প্রযুক্তি ও বিড়ম্বিত ভ্রমণমালা

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

ফারুক মঈনউদ্দীন

প্রযুক্তি ও বিড়ম্বিত ভ্রমণমালা

নিষিদ্ধ নগরীর ভেতরের প্রশস্ত চত্বর

ঢাকা থেকে মঙ্গোলিয়া যাবার খুব সহজ রুট নেই। লাখ তিরিশেক জনসংখ্যা আর ছয় কোটি ঘোড়া নিয়ে চীন ও রাশিয়ার মাঝখানে চিড়েচ্যাপ্টা হওয়া ছয় লাখ বর্গমাইলের দেশটি খুব বেশি পরিচিত নয়। বিভিন্ন রুট ধরে মঙ্গোলিয়ার রাজধানী উলানবাটোর পৌঁছা যায়। সিউল, হংকং, ব্যাংকক হয়ে যাওয়া গেলেও সবচেয়ে সহজ পথটি হচ্ছে বেইজিং হয়ে; তবে আসা-যাওয়ার পথে বেইজিংয়ে এক রাত করে থাকতে হবে। আবার সরাসরি বেইজিংও নয়। ঢাকা থেকে প্রথমে কুনমিং, সেখান থেকে আবার প্লেন বদল করে বেইজিং। তাই চীনেরও ট্রানজিট ভিসা নিতে হয়। এক রাতের জন্য বেইজিং থাকতে হবে বলে এয়ারপোর্টের কোনো হোটেলে মাথা গুঁজে কাটিয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা ছিল আমাদের। কিন্তু প্রায় মধ্যরাতে এয়ারপোর্ট হোটেলে আমাদের জায়গা মেলে না। তবে তাদেরই পরামর্শে এয়ারপোর্টের বাইরে কাছাকাছি এক হেটেলে ঠাঁই হয় আমাদের। আমাদের মানে দেশের দুটো ব্যাংকের এমডি খোন্দকার ফজলে রশীদ ও মেহমুদ হোসেইন এবং আমি। উলানবাটোরে অনুষ্ঠিতব্য অ্যান্টি মানি লন্ডারিং বিষয়ক এক আন্তর্জাতিক সম্মেলনের জন্যই ওখানে যাওয়া।

সে রাতে যে হোটেলে উঠতে হয়েছিল সেটির মান নিয়ে কোনো মন্তব্য করার প্রয়োজন নেই। রাতের আশ্রয় যে মিলেছিল, সেটাই স্বস্তির। আমাদের উলানবাটোর ফ্লাইট বিকেলে বলে দিনের প্রথমভাগে নগর পরিভ্রমণে যাওয়ার জন্য হোটেল থেকে যে গাড়ির ব্যবস্থা হয়, তার ড্রাইভার এক তরুণী। আর গাইড হিসেবে সাথে ছিল পাংক স্টাইলে কাটা চুলের এক ছোকরা। একবেলায় বেইজিংয়ের কতটুকুই বা দেখা যায়! তাই ওরা আমাদের সময়ের সীমাবদ্ধতা বুঝতে পেরে নিয়ে যায় তিয়েনআনমেন স্কোয়ারের সামনে নিষিদ্ধ নগরীতে। চীনের ইউয়ান রাজবংশের সময় ফরবিডেন সিটির কাজ শুরু হলেও বড় প্রাসাদগুলো তৈরি হয় মিং রাজবংশের শাসনকালে। চীন সম্রাটদের বাসস্থান এবং পাঁচশ' বছর ধরে দেশটির প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল কেন্দ্র হিসেবে এই নগরীতে সম্রাটের অনুমতি ছাড়া কেউ ঢুকতে বা এখান থেকে বের হতে পারতো না বলে এটির নাম হয় ফরবিডেন সিটি।

