সফল মানুষ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

হাইকেল হাশমী

অফিসে মিটিং ছাড়া আর কিছুই নেই। একজন কর্মচারীর সিংহভাগ সময় এই মিটিং করাতে অতিবাহিত হয়। কিছু কিছু মিটিং খুবই গুরুত্বপূর্ণ হয়, আর কিছু মিটিং শুধু করার জন্য করা হয়; কিন্তু দুটোতে সমান সময় ব্যয় হয়। যা হোক, আমি একটি গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে ছিলাম। হঠাৎ সেলফোনের স্ট্ক্রিন জ্বলে উঠল কম্পনরত অবস্থায়। সেল বা মোবাইল ফোন যে একটি প্রয়োজনীয় উপদ্রব এটা স্বীকার করা ছাড়া কোনো উপায় নেই। যখন-তখন যেখানে-সেখানে বেজে উঠে। অন্য প্রান্ত থেকে সব সময় পরিচিতরা জিজ্ঞাসা করবে তুমি কোথায়? আরে ভাই আমি কোথায়, আমি বললেই তুমি বিশ্বাস করে নেবে আমি কোথায়, আমি তো যেখানে নেই ওখানকার কথা বলতে পারি। আবার আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ মিটিংয়ে সবার সেল ফোন সবার সামনে টেবিলে রাখা থাকে। আর যে বক্তা, তার কথা শোনার চেয়ে বেশি সবাই তাদের ফোন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। সিনিয়রদের কথা বাদ দিলাম, তারা পদমর্যাদা বলে যা ইচ্ছে তা করতে পারে;কিন্তু জুনিয়ররা তাদের ফোনের দিকে মিনিটে দশবার তাকায় যদি কোনো মেসেজ আসে, যদি কেউ ফোন করে তাহলে খুব জরুরি ফোন বলে বাইরে গিয়ে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আসা যায়।

যা হোক আমিও এমনই একটা মিটিংয়ে ছিলাম, হঠাৎ আমার ফোন কেঁপে উঠল, তাকিয়ে দেখি একটি অজানা নম্বর তাই কেটে দিলাম। একটু পর আবার সেই নম্বর থেকে ফোন, আমি আবার কেটে দিলাম; কিন্তু অন্য প্রান্তের মানুষটি নাছোড়বান্দা, বার বার ফোন করেই চলেছে। আমি একটু চিন্তিত হলাম যে কোনো জরুরি ফোন হতে পারে। তাই 'বস'-এর অনুমতি নিয়ে বাইরে গিয়ে ফোন ধরলাম। হ্যালো বলার সাথে সাথে অন্য দিক থেকে জিজ্ঞাসা করল যে, আমি মজিদ বলছি কি-না? যখন আমি তাকে নিশ্চিত করলাম যে আমি মজিদ বলছি, তখন তার গলার স্বর পাল্টে গেল, 'শালা এতক্ষণ ধরে তোরে ফোন দিচ্ছি বার বার লাইন কাইটা দিতাসো, অনেক বড় লাট হইসো নাকি?'

আমি তাকে এখনও চিনতে পারছি না তাই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আপনার একটু পরিচয় দেবেন?'

উত্তরে সে ফিল্মি কায়দায় বলল, 'সম্পর্কে তো আমি তোর বাপ হই কিন্তু আমার নাম শাহেদ।' আমি এখনও তাকে চিনি নাই; কিন্তু বলতেও পারছি না। তাই এমন ভাব করলাম যে তাকে চিনে ফেলেছি, বললাম, 'দোস্ত আমি একটা জরুরি মিটিংয়ে আছি, এই মিটিং সেরেই তোকে ফোন দিচ্ছি।' সে বলল, 'আচ্ছা তুই মিটিং সার তারপর আমারে ফোন দে।' আমি এখন নিজের ওপরই বিরক্ত, এটা নিশ্চয়ই আমার কোনো ঘনিষ্ঠ বন্ধু আর আমি তাকে চিনতে পারছি না। এখন কীভাবে তারে বলি তোকে তো চিনতে পারছি না। আমি সারা দিন একটি বিশৃঙ্খলার ভেতরে কাটালাম এটা চিন্তা করে যে, ওই ব্যক্তিটা কে? সে আবার আমার বন্ধু হওয়ার দাবি করছে। সন্ধ্যা বেলা আমার আর এক ঘনিষ্ঠ বন্ধু হাফিজ ফোন দিল আর কথায় কথায় বলল-

