তুমুল গাঢ় সমাচার

এলিয়ট, ওরিয়েন্টালিজম ও রবীন্দ্রনাথ

ধারাবাহিক

প্রকাশ: ০৪ অক্টোবর ২০১৯      

বিনায়ক সেন

পর্ব ::২৯
[পূর্বে প্রকাশিতের পর]

'শান্তি, শান্তি, শান্তি'- এই সমাপ্তি চরণটি যদি রবীন্দ্রনাথের সূত্রে প্রাপ্ত না হয়ে থাকে, তাহলে এর আদি-প্রেরণা কোথা থেকে এসেছিল? এক্ষেত্রে আমার কাছে অধিকতর গ্রহণযোগ্য মনে হয় সেই উত্তরটি যেটি এলিয়টের মনন, পাঠ্যাভ্যাস ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাগ্রহণের সাথে জড়িত। ভুলে গেলে চলবে না যে, হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে এলিয়ট ভারতীয় দর্শন এবং প্রাচ্যীয় ভাষার ওপরে আনুষ্ঠানিকভাবে কোর্স নিয়ে ছিলেন। শুধু পরীক্ষা পাসের জন্য কোর্স নেননি, এ বিষয়ে তার পূর্বাপর আগ্রহ অটুট ছিল। তার পিএইচডি অভিসন্দর্ভে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য দর্শনের নানা সূত্রের উল্লেখ ও প্রতিতুলনা করে তিনি ব্রাডলির ভাববাদের ওপরে গবেষণা করেছিলেন। এক্ষেত্রে তাকে রীতিমতো হাত ধরে পথ দেখিয়েছিলেন দু'জন সেরা প্রাচ্যবিদ- তার একজন হচ্ছেন অধ্যাপক চার্লস লানমেন, যার কাছে এলিয়ট শিখেছিলেন সংস্কৃত এবং অন্যজন হচ্ছেন অধ্যাপক জেমস উড্‌স। লানমেন-এর কাছে সংস্কৃতে তিনি পাঠ করেছিলেন উপনিষদ ও 'গীতা', আর উড্‌স-এর কাছে অধ্যয়ন করেছিলেন পতঞ্জলির 'যোগসূত্র'। মূল সংস্কৃতে তিনি চারটি বেদ ও আঠাশটি উপনিষদ থেকে কেবল 'নির্বাচিত অংশই' পাঠ করতে পেরেছিলেন (মূল সংস্কৃতে পড়াটা হার্ভার্ড গ্র্যাজুয়েট কোর্স সমাপ্ত করার জন্য বাধ্যতামূলক ছিল)। কিন্তু বাদবাকি বেদ ও উপনিষদ তিনি অনুবাদের মাধ্যমে জেনেছিলেন ম্যাক্সমুলার সম্পাদিত Sacred Books of East, চার্লস লানমেন-এর Sanskrit Reader, এবং জেমস উড্‌স-এর অনূদিত Yoga-system of Patanjali  থেকে। ভারতীয় দর্শনবিষয়ক তার অধ্যয়ন ছাত্রাবস্থাতেই থেমে থাকেনি। আমৃত্যু তিনি এই বিষয়ে চর্চা করে চলছিলেন এবং এ বিষয়ে তার অর্জন ছিল প্রায় লোকচক্ষুর বাইরে। এ বিষয়ে মন্তব্য করতে গিয়ে Cleo Kearns তার ‘T. S. Eliot and Indic Traditions’ বইতে লিখেছেন তা পূর্ণাঙ্গ উদ্ধৃতির দাবি রাখে :

‘Eliot was as deeply versed in the ancient traditions of Indic thought as he was in the later and more precisely delineated tenets of Buddhism. The matrix of myth provided by the Vedas and the philosophical richness and diversity of the Upanishads repeatedly claimed his attention, and the brilliance of the orthodox Hindu systems, Sometimes parallel to, sometimes diverging from Buddhist debates, formed an important part of his philosophical training. Nor was the effect of these traditions and debates merely theoretical; their terminology, their distinctions, and at times their tone and cadence inform Eliot’s poetry at many points, providing images, aphorisms and points of view that often shape his stance toward his material, even when the material itself seems quite different in origin and intent.’  

