তুমুল গাঢ় সমাচার

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ

ধারাবাহিক

প্রকাশ: ০৬ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

বিনায়ক সেন

পর্ব ::২৬

[পূর্ব প্রকাশের পর]

পরবর্তী যুগে এ 'নাউ' ও 'ফ্রন্টিয়ার'-এর মতো সাহসী পত্রিকার সম্পাদক হয়ে সমর সেন ক্ষুরধার কলম ধরেছিলেন ঘনায়মান স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে ষাট-সত্তরের দশকে। বাংলায় যেমন লেখা হয়েছিল তার অনুপম গদ্য-গ্রন্থ 'বাবু বৃত্তান্ত', ইংরেজিতে লেখা তার কলামগুলোও ছিল তেমনিভাবে একাধারে যুক্তিনিষ্ঠ ও সাহিত্যগুণে সমৃদ্ধ। এ যেন সমর সেন চল্লিশের যুগের ব্ল্যাক-আউটের রাত্রিতে বসে এলিয়ট পাঠ করে চলেছেন, এলিয়টের স্বকণ্ঠে আবৃত্তি শুনবেন বলে উদগ্রীব হয়ে রেডিওর সামনে বসে আছেন এবং আর সব কবিদেরও সেই আবৃত্তি শুনতে বলছেন। একগুচ্ছ উদাহরণ :

১. বুদ্ধদেব বসুকে ১৯৪২ সালের অক্টোবর মাসের এক চিঠিতে এলিয়টের ফোর কোয়ারটেট্‌স নিয়ে লিখছেন :'গতকাল এলিয়ট BBC-তে East Coker-এর আবৃত্তি করলেন। চমৎকার লাগল। আপনি শুনেছেন না কি? আসছে সপ্তাহে Burnt Norton পড়বেন। দিনটা এখনও announce করেনি। এলিয়টের গলায় mature melancholy উপভোগ্য।'

২. বিষুষ্ণ দে'কে ১৯৪১ সালের নভেম্বর মাসে এক চিঠিতে লিখছেন : 'আসছে মঙ্গলবার রাত্রি আটটার সময় (ওঝঞ) এলিয়টের একটি বক্তৃতা আছে বিবিসি থেকে।'

৩. বিষ্ণু দে'কে ১৯৪২ সালের নভেম্বর মাসে আবার এক চিঠিতে লিখছেন :'মাঝে বিবিসিতে পরপর তিন সপ্তাহে এলিয়ট সাহেব East Coker, Burnt Norton ও Dry Salvages পড়বেন। সবচেয়ে ভালো হয়েছিল প্রথমটি। কিন্তু দেখলাম আপনার চেয়ে সুধীন বাবুর আবৃত্তির সঙ্গে এলিয়ট সাহেবের আরো মিল।'

সমর সেনের ওপরে এলিয়টের প্রভাব নিয়ে অমিয় কুমার বাগচী তার 'সমর সেন ও ভারতীয় বুদ্ধিজীবীর সমস্যা' প্রবন্ধে লিখেছেন যে ইতিহাসের মধ্যে অনেক ভুলভুলাইয়া ও চোরাগলি থাকে। সে রকমই কানাগলির মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছে সাধারণ মানুষ। আর তারই যন্ত্রণাবোধ প্রকাশিত সমর সেনের কবিতায় ও গদ্যে : 'এলিয়টের জীবনধারণ ও জীবনকৃতির সঙ্গে সমর সেনের জীবনধারণা ও জীবনপাতের ইতিহাস একেবারেই মেলে না। এলিয়টের মতো এবং এলিয়ট-প্রভাবিত আরও বিশিষ্ট বাঙালি কবির মতো তিনি জানতেন বোদ্ধা মানুষের আত্মম্ভরিতা কত ঠুনকো। কত দুর্বলাভিত্তি। কত অর্থহীন। কিন্তু এই নির্বেদ থেকে বাঁচার জন্যে অ্যাংলো-ক্যাথলিকের বিশ্বাসের কোনো ভারতীয় সংস্করণ তিনি খোঁজেন নি। প্রাচীন ভারতের স্বপ্নে নিজেকে মজিয়ে দিতে চান নি অথবা বিশুদ্ধ সংস্কৃতির পিছনে সারাজীবন ধাওয়া করে বেড়ান নি।'

