একটি ভার্চুয়াল দুনিয়া উপাখ্যান...

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

মালেকা পারভীন

সেপ্টেম্বরের অমন বিভীষিকাময় সন্ধ্যা আমার জীবনে যেন আর কখনো ফিরে না আসে। দম বন্ধ হয়ে মরে যাবার অনুভূতি হয়েছিল আমার। আগেও কখনো কখনো এমন ভয়াবহ অনুভূতির অভিজ্ঞতা হয়েছে। এক দুর্বিষহ মানসিক যাতনা। এই যন্ত্রণার স্বরূপ কেবল ভুক্তভোগীই টের পায়, আর কেউ নয়। তবে সেপ্টেম্বরের সেই সন্ধ্যায় আমার ক্ষুদ্র অস্তিত্বের প্রতিটি জীবন্ত কোষে যে তুফান আছড়ে পড়া তোলপাড় উঠেছিল, তেমন ভয়ঙ্কর চাপ আগে কখনো অনুভব করেছি বলে মনে পড়ে না।

তবে বহু বছর আগে তারুণ্যের ঘোরলাগা দিনে ভালোবাসার আবেদন যখন রূঢ় বাস্তবতার নানা যুক্তি দেখিয়ে প্রত্যাখ্যানের দরজা থেকে বারবার ফিরে আসছিল, তখন এ রকম খানিকটা অনুভূতি আমার হয়েছিল। কিন্তু মাঝসমুদ্রে ভেসে গিয়েও মানুষ যেমন খড়কুটো ধরে বাঁচার স্বপ্ন দেখতে থাকে, ওই বিক্ষুব্ধ সময়গুলোতে নিখাদ ভালোবাসার শক্তিটাই খড়কুটোর কাজ করেছিল। আমি জানতাম, প্রকৃত ভালোবাসা ফিরিয়ে দেবার মতো মনের জোর কোন মানুষেরই থাকে না। উপরন্তু, সে যদি আবার ভীষণভাবে ভালোবাসার কাঙাল হয়ে থাকে।

থাক, যে কথা বলতে এত কথা বলা। সেপ্টেম্বরের সেদিনের পুরোটা ছিল অসহনীয় ব্যস্ততার মোড়কে মোড়া। দু'দিনব্যাপী একটা কনফারেন্সের শেষ দিন। শরীরটা ভালো ছিল না। সারাদিন কনফারেন্সে বসে থাকতে থাকতে শরীর-মন দুই-ই অবসন্ন হয়ে এসেছিল। কখন ঘরে ফিরবো, সেই ভাবনায় অস্থির হয়ে উঠেছিলাম। মনটা খারাপ ছিল আরও একটা কারণে। গত দু'সপ্তাহ ধরে তার সাথে কোন যোগাযোগ নেই। শেষ যেদিন টেলিফোনে কথা হলো, শেষটা ভালো হয়নি। কথা শেষ না করেই প্রচ ঘৃণা উগরে দিয়ে ফোনটা সে রেখেছিল। তখন থেকেই আমার দম বন্ধ লাগা শুরু।

ঢাকা থেকে মোটামুটি প্রতিষ্ঠিত একজন লেখক দিল্লি এসেছে। সামান্য লেখালেখির সূত্রে তার সাথে পরিচয়। তাও ওই ভার্চুয়াল পরিচয়। সামনাসামনি দেখা হয়নি কখনো। সাথে নিজের পরিবার ছাড়া এক বন্ধুও আছে তার পরিবারসহ। পারিবারিক ভ্রমণ। দিল্লি থেকে আগ্রা, রাজস্থান; আরো কোথায় কোথায় যেন যাবে। প্যাকেজ ট্যুর-এর ব্যবস্থায় দিল্লির সাকেটে ম্যাক্স হাসপাতালের কাছে একটা হোটেলে উঠেছে। দিল্লি ঘোরার সাথে শরীরটাও একটু চেক করে নেওয়া।

