ভাগযোগের 'বালিশ'

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

লুনা নূর

ভাগযোগের 'বালিশ'

ছবি ::মোয়াজ্জেম মোস্তাকিম

সারাদেশ যখন 'বালিশ' আলোচনায় তোলপাড়, ঠিক তখন বালিশের দাম, দুর্নীতি, মানুষের মূল্যবোধ- এক বিষয় থেকে আরেক বিষয়ে ক্রমান্বয়ে সবার আলোচনায় গড়াতে থাকে। চায়ের টেবিল, রাজনৈতিক কর্মসূচি, সংবাদপত্র, টেলিভিশন টকশো সর্বত্র। আর তার সঙ্গে সঙ্গে আমার ভাবনার পেছনে ছুটতে থাকে আমার কৈশোরকালে একটি 'বালিশ', কখনও কখনও একটি দৃষ্টিভঙ্গি জীবনদর্শন তৈরি করে, যা হাজার চাইলেও আর আমি ফেলতে পারি না। ভাগ করে নেওয়ার বা ভাগাভাগি করে নেওয়ার মনস্তত্ত্ব, যা কিশোরকাল থেকে তরুণ, যৌবনকাল- পেরিয়ে এই চল্লিশোর্ধ জীবনে এসেও আমাকে বারবার ভাবায়। জীবনে ভোগ আর ভাগ (শেয়ারিং) মানুষকে কোথায় নিয়ে যেতে পারে, দুটি শব্দ মানব জীবনের দু'রকম অর্থ দাঁড় করায়, মানব জন্মের দুই ধরনের পরিপ্রেক্ষিত বর্ণনা করে। আমি ভাবতে থাকি আমার কৈশোরের স্মৃতি, আমার মা আর আমার ব্যবহূত বালিশ কীভাবে আমার দৃষ্টিভঙ্গি ও বেঁচে থাকার উদ্দেশ্যটাই পাল্টে দিল।

পারিবারিকভাবে আমি প্রকৃত অর্থেই মধ্যবিত্ত পরিবারের কন্যাসন্তান- অর্থনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সব বিবেচনায়। উনিশ শতকের শেষ দিকের একটি শহুরে মধ্যবিত্ত পরিবারের যা দৃশ্য; আমার পরিবার, আমাদের বাড়িঘর তা থেকে কোনোরকম ভিন্ন ছিল না। পুরোটাই একান্নবর্তী না হলেও বয়স্ক দাদা-দাদি, অবিবাহিত চাচা-খালারা কেউ না কেউ আমাদের পরিবারের সদস্য ছিলেন সব সময়। মফস্বল শহরে বাসা হওয়ায় গ্রামের ফুপাতো বোন, চাচাতো ভাই, খালাতো বোন- এদের কেউ না কেউ চাকরি, পড়াশোনা অথবা চিকিৎসার প্রয়োজনে বছরজুড়ে অতিথি অর্থাৎ বাড়তি মানুষ পরিবারে। আমাদের অভ্যস্ততায় এই অতিথি অনুষঙ্গ নিয়মিত ঘটনায় পরিণত হয়ে গিয়েছিল। খাওয়ার টেবিলে খাবার ভাগ করা, বাথরুমে সাবান-শ্যাম্পু ভাগ করা, আর রোজ রাতে বিছানা ভাগ করা আমাদের কাছে খুব স্বাভাবিক মনে হতো।

ত্রিশ বছরের দূরত্বে দাঁড়িয়ে, সদ্য শৈশবের দিকে তাকিয়ে দেখি- প্রতি রাতে আমার 'নিজের বালিশটি আরেকজন ব্যবহার করেছে'- এ নিয়ে মহা হট্টগোল লাগিয়ে দিতাম! আমার বাবা সমস্যা দীর্ঘায়িত না করার জন্যই হয়তো বলতেন, লুনার বালিশ যেন কেউ না ব্যবহার করে।

রাতের সমস্যা সমাধান করে সকালে ঘুম ভাঙার পর মা খবর নিতেন 'ঘুম হয়েছে... কোনো অসুবিধা হয়নি তো?' আমার আসলে ঘুমের অসুবিধার কোনো সুযোগ ছিল না। নিশ্চিন্ত মন, ফুরফুরা সময় ও শরীর, গভীর ঘুম হওয়াটাই স্বাভাবিক। তাই উত্তরও সোজা। আমার মায়ের পরের প্রসঙ্গটি আমাকে ওলটপালট করে দেয় আজও, 'বালিশটা ঠিক ছিল তো!' আসলে একটি তুলোর বালিশকে শুধু নিজের করে নেওয়ার বিষয়টি আমার মায়ের ভালো লাগেনি, তার সংকেতটি ভালো লাগেনি। তাই আমি যখন গভীর ঘুমে মগ্ন, তখন আমার মা আমার মাথাটি তুলে আমার বালিশটা পাল্টে দিতেন। শুধু পাল্টেই দিতেন না, সকালে সেটা ধরিয়ে দিতেন। অন্যের বালিশে শোবার কারণে আমার ঘুমের কোনো ব্যাঘাত ঘটেনি, শুধু নিজের করে নেওয়ার মধ্যে মানুষের একধরনের আত্মতৃপ্তি বা গরিমা আছে, আর কিছু না।

