সাহিত্যের সেতু

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

বিধান মিত্র

সাহিত্যের সেতু

সাহিত্য ভাবনায় সেকাল একাল, লেখক ::রাজীব সরকার, প্রচ্ছদ ::সব্যসাচী হাজরা, প্রকাশনা ::কথাপ্রকাশ, প্রকাশকাল ::ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মূল্য ::২০০ টাকা

কবিতা-গল্প বা উপন্যাস- বাংলা সাহিত্যের এ-কয়েকটি শাখা দৈহিক শ্রী এবং অন্তর্গতদ্যুতি বিবেচনায় যতোটা আলোকিত- সে-তুলনায় প্রবন্ধসাহিত্য বেশ অনুজ্জ্বল; প্রবন্ধ-সাহিত্যেরই বিশেষ একটি অংশ- যাকে আখ্যায়িত করা হয় 'সমালোচনামূলক প্রবন্ধসাহিত্য' হিসেবে- এর অবস্থা আরো নিষ্প্রভ, আরো শ্রীবর্জিত। তবে হ্যাঁ, মেঘাবৃত অন্ধকার রাতে পথহারা পথিক যেমন জোনাকির আলো দেখে আশাবাদী হয়ে ওঠে, ওই শ্রীবর্জিত সাহিত্যক্ষেত্রে বসে আমরাও তেমনি আশাবাদী হয়ে উঠতে পারি, যখন দেখি রাজীব সরকারের মতো প্রতিভাদীপ্ত তরুণ লেখক সাহিত্যের সেই ওই ঊষর ক্ষেত্রে সোনার ফসল-ফলাতে সচেষ্ট হয়েছেন। রাজীব সরকার- নন্দনতত্ত্বের অপরাপর ধারা ছেড়ে সমালোচনামূলক-সাহিত্য রচনায় ব্রতী হয়েছেন এবং উনিশ শতকের নমস্য লেখক বঙ্কিমচন্দ্র থেকে শুরু করে একুশ শতকের হরিশংকর জলদাস পর্যন্ত- ভিন্ন সময়ের, ভিন্ন-সমাজের মোট পনেরোজন লেখকের বহুবিচিত্র রুচি-চিন্তন-মনন ও ভাবনার প্রেক্ষণবিন্দুকে একই মলাটে উপস্থাপন করেছেন; বস্তুত শ্রমসাধ্য ও দুরূহ এ-কাজটি রাজীব সরকার যে প্রশংসনীয় দক্ষতার সাথে সম্পাদন করতে পেরেছেন, তাঁর 'সাহিত্য ভাবনায় সেকাল একাল' গ্রন্থটি পাঠ করলে সহজেই বোঝা যায়। গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধের নাম- 'বিজ্ঞানমনস্কতা ও বঙ্কিমচন্দ্র'; বস্তুত বাঙালি পাঠকসমাজে বঙ্কিমচন্দ্র বরাবরই খণ্ডিত-আকারে উপস্থাপিত হয়েছেন; এক অংশের মতে- তিনি বাংলা সাহিত্যের প্রথম ও সার্থক ঔপন্যাসিক বটে, তবে তাঁর ওই সত্তা রক্ষণশীলতা ও সংকীর্ণ হিন্দুত্ববাদিতায় যথেষ্ট কালিমাযুক্ত। অন্য অংশের মতে, হিন্দুত্ববাদ শেষপর্যন্ত তাঁকে চরম মুসলিম-বিদ্বেষী করে তুলেছে এবং এক পর্যায়ে তিনি ইংরেজ-তোষণকারী হয়ে উঠেছেন। আবার অন্য একটা অংশ- বিশেষত শাসক-ইংরেজ জাতির চোখে বঙ্কিমচন্দ্রের পরিচয়- তিনি উগ্র জাতীয়তাবাদী, ইংরেজমুক্ত স্বাধীন ভারতের স্বপ্নদ্রষ্টা। বস্তুত এই ত্রিমাত্রিক পরিচয়ের মধ্যে- কোনোটিই যে তাঁর প্রকৃত পরিচয় নয়- বঙ্কিমচন্দ্র মূলত জ্ঞানতপস্বী, মানবতাবাদী, সত্যদ্রষ্টা এবং বিজ্ঞাননির্ভর মানুষ- এ সত্যটি যুক্তি ও তথ্যের সম্মিলনে বেশ দক্ষতার সাথে উপস্থাপন করেছেন- রাজীব সরকার, তাঁর 'বিজ্ঞানমনস্কতা ও বঙ্কিমচন্দ্র' শীর্ষক প্রবন্ধে।

ওই গ্রন্থের দ্বিতীয় প্রবন্ধের নাম, "ধর্মীয় উগ্রবাদের যুগে 'গোরা'র প্রাসঙ্গিকতা"; 'গোরা' উপন্যাসের নায়ক- গোরা, একদা যে ছিল হিন্দুত্বের একনিষ্ঠ সমর্থক, কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ঙ্কর উগ্রপন্থিও, রবীন্দ্রনাথ সেই গোরার অন্তরে প্রতিস্থাপন করেছেন আপন-বিশ্বাসের অমিয়বাণী, যার সূত্র ধরে পরেশবাবুর কাছে অনুরোধ করে বলেছে সে, "আপনি আজ আমাকে সেই মন্ত্র দিন, যিনি হিন্দু মুসলমান খৃস্টান ব্রাহ্ম সকলেরই, যাঁর মন্দিরের দ্বার কোনো জাতির কাছে, কোনো ব্যক্তির কাছে কোনোদিন অবরুদ্ধ হয় না, যিনি কেবলই হিন্দুর দেবতা নন- যিনি ভারতবর্ষের দেবতা।" বস্তুত ধর্মীয় উগ্রতার যুগে, ধর্মের মোহনীয়-আচ্ছাদন পরিত্যাগপূর্বক- গোরা নামের ওই যুবকটির মানুষ হয়ে ওঠার বাঁকগুলো বেশ দক্ষতার সাথে চিহ্নিত করেছেন রাজীব সরকার।