আমি দিল্লি আছি দু'বছর ধরে। দিল্লি আসবার আগে সেই লেখক ফেসবুকে ছোট একটা স্ট্যাটাস দিয়ে ফেললো। আজকাল অনেকেই যেমনটা করে থাকে। অনেক মানুষের মনে ঈর্ষার বিষবাষ্প ছড়িয়ে দিয়ে। যেহেতু সবার জীবনে এমন বিদেশ ঘোরার সুযোগ আসে না। ফেসবুকিও ডায়ালেক্টে সেই লেখক স্ট্যাটাস দিলো : হুম, আসছি মোগলদের রাজধানী শহরে! এ রকম কিছু একটা। পরিস্কার মনে নেই। যা হয়, তার ওই স্ট্যাটাসে অনেকে লাইক-কমেন্ট করলো। আমিও বাদ গেলাম না। যেহেতু দিল্লিতেই আছি, সময় থাকলে দেখা হতে পারে, এমনটাই লিখেছিলাম। কমেন্টের সাথে তার ভ্রমণকে উদ্দেশ করে দু'পায়ের একটা ইমোজি। আমার দিক থেকে ঘটনা এতটুকুই।

ঘুণাক্ষরেও ভাবনায় আসেনি, দুজন স্বল্প-পরিচিত মানুষের সামান্য এই ফেসবুকিও ভাব-বিনিময় আমার জীবনে এতো বড় বেদনার কারণ হয়ে দাঁড়াবে। আমি সারা জীবনে যত রকম কষ্ট পেয়েছি, সবচেয়ে তীব্র কষ্টগুলোর একটি হয়ে থাকবে। না, আমার দূরবর্তী দুঃস্বপ্নেও এমন আশঙ্কা হানা দিয়ে যায়নি। কিন্তু আমি না ভাবলে কী হবে, আমার প্রায় প্রতিটি পদক্ষেপ যিনি অনুসরণ করেন, অনেক সময় আমার অজান্তে এবং হাজার মাইল দূরত্বের ব্যবধান সত্ত্বেও, তিনি ঠিকই দুয়ে দুয়ে চার করে ফেললেন।

আমার প্রতি তার বিশ্বাসে চিড় ধরেছিল সেই সন্ধ্যার ঘটনার আট/নয় বছর আগে, যখন আরেকজন তথাকথিত প্রতিষ্ঠিত লেখকের সাথে মূলত হাল্ক্কা ঠাট্টা-মশকরা জাতীয় একটা যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল। সেই লেখকের সম্পাদিত একটি সাহিত্য পত্রিকার ঈদ সংখ্যায় আমার একটি ছোটগল্প প্রকাশ করায় স্বাভাবিকভাবে আমি কৃতজ্ঞতায় গদগদ ছিলাম। খুব অল্প সময়ের মধ্যে তিনি আমার মোবাইল ফোন নাম্বার জেনে নিলেন। এর পরপরই ফেসবুকের সর্বনাশা বন্ধুত্বের জালে জড়ানো।

এখন অনায়াসে সর্বনাশা বলতে পারছি। তখন মনে হয়েছিল, দারুণ তো! এমন একজন নামকরা লেখক আমার ফেসবুক ফ্রেন্ড। তিনি আমার স্ট্যাটাসে, আমি তার স্ট্যাটাসে মন্তব্য করছি; লাইক বাটনে ক্লিক করছি। কাজের ফাঁকে ফাঁকে এ ভীষণ আনন্দের উৎস; একঘেয়ে ক্লান্তিকর জীবনে হঠাৎ পাওয়া উত্তেজনার খোরাক। ফেসবুক জমানা শুরু হবার সেই প্রথম প্রান্তিকে মনে কোন সংশয় কাজ করেনি এর ভবিষ্যৎ ভয়াবহতা নিয়ে।

