মহারানীর ঢোপকল যাচ্ছে জাদুঘরে

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০১৬      

সৌরভ হাবিব

মহারানীর ঢোপকল যাচ্ছে জাদুঘরে

১৯৩৭ সালে রাজশাহী নগরীতে পুঠিয়ার মহারানী হেমন্ত কুমারীর সহায়তায় স্থাপন করা হয়েছিল এমন অনেক ঢোপকল সমকাল

বোয়ালিয়া থানার পূর্ব প্রাচীর ঘেঁষে রয়েছে একটি ঢোপকল। এক সময় বিনামূল্যে বিশুদ্ধ পানির একমাত্র উৎস হিসেবে এই ঢোপকল ব্যবহার হয়েছে। তবে এটিসহ রাজশাহী মহানগরের প্রায় সব ঢোপকল দিয়েই পানি বের হয় না। তাই বোয়ালিয়া থানা সংলগ্ন ঢোপকলের জায়গাটি ঘিরে স্থানীয় নগেন্দ্রনাথ গড়ে তুলেছেন চা-শিঙ্গাড়ার দোকান। ঢোপকলের বিষয়ে জানতে চাইতেই নগেন্দ্রনাথ বললেন, 'আগে কত সহজে পানি পাওয়া যেত। গরিব মানুষের কত উপকার হতো, এখন আর পানি আসে না। গরমের দিন পানির জন্য গরিব মানুষ হাহাকার করে মরে।'
পুঠিয়ার মহারানী হেমন্ত কুমারীর আর্থিক সহায়তায় ১৯৩৭ সালের বসানো হয়েছিল ঢোপকল। তখন এই ঢোপকলের মাধ্যমেই রাজশাহী মহানগরীর মোড়ে মোড়ে পেঁৗছে যেত বিশুদ্ধ পানি। কিন্তু আধুনিক যুগের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে টিকে থাকতে পারছে না প্রাচীন ঐতিহ্যের ঢোপকলগুলো। রাস্তা সম্প্রসারণসহ নানা কারণে প্রতিনিয়ত ভাঙা পড়ছে ঢোপকল। ফলে ঐতিহ্য হারাচ্ছে রাজশাহী। স্মৃতি বাঁচিয়ে রাখতে এখন জাদুঘরে স্থান মিলেছে ঢোপকলের।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহী পৌরসভার চেয়ারম্যান রায় ডিএন দাশগুপ্ত (১৯৩৪-৩৯) থাকাকালে রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশনের সহযোগিতায় নগরবাসীকে সুপেয় পানি সরবরাহের উদ্যোগ নেন। সে সময় পুঠিয়ার মহারানী ছিলেন হেমন্ত কুমারী। রাজশাহী অ্যাসোসিয়েশন মহারানী হেমন্ত কুমারীসহ অন্যান্য দানশীল ব্যক্তিকে সহযোগিতার অনুরোধ করেন। হেমন্ত কুমারী একাই ৬৫ হাজার টাকা অনুদান দেন। বিশাল অঙ্কের একক অনুদানের কারণে রাজশাহী জেলা বোর্ডের দান করা জমিতে মহারানী হেমন্ত কুমারীর নামেই ওয়াটার ওয়ার্কস স্থাপিত হয়। সেই সময় ঢোপকলে পানি সরবরাহ ব্যবস্থার পাইপগুলো ছিল কাস্ট আয়রনের এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যগুলো পিতলের তৈরি ছিল। সিমেন্টের তৈরি ঢোপকলগুলো ছাড়া অন্য সবকিছু ইংল্যান্ড থেকে প্রস্তুত করে আনা হয়।
সেই সময় হেমন্ত কুমারী ওয়াটার ওয়ার্কসের প্রতিদিন ৭০০ মিটার কিউব ভূ-গর্ভস্থ পানি শোধন করা যেত। এই পানি শোধন কেন্দ্রে ধাতব পদার্থ আয়রন, ম্যাঙ্গানিজ ও পানির ক্ষার দূর করার ব্যবস্থা ছিল। এই শোধন করা পানি নগরীর মোড়ে মোড়ে পেঁৗছে দিতে তখন ১০০টিরও বেশি ঢোপকল স্থাপন করা হয়েছিল। রাজশাহীবাসী দীর্ঘ প্রায় ৮০ বছর মহারানী হেমন্ত কুমারীর সেই ওয়াটার