'দোস্ত, জাপান থেকে শাহেদ এসেছে, তোর কথা জিজ্ঞাসা করছিল, আমার থেকে তোর ফোন নম্বর নিয়েছে, তোকে ফোন করতে পারে।'

আমি তাকে বললাম, 'হ্যাঁ, একজন শাহেদ নামের লোক আমাকে ফোন করেছে, কিন্তু আমি তাকে ঠিক চিনতে পারছি না।'

হাফিজ বলল, 'তুই চিনলি না, ও তো আমাদের সাথে ওয়েস্টএন্ড স্কুলে পড়ত, পরে ওই যে একটি চুরির ঘটনার জন্য টিসি দিয়ে দেওয়া হলো।' আমার ততক্ষণে ওর কথা মনে পড়ল। হাফিজ আরও বলল, 'সে তো এখন জাপানে থাকে, তার বউ জাপানি আর ছেলেমেয়েরা ওখানেই পড়াশোনা করে। সে দেশে দুই সপ্তাহ থাকবে আর এখন তার পুরান বন্ধুদের নিয়ে একটি 'গেট-টু-গেদার' করতে চায়। তাই তোর ফোন নম্বর নিয়েছে।

তারপর মনে পড়ল সে তো আমাদের মহল্লা এলিফ্যান্ট রোডে থাকত। এটাও ঠিক, সে আমাদের সাথে ওয়েস্ট এন্ড স্কুলে পড়ত, একসাথে স্কুলে ফুটবল খেলতাম। সে একটু মাস্তান টাইপের ছিল। ওই সময়, সপ্তম শ্রেণিতে পড়ার সময় থেকে সিগারেট খেত, কয়েকবার ধরা খেয়ে শিক্ষকদের হাতে মারও খেল কিন্তু তাতে তার কোনো উন্নতি হলো না। সে বখাটে ছিল কিন্তু চুরি করবে এটা আমাদের বিশ্বাস হয় নাই। যা হোক, শাহেদ আমাকে ঠিকই ফোন করল, আমি এবার ওকে ভালোভাবেই চিনলাম আর একজন বন্ধু যেভাবে কথা বলে, অন্তরঙ্গভাবে সেই ভাবেই কথা বললাম। সে আমাকে 'গেট-টু-গেদারে'র কথা জানাল আর আমার থেকে প্রতিজ্ঞা করাল যে, আমি অবশ্যই তার বাসায় যাব সামনে শুক্রবার। আমি তাকে আশ্বস্ত করলাম যে, আমি অবশই আসব।

শুক্রবার আমি একটু আগেই চলে গেলাম তার বাসায়, তার তো আর আগের মতো থাকার কথা না, আমরা সবাই সময়ের সাথে সাথে পরিবর্তন হয়ে গেছি। তবুও তাকে চিনতে খুব অসুবিধা হয় নাই। সে আমাকে চিনে আমার সাথে কোলাকুলি করল। তখনও কেউ আসে নাই, আমি একমাত্র আমন্ত্রিত ব্যক্তি। আমরা তার বিশাল বসার ঘরে নরম সোফায় বসলাম। আসলেই তার বাড়িটা রাজকীয় ছিল। বিশাল বাসা, মার্বেল পাথরের মেঝে, দামি কার্পেট, দামি সোফা, শোকেসে দামি শো-পিস, বড় ঝাড়বাতি, এয়ারকন্ডিশন, বড় এলইডি টিভি, বেশ যত্ন করেই সাজানো। আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'ভাবি কই?'

সে বলল, তোর ভাবি তো এখানে থাকে না সে তো জাপানে থাকে আমার দুই মেয়েকে নিয়ে। মেয়েদের পড়াশোনার জন্য এখানে এসে বেশি দিন থাকতে পারে না। এই তো গত সপ্তাহ গেল।

আমি বললাম, 'যাক তুই এখনও ব্যাচেলর থাকার মজা পাচ্ছিস।'

সে হেসে বলল, 'এটা কি আর ইচ্ছে করে বন্ধু, বাধ্য হয়ে থাকতে হচ্ছে।'

আমি তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'আচ্ছা তুই এত দিন কী করলি? কোথায় ছিলি? এত দিন তো তোর কোনো খোঁজখবর পাই নাই।'

সে বলল, 'তোরা তো জানিস, তোদের সাথেই তো স্কুলে পড়তাম। ছাত্র খুব খারাপ ছিলাম না, একটু দুষ্ট প্রকৃতির ছিলাম এই যা। হাইটে একটু লম্বাও ছিলাম আর দেখলাম গায়ের জোর খাটিয়ে অনেক কিছু আদায় করা যায়, তাই একটু মাস্তানিও করতাম। ওটাই আমার জন্য কাল হয়ে গেল।'

'হ্যাঁ, আমার মনে আছে তোকে স্কুল থেকে টিসি দেওয়া হয়েছিল, আমরা সবাই জানি তুই নাকি স্কুলের পাখা চুরি করে বিক্রি করে দিয়েছিলি। এটা কি সত্য?'

