উদ্বোধনের আগেই দেবে গেল একাংশ

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬      

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম ও বিপুল দাশ, মিরসরাই

উদ্বোধনের আগেই দেবে গেছে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের একাংশ। মহাসড়কের মিরসরাই পয়েন্টে প্রায় সাত কিলোমিটারের একাংশ দেবে আরেক অংশ ওপরে উঠে গেছে। উদ্বোধনের আগেই মহাসড়ক দেবে যাওয়ার এমন ঘটনা নজিরবিহীন বলে মন্তব্য করেছেন ব্যবসায়ীরা। নিম্নমানের কাজের কারণে এ ঘটনা ঘটেছে বলে দাবি তাদের। প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার তালিকায় থাকা এ প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার পর আগামী ডিসেম্বরে সড়ক উদ্বোধন হওয়ার কথা। গুরুত্বপূর্ণ এ সড়ক দিয়ে প্রতিদিন চলাচল করে অন্তত ৪৫ হাজার গাড়ি। চট্টগ্রাম বন্দর ও দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের সঙ্গে যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম এ সড়ক। তাই দেবে যাওয়া অংশে ঝুঁকি নিয়েই চলছে যান।
চার লেন সম্প্রসারণ প্রকল্পের অতিরিক্ত পরিচালক প্রকৌশলী অরুণ আলো চাকমা বলেন, 'সড়কের কাজ শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে যানবাহন চলাচল শুরু করে দেওয়া, অতিরিক্ত মালপত্র বোঝাই যানবাহন চলাচল ও অতিরিক্ত বিটুমিনের ব্যবহার হওয়ায় সড়কের এক পাশ দেবে গেছে। এটি মারাত্মক কোনো ত্রুটি নয়।' এ প্রসঙ্গে চার লেন প্রকল্পের ব্যবস্থাপক জুলফিকার আহমেদ বলেন, 'ঢাকামুখী সড়কে মালপত্র বোঝাই যানবাহনের চাপ থাকে বেশি। মালবোঝাই ভারী যানগুলো ডিভাইডারের পাশ দিয়েই বেশি চলাচল করে। এক জায়গা দিয়ে গাড়ির চাকা যাওয়ার কারণে কার্পেটিংয়ের নিচের কংক্রিট সরে সড়ক একটু দেবে গেছে। এখন প্রায় সাত কিলোমিটার সড়ক মেলিং মেশিন (কার্পেটিং কাটার স্বয়ংক্রিয় যন্ত্র) দিয়ে কেটে নতুন করে কার্পেটিং করা হচ্ছে। এ কাজ শেষ করতে কমপক্ষে ১৫-২০ দিন লাগবে।'
সরেজমিন চিত্র : মিরসরাইয়ে চট্টগ্রাম থেকে ঢাকামুখী সড়কের নিজামপুর কলেজ, ডাকঘর, বড়তাকিয়া, মিরসরাই সদর, মিঠাছড়া, ঠাকুরদীঘি, সোনাপাহাড় এলাকার সাত কিলোমিটারের বেশি অংশজুড়ে মহাসড়ক দেবে গেছে। দেবে যাওয়া অংশ উঁচু-নিচু হয়ে যাওয়ায় মিলিং মেশিন দিয়ে কাটিং করে আবার কার্পেটিং করার কাজ চলছে। দেবে যাওয়া সড়কেই ঝুঁকি নিয়ে চলছে চট্টগ্রাম বন্দরে আসা-যাওয়া করা ভারী যানবাহন। এ জন্য প্রায়ই ঘটছে দুর্ঘটনা। বৃষ্টি হওয়ায় দুর্ঘটনার ঝুঁকি ক্রমেই বাড়ছে। দ্রুত সংস্কার করা না গেলে দেবে যাওয়া সড়কে পানি জমে নষ্ট হয়ে যাবে পুরো কার্পেটিং। মিরসরাইয়ের ধুমঘাট থেকে মিরসরাই সদর অংশে চার লেনের কাজ করে রেজা কনস্ট্রাকশন আর মিরসরাই সদর থেকে মিরেরহাট পর্যন্ত অংশের কাজে করে সিনো হাইড্রো নামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। রেজা কনস্ট্রাকশন তাদের কাজ শেষ করে গত জানুয়ারি মাসে কর্তৃপক্ষকে মহাসড়কটি বুঝিয়ে দেয়। তবে এক বছর এ সড়ক সংস্কারের দায়িত্ব ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের। তাই অফিস গুটিয়ে নিলেও রেজা কনস্ট্রাকশন ৮ জুন
