নিরীহ লোকজনকে হাত-পা বেঁধে তুলে দেওয়া হয় জাহাজে

প্রকাশ: ২৬ আগস্ট ২০১৪      

আবু তাহের, কক্সবাজার অফিস

কক্সবাজারে সমুদ্রপথে মালয়েশিয়ায় মানব পাচারে বেপরোয়া হয়ে উঠেছে পাচারকারী চক্র। নিরীহ লোকজনকে অপহরণ করে হাত-পা বেঁধে জোর করে জাহাজে তুলে দিচ্ছে পাচারকারীরা। পরে অপহৃত লোকজনকে প্রথমে থাইল্যান্ডে নিয়ে গোপন আস্তানায় জিম্মি করে আদায় করা হয় মুক্তিপণ। মুক্তিপণ দিলে অপহৃতকে মালয়েশিয়া পাঠানো হয়। অন্যথায় চালানো হয় নির্মম নির্যাতন।
গত ৫ আগস্ট মোবাইল টাওয়ার পরিদর্শনে টেকনাফ আসেন মোবাইল ফোন কোম্পানি বাংলালিংকের প্রকৌশলী এনামুল হক লিমন। টেকনাফ বাজার থেকে লিমনকে অপহরণ করে একদল যুবক। ১২ আগস্ট মহেশখালী দ্বীপ থেকে অপহৃত প্রকৌশলী লিমনকে উদ্ধার করে পুলিশ। লিমন জানান, ছয় যুবক তাকে অপহরণ করে নিয়ে যায় সাবরাং ইউনিয়নের কমিউনিটি সেন্টারের কাছে একটি বাড়িতে। ওখানে তাকে হাত বদল করা হয়। ওই দিন রাতে তার হাত-পা বেঁধে মালয়েশিয়াগামী একটি জাহাজে তুলে দেওয়া হয়। তার সঙ্গে জাহাজে তোলা হয় আরও চার ব্যক্তিকে। কয়েক দিন পর তাকে জাহাজ থেকে নামিয়ে ছোট একটি ট্রলারে তোলা হয়। এর পর মহেশখালী উপকূলে ছেড়ে দেওয়া হয়।
লিমনের মতো কক্সবাজার ভ্রমণে এসে মানব পাচারকারীদের খপ্পরে পড়েন যশোর জেলার ঝিকরগাছা উপজেলার মনোহরপুর এলাকার তিন যুবক। ওই এলাকার আবদুর রাজ্জাকের ছেলে মো. ফারুক হোসেন জানান, দুই মাস আগে তারা তিন বন্ধু কক্সবাজার ভ্রমণে আসেন। তার সঙ্গে থাকা অন্য দুই বন্ধু হলেন একই এলাকার মকবুল হোসেন ও মো. রাসেল। তারা সিএনজিচালিত অটোরিকশায় মেরিন ড্রাইভ রোড দিয়ে টেকনাফ যাওয়ার পথে অপহৃত হন। কিছু লোক অস্ত্রের মুখে তাদের অপহরণ করে নিয়ে যাওয়ার পথে তারা সোনারপাড়া বাজারে লোকজন দেখে চিৎকার করেন। এ সময় স্থানীয় কিছু
লোক এগিয়ে এসে তাদের উদ্ধার করেন।
উখিয়া উপজেলার কুতুপালং গ্রামের ফাতেমা বেগম থানায় অভিযোগ করেন, তার ছেলে মোহাম্মদ ইব্রাহিমকে (১৭) গত ৫ ডিসেম্বর সাগরপথে মালয়েশিয়ায় পাচার করেছে দালাল চক্র। এর পর থেকে ওই কিশোরের আর কোনো হদিস নেই।
সাগরপথে মালয়েশিয়া পেঁৗছেছে টেকনাফের কচুবুনিয়া এলাকার হাফেজ আহমদ। তার ভাই রফিকুল ইসলাম জানান, মালয়েশিয়ায় পেঁৗছতে তার ভাইয়ের খরচ হয়েছে চার লাখ ২০ হাজার টাকা। দালালরা নিয়েছে ২০ হাজার টাকা। থাইল্যান্ডে জিম্মি করে আদায় করেছে চার লাখ টাকা। মোবাইল ফোনে দেওয়া তথ্যমতে, টেকনাফের একটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টে তিন বারে চার লাখ টাকা দেওয়ার পর তার ভাইকে মালয়েশিয়া পেঁৗছে দেয় দালাল চক্র।
উখিয়া উপজেলাতেই নিখোঁজ অর্ধশত ব্যক্তি :উখিয়া উপজেলার অর্ধশত ব্যক্তির কোনো হদিস পাচ্ছেন না তাদের স্বজনরা। উপজেলার কচুবুনিয়া গ্রামের মোক্তার আহমদ জানান, গত বছরের ১৩ জুলাই তার আত্মীয় জালাল মিয়া, একই গ্রামের মো. শাহজাহান, রিপন বড়ূয়া, মিকু বড়ূয়া, সুপন বড়ূয়া, অনিল বড়ূয়া, রিবন বড়ূয়া, নিপন বড়ূয়া, খলিলুর রহমানকে দালাল চক্র সাগরপথে অবৈধভাবে মালয়েশিয়া পাচার করে। তাদের কোনো সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না। একইভাবে সন্ধান পাওয়া যাচ্ছে না কুতুপালং এলাকার কামাল উদ্দিন, আবদুস শুক্কুর, জামাল উদ্দিন, লম্বাঘোনা এলাকার মো. ইসমাইল, ছোয়াংখালী গ্রামের নুরুল কবির, নুরুল হুদা, মফিজ আলম, ছৈয়দ করিম, মরিচ্যা গ্রামের নুর মোহাম্মদ, রূপপতি গ্রামের আবদুল গফুরসহ আরও অনেকের। স্বজনরা জানিয়েছেন, তারা সবাই মানব পাচারকারী চক্রের শিকারে পরিণত হয়েছেন।
বেপরোয়া মানব পাচারকারী চক্র :মানব পাচারকারী চক্র এখন এতই বেপরোয়া হয়ে উঠেছে যে, নিরীহ লোকজনকে তারা অপহরণ করে জাহাজে তুলে দিচ্ছে। উখিয়া ও টেকনাফের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় লোকজন জানান, যেভাবে হোক একজনকে জাহাজে তুলে দিতে পারলেই দালালরা পাচ্ছে ১৫ থেকে ২০ হাজার টাকা। পাচার করা লোকজন ছিনতাইয়ের ঘটনাও ঘটছে।
উদ্ধার হওয়া যাত্রীদের দেওয়া তথ্যমতে, গভীর সাগরে অপেক্ষমাণ জাহাজে যাত্রী পেঁৗছানোর পর মাথাপিছু ১৫-২০ হাজার টাকা পায় দালালরা। এভাবে হাত বদল হওয়ার পর থাইল্যান্ডের আস্তানায় নিয়ে জিম্মি করা হয় যাত্রীদের। সেখানে তাদের ওপর চলে অমানুষিক নির্যাতন। মোবাইল ফোনে বাংলাদেশে স্বজনদের সঙ্গে যোগাযোগ করে আদায় করা হয় জনপ্রতি ২ থেকে ৩ লাখ টাকা। যারা মোটা অঙ্কের টাকা দিতে পারে তারা মালয়েশিয়ায় প্রবেশের সুযোগ পায়। যারা দিতে ব্যর্থ হয় তাদের ভাগ্যে কী ঘটে সে তথ্য আর পাওয়া যায় না।
উখিয়া উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হামিদুল হক চৌধুরী জানান, থাইল্যান্ডে মুক্তিপণ আদায়কারী চক্রের প্রভাবশালী সদস্য রয়েছে বাংলাদেশে। তারা বাংলাদেশের ব্যাংক অ্যাকাউন্ট, কুরিয়ার ও বিকাশের মাধ্যমে মুক্তিপণের টাকা আদায় করে। কক্সবাজারের উখিয়া-টেকনাফে দালালদের নিয়ন্ত্রণকারী ১০ গডফাদারসহ অন্তত শতাধিক দালাল রয়েছে। এদের কাছে অসহায় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সদস্যরাও। আইন প্রয়োগকারী সংস্থা নানা উদ্যোগ নিয়েও ঠেকাতে পারছে না মানব পাচার।
টেকনাফে কোস্টগার্ডের স্টেশন কমান্ডার হারুনুর রশিদ জানান, সাম্প্রতিক সময়ে মানব পাচারকালে কয়েকটি বড় চালান কোস্টগার্ড ব্যর্থ করে দিয়েছে। কয়েকশ' ভুক্তভোগীকে উদ্ধার করা হয়েছে। যাদের পাচার করা হচ্ছিল তাদের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে গডফাদারদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে মামলাও করা হয়েছে।
টেকনাফ থানার ওসি মোক্তার হোসেন জানান, সম্প্রতি আদম পাচারকারীদের বিরুদ্ধে বিশেষ অভিযান শুরু করেছে পুলিশ। দালাল চক্রের কয়েক সদস্যকে আটকও করা হয়েছে। এ ছাড়া পাচারের সময় গত তিন মাসে এক হাজারের বেশি ব্যক্তিকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, সমুদ্রপথে আদম পাচার বিষয়ে স্থানীয় লোকজনকে সচেতন হতে হবে। তারা সহযোগিতা করলে পাচার ঠেকানো যাবে।
কক্সবাজারের পুলিশ সুপার মো. আজাদ মিয়া বলেন, নৌপথে মানব পাচারে জড়িত দালাল ও গডফাদার ৮৯ জনের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। তাদের কয়েকজনকে আটক করা হয়েছে। অন্যদের আটক করতে অভিযান চলছে। তিনি জানান, মানব পাচারকারীদের হাতে অপহরণের শিকার কয়েকজনকে ইতিমধ্যে উদ্ধার করা হলেও তারা মামলা করতে চান না। ফলে অপরাধীদের ধরতে পুলিশকে নানা প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হতে হয়।