নিজের ওপর বিশ্বাস আমার বরাবরই একটু বেশি। যদিও সেটির প্রকাশ কম। আমি সবসময় বিশ্বাস করেছি- আপ ভালো তো জগৎ ভালো। কিন্তু চরম চোট খেয়ে উপলব্ধি হলো- আপ ভালো হলেও যে জগৎ ভালো হবে- এর কোন নিশ্চয়তা নেই। অন্যের মনের গহিন অঙ্গনে কোন জটিল খেলার নীলনকশা আঁকা হচ্ছে, আমার মতো গোবেচারার পক্ষে সেটি কোনভাবেই অনুমান করা সম্ভব নয়। আমি বড়জোর আমার মনের কথাটাই বলতে পারি।

তারপরও বুদ্ধি-বিবেচনা যতটুকু সক্রিয় ছিল, তাতে কিছু বিষয়ে খটকা যে লাগেনি, তা নয়। সেই লেখককে দেখতাম, উন্মুক্ত স্থানে মানে ফেসবুকের খোলা পাতায় দুনিয়ার নানা প্রান্তের নানা বয়সের তরুণী-মহিলার সাথে বিভিন্ন মাত্রার উচ্চমার্গীয় সব আলোচনায় নিমগ্ন। নিজের ব্যস্ত জীবনের ফাঁক গলে যখন ফেসবুকে কিছু সময়ের জন্য ঢুঁ মারার সুযোগ হতো, এসব চোখে পড়তো। উপেক্ষা করবার চেষ্টা করতাম। তবে সবসময় এই উপেক্ষার চেষ্টায় লাভ হতো না। মানুষের মন বলে কথা। মন ছোট হয়ে যেতো, খারাপ লাগতো। কিন্তু এসব নিয়ে কখনো ওই লেখককে আমি কিছু জিজ্ঞাসা করিনি। মনে হয়েছে, এসব তার ব্যক্তিগত বিষয়। তিনি কার সাথে কোন ঘনত্বের আন্তরিকতায় কথা বলবেন, ভাব জমাবেন, এসব নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথার দরকার নেই। তার সাথে আমার সম্পর্কটা কেবল লেখালেখিকেন্দ্রিক থাকলেই হলো।

কিন্তু সে আর থাকলো কই! তিনি আমাকে যখন-তখন ইনবক্সে মেসেজ পাঠাতে শুরু করলেন। ছোট ছোট ক্রিপটিক মেসেজ। যেন আমাকে সুড়সুড়ি দিয়ে দেখতে চান, আমি সাড়া দেই কিনা। যত যাই হোক, এতো বড় একজন লেখককে তো আমি আর এক কথাতে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিতে পারি না। আমাকে খানিকটা কৌশলের আশ্রয় নিতে হয়। অনেকটা ধরি মাছ না ছুঁই পানি। এই কৌশলের একটাই উদ্দেশ্য ছিল, আজ হোক কাল হোক তিনি ঠিক বুঝে যাবেন যে সবার সাথে ফ্লার্ট করা যায় না। আমি আকারে ইঙ্গিতে এটিও তাকে বুঝিয়ে দিতে চাইলাম যে, আমার একটা চমৎকার দাম্পত্য জীবন আছে। এটার সাথে দুনিয়ার অন্য কিছুকে আমি গুলিয়ে ফেলি না, ইত্যাদি।

কিন্তু তিনি যেন নাছোড় বান্দা। কিছু একটা আমার মুখ থেকে বের করিয়েই ছাড়বেন। কত সেলিব্রিটি তার কথায় পটে গেলো। আর আমি তো সহজ-সরল একজন সরকারি কর্মকর্তা মাত্র, যার আবার লেখক হবার খায়েশ। মিডিয়া বলেন, শিল্প-সাহিত্য জগৎ বলেন, সবখানে নানা কিসিমের বিগ ব্রাদার আছে। এদের প্রভাব মেনে এসব জগতে প্রবেশাধিকার জোগাড় করে নিতে হবে।