থেকে দেবে যাওয়া অংশের কাজ আবার শুরু করেছে।
কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন :স্থানীয়রা বলছেন, নিম্নমানের বিটুমিন ব্যবহার হয়েছে এই মহাসড়কে। আবার মহাসড়কের জন্য ভিত্তি যথাযথভাবে তৈরি না করেই দেওয়া হয়েছে কার্পেটিং। ভিত্তির মাটি সরে গিয়ে তাই দেবে গেছে মহাসড়ক। ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের গুরুত্ব প্রসঙ্গে এফবিসিসিআইর সহসভাপতি ও পোর্ট ইউজার্স ফোরামের চেয়ারম্যান মাহাবুবুল আলম বলেন, 'প্রতিদিন গড়ে ৪৫ হাজার গাড়ি চলাচল করে এ মহাসড়ক দিয়ে। চট্টগ্রাম বন্দরের বাণিজ্যও নির্ভরশীল এ মহাসড়কের ওপর। গুরুত্বপূর্ণ এ মহাসড়ক নির্মাণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের যথাযথ নজরদারি থাকা প্রয়োজন।' এ প্রসঙ্গে জুনিয়র চেম্বার চট্টগ্রামের সভাপতি ও ম্যাফ সুজের নির্বাহী পরিচালক জসিম আহমেদ বলেন, 'নিম্নমানের কাজ না হলে কোনো মহাসড়ক উদ্বোধনের আগে দেবে যেতে পারে না। শিগগির এ সমস্যার সমাধান না হলে আসন্ন ঈদে ভোগান্তি পোহাতে হবে লক্ষাধিক যাত্রীকে।' মিরসরাই বড়তাকিয়া বাজারের ব্যবসায়ী শাহ আলম বলেন, 'ঢাকামুখী সড়কে চট্টগ্রাম থেকে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের মালাপত্র বোঝাই ট্রাক চলাচল করে বেশি। চার লেন প্রকল্পে ঢাকামুখী সড়ক নির্মাণে ভরাটের জন্য মাটি তোলা হয় সড়কের পাশে বড় বড় গর্ত করে। তা ছাড়া মাটি ভরাটের পর দ্রুতগতিতে নির্মাণ কাজ শেষ করা হয়। সড়কের পাশে গর্ত থাকায় ভারী যানবাহনের চাপে সড়কের নিচ থেকে সরে গেছে মাটিও।' যথাযথভাবে কাজ তদারকি করা হলে এমনটি হতো না বলে মনে করেন তিনি।
সময় বাড়ল চারবার, ব্যয় বাড়ল পাঁচবার :এ মহাসড়ক চার লেনে উন্নীত করতে প্রকল্পের মেয়াদ প্রথমে নির্ধারণ করা হয় ২০০৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০১২ সালের জুন পর্যন্ত। তবে কাঙ্ক্ষিত গতিতে কাজ শেষ না হওয়ায় দ্বিতীয় ধাপে আবার সময় বাড়ানো হয় ২০১৩ সালের ?ডিসেম্বর পর্যন্ত। তৃতীয় ধাপে প্রকল্প শেষের সময় পুনর্নির্ধারিত হয় ২০১৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। এরপর ২০১৫ সালের ডিসেম্বরকে ডেডলাইন ঘোষণা করেন সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী। এ সময়েও কাজ শেষ না হওয়ায় চতুর্থ ধাপে সময় নির্ধারণ করা হয় ২০১৬ সালের ডিসেম্বর। এদিকে চার লেন তৈরির মূল উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাবনায় (ডিপিপি) প্রথমে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ২ হাজার ১৬১ কোটি ৩৮ লাখ টাকা। তবে প্রথম পর্যালোচিত ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ২ হাজার ৩৮২ কোটি ১৭ লাখ টাকা। বিশেষ ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে ?দাঁড়ায় ২ হাজার ৪১০ কোটি ১৭ লাখ টাকা। সময়ক্ষেপণ হওয়ায় এরপরও ক্রমেই বাড়তে থাকে ব্যয়। দ্বিতীয় পর্যালোচিত ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ৩ হাজার ১৯০ কোটি ২৯ লাখ টাকা। আর সর্বশেষ পঞ্চম দফায় বিশেষ ডিপিপিতে ব্যয় বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৮১৬ কোটি ৯০ লাখ টাকা।
ঝুঁকি নিয়েই চলছে যান : মহাসড়কে প্রতিদিন চলাচলকারী উত্তরা পরিবহনের বাসচালক আলমগীর হোসেন বলেন, 'ডিভাইডারের পাশ দিয়ে সড়ক দেবে গিয়ে ওপরের দিকে উঠে যাওয়ায় গাড়ি চলাচলে ঝুঁকি দেখা দিয়েছে। লোড গাড়ি বেশি গতিতে চালানোর সময় গাড়ির চাকা দেবে যাওয়া অংশে পড়লে গাড়ি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। বিশেষ করে বড় গাড়ি ও মোটরসাইকেল চালকদের বেশি সমস্যায় পড়তে হচ্ছে।' নিজাম উদ্দিন নামে এক ট্রাকচালক বলেন, 'সড়কের দেবে যাওয়া অংশে গাড়ি চালানোর সময় চালকদের সাবধান থাকতে হয়। উঁচু-নিচু অংশে চলার সময় গাড়ি নিয়ন্ত্রণে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অসতর্ক হলে গাড়ি উল্টে যায়। সড়ক দেবে যাওয়ার কারণে বৃষ্টি শুরু হলে দুর্ঘটনা বাড়বে।' জোরারগঞ্জ হাইওয়ে পুলিশের ইনচার্জ মোহাম্মদ ফরিদুল বলেন, 'মিরসরাই ও সীতাকুণ্ড অংশে ঢাকামুখী সড়কের ডিভাইডারের পাশ দিয়ে কার্পেটিং সরে দেবে গিয়ে ফুলে উঠায় মারাত্মক ঝুঁকি নিয়ে যানবাহন চলাচল করছে। এ কারণে কাভার্ড ভ্যান ও ট্রাক বেশি দুর্ঘটনার শিকার হচ্ছে। গত এক মাসে কমপক্ষে ২৫টি গাড়ি উল্টে দুর্ঘটনা ঘটে।'
ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান যা বলছে : রেজা কনস্ট্রাকশনের প্রকল্প কর্মকর্তা প্রকৌশলী সাখাওয়াত হোসেন বলেন, 'আমরা গত জানুয়ারি মাসে চার লেন কর্তৃপক্ষকে সাত নম্বর প্যাকেজের কাজ শেষ করে বুঝিয়ে দিয়েছি। মিরসরাই থেকে অফিসও গুটিয়ে নিয়ে গেছি। তবে চুক্তি অনুযায়ী আরও এক বছর সড়ক মেরামত আমাদের দায়িত্বে থাকবে। ওই মেরামত কাজ আমাদের চট্টগ্রাম অফিস থেকে দেখাশোনা করা হচ্ছে।' সড়কের বিভিন্ন অংশে দেবে যাওয়া সম্পর্কে তিনি বলেন, 'সড়কে নতুন মাটি ভরাট করা হয়েছে। গাঁথুনি দুর্বল হওয়ায় কোথাও কোথাও সড়ক দেবে যেতে পারে। তবে দু-একটি পয়েন্ট ছাড়া এমনটি হওয়ার কথা নয়। অতিরিক্ত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে এমনটি হতে পারে। তবে এটি মারাত্মক কোনো ক্রটি নয়।'