কমিউনিজমের শক্তির প্রমাণ রাখতে মাও সেতুং নির্মাণ করিয়েছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে বড় স্কোয়ার তিয়েনআনমেন স্কোয়ার। তার সামনে নিষিদ্ধ নগরীর লাল দেয়ালের গায়ে ছবিতে শোভা পাচ্ছেন চেয়ারম্যান মাও। সেই দেয়ালে তিনটি ধনুকাকৃতি ফটক, দু'পাশের দূরবর্তী প্রান্তে একই রকম আরও দুটো ফটক। মেরিডিয়ান গেট নামে বিশাল এই স্থাপনাটি আসলে নিষিদ্ধ নগরীতে ঢোকার মূল তোরণ। মোট পাঁচটি প্রবেশমুখের মাঝখানেরটি নির্দিষ্ট ছিল মিং আর চিং সম্রাটদের জন্য। সম্রাজ্ঞীরও এই দরজা ব্যবহারের অধিকার ছিল বৈকি, সেটা জীবনে একবার মাত্র, কেবল তাঁর বিয়ের দিন। দু'পাশের দুটো অপেক্ষাকৃত ছোট দরজার একটি ব্যবহার করতেন মন্ত্রী ও রাজ কর্মচারীরা; আরেকটি রাজপরিবারের সদস্যরা। দু'পাশের বাকি দুটো দরজা ব্যবহার হতো বিশেষ কোনো উৎসব উদযাপনের জন্য। মাঝের মূল প্রবেশপথটির পাশের জায়গাটি ব্যবহূত হতো সম্রাটকে অসন্তুষ্ট করা কর্মকর্তাদের শারীরিক শাস্তি দেওয়ার জন্য। একবার এক অপরাধে ১৫৮ জন রাজ কর্মচারীর শাস্তি হয়। তাদের মধ্যে ১৫ জনকে এখানে পিটিয়ে মেরে ফেলা হয়েছিল। পরে মিং শাসনামলে এই নিষ্ঠুর শাস্তির বিধান বন্ধ করে দেওয়া হয়।

নিষিদ্ধ নগরীর ভেতর দুটো ভাগ- বহির্দরবার আর অন্তর দরবার। বাইরের অংশটি ব্যবহার হতো বিভিন্ন আনুষ্ঠানিক ক্রিয়াকর্মে। আর ভেতরের প্রাসাদটি ছিল সম্রাটের পারিবারিক বাসস্থান; রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যক্রমও চালানো হতো এখান থেকে। মেরিডিয়ান গেট পার হলে চোখে পড়ে দর্শনার্থীদের ভিড়ে থৈ থৈ করা বিশাল চাতাল। এখানে পৌঁছলে বোঝা যায় নিষিদ্ধ নগরীর বিশালত্ব। নগরীজুড়ে আছে ৯০টি প্রাসাদ, হাজারের কাছাকাছি ভবন এবং ৮ হাজার ৭০০টি ঘর। চত্বরের মাঝখানে রয়েছে হল অব সুপ্রিম হারমনি। চাতাল থেকে প্রায় তিরিশ ফুট উচ্চতার এই হলঘরের ভেতরের কাঠের কারুকাজ আর রঙ উচ্চকিত উজ্জ্বল সাজসজ্জার চীনা প্রবণতা স্মরণ করিয়ে দেয়। কেন্দ্রে স্বর্ণখচিত সিংহাসনকে ঘিরে আছে কুণ্ডলী পাকানো পাঁচ পাঁচটি ড্রাগন। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই বলে দীর্ঘ সময় নিয়ে বিশাল এই নগরীর একাংশও দেখার সুযোগ হয় না। দ্রুততম সময়ে এক ঝলকে আমরা পুরো কমপ্লেক্সের সামান্য অংশই দেখতে পারি।

গোল বাধে ফরবিডেন সিটি থেকে ফিরে আসার সময়। ওদের গাড়িতে যে জিপিএস ছিল, সেটিতে পথনির্দেশ পাঠাবার জন্য সামনের ড্যাশবোর্ডের একটা স্ট্ক্রিনের ওপর আঙুল দিয়ে লিখে দিলেই পথনির্দেশক যন্ত্রটি পথ বাতলানো শুরু করে। আজকাল ভয়েস মেসেজ দিয়েও জিপিএসকে নির্দেশ পাঠানো যায়। আমাদের সাথের পাংক চুলের গাইডটি কাকের ঠ্যাং বকের ঠ্যাংয়ের মতো চীনা হরফে কী সব লিখে দিলে জিপিএস সরব হয়। আমাদের গাড়ি সেই অলৌকিক যন্ত্রের নির্দেশমতো যেতে থাকে। গাড়ি চলছে, আমরা বেইজিংয়ের রাস্তার শোভা দেখতে দেখতে যাই। হোটেলে পৌঁছার সম্ভাব্য নির্ধারিত সময় পেরিয়ে যায়। দিশাহীন পথে গাড়ি চলতে থাকে গহীন অরণ্যের পাশ দিয়ে। আসার সময় পথের পাশে যেসব দৃশ্য দেখে এসেছিলাম, এটির সাথে তার কোনো মিল খুঁজে না পেয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে আমদের পাংক গাইডকে জিজ্ঞেস করি। তার মুখে এক কথা- নো প্রবলেম।