একসময় সঙ্গত কারণেই তার সাথে আমাকে যোগাযোগ কমিয়ে ফেলতে হলো। তবে একদম যোগাযোগ-বিচ্ছিন্ন হই না। মাঝেমাঝে হাই-হ্যালো অব্যাহত থাকে। এর ভেতরেই ঘটে গেলো সেই দুর্ঘটনা, যার জন্য আমার কোনরকম প্রস্তুতি ছিল না। ঘরের লোক যে আমার হঠাৎ এই ফেসবুকে আসক্তি ভালোভাবে মেনে নিতে পারছিল না, ওই দুর্ঘটনায় সেটা প্রমাণিত হয়ে গেলো। অথচ এর আগে সে আমাকে একবারও বুঝতে দেয়নি যে, সে আমার আচার-আচরণের পরিবর্তনটুকু ভালোভাবেই লক্ষ্য করেছে। আর আমি বেকুব মহিলা দুনিয়ার সবাইকে আমার মতো বেকুব মনে করে বসে আছি।

অস্ট্রেলিয়া যাবার জন্য তৈরি হচ্ছিলাম। একটা ফেলোশিপে মনোনয়ন পেয়েছি অফিস থেকে। নানারকম কাগজ-পত্র গোছানো, ফর্ম পূরণ এসব নিয়ে একদিন সন্ধ্যায় বিছানায় বসে কাজ করছি। সেই লেখক জেনেছেন আমার বিদেশ যাবার কথা।

'আপনাদের কী ভাগ্য! কাজে-অকাজে বিদেশ যেতে পারেন!'

'অকাজে নয়। কাজেই যাই। সেই সাথে একটা নতুন দেশ দেখা হয়। এই যা।'

'ওটাই বলছি। আমাদের তো আর সেই সুযোগ নেই। কপালও নেই।'

তার এসব কথার কোন উত্তর নেই আমার কাছে। আমি চুপ করে যাই। আমাদের কথা হচ্ছিল ফেসবুকের ইনবক্সে।

জানি না, এর পর কী হয়েছিল। সম্ভবত ক্লান্তিতে আমি ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। কিন্তু মোবাইল ফোনটা তো আর আমার সাথে সাথে ঘুমিয়ে পড়েনি। টুং-টুং করে মেসেজ নিশ্চয় এসেছে। পড়বি তো পড় মালির ঘাড়ে। আমার জামাই এতোদিনে একটি মোক্ষম প্রমাণ হাতেনাতে পেয়ে গেলো। বেশ কিছুক্ষণ আমার কোন সাড়া-শব্দ না পেয়ে রোমান্টিক লেখক পাঠালেন সেই বিধ্বংসী বার্তা, যার দমকে আমার এতোদিনের বিশ্বাসের সংসার টলে উঠলো। 'ফারজানা, আমাকে আপনার সাথে নিয়ে যান!' সাথে চোখের পানি ঝরা চিহ্ন।

ওদিকে, চোখ কচলে আমি যখন জেগে উঠলাম, দেখি আমার মাথার কাছে থম মেরে বসে আছে জনাবে আলা। মুখের ওপর অমাবস্যার অন্ধকার। প্রথমে ভেবেছি, দু'দিন পরে বিদেশ যাবো। সেজন্য সবসময় যেমন করে, কয়েকদিন আগে থেকে মন খারাপ করে ঘুরতে থাকে। কথা-বার্তা কমে যায়। মাঝেমাঝে রক্তচাপও বেড়ে যায়। এবারও তাই ভেবেছি। এতো বড় দুর্ঘটনা ঘটে গেছে টের পেলাম রাতে ভাত খেয়ে ঘুমাতে আসার পর।

'তোমাদের সম্পর্ক তাহলে এ পর্যায়ে চলে গেছে?' আমি একবারেই বুঝি ফেলেছি সে কী ইঙ্গিত করেছে। তারপরও যেন বুঝতে পারিনি এমনভাবে বললাম,

'কিসের কথা বলছো?'