মূল ইংরেজি স্তবক যেখানে এলিয়ট ইতিহাসের ভুলভুলাইয়ার কথা পেরেছিলেন, তা এই রকম। বিখ্যাত সেই উপলব্ধি :

'After such Knowledge, what forgiveness? Think now History has many Cunning Passages, Continued corridors And issues, deceives with whispering ambitions, Guides us by vanities.’

সমর সেন (বা বিষ্ণু দে'র) জীবন চর্চা ও আদর্শ এলিয়টের থেকে পৃথক ছিল, কিন্তু তার বিষণ্ণ উচ্চারণের ধরনেরও উপলব্ধির ছায়া পড়েছিল তাদের কাব্যে।

অমন যে নিভৃতচারী জীবনানন্দ, তিনিও এলিয়টের প্রতি জানিয়েছেন শ্রদ্ধাঞ্জলি।

জীবনানন্দের নানা লেখায় এলিয়টের আলোচনা অনিবার্যভাবেই এসে পড়েছে। কবিতা কি কেবল কিছু স্মরণযোগ্য লাইনের সমাবেশ? এই প্রশ্ন তুলে জীবনানন্দ তার সমসাময়িক কাব্যধারা সম্পর্কে লিখলেন :

'রবীন্দ্রনাথের পরে বাংলা কবিতায় উক্তির স্মরণযোগ্যতার প্রাচুর্যই খুব বেশি; ইংরেজিতে যাকে বলে 'ক্লেভারনেস'। ঠিক সে-জিনিস নয়- তার চেয়ে খানিকটা উঁচু তারে বাঁধা লাইন ও পঙ্‌ক্তির সমষ্টিই ঢের বেশি। একেই অনেকে কবিতা বলতে চান। আধুনিক ইংরেজি কাব্যের ক্ষেত্রেও দেখি এ রকম লাইন ও 'স্ট্যানজা' নিয়ে, যা সৃষ্ট হচ্ছে তা-ই কাব্য বলে পরিচিত হয়ে আসছে।

এ কথা বলার পরপরই তিনি ব্যতিক্রমী কবি হিসেবে এলিয়টের উদাহরণ দিলেন :

"এলিয়টের 'ওয়েস্ট ল্যান্ড'-এর কোনও অংশকেই বাকচাল এমনকি সহনীয় চাতুর্য বললেও অন্যায় করা হবে হয়তো, কিন্তু কানিংস ইত্যাদি অনেকের কবিতা অবান্তর চাতুরী ছাড়া আর কিছুই নয়। অডেন, স্পেন্ডর, ম্যাকনিস প্রমুখ কবির অনেক লেখাও এই ধরনের। এজরা পাউন্ড-এর আগেকার রচনাগুলো বাস্তবিকই কবিতা- তাঁর আধুনিক কাল্টোজ মহাকাব্যের অর্থ ও ইঙ্গিত বুঝবার ক্ষমতা আমাদের তো দূরের কথা, স্বয়ং ইয়েটস-এর কপালেও ঘটে ওঠেনি; এলিয়টও কি বুঝেছেন?"