ওয়ার্কস থেকে বিশুদ্ধ পানি পেয়েছেন। এই ঢোপকলগুলোর প্রতিটির পানি ধারণক্ষমতা ৪৭০ গ্যালন। প্রতিটি ঢোপকলেই ছিল একটি 'রাফিং ফিল্টার'। এতে বালি ও পাথরের স্তর থাকায় সরবরাহ করা পানি আরও পরিশোধিত হয়ে বের হতো। সেই সময় সারাদিনে মাত্র দুই ঘণ্টা পানি সরবরাহ করা হতো। মোড়ে মোড়ে ঢোপকলগুলোতে পানি ধরে রাখা হতো। ফলে সারাদিনই পানি পাওয়া যেত। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের এমন ব্যবস্থা বাংলাদেশের মধ্যে শুধু রাজশাহী পৌরসভা এবং দিনাজপুরের কোথা কোথাও ছিল। পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলায়ও ছিল এ ধরনের ঢোপকল।
রাজশাহীতে গত এক যুগে ভেঙে ফেলা হয়েছে প্রায় ৬০টি ঢোপকল। রাজশাহী ওয়াসার সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুর রহমান অবশ্য এখনও নগরীতে ৪৭টি ঢোপকল রয়েছে বলে জানালেন। তিনি বলেন, এগুলোর মধ্যে পানি সরবরাহ চালু আছে ৩৩টিতে। তিনি বলেন, 'ওয়াসার পানি রাজস্বের বিনিময়ে দেওয়া হয়। ঢোপকল থেকে কোনো রাজস্ব আসে না। তার পরও আপাতত পানি সরবরাহ চালু রাখা হয়েছে। তবে রাজস্ব না আসায় ওয়াসা থেকে ঢোপকল সংস্কার করা হচ্ছে না। তাই ধীরে ধীরে ঢোপকলগুলো বাতিল হয়ে যাচ্ছে।'
রাজশাহী সিটি করপোরেশনের প্রধান প্রকৌশলী আশরাফুল হক বলেন, 'রাস্তা সম্প্রসারণের জন্য অনেক ঢোপকল ভেঙে ফেলতে হয়েছে। তাছাড়া আধুনিক যুগে প্রায় সব বাড়িতেই পানি সরবরাহ আছে। যে কারণে এগুলোর ব্যবহারও খুব বেশি হয় না।' তিনি বলেন, 'ঢোপকল আর ব্যবহারের জন্য নগরীতে রাখা হবে না। এর ভেতরে শ্যাওলা জমে যায়। পানি পড়ে ফুটপাত নষ্ট হয়। তাই একে এখন শুধু প্রদর্শনীর জন্য রাখা হবে। বরেন্দ্র জাদুঘরে দুটি, সিঅ্যান্ডবি মোড় থেকে ডিআইজি অফিস পর্যন্ত তিনটি এবং কাজলায় মাহবুর রহমানের আর্কাইভে একটি ঢোপকল প্রদর্শনীর জন্য রাখা হয়েছে। কিছু ঢোপকল পার্কেও প্রদর্শনীর জন্য দেওয়া হবে। এগুলো আর ব্যবহার করা হবে না।'
রাজশাহী ফিল্ম সোসাইটির সভাপতি আহসান কবির লিটন করপোরেশনের এ সিদ্ধান্তের সমালোচনা করে বলেন, 'ঐতিহ্য কখনও জাদুঘরে রেখে সংরক্ষণ করা যায় না। ঐতিহ্য সংরক্ষণ করতে হলে পুরনো জায়গায় রেখেই করতে হবে। ঢোপকলগুলো বহুকাল ধরে রাজশাহীর মানুষের কাছে গৌরবের ধন হয়ে আছে। এগুলো না ভেঙে যদি সংস্কার করে চালু রাখা যায় তাহলে গরিব মানুষ পানিও পেতে পারে।