সে হেসে বলল, 'জানি না তুই বিশ্বাস করবি কি-না। আসলে ওই দিন আমি সাইকেল করে এলিফ্যান্ট রোড দিয়ে যাচ্ছি, ওই যে নূর ম্যানশনের পাশে যে গ্যারেজ ছিল, ওখানে দেখলাম আমাদের ক্লাসের বল্টু আর ডাব্লু দাঁড়িয়ে গ্যারেজের মালিকের সাথে কী কথা বলছে। আমি তাদের দেখে ওখানে সাইকেল থেকে নেমে পড়লাম। দেখলাম, তারা একটা ফ্যান বিক্রি করার চেষ্টা করছে। আমাকে দেখে তার ঘাবড়ে গেল। বল্টু আমাকে এক সাইডে নিয়ে গিয়ে বলল, দোস্ত তুই বাগড়া দিস না, আমরা ফ্যান চুরি করে নিয়ে আসছি এখন বিক্রি করছি। তোকেও ভাগ দিব, গ গোল করিস না। আমি গ্যারেজের মালিক ভাইয়ের সাথে দাম-দর করে দেড়শ' টাকায় বিক্রি করিয়ে দিলাম। ওখান থেকে আমি থাবা মাইরা একশ' টাকা নিয়ে গেলাম এবং তাদের দু'জনকে পঞ্চাশ টাকা দিলাম। আমার কাজ এইটুকু ছিল।'

'তাই নাকি? আমরা তো জানি তুই ছিলি এটার হোতা।'

সে বলল, 'আরে না, পরে কী হলো, স্কুলে জানাজানি হলো, স্যাররা একটা কমিটি করলেন এই ঘটনা যাচাই করার জন্য। ওই ব্যাটা বল্টু আর ডাব্লু আমার ওপর পুরা দোষ দিয়া দিল, আমি নাকি বেচছি আর বেশি টাকা আমি নিয়েছি। যা হোক, স্যাররা মালিক ভাইকে জিজ্ঞাসা করলেন উনিও বললেন আমি ওদের সাথে ছিলাম। আমার আর করার কিছু ছিল না, টিসি খেয়ে গেলাম, ওই ব্যাটারাও বাঁচে নাই তাদেরও টিসি দিল।'

'তারপর কী হলো?' আমি কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞাসা করলাম।

সে উত্তর দিল, 'আর কী হবার ছিল বল? কাউকে মুখ দেখাতে পারতাম না, বাইরে গেলে লজ্জা লাগত। বাসায় থাকলে মায়ের কান্নাকাটি দেখে মন খারাপ হয়ে যেত। মা বলতেন, আমি কী কপাল নিয়ে জন্মাইলাম যে এই দিন দেখতে হলো, কী পাপ করেছিলাম কী জানি। এই সব বলত আর কাঁদত।'

'কান্না করারই তো কথা', আমি বললাম।

'তুই ঠিক বলছিস, মা কাঁদত আর বলত মহল্লার সব ছেলে বই হাতে করে স্কুলে যায় আর তুই এখন কী করবি? আমি তো তোর ভবিষ্যৎ দেখতে পারছি, হাতে টিফিন কেরিয়ার নিয়ে সকাল বেলা কোনো দোকানে যাচ্ছিস। হায়রে আমার কপাল।'

'তার পর তুই কী করলি?'

'চিন্তা করলাম, এই ভাবে বাসায় বসে থেকে তো লাভ নাই, মায়ের কান্না দেখা ছাড়া, আর বাপের বকা তো আছেই। তুই তো জানিস, আজিমপুর এতিমখানায় একটা স্কুল আছে তাই একদিন গিয়ে ওখানে ভর্তি হয়ে গেলাম। বাপ তো অনেক দুঃখ পেল। বললেন, 'তোর বাপ বেঁচে আছে আর তুই এতিমখানায় পড়াশোনা করছিস।' আমি বোঝালাম যে, ভালো স্কুল থেকে তো টিসি দিয়ে দিয়েছে, এখন একটাই লক্ষ্য, কোনোভাবে এসএসসি পাস করা।'

