কাভাফির কবিতা

বইয়ের ভুবন

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

শুদ্ধ বন্দ্যোপাধ্যায়

কাভাফির কবিতা

সি. পি. কাভাফির কবিতা, ভাষান্তর ::আয়শা ঝর্না, প্রকাশক ::সংবেদ, প্রচ্ছদ ::মোস্তাফিজ কারিগর, প্রকাশকাল ::ফেব্রুয়ারি ২০১৯, মূল্য ::২০০ টাকা

'কোনো সহৃদয়তা, সহমর্মিতা ছাড়া, লজ্জা ছাড়া
তারা তৈরি করেছে বড় এবং উঁচু দেয়াল আমার চারপাশে
এবং আমি এখানে বসি নিরাশায়
এ ছাড়া অন্যকিছু ভাবি না, এই নিয়তি কামড়ায় আমাকে অনবরত...'
'দেয়াল', সি পি কাভাফি

ঊনবিংশ ও বিংশ শতকের সন্ধিলগ্নে আধুনিক গ্রিক কবিদের মধ্যে স্মরণীয় একজন কন্সটানটিনস পেট্রো কাভাফি, যিনি সিপি কাভাফি নামেই অধিক পরিচিত। ধরা হয় তিনি সমস্ত জীবনে মোট ১৫৮টি কবিতা রচনা করেছিলেন। যদিও তার জীবন পর্যালোচনা করে বোঝা যায়, প্রতি বছরে লিখিত অনেক কবিতা থেকে বাছাইকৃত সামান্য কিছু কবিতা তিনি প্রকাশ করেছেন। তাই তার লেখা কবিতার প্রকৃত সংখ্যা জানার মতো উপায় আপাতত নেই। তবে তার কাব্যবোধ ও সৃজনপ্রবণতা সম্পর্কে জানা-বোঝার উপায় অবশ্যই আছে- সেই ১৫৮টি কবিতা, যার বেশ কিছু আবার অসমাপ্ত।

এই কবিতাগুলোর অধিকাংশই কবির মৃত্যুর পর প্রকাশিত। ১৯৩৩ সালে পরলোকগত হওয়া কাভাফির কবিতাকে পরবর্তী সময়ে ইউরোপের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন অন্য দুই প্রখ্যাত কবি টিএস এলিয়ট এবং ইএম ফস্টার। বাংলা ভাষায়ও সামান্য কিছু প্রকাশ দেখা গেছে।

সম্প্রতি সিপি কাভাফির ৪০টি কবিতার বাংলা ভাষান্তর নিয়ে পুরো একটি গ্রন্থ প্রকাশ করেছেন কবি আয়শা ঝর্না। এর আগে সিলভিয়া প্লাথের 'এরিয়েল'-এর বাংলা রূপ এবং 'নারীস্বর' নামক আরেকটি গ্রন্থে বিশ্বের নারী কবিদের কবিতার বঙ্গানুবাদের কাজ করেছেন আয়শা ঝর্না। নিজের কবিতাচর্চার পাশাপাশি ভিনভাষার কবিতার অনুবাদে কবি আয়শা ঝর্নার মেধা ও আগ্রহের প্রকাশ আরও একবার স্পষ্ট হলো এ বছর ফেব্রুয়ারিতে সংবেদ প্রকাশনী সংস্থা থেকে প্রকাশিত 'সি.পি. কাভাফির কবিতা' নামক এ গ্রন্থটির মাধ্যমে।

৪০টি কবিতার অনুবাদসহ কাভাফির জীবনের সংক্ষিপ্ত অবয়বও সংযুক্ত হয়েছে এ বইয়ে। তার জন্ম আলেকজান্দ্রিয়ায়, ১৮৬৩ সালে। কবি হিসেবে তাকে চিহ্নিত হরতে গিয়ে আয়শা ঝর্না বলেছেন, মিস্টিক এ কবির কবিতায় রয়েছে ক্র্যাফটম্যানশিপ; সেই সঙ্গে রয়েছে মননশীলতার ছাপ। কাভাফির কবিতার আঙ্গিক, প্রেক্ষিত ও ফর্মের ভিন্নতা তাঁর কবিতাকে দিয়েছে নতুন মাত্রা। সে কারণে কাভাফি শুধু গ্রিসে নন, পশ্চিমা সাহিত্যেও সমান আদৃত। ইএম ফস্টার তো কাভাফিকে সম্বোধন করেছেন 'আমাদের সময়ের মহাকবি' বলে।

