শ্রম নয়, অর্থনীতি হবে জ্ঞান ও প্রযুক্তিনির্ভর

আইসিটি বিষয়ক সেমিনারে প্রতিমন্ত্রী পলক

প্রকাশ: ২২ জানুয়ারি ২০১৪      

সমকাল প্রতিবেদক

'ভুল হতেই পারে, তাই বলে বসে থাকা নয়, ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে, শ্রমনির্ভর অর্থনীতিকে প্রযুক্তি ও জ্ঞাননির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তর করাই আমাদের লক্ষ্য।' গতকাল মঙ্গলবার তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) মন্ত্রণালয় এবং সমকালের যৌথ উদ্যোগে আয়োজিত 'ফ্রিল্যান্সার টু এনটারপ্রেনার' শীর্ষক সেমিনারে এ কথা বলেন আইসিটি প্রতিমন্ত্রী জুনাইদ আহমেদ পলক। সেমিনারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সারদের সহায়ক পরিবেশ ও প্রশিক্ষণের মাধ্যমে এনটারপ্রেনার হিসেবে গড়ে তোলার বিস্তারিত রূপরেখা তুলে ধরেন মন্ত্রণালয়ের সচিব নজরুল ইসলাম খান।
অনুষ্ঠানে 'গেস্ট অব অনার' ছিলেন রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান আহমেদ আল কবির। বিশেষ অতিথি ছিলেন অর্থ বিভাগের উপসচিব ইমদাদুল হক, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ, বেসিক ব্যাংকের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. সেলিম ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা পিকেএসএফের উপ-ব্যবস্থাপনা পরিচালক ফজলুল কাদের। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন আইসিটি মন্ত্রণালয়ের 'লিবারেলাইজিং আইসিটি প্রকল্পে'র বিশেষজ্ঞ নোমান হোসাইনী। সেমিনারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের ফ্রিল্যান্সার, এনটারপ্রেনার ও বিনিয়োগকারীরাও অংশ নেন।
প্রতিমন্ত্রী পলক বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাত নতুন, এই মন্ত্রণালয় নতুন এবং তথ্যপ্রযুক্তিও নতুন প্রজন্মের বিষয়। বাংলাদেশের বড় শক্তি হচ্ছে এ দেশের ১৬ কোটি মানুষের মধ্যে ১১ কোটিই বয়সে তরুণ। এ কারণে তথ্যপ্রযুক্তি খাত নিয়ে আমাদের বহুদূর এগিয়ে যাওয়ার সম্ভাবনাও অনেক বেশি। তিনি বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি খাতে যেন তরুণ উদ্যোক্তা সৃষ্টি হয় এবং দেশের উন্নয়নে তারা যেন অবদান রাখতে পারে সে জন্য মন্ত্রণালয় সহায়ক পরিবেশ সৃষ্টি করতে চায়। এ জন্য মন্ত্রণালয় বড় পরিসরে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম গ্রহণ করেছে। এ কার্যক্রম তৃণমূল পর্যন্ত ছড়িয়ে দিয়ে বিপুলসংখ্যক তরুণকে সম্পৃক্ত করতে কী ধরনের কারিকুলাম দরকার, কী ধরনের সহায়তা দরকার তার একটি রূপরেখা তৈরির জন্যই এ সেমিনারের আয়োজন। সেমিনার থেকে যে মতামত পাওয়া যাবে তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হবে এবং তা দ্রুত বাস্তবায়নও করা হবে। তিনি বলেন, মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রমে ভুল হতে পারে। ভুলের কারণে থেমে থাকা নয়।
আইসিটি সচিব বলেন, আইসিটি মন্ত্রণালয় এর আগে 'লার্নিং আর্নিং' প্রকল্প গ্রহণ করে জেলা পর্যায়ে ১৫ হাজার ফ্রিল্যান্সার তৈরি করে। যার মধ্যে অনেকেই এনটারপ্রেনার হচ্ছেন এবং নিজেরা উদ্যোগ নিয়ে আরও অসংখ্য তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দিচ্ছেন। 'লার্নিং আর্নিং' এখন উপজেলা পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, এ পর্যায়ে ৬৫ হাজার তরুণকে ফ্রিল্যান্সিং প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে; এখান থেকেও অনেক উদ্যোক্তা তৈরি হবে। সবচেয়ে বড় লক্ষ্য হচ্ছে, সারাদেশে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য সেবাকেন্দ্রকে আউটসোর্সিং সেন্টার হিসেবে গড়ে তোলা। আশার কথা, ইউনিয়ন পরিষদ তথ্য সেবাকেন্দ্রগুলো থেকে প্রতি বছর ৫০ হাজার কম্পিউটার লিটারেট বের হচ্ছে। এখন এগুলোকে আউটসোর্সিং কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হলে এখানে বসেই গ্রামের তরুণরা তথ্যপ্রযুক্তি খাতের বিশ্ববাজার থেকে আয় করতে পারবে। অনেক ইউনিয়ন পরিষদে আধুনিক ভবন আছে। সেখানে ২০-২২টি কম্পিউটারে একসঙ্গে কাজ করার উপযোগী কক্ষে প্রয়োজনীয় সংখ্যক ভালো কনফিগারেশনের কম্পিউটার এবং হাইস্পিড ইন্টারনেট সংযোগ দেওয়া হলে এটি আউটসোর্সিং সেন্টারে রূপান্তর করা সম্ভব। যেসব ইউনিয়ন পরিষদে ভবন নেই সেখানে টিনশেড বড় কক্ষ নির্মাণ করে আউটসোর্সিং সেন্টার তৈরি করা হবে। এখান থেকে শুধু ফ্রিল্যান্সার নয়, এনটারপ্রেনারও তৈরি হবে। এই এনটারপ্রেনারদের যেন শুধু গ্রামে বসে থাকতে না হয়, সে জন্য তৈরি করা হচ্ছে জেলায় জেলায় হাইটেক পার্ক।
রূপালী ব্যাংকের চেয়ারম্যান বলেন, দেশের মোট জনসংখ্যার ৬০ শতাংশ তরুণ বয়সীদের উন্নয়ন এবং সক্রিয় অর্থনীতির ধারায় সম্পৃক্ত করা যেতে পারে তথ্যপ্রযুক্তি খাতের মধ্য দিয়েই। উদ্যোক্তাদের জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন অর্থনৈতিক সহযোগিতা। ব্যাংকের মাধ্যমে সে সহযোগিতা দেওয়া সম্ভব। অনেক ব্যাংকের সিএআর (সোশ্যাল রেসপনসিবিলিটি) খাতের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার হচ্ছে না, অনেক ক্ষেত্রে অপ্রয়োজনীয় খাতে ব্যবহার করা হচ্ছে। দেশের প্রকৃত উন্নয়ন তখনই সম্ভব যখন অর্থ সঠিক খাতে সঠিকভাবে ব্যয় হবে। তথ্যপ্রযুক্তি খাতে তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির জন্য ব্যয় করা হলে সেটা এ মুহূর্তে
উপযুক্ত সিদ্ধান্ত হবে এবং এই তরুণরাই বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ, উন্নত দেশে পরিণত করার স্বপ্ন সফল করবে। মুক্তিযোদ্ধা যারা বে?ঁচে আছেন, তারা দেশকে উন্নত অর্থনীতির দেশ হিসেবে দেখে মরতে চান, এটাই তাদের চাওয়া।
অধ্যাপক নিয়াজ আহমেদ বলেন, উন্নত দেশের চোখ এখন বাংলাদেশের দিকে। কারণ এখানকার বিশাল তরুণ সমাজ। গার্মেন্ট খাতে যেমন সবচেয়ে কম দামে শ্রম কেনা যায়, তেমনি তথ্যপ্রযুক্তি খাতে ফ্রিল্যান্সিংয়ের ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের তরুণরা সবচেয়ে কম দামে সফলভাবে চাহিদা পূরণে সক্ষম। এ কারণে আগামীতে ফ্রিল্যান্সিং এবং তরুণ উদ্যোক্তা তৈরির মাধ্যমে তথ্যপ্রযুক্তি খাতই হতে পারে দেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় স্তম্ভ।