স্পষ্টতই এলিয়টকে তিনি আর সকলের থেকে আলাদা সারিতে দেখেছেন তার প্রিয় কবি ইয়েটস-এর সাথে একই স্তরে। উপরের উদ্ৃব্দতি দুটো 'উত্তর-রৈবিক বাংলা কাব্য' (১৯৪৫) থেকে নেওয়া। জীবনানন্দের বেশিরভাগ প্রবন্ধই হয় অপ্রকাশিত থেকে গেছে তার জীবদ্দশায়, অথবা প্রকাশিত হয়েছিল কোনো কলেজ-পত্রিকায় বা স্বল্পখ্যাত স্বল্পায়ু সাময়িকীতে। এর ফলে এলিয়টের প্রতি জীবনানন্দের গভীর উপলব্ধির কথা অনেকটাই আলোচনার বাইরে থেকে গেছে। যেমন, কবিতার সমালোচনায় প্রথম অধিকার কবিদেরই, এমনকি তারাই হতে পারেন কবিতার শ্রেষ্ঠ সমালোচক- এলিয়টের এই আপ্তবাক্যের প্রতি জীবনানন্দের সমর্থন ছিল। 'কবিতা, তার আলোচনা' (১৯৪৯) প্রবন্ধে এলিয়ট অনুপ্রাণিত হয়েই তিনি লিখছেন :

'আমাদের দেশে গত দশ-পনেরো বছরে দেখা গেছে এমন সব লোক কবিতা সঙ্গীত মজলিসি সমাজকথা দেশ-বিদেশের মাঝে ও মেজাজ সম্বন্ধে একই নিঃশ্বাসে ভাষ্যকারের ভূমিকায় এমন আশ্চর্য সিদ্ধি দেখিয়ে গেছেন যে, কবি ও কবিতা কতকগুলো কবিতার বই ও সংকলন সম্পর্কে অনেক আধাআধি সত্য ও অস্পষ্ট ধারণা এখনও জের টানছে।... এ রকম মানুষদের হাতে কোনও যুগের কোনও দশকের কাব্যের বড় সমালোচনা ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়। সমালোচনার ক্ষতি হবে তাতে; কবিতারও ক্ষতি হবে; পাঠকেরাও ভুল জিনিস চাইবেন কবিতার কাছ থেকে।

কবিতার সৎ সমালোচনা আসতে পারে কবিদের কাছে থেকেই- বড় কবিরাই উপহার দিতে পারবেন কাব্যের বড় সমালোচনার-এর উদাহরণ হিসেবে জীবনানন্দ স্মরণ করলেন এলিয়ট প্রমুখ কবিকে :

'ইংলন্ডে কবিতার বিশেষ পাঠ- বড় সমালোচনা কবিদের দিয়ে ধারাবাহিক ভাবে করা হয়েছে : ড্রাইডে-এর পর জনসন। তার পর কোলরিজ, অল্প পরিসরে খুব বিখ্যাতভাবে ওয়র্ডসওয়র্থ পত্রের ভিতর দিয়ে কিটস, ডিকেন্স-এ শেলি, পরে আর্নল্ড, ইয়েটস ও পাউন্ড- আজকাল এলিয়ট।'

এলিয়টের প্রসঙ্গ আরো বিস্তৃত হয়ে এসেছে 'আধুনিক কবিতা' (১৯৫০) প্রবন্ধে :

'কিছুকাল থেকে এলিয়টকে নিয়ে নানা দিকের উৎসুক ভাবুক ও পণ্ডিত মহলে- য়ুনিভার্সিটিতেও কথাবার্তা চলছে... (এলিয়ট সম্বন্ধে কয়েকখানা প্রায়-প্রামাণ্য আলোচনার বইও ব্রিটিশ সমালোচকদের হাতে তৈরি হয়ে গিয়েছে)।' একই প্রবন্ধে কবিদের করা কবিতার আলোচনার ভেতরে উৎকর্ষের পার্থক্য নির্দেশ করতে গিয়ে আবারো জীবনানন্দ রবীন্দ্রনাথ ও এলিয়টের প্রসঙ্গ একযোগে টেনে আনছেন :