রাস্তা হারিয়ে ফেললে ফিরে আসার জন্য আমাদের সাথে কোনো বিড়ালও নেই। বিড়ালের কথা কেন বলছি, তার বিশেষ কারণ আছে। এক বাড়িতে বিড়ালের অত্যাচার চরমে উঠলে ওটাকে দূরে কোথাও নির্বাসন দেওয়া হয়। কিন্তু একদিনের মাথায় বিড়ালটি ঠিকই পথ চিনে ফিরে আসে। তাই ওটাকে দূরের কোনো জঙ্গলের মধ্যে ছেড়ে দিয়ে আসার ভার দেওয়া হয় বাড়ির চটপটে কেয়ারটেকারের ওপর। সে চটের থলেতে ভরে বিড়ালটিকে নিয়ে যায় বেশ দূরের একটা জঙ্গলে। সেই গহীন বনের মধ্যে বিড়ালটি ছেড়ে দিয়ে কেয়ারটেকার যখন ফিরে আসার পথ ধরে, ও বুঝতে পারে ওটাকে পথভ্রষ্ট করার জন্য যে ঘুরপথ ধরে বনের ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, সেই পথ আর খুঁজে পাচ্ছে না। ইতস্তত এদিক সেদিক ঘুরে যখন ফিরতি পথের সবকিছু তালগোল পাকিয়ে ফেলে বেচারা ক্লান্ত-বিধ্বস্ত, তখন দেখে বিড়ালটি আপনমনে হেঁটে যাচ্ছে; ওর দিকে ফিরেও তাকায় না। কেয়ারটেকার ওটার পিছু নিয়ে কিছু দূর যাওয়ার পর ফিরে যাওয়ার রাস্তাটা চিনতে পারে। খুঁজে পাওয়া সেই পথ ধরে অবশেষে বাড়ি ফিরতে পারে কেয়ারটেকার। কিন্তু বাড়ি পৌঁছে দেখে নির্বাসনে পাঠানো বিড়ালটি ওর আগেই বাড়ি ফিরে এসে জিরোতে জিরোতে দিব্যি হাই তুলছে। এমনকি একবার ওর দিকে তাকিয়ে ভেংচি দেওয়ার মতো একটা হাসিও দেয়। বেইজিংয়ের রাস্তায় পথ হারিয়ে এ কারণেই বিড়ালের অভাব বোধ করি।

যাই হোক, এভাবে কিছুক্ষণ চলার পর বুঝতে পারি, আমাদের তরুণী ড্রাইভার ও পাংক গাইডের মধ্যে কিছু একটা নিয়ে খটাখটি বেধেছে। নিজেদের ভাষায় ছেলেটি একনাগাড়ে কিছু বলে গেলে মেয়েটিও ওকে ছেড়ে কথা বলে না। দ্বিগুণ বেগে ছেলেটিকে ঝেড়ে যেতে থাকে। ঝগড়ার মাথামুণ্ডু কিছু না বুঝলেও আন্দাজ করতে পারি, জিপিএস যন্ত্রটি নিয়েই ওদের এই খটাখটি। পথনির্দেশ লেখা স্ট্ক্রিনের দিকে ওদের মনোযোগ এবং কিছুক্ষণ পর সব মুছে আবার স্ট্ক্রিনের ওপর কাকের ঠ্যাং লিখতে দেখে বুঝতে পারি, যন্ত্রটি ওদের ভুল পথে নিয়ে এসেছে। আমরাও বুঝতে পারি, এত লম্বা সময় লাগার কথা নয়। আসন্ন বিপদ বুঝতে পেরে আমরা গাইড ছোকরাকে ধমক দিতে শুরু করি। ওর অবস্থাও বিশেষ সুবিধের নয়। ভাঙা ইংরেজিতে কিছু একটা বলতে চাইলেও কোনো সদুত্তর মেলে না ওর কথায়। তাই ক্রমাগত ড্রাইভার মেয়েটির সাথে ঝগড়া করে চলে ও। সেই ঝগড়ার মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝি না। এক পর্যায়ে ক্ষেপে গিয়ে পথনির্দেশ লেখার স্ট্ক্রিনটির ওপর দশাসই কয়েকটা ঘুষি লাগায়। এবারে আমাদের বিলক্ষণ ধারণা হয়, যন্ত্রটি ওদের ভুল পথে নিয়ে এসেছে। পথের হদিস বের করার জন্য ছেলেটি ফোনে কারো সাথে কথা বলতে থাকে। আমাদের ভয়, এভাবে পথ হারিয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমাদের উলানবাটোরের প্লেন ধরা ভেস্তে যায় কি-না! এ রকম উৎকণ্ঠার মধ্যে আরও আধাঘণ্টার মতো চলার পর ওদের মধ্যে ভাবের পরিবর্তন লক্ষ্য করি। ছেলেটি একগাল হেসে জানায়, এখন আমরা হোটেলের খুব কাছে চলে এসেছি।

