নয় শিল্পীর শিল্পপ্রচেষ্টা

প্রদর্শনী

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

সঞ্জয় ঘোষ

নয় শিল্পীর শিল্পপ্রচেষ্টা

'সুপার মুন' শিল্পী ::শায়লা আক্তার

'কালার্স'- সমসাময়িক নারী শিল্পীদের একটা ঐক্য। বেশ কয়েকজন নারী, এদের কেউ চিত্রশিল্পী, কেউ ভাস্কর, কেউ বা মৃৎশিল্পের- তবে এদের একত্র হওয়ার অন্যতম সূত্রটি হলো এরা সবাই সহপাঠী। একসঙ্গেই এরা চারুকলা শিক্ষার পাঠ নিয়েছেন, একসঙ্গে গড়ে উঠেছে তাদের শিল্পজীবন। সে সূত্রেই তাদের পরিণত জীবনের এই কালপর্বে এসে নিজেদের শিল্পচর্চার প্রতিনিয়ত বিকাশ ও প্রকাশের জন্য তারা 'কালার্স' নামে এই ঐক্য গড়ে তুলেছেন। আমাদের বর্তমান পরিবর্তিত সমাজ-সংস্কৃতিতে, অর্থাৎ আদিম মাতৃতান্ত্রিক সমাজের বিলুপ্তির এই বহু শতাব্দী পরে নারীদের যে স্বাভাবিক জীবনযাত্রা- তাতে যে কোনো কারিগরি বা চিন্তাবিকাশ চর্চার মতই শিল্পচর্চায় নিরবচ্ছিন্নভাবে নিয়োজিত থাকা অনেক সময়ই কঠিন হয়ে ওঠে। নারীর নারী জীবনযাত্রার চাপে নানাভাবেই তাদের ছিটকে পড়ার উদাহরণ খুব একটা বিরল নয়। কালার্সের এই শিল্পীরা সেই বিচ্ছিন্নতার বিরুদ্ধেই ঐক্য তৈরি করেছেন শিল্পের জন্য, সৃজনের তাগিদে।



সম্প্রতি এ দলটির আরও একটি যৌথ শিল্প প্রদর্শনী আয়োজিত হয়ে গেল। ঢাকার আলিয়ঁস ফঁদ্ধসেজে গত ২৩ থেকে ৩১ আগস্ট প্রদর্শিত এ শিল্প আয়োজনটিতে অংশগ্রহণ করেছিলেন কালার্সের মোট ৯ জন শিল্পী- ফারহানা আফরোজ, ফারজানা ইসলাম, মনিদীপা দাশগুপ্ত, মুক্তি ভৌমিক, মনিরা সুলতানা, রেবেকা সুলতানা, রেহানা ইয়াসমিন, রিফাত জাহান ও শায়লা আক্তার। প্রদর্শনী উপলক্ষে প্রকাশিত কাগজে শিল্পী নাজিব তারেক কালার্সের শিল্পীদের চিহ্নিত করতে গিয়ে বলেছেন, "একদল নারী চিত্রকর, যারা সহপাঠিনী, যৌথযাত্রার চার বছর পার করছে। 'কিটি পার্টি' থেকে যে যাত্রা, তা কতদূর এগুলো? পাঁচটি প্রদর্শনী মাত্র কি? যদি পাঁচটি প্রদর্শনীকেও বিবেচনা করি, তবে সেই প্রদর্শনীর পেছনে যে ব্যক্তি ও যৌথ শ্রম, তাকে কি অস্বীকার করা যায়!"

কালার্সের এই যৌথ শিল্পযাত্রায় এই শ্রমের পাশাপাশি কতটুকু মননবৈচিত্র্য শিল্পজগতে যোগ হলো, সেটাই এখন দেখার বিষয়।

দুই.

শিল্পী দলটির নাম কালার্স। তাদের অনেকের চিত্রকর্মেই সেই কালার বা রঙের ঔজ্জ্বল্য এবং স্পষ্টতা টের পাওয়া যায়। ৯ শিল্পীর পাঁচজনই প্রদর্শনীতে চিত্রকর্ম নিয়ে উপস্থিত হয়েছেন। বাকি চারজন আছেন মৃৎ-ভাস্কর্য ও পোড়ামাটির ফলক নিয়ে। প্রদর্শনীর শিল্পী ও কাজকেও এ দুই ভাগে ভাগ করে নেওয়া যায়।

শিল্পী ফারহানা আফরোজের 'আনএক্সপেক্টেড-৬' শিরোনামের কাজটির ধরন ও প্রবণতা তার নিয়মিত কাজেরই অনুগামী হলেও এ কাজটিকে বিশেষভাবে আলাদা করা যায়। ক্যানভাসে তার চিরাচরিত বিমূর্ত অথবা ফুলেল মোটিফের ব্যবহারের বদলে এবারে অ্যাক্রিলিকে প্রস্ম্ফুটিত হয়েছে একগুচ্ছ নর-নারীর মুখাবয়ব। অনেকটা অ্যাপ্লিক বা ক্যানভাসে চিত্রতলের একটা একক জমিনে আলগা আলগা কাগজের পাতা-প্রকৃতির সঙ্গে একীভূত হয়ে আছে নর-নারীর আদিম সম্পর্কজালের কোলাজ। জমিন আর বিষয়চরিত্র প্রায় একই রঙে- শুধু প্রচ্ছন্ন সাদা রঙ ও রেখায় তাদের চিত্রতল থেকে দৃষ্টিগ্রাহ্যতায় ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। অনেকটা বিমূর্ততার মূলগত প্রবণতায় আধা-বিমূর্ত অবয়বের সমন্বয়।