'তোর বুদ্ধিটা তো বেশ ভালোই ছিল', আমি বললাম।

'তুই তো জানিস, বখাটে ছিলাম কিন্তু বুদ্ধির কমতি ছিল না', সে মুচকি হেসে বলল। এর মধ্যে সে কাজের লোককে কফি দিয়ে যেতে বলল। আমরা গরম কফি খাচ্ছি আর গল্প করছি। আমার কৌতূহলের শেষ নেই তাই তাকে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তোর গল্প তো অসমাপ্ত রয়ে গেল, তার পরের ঘটনাগুলো তো বললি না।'

সে একটু চিন্তা করে বলল, 'এরপর ওই স্কুলে যাই। আসলে ওখানে গিয়ে পড়াশোনা তো আর করতাম না। আজিমপুরের কিছু মাস্তানদের সাথে পরিচয় হলো, সারা দিন বিড়ি-সিগারেট খেতাম, কোনো হোটেলে আড্ডা দিতাম, সভা-সমাবেশে অংশ নিতাম। মাঝে মাঝে হকিস্টিক নিয়ে প্রতিপক্ষকে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া করতাম। বেশ সক্রিয় ছিলাম। ওই বিশেষ মহলে লোকজন চিনতে শুরু করল।'

'তোর বেশ ভালোই তো উন্নতি হলো', আমি বললাম।

'এসএসসি পরীক্ষার সিট পড়ল তোদের স্কুলে। ওখানকার শিক্ষকরা তো আমাকে একজন গুণ্ডা হিসেবে চিনত। পরীক্ষার সময় পেছনের বেঞ্চে বসে আরামে বই খুলে পরীক্ষা দিলাম। কারোর কিছু বলার সাহস ছিল না। রেজাল্ট বের হলো, দ্বিতীয় বিভাগ পেলাম। তার পর রাজনৈতিক প্রভাব আর পেশির জোরে নিউমার্কেটের পাশে একটি ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে গেলাম।'

আমি খুব বিস্ময়ের সাথে জিজ্ঞাসা করলাম, 'তুই এইসব করলি কী করে?'

সে একটু কঠিন স্বরে বলল, 'যখন পিঠ দেয়ালে ঠেকে যায় তখন সবকিছুই করতে হয়।'

'এত নামকরা কলেজে ভর্তি হইলি তারপর সোজা পথে এলি কি-না?'

'একবার এই গর্তে ঢুকলে কেউ কি এত সহজে বের হতে পেরেছে দোস্ত? আমার সাথেও তাই হলো। বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন আমাকে লুফে নিল। তখন আমার দাপট আরও বেড়ে গেল। ছাত্র সংগঠনের নির্বাচন করে একটি ভালো পদ পেয়ে গেলাম। তখন লোকজন আরও তোয়াক্কা করতে শুরু করল। আমার দলে তখন অনেক লোক। আশপাশে মার্কেট, দোকান, কাঁচাবাজার, ফুটপাতের দোকান থেকে চাঁদাবাজি করে অনেক টাকা। টাকার কোনো অভাব রইল না। আবার দল নিয়ে বিভিন্ন এলাকায় মীমাংসা করার জন্য যেতাম। মাঝে মাঝে নিজের দলের লোকদের সাহায্য করার জন্য বিভিন্ন এলাকায় যেতাম। যা দরকার হতো করতাম, শক্তি বিস্তার করার জন্য যা যা প্রয়োজন তা-ই করতাম।'

'তা হলে তো তোর জীবনে বেশ রোমাঞ্চ ছিল'- আমি হিংসার স্বরে বললাম।

'তুই ঠিক বললি, রোমাঞ্চ ছিল, ঝুঁঁকি ছিল আর বিপদ ছিল।'

'কী বিপদ?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

'কোনো অন্য দলের লোকেরা সব সময় সুযোগ খুঁজত আমাকে নিচু দেখানোর, জীবনেরও ঝুঁকি ছিল। তা ছাড়া পুলিশও পিছু নিল।'

'এত কিছু করে তোর লাভ কী হলো?' আমি বললাম।

'লাভ মানে কী, যা তা লাভ হয়েছিল? কোটি কোটি টাকা বানালাম। তারপর মাথায় ঢুকল যে এত টাকা আয় করলাম, এখন যদি মরে যাই তাহলে কী লাভ হবে। তাই ব্যবস্থা করলাম, টাকা নিয়ে ব্যাংকক যাবার সিদ্ধান্ত নিলাম। যেই চিন্তা সেই কাজ। একদিন কাউকে কিছু না জানিয়ে রাতের অন্ধকারে এয়ারপোর্ট গেলাম আর থাই এয়ারওয়জের একটি ফ্লাইটে ব্যাংকক চলে গেলাম।'

