আধুনিকতা ও ভাগের বেদন

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

ফারুক ওয়াসিফ

আদম-হাওয়ার প্রথম প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে ছিল একটা ভাগের বেদনা। আদিতে তাদের 'আমি' নামক আপনবোধ ছিল না, ফলে 'তুমি' নামক অপরবোধও ছিল না। জ্ঞানবৃক্ষের ফল তাদের জুদা করল, জন্ম নিল ব্যক্তিসত্তাসহ দুই 'আমি'। এই দুই পরস্পরের চোখে হয়ে পড়ল আমি আর তুমি। ফলে স্বর্গের বাগিচার যে আদিম দুটি প্রাণী নিস্কাম বন্ধনে জড়িয়ে ছিল, তারা সকাম বন্ধনে জড়াবার তরে আলাদা হলো। প্রেম তাই এক ভাগের সংসার। আলাদা ব্যক্তিত্ব হয়ে না গজালে সেখানে আনুগত্য থাকতে পারে, বন্ধুত্ব থাকতে পারে, সহজাত টান থাকতে পারে; কিন্তু প্রেম থাকতে পারে না। বিরহ ছাড়া যেমন মিলন জমে না, তেমনি ভাবেই ঘটে ঘটনাটা।

শৈশব হারানোর আধুনিকতায় আমরা হারাই অপার্থিব সারল্য ও সুন্দর। এই হারানো সুন্দরকে ফিরে পেতে চাওয়াই তো প্রেম। আলাদা আলাদাভাবে আমরা তুচ্ছ হয়ে থাকি, কিন্তু অপরের প্রেমের চোখ সেই আমাকেই করে তোলে স্বর্গাদপী গরীয়সী। সেটাই তো প্রেম, যখন দু'জনই একই সঙ্গে ভাবে- 'দুজনে দুজনার'। পরক্ষণেই তারা বুঝতে পারে, আমার ভেতর সে, তার ভেতর আমি, তবু?ও আমরা এক নই- আমরা বিভক্ত।

মানব জাতির প্রথম ট্র্যাজিক মহাকাব্য 'গিলগামেশ' আমাদের এই বার্তাই দেয়। প্রকৃতির রাজ্য থেকে বিচ্যুত এনকিদু মানুষ হয়ে উঠল। তাকে সভ্য করে তুলল মোহনীয় শামাত, আর তার মধ্যে ঢুকিয়ে দিল সংস্কৃতি-সম্পর্ক-বন্ধুত্ব এবং উচ্চাভিলাষ। তবে সভ্যতার খেসারত হিসেবে তাকে হারাতে হলো দৈবক্ষমতা। বাসনার বিষেই সে বন্যসুন্দর থেকে জরাকাতর মানুষ হয়ে উঠল। তাই নগরে এসে গিলগামেশের সঙ্গে যুদ্ধে পরাস্ত হয়ে তারই বশ এবং তারই বান্ধব হতে হয় তাকে। এভাবে বাসনাজাত অভাববোধের সমিলে দুই বীরের বন্ধন জন্মাল। এই অভাববোধই কি প্রকৃতি থেকে বিচ্যুত আধুনিক মানুষের ব্যাধি নয়? নয় কি তার যুদ্ধ ও ভোগবাসনার মূলে? এ-ই কি নয় তার গন্ধম? আর এভাবেই কি সে পরাস্ত নয় নিজের কাছে? এনকিদুর পতন আধুনিক ভোগবাদী পণ্যায়িত সংস্কৃতিরই প্রতীক যেন।

এই বিভক্তির চেতনা থেকেই তো জন্ম যাবতীয় ইউটোপিয়ার। ইহকালে যে মিলনে তৃপ্ত হলো না মন, পরকালে বা পরজন্মে আবার সে প্রেমের সাধনের কথা চিরায়ত প্রেমের গল্পে আছে।

আমার মনে ইউটোপীয় চিন্তাভাবনার প্রথম উদয় ঘটেছিল এই ভাগের বেদনা থেকেই। সমস্যাটা ছিল 'বন্ধুর বাড়ি ওপারে, মোর বাড়ি এপারে, মধ্যে হইল ক্ষীরদ নদীর জ্বালা।' আমার বাড়ি বগুড়ায়, খালাতো ভাইবোন ঢাকায়, মামাতো ভাইয়েরা লক্ষ্মীপুরে, আর ফুফাতো ভাইবোন গাইবান্ধায়। মাটিতে কাল্পনিক মানচিত্র এঁকে জায়গাগুলোর অবস্থান দাগিয়ে মন খারাপ হয়ে যেত। কেন এত দূরে দূরে সবাই, কেন এত ভাগে ভাগে থাকে বন্ধুরা?