'ও, বুঝতে পারছ না? আরো খুলে বলতে হবে?'

'হ্যাঁ, খুলে বলো। বুঝতে পারলে তো আর উল্টা জিজ্ঞাসা করতাম না।'

আমি হাল্ক্কা ঝাঁজের সাথে বললাম, যাতে ওর ঝাঁজটা একটু কমে আসে। দেখি, সে চুপ করে আছে। আর তেমন কিছুই বলছে না। কিছুক্ষণ পরে আরেক পাশে ফিরে ঘুমানোর ভান করলো। বুঝলাম, তার যে স্বভাব, আর কিছু বলবে না। যা বলার সে বলেছে। এটা থেকেই আমাকে বুঝে নিতে হবে।

ততক্ষণে একটা অস্থিরতা আমার স্নায়ুর ওপর চেপে বসতে শুরু করেছে। মনে হলো, তাকে কিছু বলি, যাতে অকারণ ভুল বোঝাবুঝি না হয়। যেহেতু আমার দিক থেকে আমি পরিস্কার, কাজেই এটা নিয়ে ওর মনে শুধু শুধু ধোঁয়াশা রেখে সংসারে অশান্তি করার দরকার নেই।

'আমার কিছু কথা ছিল' বলে তার পিঠে হাত রাখি। হাত সরিয়ে সে সোজা হয়ে সিলিং-এর দিকে তাকিয়ে থাকে। অন্ধকার ঘরে ডিম আলোতেও আমি তার ভ্রু কুঁঁচকে থাকা দেখতে পাই।

'তোমার কাছ থেকে এমনটা আশা করিনি।' আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে স্বগতোক্তির মতো উচ্চারণ করে।

'তুমি আমার পুরোটা শোনো, তাহলে বুঝতে পারবে।'

'বোঝার আর কী বাকি আছে? গত কয়েক মাসে তোমার বদলে যাওয়া আচরণ, যতক্ষণ বাসায় থাকো সারাটা সময় ওই ফেসবুক; আমার সন্দেহ হয়েছিল, কিছু একটা হয়েছে। আজ সব পরিস্কার হয়ে গেলো।' আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে সে একাই কথা বলে যেতে থাকলো।

বুঝে গেলাম, এ মুহূর্তে ওকে কিছুই বোঝানো সম্ভব নয়। যে মেসেজ ওর চোখে পড়েছে তাতে অবশ্য এমনটা ভাবাই স্বাভাবিক। নিজের সরলতা নিয়ে নিজেই বিরক্ত হয়ে উঠলাম। তারপরও মনে হলো, আমার মনে সত্যিই কোন পাপ নেই। কেবল লেখক বলেই একটা যোগাযোগ বজায় রাখতে চেয়েছি। যখন থেকে খেয়াল করলাম, তার কথার সুর অন্যদিকে ঘুরে যাচ্ছে, আমি সতর্ক হয়ে গেছি। আমার এই সাবধানী ব্যবহার সেই লেখকের জহুরী-চোখে ঠিকই ধরা পড়েছে।

কবিতা ভালোবাসি বলে মাঝেমাঝে স্ট্যাটাসে প্রিয় কবিদের কবিতার কিছু পঙ্‌ক্তি তুলে দিতাম। একদিন ক্রিস্টিনা রোসেটির 'রিমেম্বার' কবিতার পুরোটা তুলে দিয়েছি। লেখক মনে হয় এই কবির কবিতা আগে কখনো পড়েননি। কবিতা পড়ে কী বুঝেছিলেন, কে জানে! একেবারে বিমুগ্ধ বিস্ময়ে পোস্ট দেবার সাথে সাথে ইংরেজিতে মন্তব্য করে বসলেন, 'ফারজানা, আমি আপনাকে সবসময় মনে রাখতে চাই' বা এ রকম কিছু। তখনো লাভ বাটন এসে হাজির হয়নি। সাথে সাথে পোস্টটা মুছে দিতে বাধ্য হয়েছিলাম।

