যেসব কারণে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল

প্রকাশ: ১০ জুন ২০১৪      

পুলক চ্যাটার্জি, বরিশাল ব্যুরো

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চলমান অস্থিতিশীল পরিস্থিতির পেছনে উপাচার্যের অতিমাত্রায় কৃচ্ছ্রসাধন, সব বিভাগে চেয়ারম্যান না থাকা, দায়িত্বপ্রাপ্ত চেয়ারম্যানরা ইচ্ছেমতো তহবিল খরচ করতে না পারা এবং শিক্ষক-কর্মকর্তাদের মধ্যে চরম স্নায়ুদ্বন্দ্বসহ কমপক্ষে ১০টি কারণ খুঁজে পাওয়া গেছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে এবং অনুসন্ধানে জানা গেছে এসব চমকপ্রদ কারণ।
কীর্তনখোলা নদীর পূর্বতীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্থায়ী ক্যাম্পাসে ক্লাস শুরু হওয়ার পর গত দুই মাসে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে কয়েকদফা রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষ হলেও শিক্ষা কার্যক্রমে তার আঁচ লাগেনি। হঠাৎ করেই গত ১৮ মে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতি শিক্ষকদের জন্য সার্ভিস রুল প্রণয়ন, শিক্ষা ছুটি ৫ বছর করা, সপ্তাহে দুদিন ছুটি, প্রত্যেক বিভাগে
চেয়ারম্যান নিয়োগসহ ৯ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেন। ওই দাবি বাস্তবায়নের জন্য সাত কার্য দিবস বেঁধে দেওয়া হয় ভিসিকে। গত ২৯ মে বৃহস্পতিবার স্থায়ী ক্যাম্পাসে পরিবহন শ্রমিকরা এক ছাত্রীকে লাঞ্ছিত করলে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ও পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে ব্যাপক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। ওই সংঘর্ষের পরপরই বিশ্ববিদ্যালয়ে একের পর এক ঘটতে থাকে রহস্যাবৃত ঘটনা।
২৯ মে পরিবহন শ্রমিকদের সঙ্গে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীদের সংঘর্ষের পরই পদত্যাগ করেন ৪ সহকারী প্রক্টর। পদত্যাগের কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, প্রক্টর পদে অতিরিক্ত দায়িত্ব পালন করলেও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে যথাযথ সম্মানী দেওয়া হয় না। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র মনে করেন, যেখানে শিক্ষক সমিতি তাদের ৯ দফা দাবি আদায়ের জন্য ভাইস চ্যান্সেলরের কাছে পেশ করেছেন এবং তা বাস্তবায়নের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছেন। সেখানে ছাত্র-শ্রমিক সংঘর্ষের দিনই ৪ সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগের বিষয়টি অন্যরকম ইঙ্গিত দেয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষক বলেছেন, ৪ সহকারী প্রক্টরের পদত্যাগের ধারাবাহিকতায় ৩০ মে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা ৬ দফা দাবি আদায়ের জন্য ক্লাস বর্জনের ঘোষণা দেন। শিক্ষকদের মতোই শিক্ষার্থীরাও দাবি বাস্তবায়নে ৭২ ঘণ্টার আলটিমেটাম বেঁধে দেয় বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে। ২ জুন ভাইস চ্যান্সেলর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে একাধিক বৈঠক করে সব দাবি পর্যায়ক্রমে মেনে নেওয়ার ঘোষণা দিলে ওই দিনই শিক্ষার্থীরা ক্লাস ও পরীক্ষা বর্জন কর্মসূচি প্রত্যাহার করে নেয়। ৩ জুন বিশ্ববিদ্যালয় সম্পূর্ণ স্বাভাবিক থাকলেও ৪ জুন সকালে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা তাদের আগের ৬ দফার সঙ্গে আরও ৭টি নতুন দফা যুক্ত করে ১৩ দফা দাবি বাস্তবায়নের জন্য ক্যাম্পাসে বিক্ষোভ এবং দিনভর ভাইস চ্যান্সেলরকে তার কক্ষে অবরুদ্ধ করে রাখে। অপরদিকে ওই দিনই শিক্ষকদের ৯ দফা দাবি পূরণে বেঁধে দেওয়া সময়ের শেষ দিন। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে ৪ জুন গভীর রাতে সিন্ডিকেট সদস্য ভাইস চ্যান্সেলর ও শিক্ষকদের যৌথ সভায় শিক্ষার্থীদের সব দাবি মেনে নেওয়ার লিখিত অঙ্গীকার করলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাস ছেড়ে যায়। এমনকি ৫ জুন সকালে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসে দাবি পূরণ হওয়ায় আনন্দ মিছিলও করে। হঠাৎ করেই ঘটে যায় অঘটন। কতিপয় শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রারের কক্ষে হামলা চালিয়ে ব্যাপক ভাংচুর ও মারধর করে সহকারী রেজিস্ট্রার বাহাউদ্দিন গোলাপকে। ওই ঘটনার পর থেকে বিশ্ববিদ্যালয় কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ধর্মঘটে যান।
বিশ্ববিদ্যালয়ে অস্থিতিশীলতার কারণ অনুসন্ধান করতে গিয়ে পাওয়া চমকপ্রদ তথ্যগুলোর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে 'ভর্তি পরীক্ষার ফি'। দেশের অন্যান্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ভর্তি পরীক্ষার ফি বাবদ পাওয়া টাকা থেকে ৪০ ভাগ টাকা মঞ্জুরি কমিশনকে প্রদান করেন। বাকি টাকা বিভাগীয় উন্নয়ন এবং শিক্ষক-কর্মকর্তারা ভাগ-বণ্টন করে নেন। কিন্তু বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে গত ৩টি ভর্তি পরীক্ষায় প্রাপ্ত শতভাগ অর্থ বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় তহবিলে জমা দেওয়ার প্রথা চালু করেন ভিসি প্রফেসর হারুনর রশীদ। সূত্র মতে, এতে নাখোশ হন এক শ্রেণীর শিক্ষক। ভিসি প্রফেসর ড. হারুনর রশীদ বলেছেন, নতুন বিশ্ববিদ্যালয় বলে তিনি এমন নিয়ম চালু রেখেছেন। তবে এ প্রসঙ্গে ভিন্ন মত পোষণ করেছেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক শফিউল আলম। তিনি বলেছেন, বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের নিয়মানুযায়ী ভর্তি পরীক্ষার ৪০ ভাগ টাকা তাদের দিতে হয়। বাকি টাকা বিভিন্ন বিভাগের পরীক্ষা ও পারিপাশর্ি্বক খরচ বহনের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগের তহবিলে রাখার নিয়ম থাকলেও বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ে তা উপেক্ষিত।
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যেকটি বিভাগে ভাইস চ্যান্সেলরের প্রতিনিধি থাকলেও আয়-ব্যয়ের হিসাব-নিকাশের ক্ষেত্রে ভিসির কাছে জবাবদিহি করতে হওয়ায় সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যানরা ভেতরে ভেতরে ক্ষুব্ধ হন। শিক্ষকদের গাড়িবিলাসও অনেকটা দায়ী বর্তমান পরিস্থিতির জন্য। যেখানে ভাইস চ্যান্সেলরের নিজস্ব গাড়ি নেই। তিনি এখনও প্রকল্পের গাড়িতে যাতায়াত করেন। সেখানে শিক্ষকদের জন্য বাড়তি গাড়ির ব্যবস্থা করা অসম্ভব। সূত্র জানায়, যদিও ভাইস চ্যান্সেলরের একটি জিপ, শিক্ষার্থীদের জন্য ছোট-বড় ৩টি বাস, শিক্ষকদের জন্য একটি বড় মাইক্রোবাস ক্রয়ের জন্য বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশন অনুমোদন দিলেও বরাদ্দের অভাবে তা ক্রয় করা যাচ্ছে না। ভাইস চ্যান্সেলর জানিয়েছেন, ভর্তি পরীক্ষার ফির টাকা দিয়ে শিক্ষার্থীদের জন্য ৩টি বাস ও শিক্ষক-কর্মকর্তাদের একটি মাইক্রোবাস কেনা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে শিক্ষক সমিতির সভাপতি শফিউল আলম বলেন, শিক্ষকদের জন্য গাড়ির দাবি দীর্ঘদিনের। সেখানে একটি মাইক্রোবাস দিয়ে শিক্ষকদের যাতায়াত সম্ভব নয়।