গাইবান্ধায় বেড়াতে গিয়ে যে বোনটির সঙ্গে বিলে শাপলা তুলতে যেতাম, তার সঙ্গে লক্ষ্মীপুরে যে ভাইবন্ধুদের সঙ্গে খালের জলে মাছ ধরতাম- তাদের কেন এক করা যাবে না? বগুড়ার জানি দোস্তকে কেন ঢাকার বন্ধুর সঙ্গে মিলিয়ে আড্ডা দিতে পারব না?

সেই থেকে স্বপ্ন এমন একটি গ্রাম হোক বা হোক শহর, যেখানে সব কাছের মানুষ একসঙ্গে থাকা যাবে। চাঁদনি রাতে বিদ্যুৎ চলে গেলে এক হৈহৈ আওয়াজে সবাই বেরিয়ে পড়ে জড়ো হবে পুকুরের ঘাটলার ধারে।

ইংরেজ কবি হেনরি ওয়ার্ডসওয়র্থের কবিতায় আছে- বালকের চিন্তা আকাশ-পাতাল অবধি প্রসারিত, বালকের ইচ্ছা মানে বাতাসের খামখেয়াল :

“Often I think of the beautiful town
      That is seated by the sea;
Often in thought go up and down
The pleasant streets of that dear old town,
      And my youth comes back to me.
            And a verse of a Lapland song
            Is haunting my memory still:
      “A boy’s will is the wind’s will,
And the thoughts of youth are long, long thoughts.”
(My Lost Youth : HENRY WADSWORTH LONGFELLOW)

বালক-বালিকাদের মধ্যে হিংসা-ঈর্ষার কথাটা যতটা সুবিদিত, তারা যে মূলত সাম্যবাদী, ভেদের ব্যকরণ ও ভাগের সংসার তারা যে মানে না, সেটা তো আমাদের শৈশবের দেখা। সরকারি স্কুলে সব শ্রেণি-ধর্মের ছাত্রছাত্রীরা একসঙ্গে পড়ত, একসঙ্গে বসতো, একসঙ্গে খেলত। খেলার মাঠেও কোনো শ্রেণিবিচার তেমন করতে দেখিনি। এমনকি ঈদ-পূজার মতো সামাজিক উৎসব ওপরের দিকে বৃক্ষের শাখার মতো আলাদা হলেও শিশু-কিশোর সমাজে তা গাছের গুঁড়ির মতো একাকার। বলা হয়, মানব জাতি তার শৈশবে এমনই সাম্যবাদী ছিল। সাম্যের টান অনেকের মধ্যেই যে টানাটানি করে, তার কারণ বোধহয় ওই শৈশবীয় রোমাঞ্চের স্বাদ।

উপনিবেশবাদও তো তাই, যা কিনা আমাদের সংস্কৃতির শৈশব কেড়ে নিয়ে আমাদের মন্দ অভিজ্ঞতায় অভিজ্ঞ করে তোলে। অভিজ্ঞতার বিষে মজে আমরা মজমা বসাই সংস্কৃতির ভাঙা সেতুর দু'পারে। কোনো আক্ষেপ জাগে না।

ইসলামের মহানবী বালক বয়সে বঞ্চনা ও বৈষম্য দেখেছিলেন বলেই হয়তো পরিণত বয়সে সাম্যের ডাক দিয়েছিলেন। রুশ বিপল্গবের দ্বিতীয় পুরুষ ট্রটস্কির বিশ্ববিপল্গবের স্বপ্ন তৈরি হয়েছিল খুব কৈশোরকালে।

