অপহরণের সাত দিন পর মায়ের কোলে শিশু আনিকা

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০১৪      

সমকাল প্রতিবেদক

অপহরণের সাত দিন পর মায়ের কোলে শিশু আনিকা

মায়ের কোলে উদ্ধার পাওয়া শিশু আনিকা (উপরে), অপহরণকারী নাছির উদ্দিন নেছার সমকাল

ফোনের একপ্রান্ত থেকে বলা হচ্ছে_ 'বুজেছি, তুই টাকা দিবি না। তোর মেয়েটাকে শেষ পর্যন্ত মেরেই ফেলতে হবে। মেয়ের জন্য তোর কোনো দরদ নাই।' অপরপ্রান্তে কান্নাজড়িত নারী কণ্ঠ_ 'ভাই এত টাকা কই পামু, আমার মেয়েটারে মাইরেন না, আমারে নিয়া মাইরা ফেলেন।' এ কথোপকথন একজন অপহরণকারী ও অপহৃত ১৪ মাস বয়সী একটি শিশুর মায়ের। তবে র‌্যাব সদস্যরা আনিকা নামের ওই শিশুটিকে গতকাল শুক্রবার দুপুরে মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগের একটি বাসা থেকে অক্ষত অবস্থায় উদ্ধার করেছে। সাত দিন আগে ১৪ মাস বয়সী ওই শিশুটি রাজধানীর আদাবর এলাকা থেকে অপহৃত হয়। র‌্যাব সদস্যরা অপহরণকারী নাছির উদ্দিন নেছারকেও গ্রেফতার করেছে। র‌্যাব জানায়, ৩ জানুয়ারি রাতে আদাবরের সুনিবিড় হাউজিং এলাকায় ভোলার হোটেলের কাছ থেকে শিশু আনিকাকে অপহরণ করে নেছার। তার মায়ের মোবাইল ফোনে কল দিয়ে প্রথমে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করা হয়। পরে মুক্তিপণ কমিয়ে দুই লাখ টাকা দাবি করে অপহরণকারী। বিষয়টি র‌্যাব-২ এর সদস্যরা অবগত হয়ে টানা অভিযান চালিয়ে অপহৃত শিশুটিকে উদ্ধারের পাশাপাশি অপহরণকারীকে গ্রেফতার করতে সক্ষম হন।
গতকাল বিকেলে র‌্যাব-২-এর শেরেবাংলা নগরের কার্যালয়ে উদ্ধার করা শিশুটিকে নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেন র‌্যাব কর্মকর্তারা। সেখানে শিশুটির বাবা আবুল হোসেন ও মা রুমা আক্তারও উপস্থিত ছিলেন। তারা সাত দিন পর আদরের একমাত্র সন্তানকে কাছে পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন। প্রাণের নিধিকে জড়িয়ে ধরে চুমু খান বাবা-মা। কিছু না-বোঝা শিশুটিও বাবা-মাকে কাছে পেয়ে যেন আনন্দে আত্মহারা হয়ে ওঠে। তাদের উপস্থিতিতেই অপহরণকারী নাছির উদ্দিন নেছার ঘটনার সঙ্গে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করে অপহরণের বিবরণ দেয়।
র‌্যাব-২-এর অপারেশন অফিসার অ্যাডিশনাল এসপি রায়হান উদ্দিন খান জানান, শিশুটির বাবা-মা একেবারেই গরিব। মা রুমা সুনিবিড় হাউজিংয়ের পাশে ভোলার হোটেলে রান্নার কাজ করেন। অপহরণকারী নেছারও কয়েকদিন আগে ওই হোটেলে কাজে যোগ দেন। সেখান থেকেই টাকার লোভে শিশুটিকে অপহরণ করে নেছার। প্রথমে শিশুটিকে সে নিজের গ্রামের বাড়ি কুমিল্লার চৌদ্দগ্রামে নিয়ে আটকে রাখে। এরপর শিশুটির কান্না শুনিয়ে ফোনে তিন লাখ টাকা মুক্তিপণ দাবি করে সে। একপর্যায়ে শিশুটির কান্না থামাতে না পেরে তাকে ঢাকায় নিয়ে আসা হয়। বিভিন্ন আত্মীয়ের বাসায় রাখতে ব্যর্থ হয়ে শিশুটিকে মিরপুরের দক্ষিণ পীরেরবাগের ১৮৩/২ নম্বর বাসার নিচে সে ফেলে রাখে। ওই বাসার লোকজন শিশুটিকে উদ্ধার করে তার বাবা-মাকে খুঁজতে থাকে। র‌্যাবের এ কর্মকর্তা জানান, বৃহস্পতিবার
রাতে কুমিল্লার চৌদ্দগ্রাম থেকে অপহরণকারী নেছারকে গ্রেফতার করা হলেও শুরুতেই শিশুটিকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। জিজ্ঞাসাবাদে নেছার জানায়, দু'দিন আগে শিশুটিকে মিরপুরের পীরেরবাগে ফেলে রেখে যায় সে। তার দেওয়া তথ্যানুযায়ী গতকাল দুপুর ১টার দিকে পীরেরবাগে শিশুটির অবস্থা জানতে র‌্যাব অভিযান শুরু করলে ১৮৩/২ নম্বর বাসার লোকজন শিশুটি তাদের কাছে রয়েছে বলে জানান। তারা শিশুটিকে র‌্যাবের কাছে হস্তান্তর করলে বাবা-মা তাকে শনাক্ত করেন। র‌্যাব কর্মকর্তা রায়হান উদ্দিন খান জানান, যে পরিবারটির কাছ থেকে শিশুটিকে পাওয়া গেছে, তারা নির্দোষ। বাসার নিচ থেকে উদ্ধার করে তারা শিশুটির বাবা-মাকে খুঁজছিলেন।
১৪ মাস বয়সী শিশু আনিকাকে কাছে পেয়ে আবেগাপ্লুত মা রুমা আক্তার বলেন, হোটেলে কাজ করার সময় নেছার তার মেয়েকে আদর করত। সে যে এমন কাজ করতে পারে, প্রথমে বিশ্বাসই হচ্ছিল না। পরে ফোন দিয়ে তিন লাখ টাকা চাইলে বুঝতে পারি নেছারই তার মেয়েকে তুলে নিয়েছে।
রুমা বলেন, নেছার ফোনে তাকে বলে টাকা না দিলে মেয়েকে মেরে বাসার সামনে ফেলে রাখবে। আমি বলেছি এত টাকা কই পামু। আমার মেয়েটাকে ফেরত দিয়ে আমারে মেরে ফেলেন। এতে রেগে যায় নেছার।
আনিকার বাবা আবুল হোসেন বলেন, মেয়েটাকে দেখতে না পেয়ে গত সাত দিনে আমরা পাগল হয়ে গিয়েছিলাম। মেয়েটাকে উদ্ধার করে তাদের কোলে তুলে দেওয়ায় তিনি র‌্যাবের কাছে কৃতজ্ঞতাও জানান।
অপহরণকারী নেছারের দাবি, টাকার লোভে শিশুটিকে অপহরণ করে সে। শিশুটির পরিবার গরিব জেনেও কেন অপহরণ করা হলো_ জানতে চাইলে নেছার জানায়, ভাবছিলাম যে কোনোভাবে টাকা জোগাড় করে দেবেন শিশুটির বাবা-মা। টাকা না দেওয়ায় শিশুটিকে মেরে ফেলারও সিদ্ধান্ত নেয় সে। তবে কান্নাকাটির জন্য তা সম্ভব না হলে শিশুটিকে সে মিরপুরের পীরেরবাগে ফেলে রাখে বলে জানায় নেছার।
র‌্যাব কর্মকর্তারা বলেছেন, প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে নেছার জানিয়েছে, এ অপহরণের সঙ্গে সে একাই জড়িত। তবে এর পেছনে অন্য কারও পরিকল্পনা রয়েছে কি-না তা তদন্ত করা হচ্ছে।