প্রায় এক সপ্তাহ উলানবাটোরে কাটিয়ে ফিরে আসার পথে বাধে আর এক বিপত্তি। আমাদের পাসপোর্টে চীনের ট্রানজিট ভিসা ছিল, তবে চীনে ঢোকার সময় অনুরোধ করেছিলাম, সেটি যাতে মোহর মেরে বাতিল না করা হয়। আমার সফরসঙ্গী দু'জনের ভিসায় মোহর মেরে দেওয়ায় সেগুলোর আর মেয়াদ ছিল না। এয়ারপোর্টে চেকইন করার সময় আমাদের তিনজনকেই আটকে দেওয়া হয় চীনের ট্রানজিট ভিসা নেই বলে। ওদের অনেক বোঝানোর চেষ্টা করা হলো, আমার সাথের দু'জন দুটো ব্যাংকের ম্যানেজিং ডিরেক্টর। কিন্তু এসব কথায় কান দেয় না ওরা। ওদের এক কথা, তোমাদের ভিসা নেই। বহু হট্টগোলের পর এক সময় ওরা একটা একটা সমাধান বের করে বলে, ঠিক আছে; আপনাদের লাগেজ বেইজিংয়ে নামবে না, সোজা যাবে ঢাকা। অর্থাৎ কেবল হ্যান্ড লাগেজ নিয়ে বেইজিংয়ের হোটেলে উঠতে হবে। ব্যাপারটা স্বস্তিদায়ক নয়। রাতের পোশাক, শেভিং কিট সবই চেকইন লাগেজে। এক কাপড়েই রাত কাটাতে হবে। তবু এই সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়া ছাড়া গত্যন্তর ছিল না। এখান থেকে ছাড়া পাওয়া যাচ্ছে, সেটাই যথেষ্ট। বেইজিং গিয়ে আবার নতুন ঝামেলায় পড়লে সেটা তখন ফয়সালা করা যাবে। বেইজিংয়ে অবশ্য কোনো ঝামেলা পোহাতে হয়নি। ওরা বিশেষ কোনো ঝামেলা না করে আমাদের ছেড়ে দেয়।

তবে কুনমিং এয়ারপোর্টে আরেক দফা হেনস্তার শিকার হতে হয় আমাদের। ট্রানজিটের জন্য প্লেন বদলাতে হবে দূরবর্তী এক টার্মিনালে গিয়ে। সেখানে যেতে হয় বাসে চেপে। আমাদের প্রিজন ভ্যানে নিয়ে যাওয়া কয়েদির মতো; কঠোর নজরদারির ভেতর ডিপার্চার টার্মিনালে পাঠানো হয়। ওদের ভাব দেখে মনে হচ্ছিল, চোখের আড়াল হলেই আমরা পালিয়ে যাবো। আচরণের মধ্যে ছিল না কোনো সৌজন্যবোধ। যারা আমাদের এই হেনস্তার পেছনের কারণ জানে না, তারা ভাববে, অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে হয়তো আমাদের দেশে ফেরত পাঠানো হচ্ছে।

নিষিদ্ধ নগরী থেকে ফেরার পথে জিপিএস যন্ত্রটির খামখেয়ালিতে যে বিপাকে পড়েছিলাম, সে রকম ঘটেছিল আরেকবার নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন ডিসি যাবার পথে। আমাদের গাড়ি চালিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল সৈয়দ কামরুল দম্পতি। কুইনসের কলেজ পয়েন্ট থেকে আমাদের তুলে নিয়ে নিউ জার্সি পর্যন্ত পরিচিত রাস্তা বলে কামরুল নিশ্চিন্তে গাড়ি চালিয়ে হল্যান্ড টানেল পেরিয়ে যায়; জিপিএসের প্রয়োজন পড়ে না। উন্নত দেশের গাড়িচালকরা আজকাল জিপিএস ছাড়া প্রায় অচল। সেসব দেশের বিশাল সড়ক ব্যবস্থায় সঠিক পথনির্দেশ ছাড়া অচেনা পথ চলা প্রায় অসম্ভব। রাস্তা চেনার জন্য পথের ধারে গাড়ি থামিয়ে কারো কাছে পথের সন্ধান জানতে চাওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না। কারণ সেসব দেশে হাইওয়েতে মানুষের হেঁটে পথচলা নিষিদ্ধ। আর নিষিদ্ধ না হলেও পদব্রজে হাইওয়ে পাড়ি দেওয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। তাই পথ চলতে সবারই জিপিএস ভরসা।