সবাই যখন বালিশের দাম- টাকার হিসাব দুর্নীতি নিয়ে দুর্ভাবনা করে; আমি তখন আমার মাথার বালিশের কথা ভাবি। আসলে ভাবতে থাকি, মানুষের জীবনে সার্থকতা কোথায়! নিজের করে নেওয়ায়? নাকি ভাগ করে নেওয়ায়?

কৈশোরের যে বালিশ আমি ভাগাভাগি করে ব্যবহার করেছি; সেই আমি এই বয়সে এসে পারলে সবটুকু ভাগ করে দিই নিজের সন্তানদের মাঝে, তার মধ্যেই শান্তি পাই। জীবনের উত্তাল সময়ে নিজেকে গড়ার শ্রেষ্ঠ সময়ে বারবার চেয়েছি সবার মাঝে, সবার প্রয়োজনে নিজেকে বিলীন করে দিতে। আসলে মানুষের জীবনটাই তাই, একা কখনও মানুষের জীবন এগোতে পারে না। সময় হয়তো পার হয়ে যায়, কিন্তু মানুষ তার জীবনকে অন্যের সাথে ভাগ করবার সুযোগ পায় একবারই!

আজকাল নগরে খুপরির মতো বাড়িঘরগুলোয় মানুষ হাতে গোনা যায়। একটি-দুটি সন্তান, স্বামী ও স্ত্রী- মফস্বল থেকে আসা আত্মীয়-স্বজনও কমে গেছে! কেন? মানুষ কি কমে গেল; নাকি আমরা আত্মকেন্দ্রিক হয়ে উঠছি দিন দিন। ওই যে বললাম, শৈশবে দেখেছি- আমাদের মফস্বলের বাড়িটি গমগম করেছে আত্মীয়-স্বজনে। আমরা ভাগ করে খাচ্ছি; আচমকা অতিথির আগমনে আমাদের কারও ভ্রু কুঁচকে যায়নি; আমরা হাসিমুখে তাদের হাত ধরেছি! আজকাল ফোন না করে শুনি কারও বাড়িতে কেউ যায় না। যত দিন যাচ্ছে, ততই এই আত্মকেন্দ্রিকতা আর ছোট ছোট খুপরিতে ভাগ হওয়া পৃথিবীর গল্প বেড়ে যাচ্ছে।

ছোট ছোট খুপরিতে ভাগ করা এই পৃথিবী গড়ছি কিন্তু আমরা নিজেরাই। শিশুদের আমরা চার রকমের বিদ্যালয়ে পাঠাতে শুরু করেছি। ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম, ইংরেজি ভার্সন আর মাদ্রাসা। রাজধানীতে আমরা এমন বিদ্যালয় গড়েছি; যাতে পড়তে মাসিক ব্যয় হয় বিশ হাজার টাকা! আবার ২০ টাকার বিদ্যালয়ে আজও আমরা আমাদের সব শিশুর পড়াশুনা নিশ্চিত করতে পারিনি। এই যে দূরত্ব- শিশুতে শিশুতে মাধ্যমে মাধ্যমে, পড়াশোনার সিলেবাস ও জীবনদর্শনে- আমরা আমাদের ভবিষ্যৎকে টুকরো টুকরো করে ছড়িয়ে দিচ্ছি শ্রেণিবৈষম্যের অতল গহ্বরে!

শিশুদের কাছ থেকে আমরা কেড়ে নিচ্ছি তাদের রঙিন শৈশব। তোমাকে প্রথম হতে হবে, হতে হবে সবার সেরা- এই অসুস্থ দৌড়ে যুক্ত করে আমরা তাদের সমস্ত শৈশব আর আনন্দকে গ্রাসই কেবল করি না, তাদের ফেলে দিই অন্তহীন এক অবাস্তব উল্লম্ম্ফনে। সারাটা জীবন তারা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে জীবনের আশ্চর্য সৌন্দর্যকে সবার সাথে 'ভাগ' করে উপভোগ করার স্পৃহা থেকে নিজেদের একেবারে হারিয়ে বসেছি। আমাদের আত্মকেন্দ্রিকতা আর তথাকথিত 'সাফল্যে'র বলি হয় আমাদের ভবিষ্যৎ, আমাদের সকল স্বপ্ন।