আমার সাধারণ ধারণা বলেছিল, তার এই মন্তব্যের কয়েক রকম ব্যাখ্যা হতে পারে। পসিবল মিসইন্টারপ্রিটেশন এড়াতে তার মন্তব্যসহ পোস্টটা আমার ফেসবুক ওয়ালে রাখা সমীচীন মনে করিনি। তখনো মন্তব্য মুছে ফেলা বা লুকিয়ে ফেলার অপশন সম্ভবত আসেনি। এলেও আমার জানা ছিল না।

আমার আরো জানা ছিল না যে ঠিক কবে থেকে ঘরের লোকটা আমার এই হঠাৎ ফেসবুকপ্রীতি শ্যেন দৃষ্টিতে পর্যবেক্ষণ করে আসছে। তার স্বভাব যেমন, কোন কিছু খারাপ লাগলে সাথে সাথে বলবে না। মুখ চেপে কিছুদিন সাথে করে নিয়ে ঘুরবে। কথা-বার্তা কমে আসবে। কিছু একটা গণ্ডগোল হয়েছে বলে যখন আমি অনুমান করতে শুরু করবো, তখনই তার বিস্টেম্ফারণ ঘটবে। অনেকটা ঘূর্ণিঝড় আঘাত হানার আগে নিম্নচাপজনিত মেঘ থমথম করা অবস্থা।

সেই রাতে আত্মপক্ষ সমর্থনের জন্য সে আমাকে তেমন কোনো সুযোগ দেয়নি। এ রকম ভুল বোঝাবুঝি হলে আগে যেমন করেছি, নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করে একটা চিরকুট লিখে অপেক্ষা করতে থাকা। পরদিন সকালে অফিস যাবার আগেই সেই চিরকুট তার প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে দিলাম। লিখলাম, 'তোমার ফারজানাকে এতোদিনে তোমার চেনা উচিত ছিল। যা ভাবছো, তার ধারেকাছেও আমার চিন্তা-ভাবনা যায়নি। যাওয়ার কারণ নেই। একটু লেখক হবার বাসনা পোষণ করি বলে অনিচ্ছা সত্ত্বেও এ ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করে করেছি। তবে জেনে রেখো, আমার তরফ থেকে কখনোই সেটি ভদ্রতার সীমা লঙ্ঘন করেনি, করবে না। আমার আত্মসম্মানবোধ সেটি অনুমোদন করে না।'

এ রকম ভারি কথা ভরা চিরকুট তার হাতে পড়ার পর ব্যবহার স্বাভাবিক হতে কয়েক দিন সময় লেগে গেলো। কিন্তু এরপর যেদিন সে আমার সাথে আগের মতো কথা বলতে শুরু করলো, তার প্রথম বাক্যটি ছিল :

'ওরকম একটা ফাতরা লেখকের সাথে তুমি কথা বলেছ কোন রুচিতে?' তার কথা শুনে আমার তৎক্ষণাৎ প্রতিক্রিয়া হলো, যাক সে তাহলে আমার কথা অন্তত বিশ্বাস করেছে।

'তুমি কী করে জানলে, সে ফাতরা? তার লেখা পড়েছো?'

'লেখা পড়া লাগে না। তার ফেসবুকে ঢুকলেই হয়। দুনিয়ার মেয়েদের সাথে সারাক্ষণ রসালাপ চালিয়ে যাচ্ছে। ফাতরা না তো কী! একজন ভালো লেখকের এতো সময় থাকে, না রুচি থাকে এসব করার? আমি কিছুতেই ভেবে পাই না- তুমি কীভাবে পটে গেলা!'