হ্যারল্ড ব্লুম যার বইয়ের প্রশংসায় পঞ্চমুখ সেই অধ্যাপকের কথা মনোযোগের দাবি রাখে। অধ্যাপক keans-এর বক্তব্য হচ্ছে যে, এলিয়ট প্রাচীন ভারতীয় শাস্ত্রে ততটাই নিমজ্জিত ছিলেন যতটা তিনি পরবর্তীতে প্রভাবিত ছিলেন বৌদ্ধ দর্শনে। বেদের উপাখ্যানগুলো যেমন তার দৃষ্টি কেড়েছিল, তেমনিভাবে উপনিষদের পাতায় বিবৃত দর্শনের বৈচিত্র্য ও বিশালতা তার ওপরে প্রভাব বিস্তার করেছিল। কখনও সনাতনী হিন্দু শাস্ত্রের নানা শাখা, কখনও এসবের বিরুদ্ধে তোলা বৌদ্ধ-বিতর্ক এলিয়টের দার্শনিক হিসেবে গড়ে ওঠার পেছনে ক্রিয়াশীল ছিল। এসবের প্রভাব শুধু তত্ত্বগত ভাবলে ভুল হবে। এই প্রভাব ছড়িয়ে পড়েছিল তার কাব্যজগতে- শব্দাবলির ব্যবহারে, বাক্‌প্রতিমায়, উপলব্ধির বর্ণনায়, নানা স্থানে। এলিয়টের কবিতার ব্যবহূত চিত্রকল্পে, আপ্তবাক্যে, মতামত প্রকাশের মধ্যে অন্তর্লীন হয়ে আছে এই প্রভাব। কবিতার বিষয়বস্তুকে কীভাবে তিনি জড়ো করেন তার প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি নির্মাণে এসব উপাদান ছায়া ফেলেছে, এমনকি যখন এসব উপাদানের উৎপত্তিস্থল বা আয়োজন সম্পূর্ণ ভিন্ন বলয়ের আবহে গড়ে উঠেছিল তখনও।

আমার অক্ষম ও দ্রুত ভাব-তর্জমা থেকে এটুকু অন্তত স্পষ্ট হয়ে ওঠে যে, আধুনিক পাশ্চাত্যের কাব্যরীতির স্রষ্টা যিনি- অন্তত পক্ষে পুরোধা ব্যক্তিত্ব যিনি- তার সৃষ্টিকর্মের পেছনে রয়ে গেছে প্রাচ্যবাদী বা ওরিয়েন্টালিস্ট অধ্যয়ন-পাঠ ও অবস্থান। তার মতো করে তিনি তার 'নিজস্ব প্রাচ্য' গড়ে নিয়েছিলেন। ১৯৫১ সালে দার্শনিক Simon weil-i The Needs for Roots-র ভূমিকায় এলিয়ট লিখেছিলেন, 'উপনিষদ পাঠে যতই নিমজ্জিত হওয়া যায় ততই একজন ইউরোপীয় ছাত্রের কাছে মর্মোদ্ধার করা কঠিনতর মনে হতে থাকে।' তারপরও তিনি বার বার ছুটে গেছেন উপনিষদের দিকে, কেননা তিনি অন্যান্য ওরিয়েন্টালিস্টদের মতো বিশ্বাস করতেন এর মধ্যকার জ্ঞানে পাশ্চাত্য 'উপকৃত' হবে। এলিয়টের এই বিশ্বাসের ভেতরে এডওয়ার্ড সাইদ কথিত ওরিয়েন্টালিজমের ছায়া দেখতে পাবেন কেউ কেউ। তাতে বিস্ময়ের কিছু নেই। এলিয়টের বিশ্বাসের জগৎ আমাদের কাছে দূরবর্তী হতে পারে, আমরা সে বিশ্বাসকে অগ্রাহ্যও করতে পারি, কিন্তু বিষ্ণু দে'র মতো আমরা দেখতে পারি কী করে প্রাচ্যীয় দর্শন পাশ্চাত্যের কাব্য ভুবনে আধুনিকতার নতুন ভঙ্গিমা, চিত্রকল্প, অনুভব ও কণ্ঠস্বরের সৃষ্টি করছে। ক্লেদজ কুসুমের মতো অশুদ্ধ পটভূমি থেকে শুদ্ধতম কবিতার লাইন নিঃসৃত হতে পারে। এই দৃষ্টিকোণ থেকে এলিয়টের কাব্যজগতে প্রাচ্যীয় দর্শনের প্রভাবকে আমরা বিচার করতে পারি। কয়েকটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ নিচে তুলে ধরা হলো।

এলিয়টের কবিতা বুঝতে গেলে তার কবিতার পেছনের দর্শন-চিন্তাকে বোঝা দরকার। আগেই বলেছি, এই দর্শন-চিন্তার ভূমিতে ভারতীয় দর্শন গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলেছিল। এ নিয়ে এলিয়ট পরবর্তী সময়ে স্মৃতিচারণ করেছেন এভাবে :'চার্লস লানম্যান-এর অধীনে দু'বছর ধরে সংস্কৃত শিক্ষার পর এবং জেমস উডস্‌-এর অধীনে আরও এক বছর পতঞ্জলির যোগ-সূত্রের জটিল পথে চলার পরে আমার অবস্থা অনেকটা আলোকপ্রাপ্ত সাধু-সন্তদের মত হয়ে দাঁড়িয়েছিল। প্রাচীন ভারতীয় দার্শনিকেরা যা করতে চেয়েছেন; তাদের চিন্তাভাবনার সূক্ষ্ণাতিসূক্ষ্ণ দিকের তুলনায় বেশির ভাগ য়ুরোপীয় দার্শনিকদেরই আজ নিতান্ত স্কুল-বালক বলে মনে হবে। সেই মহৎ প্রচেষ্টার অর্ধেকও যদি বুঝে থাকি তার ফল হয়তো এই যে, আমার মন থেকে গ্রিক থেকে শুরু করে য়ুরোপীয় দর্শনের যাবতীয় ক্যাটাগরি আর বৈশিষ্ট্যসমূহের মোহ মন থেকে মুছে গিয়েছিল।'

ভারতীয় দর্শন বলতে নির্দিষ্ট করে উপনিষদ, শংকরের অদ্বৈতবাদ, পতঞ্জলির ভাষ্যে যোগসূত্র, গীতার সকাম ও নিস্কাম কর্মফলের তত্ত্ব ও বৌদ্ধ দর্শন বিশেষ করে এলিয়টের মনকে প্রভাবিত করেছিল। এসব তাকে পড়তে হয়েছিল হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শনের ছাত্র হিসেবে এবং পরবর্তী সময়ে ব্রাডলির ওপরে পিএইচডি অভিসন্দর্ভ লেখার কালে এলিয়ট এদিক থেকে ভাগ্যবান ছিলেন। একদিকে সংস্কৃৃত ও ভারতীয় দর্শনের শিক্ষক হিসেবে যেমন তিনি পেয়েছিলেন চার্লস লানম্যান ও জেমস উড্‌সের মতো অধ্যাপকবৃন্দ, অন্যদিকে পাশ্চাত্য দর্শনের শিক্ষক হিসেবে বার্ট্রান্ড রাসেলকে। লানম্যানই তাকে '২৮টি উপনিষদ' থেকে বিভিন্ন নির্বাচিত অংশ বিশেষভাবে পাঠ করার জন্য উদ্বুদ্ধ করেন। এর মধ্যে ছিল বৃহদারণ্যক উপনিষদের সেই বিখ্যাত অংশটি, যেটা এলিয়ট ওয়েস্ট ল্যান্ড-এর শেষাংশে ব্যবহার করেন। মূল সংস্কৃতে অধ্যয়নের পাশাপাশি তিনি ইংরেজিতে ততদিনে প্রকাশিত অনুবাদ-গ্রন্থের সহায়তা নেন। ইংরেজি ছাড়া ফরাসি ও জার্মানও জানতেন তিনি। হার্ভার্ডে প্রবেশের আগে বয়স কম হওয়ার কারণে বোস্টনের সুবিখ্যাত প্রাইভেট স্কুল মিল্টন একাডেমিতে এক বছর বাড়তি হাইস্কুলের পড়াশোনা করতে হয়েছিল এলিয়টকে। সেই 'অতিরিক্ত' বছরে এলিয়টের পাঠ্যসূচিতে জার্মান ভাষা-শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত ছিল। ফলে পরবর্তী সময়ে পল ডিউসেন-এর (Deussen) 'দ্য সিস্টেম অব বেদান্ত' বইটি মূল জার্মান সংস্করণেই পাঠ করেছিলেন। এ ছাড়া ম্যাক্সমুলারের 'দ্য সেক্রেড বুকস্‌ অব দ্য ইস্ট' তো তার পাঠ্যসূচিতে ছিলই। হার্ভার্ডে পড়ার সময় এক সেমিস্টারের জন্য প্যারিসে আঁরি বার্গসঁর কাছে পাশ্চাত্য দর্শনও পড়তে যান এলিয়ট। আমি বলতে চাচ্ছি, ইয়েটস বাদ দিলে সমসাময়িক কবিকুলের মধ্যে ইলিয়টের মতো এতটা দর্শনে প্রশিক্ষিত কেউ ছিলেন না আমেরিকা বা ইউরোপে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য- এই উভয়বিধ দর্শনেই আগ্রহ ও ব্যুৎপত্তি দুই-ই ছিল তার এবং এটি তার আধুনিক কবিতার পরীক্ষা-নিরীক্ষার পেছনে অন্তনির্হিত শক্তি ও ভরসা জুগিয়েছিল। তার বিভিন্ন পর্যায়ের কবিতায় এ কারণেই অনায়াসে প্রাচ্য দর্শন উঁকি-ঝুঁকি দিয়ে গেছে। তাতে করে কবিতার আধুনিক সাজ-সজ্জায় কোনো বিরুদ্ধাচার হয়নি। একজন দক্ষ কারিগর যেমন করে থাকেন, তেমনিভাবে বিভিন্নমুখী প্রভাবকে এলিয়ট আত্মস্থ করেছেন- আবহমান সময় ও তার স্বভাবকে নৈর্ব্যক্তিক ধররে প্রায় 'তৃতীয় নয়ন' ব্যবহার করেই তুলে ধরেছেন।