'নতুন জায়গায় গিয়ে নিশ্চয় অসুবিধা হয়েছিল?' আমি জিজ্ঞাসা করলাম।

'তা তো বটে, কিন্তু টাকা যদি থাকে তবে সব মুশকিল আসান হয়ে যায়', সে হেসে বলল। 'তার পর ওখানে অনেক কষ্ট করে ব্যবসা করলাম, খুব সুবিধা করতে পারি নাই। তারপর জাপানে একটি ব্যবসার সুযোগ এলো। ওখানে চলে গেলাম আর ওখানে ব্যবসাটা বেশ জমে উঠল। বেশ বড় ব্যবসায়ী হিসেবে বিবেচিত আর স্বীকৃত হলাম। তোর ভাবির সাথে ওখানেই পরিচয়, তারপর বিয়ে। এখন তোদের দোয়ায় দুটি মেয়ে আছে তারা ওখানেই পড়াশোনা করছে। আমি অনেক দিন থেকে দেশের বাইরে ছিলাম, দেশের জন্য মন আনচান করত। এই বয়সে উপলব্ধি করলাম, সারা জীবন দেশ থেকে নিয়েই গেলাম কিছুই তো দিলাম না। এই ভেবে দেশে ফিরে এলাম যে, একটা ইন্ডাস্ট্রি করে কমপক্ষে কিছু চাকরির সুযোগ সৃষ্টি করব। ভালোই আছি, দুই মাস পর পর জাপানে যাই আবার ফিরে আসি। আমার বউ-বাচ্চারা আসতে চায় না, তাদের এই ঢাকা শহরের গেঞ্জাম ভালো লাগে না। কিন্তু আমার তো দেশ, আমার তো সব কিছু ভালো লাগে।'

এর মধ্যে অনেক অতিথি আসতে শুরু করেছে। পুরনো বন্ধুদের সাথে জমজমাট আড্ডা, হাসি, পুরনো স্মৃতি রোমন্থন আর একের অন্যের সম্বন্ধে খোঁজখবর দেওয়া-নেওয়া। বিশাল খাওয়া-দাওয়ার আয়োজন ছিল যাদের হার্ড ড্রিঙ্ক করার অভ্যাস ছিল তাদের জন্য রকম রকমের ব্যবস্থা ছিল। আর আমাদের মতো নিরামিষ লোকদের জন্য সফট ড্রিঙ্ক আর জুসেরও কমতি ছিল না। গভীর রাত পর্যন্ত আড্ডা চলল, তারপর আস্তে আস্তে আমরা সবাই বিদায় নিলাম। শাহেদ আমাদের আবার ডাকবে এই আশ্বাস দিল।

আমি কয়েক দিন শুধু এই চিন্তাই করলাম, আমাদের শিখানো হলো সৎ পন্থা অবলম্বন করে আয় করবে। নিষ্ঠা আর পরিশ্রম উন্নতির চাবিকাঠি; কিন্তু এখন তো দেখছি সফল আর ধনী তারাই হচ্ছে যারা অন্য পথ অবলম্বন করেছে। কয়েকদিন ধরে আমার মাথায় শাহেদের সমৃদ্ধি আর সম্পদের কথা ঘুরপাক খাচ্ছিল। একদিন আমি চিন্তা করলাম, এত ধনী আর বড় ব্যবসায়ী তার কথা তো আজ পর্যন্ত কারোর কাছে শুনি নাই, তার সম্বন্ধে বা তার ব্যবসার সম্বন্ধে কোথাও কিছু পড়ি নাই। তাই কম্পিউটারে তার নামের গুগল সার্চ দিলাম। অনেক শাহেদ সম্বন্ধে হিট এলো কিন্তু ব্যাংকক পোস্টের একটি খবরের শিরোনামে আমার চোখ আটকে গেল, '২০ বছর পর মাদক ব্যবসায়ী শাহেদ আলী যাকে ড্রাগ কিং বলা হতো জেল থেকে মুক্তি পেল। সে বাংলাদেশ থেকে এসে এখানে তার অবৈধ ব্যবসা স্থাপন করেছিল। তাকে বাংলাদেশে ফেরত পাঠানো হয়েছে' খবরের সাথে শাহেদের ছবিও ছিল।

আমি কম্পিউটারের স্ট্ক্রিনের দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলাম!