দুইটা চা চারটা হেলিকপ্টার

প্রচ্ছদ

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

ইরাজ আহমেদ

'কী খাবেন?'
রেস্তোরাঁর লোকটির একঘেয়ে কণ্ঠে প্রশ্ন। 
'দুইটা চা চারটা হেলিকপ্টার।'
এক বন্ধুর গলায়

হেলিকপ্টার আবার কী! দুই কাপ চায়ের সঙ্গে হেলিকপ্টারের সম্পর্কই বা কোথায়? বিস্ময়ের মেঘ আমার মনের মধ্যে। কিন্তু যে বন্ধুটি রেস্তোরাঁয় ঢুকে অর্ডার দিল তার মধ্যে হেলদোল নেই, অম্লান বদনে সে বসে আছে একটা চেয়ারে। আমরা ক'জন ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে আছি মহল্লার মোড়ের চায়ের দোকানে। স্কুলের দরজা টপকে গেছি তখন। সবেমাত্র বসতে শুরু করেছি এখানে-সেখানে রেস্তোরাঁয়। চা, পুরি আর সিগারেটের সঙ্গে আড্ডা তখন হাত ধরেছে কেবল। তাই হেলিকপ্টার বিষয়টা বুঝতে সময় লাগল। একটু পরেই দুই কাপ চায়ের আগমন, সঙ্গী চারটি শূন্য কাপ। রেস্তোরাঁর লোকটি শূন্য কাপগুলোতে ভর্তি কাপ থেকে সমান মাপে চা ঢেলে দিয়ে গেল। চায়ের অর্ডার দেওয়া বন্ধুটি চা খেতে ইশারা করল। তখন কি হেলিকপ্টারের রহস্য কিছুটা হালকা হলো? হলো বোধ হয়। বুঝলাম, পকেটে পয়সা না থাকলে চা এরকম ভাগ করেই খেতে হয় এবং সেই ভাগের চায়ের নাম হেলিকপ্টার। সেই মনে হয় শুরু আমাদের ভাগেযোগে খাওয়া। এই আমরা মানে বন্ধুদের বহর। তখন কত ছিল এক কাপ চায়ের দাম? এক অথবা দেড় টাকা হতো। আমাদের পকেট সেই চাপ সহ্য করার মতোও সক্ষম ছিল না। তখন ভাত, সিগারেট, দেশি মদ, সিঙাড়া, পোশাক, রিকশাভাড়া, বই, কত কী যে আমরা ভাগ করে খেতাম অথবা ব্যবহার করতাম তার কোনো ইয়ত্তা নেই। 

একটা সিগারেট তিন থেকে চারবার হাত বদল হতো চোখ বন্ধ করে। তখন সিগারেটের বেলায় 'ফাস্ট বুক' আর 'কোম্পানিতে আগুন লাগা' এই দুটি কথা খুব ব্যবহূত হতো। হয়তো এক বন্ধু যত্ন করে একটা সস্তা সিগারেট ধরিয়েছে- ব্যস, শুরু হয়ে যেত বাকি বন্ধুদের নিলাম ডাকার মতো হাঁকডাক। একজন বলত ফাস্ট বুক। সঙ্গে সঙ্গে অন্যজন বলে উঠত সেকেন্ড বুক, অন্য একজন বলত থার্ড বুক দিলাম। এসব বুকিং ছিল একটা সিগারেট কতজন কতবার ভাগ করে খাবে, তারই মহড়া। এতগুলো ভাগের পরেও সিগারেটটা কিন্তু মূল মালিকের একচ্ছত্র অধিকারে আসত না, কেউ একজন বলে উঠত, 'কোম্পানিতে আগুন লাগার আগে একটু দিস।' এই কোম্পানিতে আগুন লাগার ব্যাপারটা বেশ মজার। প্রতিটি সিগারেটের শেষাংশে উৎপাদক কোম্পানির নাম লেখা থাকে। সেই পর্যন্ত ফিল্টারহীন সিগারেটটা পুড়লে আমরা বলতাম কোম্পানিতে আগুন ধরে গেছে। 

আমাদের সেইসব দিন আর ভাগাভাগির সংসারটা কিন্তু অসাধারণ আনন্দে ভরে থাকত। আমাদের চাহিদার তালিকাটা এখনকার মতো সব পেয়েছির দেশ হয়ে থাকত না। হাজারটা না-পাওয়া ছিল আমাদের। আর তাই হয়তো সেই ভাগাভাগির সংসারে আনন্দ ছিল অভিযোগহীন। 

