অধ্যয়ন করবার সুযোগ পেয়েছিলেন। পরবর্তীকালে তাঁর শিল্পকর্মে নানাভাবে কবিগুরুর প্রভাব পরিলক্ষিত হয়। সংখ্যায় নগণ্য আরেকটি দল অবশ্য দাবি করে যে, শ্রীলংকার জাতীয় সঙ্গীতের পুরোটিই রবি ঠাকুরের রচনা। ঘটনা যাই হোক, এটি অস্বীকার করবার উপায় নেই যে, লংকার জাতীয় সঙ্গীতে রবীন্দ্রসঙ্গীতের একটি সুস্পষ্ট উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।

যেটি বলবার জন্য এত কিছু বলা, ১৯১৩ সালে নোবেল সাহিত্য পুরস্কার প্রাপ্তির পর থেকে এশিয়ার অন্যান্য দেশের মতো তৎকালীন সিলন দ্বীপ হিসেবে পরিচিত বর্তমান শ্রীলংকার শিক্ষিত মহলেও কবিগুরুর নাম পরিচিত হয়ে ওঠে। এর অব্যবহিত পরে তাঁর বিশ্বভ্রমণের অংশ হিসেবে যে দেশগুলো তিনি একাধিকবার ভ্রমণ করেন, সিলন তার মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন সময় শ্রীলংকার কয়েকজন বিদ্যুৎসাহী ব্যক্তির আমন্ত্রণে ১৯২২, ১৯২৮ এবং ১৯৩৪ সালে কবি মোঁ তিনবার শ্রীলংকা সফর করেন। তথ্যানুসারে এর বাইরে আরও তিনবার তিনি অন্য দেশে যাবার পথে কলম্বোতে যাত্রাবিরতি করেন।

১৯৩৪ সালে শ্রীলংকার সফরটি ছিল কবিগুরুর সর্বশেষ বিদেশ ভ্রমণ। নানা দিক থেকে এই ভ্রমণটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ। ১৯৩৪ সালের ৯ মে কবি যখন কলম্বো এসে পৌঁছান, ২৩ সদস্যের শিল্পী দল ছাড়াও তাঁর সাথে ছিলেন পুত্রবধূ প্রতিমা দেবী, কন্যা মীরা এবং প্রখ্যাত শিল্পী নন্দলাল বসু। যাত্রাপথে জাহাজে অবস্থানকালেই কবির ৭৩তম জন্মবার্ষিকী পালিত হয়।

তৎকালীন শ্রীলংকার ধনাঢ্য শিক্ষানুরাগী ব্যবসায়ী উইলমোঁ এ পেরেরা সস্ত্রীক ১৯৩২ সালে শান্তিনিকেতন ভ্রমণ করে সেখানকার শিক্ষাদান পদ্ধতি বিষয়ে বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেন এবং তাঁর স্ত্রী কলাভবনে শিল্পকলার বিভিন্ন দিক সম্পর্কে জ্ঞানলাভ করেন। শ্রীলংকা ফিরে তাঁরা গ্রামীণ জীবনের উন্নয়নের লক্ষ্যে শান্তিনিকেতনের আদলে হোরানা জেলায় শ্রী পালি নামে একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণের কাজে আত্মনিয়োগ করেন। সদ্য প্রতিষ্ঠিত তাঁদের স্বপ্নের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান শ্রী পালি উদ্বোধনের জন্য উইলমোঁ এ পেরেরা কবিগুরুকে সিলন সফরের আমন্ত্রণ জানান। কবির সাথে পেরেরার যে গভীর মননশীল সম্পর্ক গড়ে ওঠে, পরবর্তীকালে তা দুটি দেশের বিশেষত শিক্ষাগত ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক জোরদার করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

আগের দুটি সফরের তুলনায় শ্রীলংকায় কবিগুরুর শেষ সফরটি স্থানীয় শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে ব্যাপক আলোড়ন তোলে। সিনহালা এবং ইংরেজি পত্রিকার প্রথম পাতায় এই সফরের খবর স্থান করে নেয়। প্রকাশিত হয় সম্পাদকীয় এবং বিভিন্ন গুণীজনের লেখা নিবন্ধ। ইংরেজি পত্রিকায় সাক্ষাৎকার প্রদানের পাশাপাশি বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানসহ সেবার একাধিক জায়গায় কবি বক্তৃতা ও কবিতা পাঠ করেন। তাঁর বিভিন্ন বক্তৃতার সারমর্ম ছিল বিশ্বভারতী, ভারতীয় শিল্পকলা ইত্যাদি বিষয়ে ধারণা প্রদান এবং ভারত ও লংকার মধ্যকার হারানো ঐতিহাসিক সম্পর্ক পুনরুদ্ধারে কবি হিসেবে তাঁর ভূমিকা। এই সফরে কবির অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল বিশ্বভারতীর জন্য তহবিল সংগ্রহ। অন্যান্য আয়োজনের মধ্যে এ লক্ষ্যে তাঁর সাথে ভ্রমণকারী ২৩ সদস্যের শিল্পী দলটি কলম্বো এবং জাফনায় গীতিনৃত্য নাট্য 'শাপমোচন' মঞ্চস্থ করে, যা ওই সময় একটি স্মরণীয় পরিবেশনা হিসেবে স্থানীয় দর্শকদের ভূয়সী প্রশংসা অর্জন করে।

যে কথা বলে এই সংক্ষিপ্ত লেখার ইতি টানতে চাই, শেষবারের মতো কবির সিলন সফরে অনেক অনুষ্ঠানের মধ্যে কলম্বো মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল কর্তৃক প্রদত্ত একটি রিসেপশনও অন্তর্ভুক্ত ছিল। আমার তিন বছরের কলম্বো বাস ছিল এই মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিল চত্বরের বিপরীত দিকে অবস্থিত একটি অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের ছয়তলায়। অ্যাপার্টমেন্ট ভবনটি তখন ছিল না। কিন্ত ৭৩ বছর বয়সে কবি একদিন এই এলাকায় এসে ঘুরে গেছেন, সেই ভাবনা ভেবেই অন্যরকম শিহরণে শিহরিত হয়ে উঠি। যেমন শিহরিত হয়েছিলাম ঠিক ওই মিউনিসিপ্যাল কাউন্সিলের সামনের রাস্তায় ট্যাক্সিচালকের মুখে টেগোর আর গীতাঞ্জলির নাম শুনে!