নিউ জার্সি থেকে আমরা টার্নপাইক মহাসড়ক ধরি। ১১৮ মাইল (প্রায় ১৯০ কি.মি.) দীর্ঘ সড়কটি আমেরিকার ষষ্ঠ ব্যস্ততম টোল রোড। এটির বিভিন্ন অংশে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যা সর্বনিম্ন ৪০ হাজার, আর সর্বোচ্চ দুই লাখ। এই গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়ক ধরে চলতে চলতে একসময় জিপিএসের নির্দেশনা মেনে আমরা কখন যে টার্নপাইক ছেড়ে শহরের ভেতরে ঢুকে পড়েছি, বুঝে উঠতে বেশ সময় লেগে যায়। একসময় নিজেদেরকে আবিস্কার করি গার্ডেন স্টেট পার্কওয়ের ভেতর।

শহরটায় ঘন ঘন ট্রাফিক সিগন্যাল, গাড়ির ভিড় আমাদেরকে আরো দেরি করিয়ে দিচ্ছিল। অথচ টার্নপাইক থেকে ভেতরে আমাদের যাওয়ার কোনো দরকার ছিল না। যাই হোক এক সময় আমরা আবার মহাসড়কে উঠে আসি। সকাল থেকেই আকাশ ছিল হালকা মেঘে ঢাকা। মেঘ ততক্ষণে ঘন হয়ে নেমে এসেছে, হালকা শুরু হলেও বৃষ্টিও একসময় গাঢ় হয়ে নামে। বৃষ্টির এই ডামাডোলে আমরা আবার টার্নপাইক থেকে বের হয়ে অচেনা এক শহরে ঢুকে গাড়ির ভিড়ে প্রায় হারিয়ে যাই। বারবার মূল সড়ক থেকে বেরিয়ে গিয়ে অজানা শহরে ঢুকে পড়ার রহস্য একসময় ফাঁস করে কামরুল। জিপিএসটি ও ওর কোনো বন্ধুর কাছ থেকে হাওলাত করে এনেছে। ধারণা করা যায়, যন্ত্রটিতে টোল রোড এড়িয়ে যাওয়ার অপশন দেওয়া আছে। ফলে যখনই সামনে কোনো টোল সংগ্রহকারী পয়েন্ট থাকে, তখন যন্ত্রটি হাইওয়ে থেকে সরিয়ে ঢুকিয়ে দিচ্ছে পাশের কোনো শহরে। তারপর টোল পয়েন্ট এড়িয়ে আবার মহাসড়কে তুলে দিচ্ছে। এতে টোলের টাকা বেঁচে যাচ্ছে বটে, কিন্তু ঘুরপথে গিয়ে শহরের ট্রাফিক জ্যামে পড়ে যে তেলের শ্রাদ্ধ ঘটছে, সেটা আর মাথায় নেই ওর বন্ধুটির। নিউইয়র্ক থেকে ওয়াশিংটন ডিসি-র দূরত্ব সাড়ে চার ঘণ্টার মতো। জিপিএস-এর চক্করে পড়ে সেটা কত ঘণ্টায় দাঁড়ায় কে জানে!