তাঁদের ছোট শহরে আকর্ষণের জিনিস তেমন ছিল না। এরই মধ্যে ট্রটস্কিকে টানত শহরের এক কোণের এক কামারশালা। রোজ দুপুরে বাবা-মা খেয়ে ঘুমিয়ে গেলে বালকটি গুটিগুটি পায়ে চলে যেত সেই কামারশালায়। সেখানকার বলশালী কামারটি ছিল অদ্ভুত। অন্যের জন্য যন্ত্রপাতি বানানো শেষ হলে সেই কামার মহাশয় বসে যেত অদ্ভুত এক যন্ত্র বানাতে। সেটা হবে এমন এক ইঞ্জিন, যা কোনোদিন থামবে না- অর্থাৎ বিরতি দেবে না, ভাগ হবে না যার শক্তি ও গতি। এই চিরস্থায়ী ইঞ্জিনের কল্পনা ট্রটস্কির মনে এমনই গেঁথে গিয়েছিল যে, রুশ বিপল্গব বিজয়ী হওয়ার পরেও তিনি থামলেন না, ডাক দিলেন চিরস্থায়ী এক বিপল্গবের- পার্মান্যান্ট রেভ্যুলিউশনের। এই বিপল্গব কেবল এক দেশে হলে হবে না, হতে হবে বিশ্বব্যাপী, এবং তা চলতে থাকবে নিরন্তর। নইলে প্রতিবিপল্গব আবার থাবা বসাবে।

শৈশবের এসব ভাগবৈরী স্বপ্নের গোড়াটা কোথায়? আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের সাহিত্যের দুই দিগন্ত। এক দিগন্তে থাকে মনের অজ্ঞান প্রদেশ, যাকে আমরা অবচেতন বলি, স্বপ্নও বলি। আরেক দিগন্ত হলো ইতিহাসের জনজীবন। দুই মাত্রাতেই দেখি এক মিলনবাদী ইউটোপিয়ার জ্বলজ্বলে ইশারা।

মানবজন্মের প্রথম বিচ্ছেদ হলো মায়ের সঙ্গে নাড়ির বিচ্ছেদ। মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েডের মতে, এই বিচ্ছেদ শিশুকে ভোগায়। সে আবার ফিরতে চায় মাতৃজঠরের ওমে, পরম শান্তির অবিচ্ছেদী কোলে। বড় হতে হতে সে আলাদা হয়। কিন্তু মনের তলায় রয়ে যায় সেই নিশ্চিন্ত জোড়ালাগা মিলনের আধ্যাত্মিক বাসনা। আখতারুজ্জামান ইলিয়াসের 'নিরুদ্দেশ যাত্রা' গল্পটা যেন এই চিরায়ত আকুতিরই শিল্প। এটা তার প্রথম প্রকাশিত গল্প। গল্পটায় ঘোরগ্রস্ত একটি যুবকের ঘুম হয় না। তার কেবলই মনে হয়, 'আম্মার ঘরে কী যেন ফেলে এসেছি।' যুবকের নামটাও ইলিয়াসের ডাকনামের সঙ্গে মেলানো, 'রঞ্জু'। রঞ্জু কী যেন হারিয়ে ফেলেছে, সে তা জানে না। তার ফাঁকা লাগে, একলা লাগে, শোক হয়। হারানোর এই অনুভূতি শিল্পীকেও চালিত করে। আজীবনের কাজে, রচনায়, সঙ্গীতে সে তা খোঁজে। হয়তো তা মায়ের কোলের পরম শান্তি ও নিশ্চয়তা। নাড়ির সেই বন্ধন যৌবনে আমরা হারিয়ে ফেলি। তারপর না বুঝেই খুঁজি অন্য কোনো মানুষে, প্রকৃতিতে, দৈবে, ইতিহাসে। খুঁজি অন্য কোনো নারী বা পুরুষে, প্রেমিকের ভেতরে বাবাকে খোঁজা, প্রেমিকার মধ্যে মাকে খোঁজার এই মনোটানের নাম দিয়েছেন ফ্রয়েড যথাক্রমে ইডিপাস ও ইলেক্ট্রা কমপেল্গক্স। ইলিয়াসও কি 'আম্মার ঘরে হারিয়ে ফেলা' সেই পরম বন্ধন খুঁজে গেছেন মানুষের ভেতর, ইতিহাসের মধ্যে, মিথ ও প্রবাদে এবং মনের অন্ধকার প্রদেশে?