কবি আয়শা ঝর্নার ভাষায়, 'কাভাফি সেই দুর্ভাগা কবি, যিনি গ্রিক হয়েও থাকতেন আলেকজান্দ্রিয়ায়, যদিও তার নিজ দেশের প্রতি ছিল সুতীব্র টান। তাই তিনি ইউরোপে না গিয়ে দেশের কাছাকাছি থেকে কবিতার মৌলিক সুর খুঁজতে শুরু করেন এবং মিসরের ঐতিহ্যের সঙ্গে একাত্মতা বোধ করেন। এ জন্য কাভাফির কবিতায় হেলেনিস্টিক যুগের অনেক উপাদান, চরিত্র চলে আসে। কাভাফি কবিতার ক্ষেত্রে ছিলেন পারফেকশনিস্ট। াঁর কবিতা ফর্ম ও আঙ্গিকের দিক থেকে ছিল সে সময়ের কবিদের থেকে একেবারেই আলাদা। ফলে কাভাফির কবিতায় ছিল আধুনিকতার ছোঁয়া। তিনি ছিলেন জীবনবাদী।'

কবিতায় কবি কাভাফির এই জীবনবাদিতা কোথাও যেমন স্পষ্ট, আবার কোথাও অত্যন্ত ক্ষীণ সুরে কবিতার মূল স্বরের ভেতর দিয়ে যেন বয়ে যায়। কবি বলছেন, 'গোপন একটি স্বরে সমুদ্র কথা বলে/ সেই স্বর যা প্রবেশ করে/ আমাদের হৃদয়ে, ওঠানামা করে/ আর আনন্দ দেয়।/ সমুদ্র তার স্বরের ওঠানামায় আমাদের জন্য সুন্দর একটি গান গায়/ সেই গান তিনজন মহাকবি কম্পোজ করেছেন/ সূর্য, বাতাস আর আকাশ।'

সচেতন বাঙালি কাব্যরসিকমাত্রই অনুধাবন করতে পারেন বিশ্বকাব্যবাস্তবতায় বাংলা কবিতার পরম্পরায় স্পষ্ট যে বিবর্তন-বাঁক এবং তার সর্বশেষ অবস্থা, সে তুলনায় পাশ্চাত্য কাব্যরসের তুলনামূলক স্বাদ অনেক জায়গায়ই অধিকতর মোলায়েম, অধিকতর অবসর চেতনার আবেশের মতো মনে হয় যেন। এতে ভাষান্তরের সীমাবদ্ধতাও কিছুটা প্রভাব রেখে থাকতে পারে। সিপি কাভাফির কবিতাতেও সে ধরনের আবেশের উপস্থিতি আছে, তবে তা কবিতার জায়গায় জায়গায় চমকপ্রদ উৎপ্রেক্ষার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায়। তার কবিতার বিশেষত্ব অনুধাবন করতে হলে বাঙালি কাব্যরসিকদের পশ্চিমা কবিতার বিংশ শতকের গোড়ার দিককার সমসাময়িক কাব্যপ্রবণতার কথা মাথায় তো রাখতে হবেই, সেই সঙ্গে তখনকার সময়ে দাঁড়িয়ে কাভাফির জীবনদর্শনের অগ্রগামিতাও লক্ষণীয়। আর সবার ওপরে এ বইতে লক্ষণীয়, আয়শা ঝর্নার কবিতাবোধ ও অনুবাদ ক্ষমতা, সিপি কাভাফির কবিতার ভেতর দিয়ে যা পাঠককে নিঃসন্দেহে আনন্দ দেবে।