নিজেদেরও আমরা প্রতিযোগিতা থেকে দূরে রাখি না। এক অন্তহীন অতৃপ্ত বাসনা আমাদের শান্তির ঘুম কেড়ে নেয়; যে যেখানে আছি- সেখানে আমরা তৃপ্ত নই। আরও, আরও এবং আরও- শুধু নিজের জন্য, কেবল নিজের জন্যই আমাদের সব আয়োজন ! এই আত্মবিধ্বংসী আত্মকেন্দ্রিকতা আমাদের ছিন্নভিন্ন দ্বীপের বাসিন্দায় পরিণত করছে।

২.
মধ্যবিত্ত পরিবারে কৈশোর পার করে আমি যখন নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করি, তখন ভর্তি হই একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে ভিন্ন ভিন্ন জায়গা থেকে, ভিন্ন ভিন্ন পরিবারের সংস্কৃতির মানসিকতা ও শ্রেণির শিক্ষার্থীরা এসে জড়ো হয় এবং বছর-ছ'মাস পরে সবার ভাবনা, গল্প, স্বপ্ন সব একাকার হয়ে যায়, শুধু থাকে জীবনকে ভাগ করে নেওয়ার এক অদম্য স্পৃহা।

দেশের জন্য, বন্ধুর জন্য, কমরেডের জন্য, নিজেরটুকু দিয়ে ভাগাভাগি করে একটি নতুন কিছু নির্মাণ, নতুন ভাবনা আরও কত কী। চায়ের কাপে ভাগাভাগি, নোটখাতা ভাগাভাগি, সবকিছুকে ছাপিয়ে নিজেদের স্বপ্নগুলোকে ভাগ করে নেওয়াই হয় সে সময়ের প্রতীক। নিজের করে শুধু আমার করে আর ভাবা যায় না কিছুই।

জীবন এগিয়ে চলে সামনের দিকে। বন্ধুরা, কমরেডরা ছড়িয়ে পড়ে জগৎজুড়ে। যাকে দেখেছি- না খেয়ে বন্ধুর জন্য বসে আছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা; তার সময় হয় না, সেই বন্ধুকে একটি ফোন করে খোঁজ নেওয়ার! এই দূরত্ব কি শ্রেণি তৈরি করে? নাকি বাস্তবতা? নাকি ব্যস্ততা? নাকি জীবনের সত্যই এই- মানুষ ক্রমশ একা হয়; সব ফেলে সে নিজের জন্য একাকী একটি ঘর বানাতে চায়? নিজের জন্য; নাকি তার শ্রেণির জন্য? খুব কঠিন প্রশ্ন অবশ্য।

জীবনে চলতে গেলে আমি আছি ভাবতে গেলে সবার মাঝে আমাকে ভাবতে হয়। আসলে জীবন তাই- জীবনের সবক্ষেত্রে মানুষ এটাই করে কখনও বুঝে, সিদ্ধান্ত নিয়ে; কখনও স্বাভাবিক নিয়মে। এর বাইরে নিজের মতো করে ভোগ করার ভাবনা হয়তো অন্য একটি জগৎ তৈরি করে, যার মধ্যে অতৃপ্তি, না পাওয়ার বাসনা থেকেই যায়।

আজকাল যখন হাজার হাজার টাকার বালিশ কেনার খবর শুনি, আমি আমার মায়ের শান্ত চোখ দেখতে পাই। শৈশবে গভীর ঘুমের মধ্যে আমার মাথার নিচ থেকে তিনি বালিশ সরিয়ে নিতেন। বুঝিয়ে দিতেন, একটাই বালিশ- ভাগেযোগে সবাই মিলে ঘুমালে ঘুমের উনিশ-বিশ হয় না!... সেই শান্ত চোখ আমাদের চারপাশ থেকে হারিয়ে যাচ্ছে বলেই আমরা 'বালিশ কাণ্ডে' জড়াই। একটি রুটি সমান ভাগে ভাগ করে খাওয়ার মানসিক শক্তি ও চেতনা আমরা হারিয়ে বসি। প্রবল উল্লম্ম্ফনপ্রবণ সমাজ বাস্তবতায়, একা একজন মানুষকে নিয়ে বয়ে চলা গাড়ির সারি আমাদের যৌথ খামারের স্বপ্নও ভেঙে দেয়।

তার পরও কোথাও না কোথাও শান্ত কোনো কোনো চোখ জেগে তো থাকে! এই আমাদের বেঁচে থাকার সম্বল, টিকে থাকারও।