বিদ্রোহী কবিখ্যাত কাজী নজরুল ইসলামের সাম্যবাদী দৃষ্টিভঙ্গির স্বরূপচিত্র উন্মোচিত হয়েছে, 'নজরুল সাহিত্যে উপনিবেশ-বিরোধিতা' প্রবন্ধে। কাদামাটির নরোম সোঁদা-গন্ধমাখা কবি- কাজী নজরুল ইসলাম, যিনি সারাজীবন খেটে-খাওয়া মানুষের জয়গান করেছেন, তাঁর ওই বিশেষ দৃষ্টিভঙ্গিটির পরিচয় দিতে গিয়ে তাৎপর্যপূর্ণ তথ্য উপস্থাপন করেছেন রাজীব সরকার, "উপনিবেশ-বিরোধিতার ক্ষেত্রে নজরুল-সাহিত্যে মোটা দাগে তিনটি ধারা পরিলক্ষিত হয়। প্রথমত, নিজস্ব শক্তিতে বলীয়ান হওয়া তথা আত্মশক্তির উদ্বোধন, দ্বিতীয়ত মিথ-পুরাণ-ঐতিহ্যের নবায়ন এবং তৃতীয়ত অধিকাবঞ্চিত প্রান্তজনের বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর।" বস্তুত নজরুলের 'উপনিবেশবিরোধী' বিদ্রোহী চেতনারই সূত্রবদ্ধ ও জীবনঘনিষ্ঠ রূপটি পাই 'মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের ছোটগল্পে শিল্পী ও বিপ্লবীসত্তা' প্রবন্ধে। উল্লেখ্য যে, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়ের শ্রেণিসংগ্রামতত্ত্বে প্রবেশের আগে, যেন পাঠককে একটু ভিন্নতর স্বাদ দেবার জন্যেই- রাজীব সরকার উপস্থাপন করেছেন রম্যকথার রসালো-আলাপন, 'বুদ্ধদেব বসুর উত্তর তিরিশ'। না, এখানে তিনি রম্যকথা নিয়ে গতানুগতিক-আলোচনায় প্রবৃত্ত হননি, বুদ্ধদেব বসু প্রসঙ্গে তাঁর দ্ব্যর্থহীন মন্তব্য, "ব্যঙ্গ-নৈপুণ্যে, শাণিত পরিহাসে, সামান্য বিষয়কে একইসঙ্গে গভীর ও মনোমুগ্ধকর করে তোলার অতুলনীয় উদাহরণ সৃষ্টি করেছেন তিনি। এ-ক্ষেত্রে তিনি যথার্থই বিদ্রোহী-সর্বতোভাবে প্রথাবিরোধী।" তারপর তার আলোচ্য বিষয় হয়েছে, বাহান্নর ভাষা আন্দোলনের প্রেক্ষাপটে রচিত মাহবুব আলম চৌধুরীর কালজয়ী আখ্যান, 'কাঁদতে আসিনি, ফাঁসির দাবি নিয়ে এসেছি' এবং আবদুল গাফ্‌ফার চৌধুরীর অবিনাশী চেতনা-সঙ্গীত 'আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি, আমি কি ভুলিতে পারি'। তারপর একে একে 'চিলেকোঠার সেপাই', 'একুশের প্রথম কবিতা ও গান :জাগরণের যাত্রাবিন্দু', 'আরজ আলী মাতুব্বরের জিজ্ঞাসা', 'হাসান আজিজুল হকের উপন্যাস-ভাবনা ও সাবিত্রী উপাখ্যান' এমন বারোটি প্রবন্ধে- ভিন্ন ভিন্ন সময়ের মোট পনেরো জন লেখকের শিল্পসত্তা সম্পর্কে আলোকপাত করা হয়েছে রাজীব সরকারের 'সাহিত্য ভাবনায় সেকাল একাল' গ্রন্থে। প্রবন্ধগুলোর পর্যালোচনায় এমন একটা ঐক্যময় সুরের অনুরণন পাওয়া যায়, যাতে মনে হতে পারে- এই বারোটি প্রবন্ধ বুঝি- আলাদা আলাদা রচনা নয়- এতে প্রতিফলিত হয়েছে বাংলা সাহিত্যের বারোটি বাঁকবদলের অখণ্ড একটা চিত্র। চিন্তার গভীরতা, দৃষ্টিভঙ্গির স্বচ্ছতা এবং ভাষাব্যবহারের প্রাঞ্জলতা বিচার করে আমরা আশাবাদী হয়ে উঠতে পারি যে, রাজীব সরকারের এমন চিন্তন-মনন-শ্রমের নিয়ত সংশ্নেষণ পেলে, সমৃদ্ধ হবে আমাদের সমালোচনামূলক প্রবন্ধ-সাহিত্য।