উপনিষদের 'কর্মফল'তত্ত্ব, যাকে ইংরেজিতে বলে 'doctrine of Karma' এলিয়টের দৃষ্টি এড়িয়ে যায়নি। কর্মফলের কারণে সুখ বা অসুখ, সত্তার জন্মান্তর বা পুনর্জন্ম, যুক্ত ও বিযুক্ত কর্ম এবং এ মোহের আবরণ থেকে মুক্তি- এমনই উপনিষদের বড় অংশজুড়ে আলোচিত হয়েছে। সেটি এখানে আমার আলোচনার বিষয় নয়। আমি দেখাতে চাইছি, এই আপাত নীরস এবং জটিল দর্শনের থেকে কবিতার জন্য নতুন ইমেজ-চিত্রকল্প ও উপমা এবং হয়তোবা কোনো দার্শনিক রোধ আহরণ করতে চেয়েছেন এলিয়ট। 'লাভ সং অব প্রুফ্রক'-এ 'doctrine of Karma' অনুসরণে প্রুফ্রক-এর মনে হয়েছে যে, ব্যর্থ এই জীবন- যেখানে ভক্তিতেও আত্মসমর্পণ করতে পারেনি, কর্মেও মনোনিবেশ করতে পারেনি। তারচে বরং ভালো ছিল নিঃশব্দ সমুদ্রের তলদেশে পরিত্যক্ত একাকী কাঁকড়ার মতো নিজেকে টেনে বেড়ানো : 'I should have been a pair of ragged claws/Scuttling across the floors of silent seas' 'জন্ম, প্রজনন ও মৃত্যু'- এ রকম একটি ক্ষান্তিহীন চক্রের ভেতর দিয়ে প্রুফ্রকের পথচলা :সময় গেলে যেমন সাধন হয় না, সাধনের সময় কখনোই আসে না প্রুফ্রকের জীবনে। এই নিষ্ম্ফলা জীবনের আর্তনাদ বেজে ওঠে :

'There will be time, there will be time
To prepare a face to meet the faces that you meet;
There will be time to murder and create,
And time for all the works and days of hands...'

এ রকম বিফল মনুষ্য-জীবনে বারবার এসে লাভ কী? এলিয়ট তার প্রথম কাব্য-নাট্য প্রচেষ্টা 'Sweeney Agonistes : Fragments of an Aristophanic Melodrama'তে আরও স্পষ্ট করে জন্মান্তরবাদ সম্পর্কে বলছেন :

ÔI’ve been born, and once is enough
You don’t remember, but I remember,
Once is enough.’ 

[ক্রমশ]