তাঁর চিলেকোঠার সেপাই উপন্যাসে ঊনসত্তরের অভ্যুত্থানের সময়ের ঢাকার রাজপথে বসে এক মহামিলন মিছিল, দেখা যায় বিদ্রোহের ধ্বংসাত্মক নন্দনতত্ত্ব।

'কালো কালো হাজার হাজার মাথা এগিয়ে আসছে অখ স্রোতধারার মতো। এই বিপুল স্রোতের মধ্যে ঘাইমারা রুই-কাতলার ঝাঁক নিয়ে গর্জন করতে করতে এগিয়ে আসছে কোটি ঢেউয়ের দল। ...উত্তর থেকে আসে বরফ-গলা শহরের স্রোত, উপচে উঠে মানুষ গড়িয়ে পড়ছে পাশের গলিতে-উপগলিতে। ...দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা। ওসমানের বুক ধক ধক করে ওঠে, এই এতদিনকার শহর কি আজ তার সব মানুষ, সব রাস্তা গলি-উপগলি, বাড়িঘর, সব অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যৎ নিয়ে গড়িয়ে পড়বে বুড়িগঙ্গার অতল নিচে। না দক্ষিণে বুড়িগঙ্গা তার শীতের শীর্ণ তনু একেবারে নিচে ফেলে উঠে এসেছে বিপুল স্ম্ফীত হয়ে, বুড়িগঙ্গার অজস্র তরঙ্গরাশির সক্রিয় অংশগ্রহণ না হলে কি এ রকম জলদমন্দ্র ধ্বনি উঠতে পারে?'

এই মিছিলে কেবল অনুভূমিকভাবে সমাজের সব ধরনের মানুষই আসে না, সময়ের ভাগ ভেদ করে উঠে আসে তিতুমীরের সঙ্গীরা, সিপাহি যুদ্ধের বিদ্রোহীরা, বাহাদুর শাহ পার্কে ফাঁসিতে ঝোলা লাশেরাও জীবন্ত হয়ে হাঁটতে থাকে তেভাগার কৃষক শহীদদের সঙ্গে। এই যে একাকার হওয়া ইতিহাস ও মানুষ, ইলিয়াসের এই স্বপ্ন কি ভাগাভাগির বিপক্ষের স্বপ্ন নয়?

খোয়াবনামা উপন্যাসে এই স্বপ্ন আরও স্পষ্ট ও সুন্দর। এক অদ্ভুত মায়াবী কাব্যিকতায় তিনি রচনা করেন তাঁর শ্রেষ্ঠ ইউটোপিয়া।

'এখন রাত। এখন কিন্তু অমন নয়। সন্ধ্যা থেকে আবছা কালো পাতলা একটা জাল পড়ে বিলের ওপর, সন্ধ্যা গড়ায় রাত্রিতে আর ঐ অদৃশ্য জালের বিস্তার বাড়ে ঐ সঙ্গে। অন্ধকার গাঢ় হতে হতে সেই বেড় জালের নিচে ধরা পড়ে সমস্ত এলাকা। রাত বাড়ে, রাত আরো বাড়ে, কেউ টের পাবার আগেই শুরু হয় জাল গোটানো। পাকুড়গাছ থেকে টান পড়ে জালের দড়িতে, আস্তে আস্তে দুই পাড়ের গ্রাম নিয়ে গোটা বিল তির তির করে কাঁপতে কাঁপতে এসে থিতু হয় বিলের মাঝখানে। পূর্ণিমা, অমাবস্যা, একাদশী- কী শুক্লপক্ষ কী কৃষ্ণপক্ষ-গিরিরডাঙা-নিজগিরিরডাঙা-কাৎলাহার বিলের দুই পাড়ের দুই গ্রাম এই বিলের মধ্যে একাকার হয়ে যায়। তখন যাই দেখো, একটার থেকে আরেকটার ফারাক ধরতে পারবে না। তখন বিলের সিথান থেকে সেই পাকুড়গাছ মস্ত ছায়া ফেলে বিলের ওপর। রাত বাড়ে, বিলজুড়ে তার ছায়া খালি ছড়াতে থাকে, ছড়াতেই থাকে। অমাবস্যার ঘনঘোট অন্ধকার কি পূর্ণিমার হলদে জ্যোৎস্না কিংবা কৃষ্ণপক্ষের ঘোলা লাল আলোয় সেই মস্ত ছায়া গতরে মুড়ে কাৎলাহার বিল, বিলের দুই পাশে গ্রাম, বিলের কাছে খাল, বিলের সিথানে পাকুড়তলা, ওদিকে দক্ষিণে শরাফত ম লের টিনের বাড়ি এবং বাড়ির পুবে সাদা বকে-ছাওয়া শিমুলগাছ- সব, সবই মায়ের কাছে ভাতের জন্য কাঁদতে কাঁদতে গায়ে মাথায় জাল জড়িয়ে ঘুমিয়ে-পড়া মাঝিপাড়ার বালকের মতো একটানা নিশ্বাস নেয়। সেই নিশ্বাসের টানে ফোঁপানির রেশ। সব একসঙ্গে দেখার তখন ভারী জুত। এই সময় বেড়জালের দড়ি টানতে টানতে বিলের মাঝখানের আসমানে এসে দাঁড়ায় মুনসি বয়তুল্লা শাহ। তার আগে সাঁতার কেটে কেটে চলে যায় ভেড়ার পাল। মুনসিকে একনজর দেখার সুযোগটা নিতেই তমিজের বাপের এখানে আসা। মুনসি কখনোই বেশিক্ষণ থাকে না। ওপরে আসমান আর নিচে পানি ও জমিন একেবারে একাকার। সবখানে মুনসির ইচ্ছামতন বিচরণ। সবাইকে একটি লহমার জন্য এক জায়গায় ঠাঁই করে দিয়ে জাল নিয়ে সে উড়াল দেবে উত্তরের দিকে। বাঙালি নদীর পথভোলা রোগা একটি স্রোত এসে মিশেছে। সেখানে কাৎলাহার বিলে। বিলের শিওরে পাকুড়গাছে বসে সকাল থেকে শকুনের চোখে মণি হয়ে ঢুকে মুনসি সূর্যের আকাশ পাড়ি দেওয়া দেখবে, দেখতে দেখতে হঠাৎ রোদে মিশে গিয়ে রোদের সঙ্গে রোদ হয়ে ওম দেবে বিলের গজার আর শোল আর রুই আর কাৎলা আর পাবদা আর ট্যাংরা খলসে আর পুঁটির হিম শরীরে। আর হয়রান হয়ে পড়লে পাকুড়গাছের ঘন পাতার আড়ালে কোনো হরিয়াল পাখির ডানার নিচে ছোটো একটি লোম হয়ে নরম মাংসের ওমে টানা ঘুম দেবে সারাটা বিকাল ধরে।'