আমার আদি মহলল্গার এক বন্ধু ছিল, প্রেমের ক্ষেত্রে যার ছিল অসামান্য দক্ষতা। আমরা যখন মহল্লার মোড়ের লাইটপোস্টে হেলান দিয়ে প্রেমহীন জীবন কাটাই আর দীর্ঘশ্বাস ফেলি, তখন সেই বন্ধুটি দক্ষ ফিল্ডসম্যানের মতো একের পর এক ক্যাচ ধরেই চলেছে। তার জীবনে প্রেমের কোনো অভাব ছিল না। সেই বন্ধুটির স্বভাব ছিল অন্য বন্ধুদের সুন্দর শার্ট বা প্যান্ট দেখলেই সেটা ধার করে পরে নিয়ে প্রেমিকার সঙ্গে দেখা করতে যাওয়া। বহু বছর আগের গল্প। আমার সম্পর্কে এক দাদা বিদেশ থেকে চমৎকার একটা জিন্সের শার্ট এনে দিলেন আমাকে। আমি তো সেই শার্ট গা থেকে আর খুলতেই চাই না। সেই শার্ট পরে পাড়ায় ঘুরছি আবার সেটা পরেই কলেজে যাচ্ছি। বন্ধুটি এক দুপুরে পাকড়াও করল আমাকে- শার্টটা তার এক বেলার জন্য চাই। মহল্লার দারুণ সুন্দরী এক কিশোরীর সঙ্গে তার কিছু একটা হবে হবে করছে। আমি ঘোর অনিচ্ছা থাকার পরও বন্ধুকে শার্ট ধার দিলাম। সে শার্ট নিয়ে গিয়ে তার মিশন সেরেও এলো। বিষণ্ণ বদনে শুনলাম, মেয়েটি প্রায় তার প্রেমে নিমজ্জিত। মেয়েটিকে আমিও চিনতাম। আমাদের কয়েকটা বাড়ি পরেই ছিল তার নিবাস। একদিন সেই মেয়েটির সঙ্গে হঠাৎ দেখা। বাড়ি ফিরছিল সে-ও। আমার গন্তব্যও বাড়ি আর পরনে সেই জিন্সের শার্ট। হঠাৎ ডাক শুনে থমকে দাঁড়াই। চশমার আড়ালে থাকা তার চোখ আমাকে চকিতে দেখে নিয়ে তার প্রশ্ন ছিটকে আসে, 'শোনেন, এই শার্টটা আপনার?' আমি তো আকাশ থেকে পড়ি। এমন কাচের চুড়িভাঙা গলা ডাকের পর এমন এক প্রশ্ন! 

'হ্যাঁ, আমার...আমার-ই তো।'
'মানে! এটা তো মিলুর শার্ট, আপনার হবে কেন? সেদিন বলল, ওর কোন আত্মীয় বিদেশ থেকে এনে দিয়েছে। '

বিস্মিত আমাকে সেদিন অনেক কথাই বলতে হয়েছিল নিজের শার্টের কৃতিত্ব রক্ষায়। আর তাতেই ধার করে শার্ট পরা আমার বন্ধুর ভালোবাসার ভবিষ্যৎ তলিয়ে গিয়েছিল অন্ধকারে। 

এত ঘটনা আর দুর্ঘটনার মাঝেও কিন্তু আমাদের সেই ভাগাভাগির পৃথিবী বেঁচে ছিল সগর্বে। আর থাকবেই-বা না কেন? আমাদের যেন ছিল এক যৌথ সংসার। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে দুপুরে পুরনো ঢাকায় ভাত খেতে যেতাম। সেখানেও ছিল আমাদের ভাগাভাগি। আমরা বলতাম 'ঠেকা দেওয়া'। কতদিন বান্ধবীদের নিয়ে গেছি খেতে, আরেক বন্ধু টাকা জোগাড় করে হাতে গুঁজে দিয়েছে। বন্ধুর মানসম্মান বলে একটা কথা আছে তো। রাত গভীরে গড়ালে এখনকার মতো খাবারের দোকান আর রেস্তোরাঁ আলো জ্বেলে বসে থাকত না। তখন হলে বন্ধুই ছিল ভরসা। তার রুমে মেস করে খাওয়া হতো হয়তো। সেই ভাতের ওপর চলত আমার আগ্রাসন। 

বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময়টা ছিল আন্দোলন আর বিপ্লবে ক্ষতবিক্ষত। বহুদিন রাতে সংঘর্ষের কারণে হল বন্ধ হয়ে গেছে হয়তো। হয়তো সংঘাতের কারণে গোটা ক্যাম্পাস অনিরাপদ। গভীর রাতে বাড়িতে বন্ধু এসে হাজির। কোনোদিন কোমরে গোঁজা থাকত মারণাস্ত্র আবার কোনোদিন হাতে গল্পের বই। অত রাতে দাদুকে তুলতাম ঘুম থেকে। তিনিই রান্নাঘরে হাঁড়ি ঘেঁটে খাবারের ব্যবস্থা করতেন। তারপর বিছানা ভাগ করে শুয়ে চলত আমাদের আড্ডা, বই পড়া। আমাদের ভাগাভাগির সংসার বাড়ির অন্দরমহলে এসেও হানা দিত এভাবে। 

এই ভাগাভাগির সংসারটা শুধু বন্ধুদের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল বললে ভুল বলা হবে। পাড়ায় প্রতিবেশী বাড়িগুলোর সঙ্গে আমাদের এই ভাগাভাগির সংসার জড়িয়ে থাকত লতায়পাতায়। কারও বাড়িতে ভালো রান্না হলে তা চলে আসত পাশের বাড়ির চৌকাঠ পেরিয়ে। আবার কারও বাড়িতে চিনি থেকে শুরু করে আলু বা পেঁয়াজের অচমকা সংকট হলে প্রতিবেশীর বাড়ি থেকেই হতো অভাব পূরণ।এমনও হয়েছে, বন্ধুর বাবা-পুত্রের জন্য কিছু কিনে আনলে আমিও কখনও কখনও বঞ্চিত হতাম না। কেউ বিদেশে গেলে আত্মীয়দের পাশাপাশি এই পাশের বাড়ির স্বজনদের জন্যও উপহার নিয়ে আসতেন। সেসবই তো ভাগাভাগির গল্প। 

আমাদের ভাগাভাগির গল্পগুলো খুব সাধারণ ছিল। একবিংশ শতাব্দীর মোড়ের মাথায় দাঁড়িয়ে কারও কাছে সেসব হাস্যকর বলেও মনে হতে পারে। কিন্তু আমরা সবাই একসঙ্গে ছিলাম। জড়িয়ে ছিলাম একে-অপরের সঙ্গে। সে আনন্দ এই শতাব্দী কোথায় পাবে? পেয়েছি কি কখনও?