কামরুল জিপিএস-এ গন্তব্যের ঠিকানা দিয়েছিল :১৬০০, পেনসিলভানিয়া এভিনিউ, ওয়াশিংটন মেট্রো। ওর ভাবভঙ্গি দেখে মনে হচ্ছিল, যেন কোনো কুটুমবাড়ির ঠিকানা দিচ্ছে। আসলে এটি হচ্ছে মার্কিন প্রেসিডেন্টের বাড়ি, বিখ্যাত হোয়াইট হাউস। আমরা বাড়িটির খুব কাছাকাছি ঘুরঘুর করলেও ঠিক ওটার সামনে পৌঁছাতে পারছিলাম না। জিপিএস যন্ত্রটি ক্রমাগত আমাদেরকে এদিক ওদিক ঘোরাচ্ছিল।

সেদিন ন্যাশনাল মল-এর পাশে সন্ধ্যাতক ঘোরাঘুরি করে রাত কাটাই মেরিল্যান্ডের এক মোটেলে। সকালে নাশতার পর আমরা যাত্রা করি ওয়াশিংটনের উদ্দেশে। ২০-২২ মাইল রাস্তা ওখানে আধাঘণ্টার দূরত্ব, তবে ওয়াশিংটনে ঢোকার পথে সকাল বেলায় প্রচণ্ড চাপ থাকে গাড়ির। সেক্ষেত্রে মেরে-কেটে ঘণ্টাখানেক লাগতে পারে। রওনা হবার সময় আবার জিপিএস-এ ১৬০০, পেনসিলভানিয়া এভিনিউর ঠিকানা সেট করে নেওয়া হলো, যাতে প্রথমেই হোয়াইট হাউসে যাওয়া যায়।

কিন্তু যন্ত্রটির নির্দেশিত পথে ঘণ্টাখানেক চলার পরও ওয়াশিংটনের কোনো হদিস মেলে না। আমরা ঠিক কোথায় আছি, সেটাও বুঝতে পারি না। ওখানে তো আর পথে পথে দোকানপাট নেই যে সাইনবোর্ড দেখে অবস্থান বোঝা যাবে। জনশূন্য ধু ধু রাস্তা চলে গেছে, দু'পাশে গাছপালা ছাড়া দৃষ্টিসীমার মধ্যে আর কিছু নেই। সামনে কোনো জংশন নেই। সোজা রাস্তা বলে জিপিএসটি নির্বাক। কিছুক্ষণ পর যন্ত্রটি সবাক হয়ে আমাদেরকে যা বলে তাতে অধিক শোকে পাথর হওয়া ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। নারীকণ্ঠের মাদকতাও আমাদেরকে আকর্ষণ করে না। যন্ত্রটি আমাদেরকে নির্বিকার কণ্ঠে জানায়, 'টেক রাইট টার্ন আফটার টোয়েন্টি ফোর মাইলস।' অমোঘ পরিণতির মতো আমাদের সেই ভুতুড়ে নির্জনতার মধ্য দিয়ে অনিশ্চিত পথের দিকে এগিয়ে যেতে হয়। পথ হারিয়ে ফেলার অভিজ্ঞতার কথা কখনো কখনো পড়েছি গল্পে। সেসব ঘটতো গহিন জঙ্গলের ভেতর; কিন্তু খোদ মার্কিন মুলুকের রাজধানীর কাছাকাছি উন্মুক্ত সড়কে পথ হারানো অভিনব বৈকি। রাস্তার একটা সাইন পোস্টে জানা যায়, সামনে একটা সার্ভিস এরিয়া আছে। ওখান থেকে তেল নেওয়া যাবে, পথের হদিসও জানা যাবে।

তেল নেওয়ার ফাঁকে একটা ম্যাপ কেনা হয়। বাইরে দু'জন কাউবয় বেশভূষার লোক গাড়িতে তেল নিচ্ছিল তখন। কামরুল ওদেরকে জানায় আমাদের দুরবস্থার কথা। ওদের চেহারায় অবিশ্বাস- ও মাই গাড! লরেল থেকে ডিসি! এখানে কী করছো তোমরা! তারপর ম্যাপ দেখিয়ে বুঝিয়ে দেয় মূল রাস্তা থেকে ম্যারিল্যান্ডের কতখানি ভেতরে ঢুকে পড়েছি আমরা। কামরুলকে খুব বোকা বোকা দেখায়। সত্যিই বোকা হয়ে যাবার মতো অবস্থা। ওরা অনেকখানি সময় নিয়ে বেশ জটিলভাবে ওয়াশিংটন যাবার রাস্তা বাতলে দেয়। বুঝতে পারি, আমরা ম্যারিল্যান্ডের ভেতরে ক্রমাগত ঘুরপাক খাচ্ছিলাম। জিপিএসের কল্যাণে এক ঘণ্টার রাস্তা প্রায় চার ঘণ্টায় অতিক্রম করে বহু কসরতের পর আমরা যখন ওয়াশিংটনে ঢোকার মুখে ট্রাফিক জ্যামে পড়ি, তখন ভরদুপুর।