'রবীন্দ্রনাথ শেলিকে আর্নল্ড-এর চেয়ে স্পষ্টভাবে বুঝতে পেরেছেন এবং এলিয়ট ইংলন্ডের জর্জীয় কবি ও সমালোচকদের চেয়ে বেশি যুক্তিসিদ্ধ ভাবে। আমার মনে হয়, এলিয়ট যা পেরেছেন তার চেয়ে বেশি সংশ্নেষপূর্ণ প্রাণবত্তার ইংলন্ডের উনিশ শতকের কোনও-কোনও কবিকে ধরতে পেরেছেন রবীন্দ্রনাথ- যদিও এলিয়ট-এর বিচার ও বিশ্নেষণ, ও যে-ভাষায় তা প্রকাশ করা হয়েছে, সেই সমীচীন মেধাউজ্জ্বল স্পষ্টতার ফলে, আমরা ... যা জ্ঞান লাভ করেছি- এলিয়ট-এর সমালোচনা অবর্তমান থাকলে সেটা পাওয়া কঠিন হত নিশ্চয়ই।' তার পরপরই পাঠককে সতর্ক করে দিচ্ছেন জীবনানন্দ- 'এলিয়ট-এর সমালোচনার পদ্ধতি ও মীমাংসার সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত মতভেদ রয়েছে আনেকখানি যদিও।'

এ তো গেল 'সমালোচক' এলিয়ট সম্পর্কে জীবনানন্দের অভিব্যক্তি। কিন্তু তার কবিতা সম্পর্কে কী ভেবেছিলেন জীবনানন্দ? ১৯৩৭ সালের একটি অপ্রকাশিত লেখায় তিনি অনুভূতিকে জীবনানন্দীয় ধরনে এভাবে প্রকাশ করেছিলেন। 'কবিতা ও কঙ্কাবতী' শীর্ষক লেখার খসড়ায় তিনি লিখছেন :

"টি. এস. এলিয়ট-এর কবিতা সম্বন্ধে কোনও কথা বলতে আমি নানা কারণে দ্বিধা বোধ করি। কিন্তু তবুও তাঁর 'দ্য লাভ সঙ অফ আলফ্রেড প্রুফ্রক' পড়ে যদি তরুণ-তরুণীরা মনে করেন মানবপ্রেমের নব-সংস্কারের বাণী নিয়ে এসেছেন কবি, এসেছেন একজন নতুন সমাজ-সংস্কারক- এসো, আমরা আমাদের জীবনে তাঁর প্রেমের-সংস্কারকে প্রতিষ্ঠিত করে ক্রমে-ক্রমে 'হলো ম্যান' এবং 'হলো ওম্যান' হয়ে যাই, তা হলে বুঝতে হবে এলিয়ট-এর ছেঁড়া ছেঁড়া সৌন্দর্য-কুয়াশাকে ধরতে না পেরে হাড় নিয়ে খটখট করছে তারা। এলিয়ট-এর কবিতা যেখানে বাস্তবিকই কবিতা, সেখানে মুখ্যত সমাজ সংস্কার সৃষ্টি; শুধু বা কোনও সংস্কারই তারা নয়। কবি চিত্তের আবেগেই সৌন্দর্য সৃষ্টি করেন।"

এলিয়টের কবিতার বৃহৎ পরিসর আলোচনা জীবনানন্দ করেছেন অবশ্য তার একটি স্বল্প পরিচিত ইংরেজি লেখায়। সাহিত্যিক সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ সম্পাদিত 'কনটেম্পোরারি' বইতে এই গুরুত্বপূর্ণ প্রবন্ধটি প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৪৬ সালে, কমরেড পাবলিশার্স থেকে। এই প্রবন্ধের প্রথম লাইনটি 'অন্য জীবনানন্দ' সম্পর্কে আমাদেরকে সচকিত করে : : 'I may be a student of politics- in a faint way’ । ঐ প্রবন্ধে এলিয়টকে নিয়ে একটি দীর্ঘ কাব্যালোচনা করেছেন তিনি।

[ক্রমশ]