এক পরিবারে ২৫ দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬      

মুকিত রহমানী, সিলেট ব্যুরো

গ্রামের নাম পুটামারা। এ গ্রামের দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী এক পরিবারের জন্য রয়েছে আলাদা পরিচিতি। গ্রামের নাম শুনলেই সেই পরিবারের কাহিনী চোখের সামনে ভেসে ওঠে। কীভাবে পরিবারের একের পর এক সদস্য দৃষ্টি হারাচ্ছেন; কী করে তারা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়েও চালাচ্ছেন জীবন-সংসার। সিলেটের সীমান্তবর্তী কোম্পানীগঞ্জের ওই গ্রামটি দুর্গর্ম হওয়ায় তাদের খবর অনেকেরই জানা নেই। স্থানীয়রা মনে করেন, জানলে হয়তো আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানের সহায়তায় তারা ফিরে পেত চোখের আলো।
পুটামারা গ্রামে গিয়ে জানা যায়, ওই পরিবারের প্রায় অর্ধেক সদস্যই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বেশিরভাগ শিশু-কিশোর ও চার-পাঁচজন প্রাপ্তবয়স্ক লোক ছাড়া পরিবারটিতে প্রতিবন্ধীর সংখ্যা ২৫ জনে দাঁড়িয়েছে। কেউবা জন্মগত আবার কেউ তরুণ বয়স থেকে হয়েছেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বর্তমানে যারা দেখতে পায় হয়তো 'চিরায়ত নিয়ম অনুযায়ী' তারাও একদিন দৃষ্টি হারাবেন- এমন শঙ্কা তাদের প্রতিনিয়ত তাড়া করছে। চিকিৎসকরা বলেছেন, জেনেটিক কারণে ওই পরিবারের সদস্যদের ক্ষেত্রে এমনটি হতে পারে। কিন্তু পরিবারের সদস্যরা ও গ্রামের অনেকে বিষয়টিকে অভিশাপ ও অজানা রোগ হিসেবে দেখছেন। বিয়ে-শাদি ও সংসার করতে গিয়ে কঠিন বাস্তবতার মুখোমুখি হচ্ছেন ওই পরিবারের সদস্যরা। ২০০৭ সালের দিকে ঘটনাটি জানাজানি হলে সিলেটের বিশিষ্ট চক্ষু চিকিৎসক মোশাহিদ ঠাকুর এগিয়ে আসেন। তিনি কিছুদিন চিকিৎসা দিলেও আবার কার্যক্রম থেমে যায়।
উপজেলার ইছাকলস ইউনিয়নের পুটামারা গ্রামের আরজু মিয়া পেশায় কৃষক ছিলেন। তিনি ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। মারা গেছেন অনেক বছর আগে। তার ছয় ছেলে ও এক মেয়ের মধ্যে প্রথমে ছেলে খুরশিদ আলী (৯০) ও মেয়ে জয়তেরা দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। জয়তেরা এরই মধ্যে মারা গেছেন। খুরশীদ আলীর অপর ভাই তহুর আলী, আবদুন নুর ও তাদের পরিবারের অনেক সদস্যই এখন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। বর্তমানে আরজু মিয়ার অপর তিন ভাই ইসমাইল, আবদুল মছবি্বর ও জফর আলীসহ কয়েকজন দেখতে পান; কিন্তু তাদের পরিবারের অনেকেই দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী।
খুরশিদ আলী জানান, তাদের পূর্বপুরুষও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ছিলেন। তার মা শরবান বিবি ও বাবা আরজু মিয়া যৌবনে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে পড়েন। বর্তমানে তাদের এক পরিবার
থেকে আটটি পরিবার হয়েছে। দুটি পরিবার এক বাড়িতে থাকে। অপর পরিবার গ্রামেই আছে। তিনিসহ তার নাতি-নাতনিদের অনেকেই বংশের অভিশাপ বয়ে বেড়াচ্ছেন। খুরশিদ আলীর তিন ছেলে, তিন মেয়ের মধ্যে ছেলে আনছার মিয়া (৪০), দুদু মিয়া (৩৫), মেয়ে রিনা বেগম (২৫) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অন্যদিকে জয়তেরার পরিবারে তাকে বিয়ে করার পর তার স্বামী আম্বর আলী দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে যান। তারা জীবিত না থাকলেও তাদের তার ছেলে ঠাণ্ডা মিয়া (৬০), মেয়ে জবা বেগম (৪৫), রোশনা বেগম (৩০) ও নাতনি রহিমা বেগম (২০) দৃষ্টি হারিয়েছেন। খুরশিদ আলীর চাচাতো ভাই আবদুন নূরসহ (৬০) তার পরিবারে রয়েছেন পাঁচজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তারা হলেন- ছেলে জামাল উদ্দিন (৩৫), মেয়ে মরিয়ম বেগম (২০), দিলারা বেগম (৩০) ও সিতারা বেগম (২৫)। খুরশিদ আলীর আরেক চাচাতো ভাই তহুর আলীর পরিবারে রয়েছেন তিনজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এর মধ্যে তহুর আলী (৮০), তার ছেলে শামসুদ্দিন (৪০), নাতি রাজু মিয়া (১৮) রয়েছেন। তহুর আলীর ছোট বোন মৃত রাজিয়া বেগমও ছিলেন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। তারই ছেলে সুন্দর আলীও (৩৮) দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। এ ছাড়া অন্য ভাইদের পরিবারে আরও কয়েকজন দৃষ্টিহীন সদস্য রয়েছেন।
কথা হয় আবদুন নুরের ছেলে একমাত্র কর্মক্ষম দিনমজুর কামাল উদ্দিনের সঙ্গে। তিনি সমকালকে বলেন, 'কোনোদিন আমিও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী হয়ে যাব।' এই পরিবারে অন্ধত্বের সংখ্যা দিন দিন বাড়ছে দাবি করে তিনি বলেন, 'বিবাহযোগ্য ভাইবোন রয়েছে। কেউ বিয়ে দিতে চায় না আবার করতেও চায় না। যারা কাজ করত, তারা এখন চোখে দেখে না। সংসার কী করে চলবে? আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।'
২০০৭ সালে এগিয়ে আসে জালালাবাদ রাগীব-রাবেয়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। হাসপাতালের চক্ষু বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মোশাহিদ ঠাকুরকে প্রধান করে একটি টিমও গঠন করা হয়। পুরো টিম পুটামারা গিয়ে কাজ করে। ওই সময় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে তাদের চোখের গ্গ্নুকোমা সমস্যা পাওয়া যায়। কিন্তু চিকিৎসায় ফল পাননি ওই পরিবারের সদস্যরা। পরে কোনো চিকিৎসক বা চিকিৎসক দল তাদের সহায়তায় আর এগিয়ে আসেনি।
সিলেটের সিভিল সার্জন ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, 'বিভিন্ন কারণে তারা দৃষ্টিহীন হতে পারে। জেনেটিক কারণেও হতে পারে। সাধারণত এরকম অন্ধত্ব হওয়ার ঘটনা ঘটে না। তারা যোগাযোগ করলে অবশ্য আমরা পরামর্শ ও সহযোগিতা করব।'