আমি বুঝে গেলাম, আমার ভদ্রলোক জামাইকে যত আলা-ভোলা ভেবেছি, তার চেয়ে বেশি বুদ্ধি সে ঘটে রাখে। নিজের বউ কোন পরপুরুষের সাথে কথা বলছে, সে সরেজমিন তদন্ত করে শুধু বের করেনি; রায়ও দিয়ে দিয়েছে। আমি আর কথা বাড়াইনি। তবে সেই লেখকের সাথে যোগাযোগ একেবারে বন্ধ না করলেও মাত্রা কমে গিয়েছিল। গৃহশান্তি ধরে রাখবার জন্য তা দরকার ছিল। এরপর এ বিষয় নিয়ে আমাদের আর কখনো কোন কথা হয়নি।

কথা উঠলো ওই ঘটনার আট বছর পরে, যখন দিল্লিতে আমি আরেক লেখকের আগমন উপলক্ষে তার ফেসবুক স্ট্যাটাসে আলটপকা একটা মন্তব্য করে ফাঁসির আসামি বনে গেলাম। ঘটনাক্রমে এই লেখক সেই লেখকের ঘনিষ্ঠ বন্ধু।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় আমার বুদ্ধিমান জামাই সবসময় আমাকে ফেসবুকে অনুসরণ করে গেছে; আমার অজান্তে। আট বছর আগে চিরকুটে যে প্রত্যয়ের কথা লিখছিলাম, সে তা বিশ্বাস করেনি। বিশ্বাস করতে পারেনি পুরোটা। তাই আমি ভাবতে না পারলেও সে ভেবেছে, সেই লেখকের সাথে আমার একই রকম যোগাযোগ আছে। যোগাযোগ আছে বলেই তার আরেক বন্ধুর দিল্লি আসার খবরে আমি এমন উদ্বেল হয়ে উঠেছি। সাংকেতিক চিহ্ন ব্যবহার করে কথা বলেছি। আমি যে ভ্রমণের সাইন হিসেবে দুটো পায়ের ইমোজি দিয়েছিলাম আমার মন্তব্যে, আমার গোয়েন্দা জামাই সেটাকে ভেবেছে টেলিফোনে কথা বলার সাইফার কোড।

টেলিফোনের অপর প্রান্ত থেকে সে আরো অনেক আজেবাজে, অশ্নীল কথা আমাকে বলে গেলো সেই সন্ধ্যায়; গম্ভীর কিন্তু কঠিন গলায়। আমার বিরুদ্ধে এমন ভয়ঙ্কর অভিযোগ তার সংযত জিহ্বা আগে কখনো উচ্চারণ করেনি। হাজার মাইল দূর থেকে ইথারে ভেসে আসা টেলিফোনের সেই কথাগুলোর প্রভাব আমার ওপর এমন ছিল যে, সে যদি ওই মুহূর্তে সামনাসামনি আমাকে গলা টিপেও ধরতো, আমার এতোটা কষ্ট হতো না।

দিল্লির বিশাল এক অ্যাপার্টমেন্টের অন্ধকার ড্রইংরুমে অনেকক্ষণ চোখ বন্ধ করে বসে ছিলাম; একলা। সোফার ওপর বসে ঘাড় পেছনে ঝুলিয়ে। দুনিয়ার সমস্ত নিঃশব্দ নিসঙ্গতা আমার চারপাশ ঘিরে। সম্বিৎ ফিরে পেয়েই চট করে সোজা হয়ে বসি। তারপর সোফার ওপর রাখা ল্যাপটপটা টেনে নিয়ে অন করি। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যে ফেসবুকের যাবতীয় অনুরোধ উপেক্ষা করে একাউন্টটা ডিঅ্যাক্টিভেট করে দিই। যত অশান্তির মূল!!!