মনিদীপা দাশগুপ্তের চিত্রকর্মের নাম 'ড্রিমস্কেপ-১৪'। উজ্জ্বল হলুদ, সাদা, কমলা, খয়েরি, রূপালি এমন বহুবর্ণিল রৈখিক অনেকটা ব্লকের ছাপের মতো করে ফুলেল স্বপ্ন চিত্রায়িত করেছেন যেন এই শিল্পী। অ্যাক্রিলিক ও কলমে ক্যানভাসে রৈখিক নকশানির্ভর এ ধরনের কাজের শিল্প প্রচেষ্টা নতুনত্বের বিচারে কোনো পদক্ষেপ না রাখলেও দক্ষতার বিবেচনায় কিঞ্চিৎ দাগ রেখে যায়। সেই একই কথা খাটে মনিরা সুলতানার 'অন্তর' নামের টেরাকোটার কাজের ক্ষেত্রেও। পোড়ামাটির তিনটি ইটে অলঙ্করণের মাধুর্য নির্মাণেই নিয়োজিত থেকেছেন মনিরা সুলতানা।

তবে রেহানা ইয়াসমিন ও ফারজানা ইসলামের মাটির কাজে চিন্তা ও করণকৌশলের সংশ্নেষ অনেকটা তাৎপর্য সঞ্চয় করতে সক্ষম হয়েছে বলা যায়। রেহানা ইয়াসমিন 'পরিত্যক্ত' শিরোনামে আগুনে পুড়ে যে পুরাতনকে নির্মাণ করেছেন, তাতে পরিত্যক্ত জিনিসের প্রতীকের ভেতরে প্রাচীনের যে আবহ সংযোজন করেছেন- বস্তুত পোড়াবাড়ির সেই চিরচেনা ভগ্নদেয়ালের অবয়বকে অব্যবহার্য বোতলের আদলে এ এক অনন্য রূপান্তর।


ফারজানা ইসলাম নির্মাণ করেছেন পরিবার। বাবা-মা ও সন্তান। মাটি দিয়ে গড়া তিনটি মানব চরিত্র আগুনে পুড়ে যে রঙ পেয়েছে, সেই রঙই তাদের গায়ের রঙ। তবে তাদের চেহারা অনেকটা ভিনদেশি। বিশ্বগ্রামে ক্রমে ছোট হয়ে আসা বিশ্ব বাস্তবতায় ঠিক যেন আপনি দেখে থাকবেন কোথাও না কোথাও। তবে বাংলার মানুষের অবয়ব যে নয়, সেটা নিশ্চিত।

বাঙালি অবয়বের মূর্ত মুখাবয়বের প্রতিভূ ফুটে উঠেছে রিফাত জাহানের 'ইন কোয়েস্ট অব লিবার্টি' শিরোনামের মিশ্র মাধ্যমের কাজটিতে। প্রথম দৃষ্টিতেই যে কোনো শিল্পরসিকের ভালো লেগে যাওয়ার মতো একটা চিত্রকর্ম। বহু রঙিন, পাখি-প্রকৃতির জমিনি লালে শাড়ি পরিহিত নারী অবয়ব। সুশ্রী, সুখী সৌন্দর্যবিলাসী স্বাভাবিক নারী। কিন্তু শিল্পীর বেঁধে দেওয়া শিরোনামে বুঝে নিতে হচ্ছে এ নারী পরাধীন, মুক্তির আকাঙ্ক্ষায় উদ্বেল। নাজিব তারেকের ভাষায়, 'রিফাত এবারের ছবিতে যে নারী অবয়ব যুক্ত করেছেন, যা বেঙ্গল স্কুলকে প্রতিনিধিত্ব করে, পাখিগুলো অনেক বেশি পশ্চিমা।' তবে এসব বিবেচনার বাইরে বলা যায়, সুন্দর দৃষ্টিনন্দন এবং করণকৌশলের দক্ষতায় ঋদ্ধ একটি কাজ।


নবম ও সর্বশেষ যে শিল্পীর কাজের কথা বলছি, তার নাম শায়লা আক্তার। 'সুপার মুন' শিরোনামে মিশ্র মাধ্যমের এ কাজটিও প্রদর্শনীর প্রতিটি কাজের মতো বিষয় ও করণকৌশলে অনন্য। নীল আর সাদার প্রাধান্যে চিত্রতলে টেক্সচার নির্মাণের মধ্য দিয়ে চাঁদ ও জ্যোৎস্নার নিচে আবছা এক মানবীর অবয়ব ফুটিয়ে তুলেছেন শিল্পী। কাছে গিয়ে না দেখলে আবছা সেই শরীর ও চাঁদের অবয়ব স্পষ্ট হয়ে ওঠার আগে ছবিটিতে চিত্রতলে জায়গার ব্যবহার ও পরিমিতির কাজকেই প্রধান মনে হয়। সেই দিক দিয়ে চিত্রে এক ধরনের দ্বিবিধ আচরণ তৈরি হয়েছে যেন।

সব মিলিয়ে সমসাময়িকতা ও নারী সূত্রে ঐক্যবদ্ধ এই শিল্পীদের কাজের বৈচিত্র্য এই ৯ শিল্পীর শিল্প প্রচেষ্টাকে বাংলাদেশের সমসাময়িক শিল্পধারার প্রধান বাস্তবতা বললে ভুল বলা হবে না বোধ হয়।