মহৎ সকল সাহিত্যিককেই এই অভেদের কল্পনা তাড়িত করে। অমিয়ভূষণ মজুমদারের 'গড়শ্রীখে ' দেখব যে সব শেষ হয়ে গেল, সব ভেসে গেল। বানের তোড়ের মধ্যে শুধু দুই শান্দার ইয়াজ আর সুরতুন গিয়ে আশ্রয় নিচ্ছে নতুন জাগা ভূখ।ে তারা শেষের শুরুর দুই নারী-পুরুষ। নতুন এক জেনেসিসের নায়ক-নায়িকা। সেই নতুন চরটা হচ্ছে পূর্বদিকে। অর্থাৎ নতুন ইতিহাস শুরুর ইঙ্গিত পাচ্ছি, একটা ময়না দ্বীপে ও আর এ নতুন চরে। এই নতুন জাগা চরকে কি নতুন বাংলাদেশ বলা যায়?

এই অভেদের সমাজের কল্পনাই তো মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়কে দিয়ে লিখিয়েছিল পদ্মা নদীর মাঝি ও তার ময়নার দ্বীপের এজমালি সমাজের কথা।

শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়ের 'কাপুরুষ' উপন্যাসের স্পাই আর সন্ত্রাসবাদী দস্যু ছোটবেলায় ছিল গলাগলি বন্ধু। স্পাইটির নাম ছিল রূপা। শৈশবের মাঠে দস্যুটি বন্ধুকে ডাক দিত : 'রূপা বেন গাড়া রে!' রূপা স্বপ্ন দেখে, কৈশোরের সেই মাঠে আবার তারা দু'দিকে এসে দাঁড়াবে, আবার তারা একসঙ্গে ডেকে উঠবে 'বেন গাড়া রে!' আবার তারা মুখোমুখি হয় বটে, তবে একজন আরেকজনকে হত্যার জন্য।

আধুনিকতার এই ব্যথা ও বিচ্ছেদ আমাদের স্মৃতির দিকে ফেরায়। ফেরায় শৈশবের দিকেও। খুঁজে ফিরতে হয় আদি ও সরল কোনো অভিজ্ঞতা, যেখানে কবি উইলিয়াম ব্লেইক কথিত এক্সপেরিয়েন্স এসে ইনোসেন্সকে নষ্ট করে দেবে না!