আজ বিশ্ব শিশুশ্রম নিরসন দিবস

পরিবারের অর্থের জোগান দিতে ঝুঁকিপূর্ণ কাজে যাচ্ছে শিশুরা

প্রকাশ: ১২ জুন ২০১৬      

নাহিদ তন্ময়

খুলনা শহরের টুটপাড়ায় একটি গাড়ির গ্যারেজে কাজ করত ১২ বছরের শিশু রাকিব। বেতন একটু বেশি পাওয়ার আশায় মালিককে না জানিয়েই অন্য গ্যারেজে কাজ নেয় সে। আর এতে ক্ষিপ্ত হয়ে আগের গ্যারেজের মালিক কমপ্রেসারের নল রাকিবের পশ্চাৎদেশে ঢুকিয়ে হাওয়া প্রবেশ করিয়ে দেয়। একপর্যায়ে পেট বেলুনের মতো ফুলে মারা যায় রাকিব। এ ঘটনা গত বছরের ৩ আগস্টে।
গত ২৫ মে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের জরুরি বিভাগের সামনে থেকে অচেতন অবস্থায় উদ্ধার করা হয় ১১ বছরের নাছিমাকে। তারা পুরো শরীরে ছিল গুরুতর জখমের চিহ্ন। টানা তিন দিন হাসপাতালে অজ্ঞাত হিসেবে থাকার পর ময়মনসিংহ থেকে মা-বাবা এসে মেয়েকে শনাক্ত করেন। তবে এক সপ্তাহ চিকিৎসাধীন থেকে গত ২ মে মারা যায় নাছিমা। মা-বাবা জানান, মোহাম্মদপুর টাউন হলের পাশে শরিফুল নামের এক ব্যক্তির বাসায় গৃহকর্মীর কাজ নেয় সে। ওই বাসার গৃহকর্ত্রীর নির্যাতনের কারণেই নাছিমাকে এই পরিণতি বরণ করতে হলো।
রাকিব-নাছিমার মতো এভাবে প্রতিনিয়ত নির্যাতনের শিকার হয়ে মৃত্যুর দিকে ছুটছে অনেক শিশু। কেউ কেউ নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করতে গিয়ে পঙ্গুত্বও বরণ করছে। দরিদ্র পরিবারে অর্থের জোগান দিতে রাজধানীসহ সারাদেশের অসংখ্য শিশুকে করতে হচ্ছে নানা ঝুঁকিপূর্ণ কাজ। এ অবস্থার মধ্য দিয়ে আজ রোববার পালিত হচ্ছে আন্তর্জাতিক শিশুশ্রম নিরসন দিবস। এ উপলক্ষে গতকাল শনিবার এক বাণীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা শিশুশ্রম প্রতিরোধ ও শিশুদের কল্যাণে সরকারের পাশাপাশি সমাজের সব শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসার আহ্বান জানিয়েছেন।
এদিকে, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও) জরিপ অনুযায়ী, ৭৪ লাখ শিশু শ্রমিকের মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশই পরিবারের আয়ের প্রধান উৎস। দেশে শিশুশ্রম নিরসনের কথা বলা হলেও দারিদ্র্যের কারণে বর্তমানে নিয়ন্ত্রণহীনভাবে বাড়ছে
এ সংখ্যা।
২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিশুশ্রম নিরসন নীতি বাস্তবায়নের জন্য ২০১২ সালে পাঁচ বছর মেয়াদি জাতীয় কর্মপরিকল্পনা (২০১২-১৬) তৈরি করা হয়েছিল। তাতে ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসনের অঙ্গীকার করা হয়। ২০১৬ সালে এসে এ অঙ্গীকার কাগজে-কলমেই থেকে গেছে।
এ ব্যাপারে শ্রম ও কর্মসংস্থানমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেছেন, ২০১৬ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম নিরসন পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা না গেলেও তুলনামূলক এর সংখ্যা কমেছে। ২০২১ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম পুরোপুরি নিরসন করা হবে। এ নিয়ে একাধিক মন্ত্রণালয় কাজ করছে। তিনি আরও বলেন, ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম হিসেবে ৪২টি খাতকে চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে গার্মেন্টসসহ কয়েকটি খাতে শিশুশ্রম পুরোপুরি বন্ধ করা হয়েছে। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এটা বন্ধে প্রধান অন্তরায় পরিবারের সদস্যরাই। কারণ, শিশুদের আয়ের ওপরই অনেক পরিবার নির্ভরশীল।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো এবং আইএলও পরিচালিত ২০০২-০৩ সালের সর্বশেষ জরিপ অনুযায়ী, দেশে শিশু শ্রমিক ছিল ৪৭ লাখ। এদের মধ্যে ১৩ লাখ ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত। জরিপে সপ্তাহে ৪৩ ঘণ্টার বেশি কাজ করে এমন শিশুদের শিশু শ্রমিক ধরা হয়েছে।
এ নিয়ে সরকারি-বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান কাজ করলেও তাদের কাজে সমন্বয়ের অভাব আছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অনেক সংগঠন শিশুদের জন্য মহিলা ও শিশুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে আলাদা শিশু অধিদপ্তর করার দাবি জানিয়ে আসছে। ২০১৫ সালে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয় একটি শিশুশ্রম শাখা চালু করেছে। এ শাখার কাজ হচ্ছে, মন্ত্রণালয়ের অধীনে শিশুশ্রম নিরসনে যেসব কাজ হচ্ছে, সেগুলো দেখভাল করা।
আইএলওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের শিশু শ্রমিকরা প্রায় ৩৪৭ ধরনের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত। এর মধ্যে ৪২ ধরনের কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ ও ১৩ ধরনের কাজকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এসব কাজে নিয়োজিতদের অধিকাংশই পথশিশু। শুধু একবেলা খাবার জোগাড় করতে তারা দিনে ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত পরিশ্রম করে। এদের ৬৯ শতাংশই কোনো না কোনো শিশুশ্রমে নিয়োজিত।
জাহাজভাঙা, চামড়ার কারখানা, বিড়ি ও তামাক ফ্যাক্টরি, গ্যাস ফ্যাক্টরি, লেদ মেশিন, ওয়েল্ডিংয়ের কাজসহ ৪২টি কাজকে শিশুদের জন্য বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে উল্লেখ করে ২০১৩ সালে গেজেট প্রকাশ করে শ্রম ও কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়। এ ধরনের ঝুঁকিপূর্ণ কাজে শিশুদের নিয়োগ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করা হয়। এ ছাড়া জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের ৩২ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রাষ্ট্রগুলো অর্থনৈতিক শোষণ থেকে শিশু অধিকার রক্ষা করবে। ২০০১ সালে ঝুঁকিপূর্ণ শিশুশ্রম সম্পর্কিত আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা কনভেনশন নম্বর ১৮২ অনুসমর্থন করেছে বাংলাদেশ। বাস্তবে ঝুঁকিপূর্ণ শ্রম নিরসনে সরকার তেমন কোনো ভূমিকাই পালন করছে না।
সুনির্দিষ্ট আইন থাকার পরও গুটিকয়েক কারখানা ছাড়া এ আইন মানা হচ্ছে না। রাজধানীর বিভিন্ন মোটর ওয়ার্কশপ, লেদ কারখানা, ওয়েল্ডিং, গার্মেন্ট ও নির্মাণ শ্রমিক হিসেবে অসংখ্য শিশু কাজ করছে। রোদ-বৃষ্টিসহ নানা প্রতিকূল পরিবেশে কাজ করছে তারা। এতে শিশুদের শারীরিক সমস্যার পাশাপাশি মানসিক বৃদ্ধিও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। আক্রান্ত হচ্ছে নানা রোগব্যাধিতে। এসব কারণে দিন দিন শিশু অপরাধের সংখ্যাও বাড়ছে। তারা মাদক সেবন এবং পরিবহনের সঙ্গেও জড়িয়ে পড়ছে। চুরি, ডাকাতি, ছিনতাই এবং যৌনকাজেও শিশুদের বড় একটা অংশ ব্যবহৃত হচ্ছে।